মহিবুল আলম
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৪১ পিএম
অলংকরণ : মিজান স্বপন
আমি যখন নীলকে নিয়ে লিখছি তখন সে লিভিংরুমের মেঝেতে হাঁটছে আর নিজে নিজে কথা বলছে। কখনও আমার পায়ের কাছে আসছে। কখনও পা বেয়ে খানিকটা উঠে আবার নেমে যাচ্ছে।
সাধারণত নীল পা বেয়ে কাঁধে ওঠে। ডানা আধাআধি ফুলিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। পরিবারের সদস্যদের এক কাঁধ থেকে অন্য কাঁধে ওড়ে। টিভি দেখার সময় তারও টিভি দেখা চাই। আমরা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার সময় সে-ও যাওয়ার জন্য ছটফট করে। কয়েক মাস আগে আমরা দূরে ফ্রেজার আইল্যান্ডে চার দিনের হলি ডে-তে গিয়েছিলাম। তখন সে সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গে ছিল। হোটেলের খোলা রুমে থেকেছে। দূরদূরান্তের পথে গাড়ির খোলা জানালার পাশে হাওয়া খেয়েছে।
এখনও আমরা কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি টের পেলে নীল ওড়াউড়ি শুরু করে দেয়। দরজার কাছে চলে আসে। ডাকাডাকি শুরু করে। ওর জন্য আলাদা করে খাঁচা আছে। খাঁচার দরজা সবসময়ই খোলা থাকে। বরাবরই সে রাত ৯টার দিকে নিজে নিজেই খাঁচায় চলে যায়। এ ছাড়া সে সারাদিন বাসার এ রুম-ও রুম ঘুরে বেড়ায়। কখনও কখনও সে বাসার এটাসেটা ঠুকরে নষ্ট করে। আমাদের কারও কারও মোবাইলের কভার দু-দুইবার কিনতে হয়েছে। অন্য জিনিসপত্র বা আসবাবের কথা বাদই দিলাম। দু-একবার সে ঠুকরে ছিঁড়ে আমাদের হাজার ডলারের সম্পদও নষ্ট করেছে। রাগ করে একবার খাঁচায় সারাদিন আটকে রেখেছিলাম। এজন্য সে অভিমান করে পুরো একদিন পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে কথা বললেও আমার সঙ্গে কথা বলেনি। এমনকি তার প্রিয় খাবার দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও সে বলেনি।
আমি নীলকে নিয়ে লিখছি আর ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে দেখছি। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় এখন গ্রীষ্মকাল। বিশেষ করে কুইন্সল্যান্ড প্রদেশে গ্রীষ্মকালে বরাবরই চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। কখনও কখনও চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রাও উঠে যায়। তাই বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দই আলাদা। নীল মাঝেমাঝে বাসার কাচের দরজার কাছে চলে যাচ্ছে। নিয়মমাফিক শব্দ করে বৃষ্টিতে ভেজার আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমারও যে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে না, তা নয়। খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী করব, এই নীলকে নিয়েই তো এখন লিখছি।
নীল আমাদের সবার ভালোবাসার একজন। আমার মেয়ে অবন্তী স্কুল থেকে ফিরেই নীলকে তার রুমে নিয়ে যায়। এক-দুই ঘণ্টা তার সঙ্গে খেলে। সন্ধ্যার পর নীল চলে যায় ছেলে অনিমের দখলে। টিভি দেখার সময় বরাবরই আমার সহধর্মিণী জলির কাঁধে থাকে। টিভির প্রোগ্রামগুলো তারও দেখা চাই। আর জলি যখন কিচেনে রান্না করে বা বেসিনে কিছু ধোয়, তখন সে মহাউৎসাহ নিয়ে ডানা মেলে বেসিনের টেপের নিচে গিয়ে বসে। টেপ ছেড়ে দিলে কখনও কখনও ডানা ঝাপটে জলিকে ভিজিয়ে দেয়। ঠোঁট ফাঁক করে হাসে, আর কী সব মধুর শব্দ করে। নীল আছে বলেই বাসাটা সারাক্ষণ মুখরিত হয়ে থাকে।
।। দুই ।।
আমাদের সেই নীল নামের টিয়েপাখিটি একদিন হারিয়ে গেল। পুরো আটাশ ঘণ্টা আমার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। আটাশ ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট। সময়টা পুরোপুরি মনে আছে কারণ সেই আটাশ ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের সময়টার সম্পূর্ণটাই ছিল আতঙ্কের, উৎকণ্ঠার, বিরহের ও বিচ্ছিন্নতার। বাসাটাকে মনে হয়েছিল প্রেতপুরীর মতো নিস্তব্ধ। বাসার সবাই কথা বলছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল কেউ কথা বলছে না। সবাই সব কাজ করছে, কিন্তু কেউ যেন কিছুই করছে না। অনিম কতক্ষণ পরপর সটান হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকে, নীল নেই। অবন্তী সারারাত ঘুমায়নি, কিছুক্ষণ পরপর গুমড়ে কেঁদে ওঠে, নীল নেই। আমি যথারীতি ডিউটিতে গেছি, কিন্তু সারাক্ষণ কী একটা শূন্যতা। জলিও ডিউটি গেছে, কিন্তু অবসরেই চোখ ভেজাচ্ছে। সে কী বিচ্ছিন্নতা। নীলের বিচ্ছিন্নতার সেই আটাশ ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট!
এবার সেই গল্পটা বলি। কোনো এক স্তব্ধ বিকাল। ৩টা বাজে। আমি বাসার পেছনের উঠোনে শখের ছোট্ট সবজির বাগানে কাজ করছিলাম। ডাটা, লালশাক, পালংশাক, লাউ, করলা, শিম, পুঁইশাক ও ধনেপাতা। এমনকি ধুদুল-ঝিঙেও। সবজির গাছগুলো যত বড় হচ্ছিল না এর চেয়ে বেশি বড় হচ্ছিল আগাছা। আমি সেই আগাছাই সাফ করছিলাম। ঠিক সেসময় আমার মেয়ে দৌড়ে এসে বলল, বাবা, ‘একটা সমস্যা হয়ে গেছে?’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী সমস্যা?’
অবন্তী বলল, ‘নীল বের হয়ে উড়ে পাশের বাসায় চলে গেছে।’
‘পাশের বাসায় চলে গেছে মানে?’
‘তুমি কী করছ দেখতে আমি দরজা খুলে বাইরে আসছিলাম। নীল ডাইনিং টেবিলের ওপর বসেছিল। আমি দরজা খোলা মাত্রই ফুড়ুৎ করে উড়ে বাইরে চলে গেছে।’
আমি অবন্তীর কথাটা খুব যে গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছি, তা নয়। নীল এর আগেও দরজা খোলা পেয়ে ফুড়ুৎ উড়ে বের হয়েছে। আমরা বাইরে বসে থাকলে কাঁধে এসে বসেছে। আবার ফুড়ুৎ করে বাসার ভেতরেও চলে গেছে। দুই-তিনবার বাইরে কাঁধে নিয়ে ঘোরার সময় কোনো কারণে বিভ্রান্ত হয়ে ওড়ে প্রতিবেশীর বাসার গাছে চলে গিয়েছিল। আমরা গাছের নিচে গিয়ে হাত বাড়াতে বিনা দ্বিধায় হাতে চলে এসেছে। একবার তো কাঁধে নিয়ে ঘোরার সময় বিভ্রান্ত হয়ে উড়ে প্রতিবেশীদের তিনটা বাড়ি পেরিয়ে একটা উঁচু গাছে চলে গিয়েছিল। আমরা মই বেয়ে নামিয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। এরপর থেকে নীলকে কাঁধে নিয়ে আর বাইরে হাঁটি না। এমনিতে অবশ্য দরজা খোলা থাকলে সে বাইরে আসে আবার ভেতরে চলে যায়। আমরা বাসার ভেতরে থাকলে অবশ্য দরজা খোলা থাকলেও সে বাইরে যায় না।
অবন্তীর কথা শুনে তখনই আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, আমার বাসার পেছনের প্রতিবেশীর মাঝারি ধরনের নারিকেল গাছের একটা ডগার নীল বসে আছে। নীলকে আমাদের বাড়ি থেকেই ডাকলাম। সে আসে না। অবন্তী ডাকল, সে আসে না। এরই মধ্যে জলি চলে এলো। কিছুক্ষণ পর অনিম। আমরা সবাই ডাকলাম। নীল আসে না। কিন্তু গাছের ডগায় বসে পুটপুট শব্দ করে আমাদের ডাকাডাকির সাড়া দিচ্ছে। শেষে অনিম বলল, ‘চল বাবা, মই নিয়ে নীলকে নামিয়ে নিয়ে আসি’।
অনিম ও আমি তাই করলাম। মই নিয়ে প্রতিবেশীর বাসায় গেলাম। দরজায় করাঘাত করে জানান দিয়ে তাদের নারিকেল গাছের কাছে মইটা নিয়ে গেলাম। জলি ও অবন্তী আমাদের পেছনের উঠোনেই রইল। এরই মধ্যে আমাদের একজন প্রতিবেশীও বের হয়ে এলো।
আমি মই বেয়ে গাছের আধাআধি উঠে নীলের দিকে হাত বাড়ালাম। সাধারণত এ পরিস্থিতিতে সে হাত বাড়ালেই চলে আসে। এমনটা আগেও দুই-দুইবার হয়েছে। কিন্তু এবার ওর মাথায় কী ছিল কে জানে? সে হাত বাড়ানো মাত্রই শখানেক মিটার উড়ে গিয়ে রাস্তার পাশের আরেক প্রতিবেশীর গাছের মগডালে গিয়ে বসল। ব্যাপারটা আমাদের বেশ অবাক করল। ভাবলাম, নীল তো এমনটা কখনও করে না? জলি ও অবন্তী আমাদের পেছনের উঠোন থেকে দৌড়ে সেই গাছটার কাছে গেল। আমরা মই ফেলে গাছটার দিকে দৌড় দিলাম। এবার তাড়াহুড়ো করে কিছু করলাম না। নীলকে স্থির হতে দিলাম। আমরা গাছটা থেকে একটু দূরে গিয়ে জলিকে বললাম ডাকতে। নীল জলির কাঁধে বেশি বসে ও তার সঙ্গেই কথা বলে বেশি।
জলি নীলকে ডাকতে শুরু করল। নীল সময় নিলেও আস্তে আস্তে গাছের মগডাল থেকে অনেকটা নেমে এলো। সে আরও নামছে, আরও নামছে, জলি ব্যাকুল হয়ে ডাকছে। আমরা বাকি তিনজন চোখ বড় বড় করে তা দেখছি। ঠিক তখনই দুটো খয়েরি রঙের পাখি সেই গাছটায় এসে বসল। পাখি দুটো মনে হয় ওই গাছটাতেই থাকে। পাখি দুটো নীল থেকে কিছুটা ছোটই হবে, কিন্তু আমরা বুঝে ওঠার আগেই ওরা নীলকে আক্রমণ করে বসল।
খয়েরি পাখি দুটো তো জংলি পাখি, আর নীল আমাদের হাতে হাতে বড় হয়েছে। মারামারি বা বাইরের জগৎটা তেমন বোঝে না। তাই খয়েরি জংলি পাখি দুটোর আক্রমণে নীল প্রথমে একটা ‘ক্যায়েত’ শব্দ করে উঠল। তারপর বিভ্রান্ত হয়ে উড়তে শুরু করল।
নীল দিগ্বিদিক উড়ছে, পেছনে খয়েরি পাখি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাড়া করছে। একশ মিটার, দুইশ মিটার, পাঁচশ মিটার, আটশ মিটার কিংবা এক কিলোমিটার। বাড়ির পর পার্ক, পার্কের পর বাড়ি। প্যাসিফিক পাইনস সাবার্বে আমাদের টাসকি রাইজ স্ট্রিটটা যেহেতু পাহাড়ের খানিকটা উঁচুতে, তাই অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আমরা যতদূর দেখলাম, নীল উদ্ভ্রান্তের মতো উড়ছে আর খয়েরি পাখি দুটো তাকে আক্রোশে তাড়া করছে। একসময় দূরের বাড়িগুলো আড়ালে নীল হারিয়ে গেল। আমরা শুধু হতভম্বের মতো তাকিয়েই রইলাম।
।। তিন ।।
নীল হারিয়ে যাওয়ার পর আমাদের অবস্থা বলার মতো নয়। অতি শোক বলে একটা কথা আছে। আমরা চারজন অতি শোকে কতক্ষণ সেই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম, জানি না। ওদিকে বিকেলটা পড়ে আসতে শুরু করেছে। গ্রীষ্মের বিকেল, একটু দীর্ঘই হয়। কুইন্সল্যান্ড প্রদেশে অবশ্য ডে-লাইট সেভিন্স নেই। তারপরও সন্ধ্যা হতে হতে সাড়ে ৬টা-পৌনে ৭টা বেজে যায়। আমাদের একসময় টনক নড়ল, নীল তো হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
নীল যেদিকে উড়ে গেছে প্রথমে আমরা চারজন সেদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের প্যাসিফিক পাইনস সাবার্বে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পার্ক। পার্কে সারি সারি গাছ আর কংক্রিট বা ইট বিছানো হাঁটার পথ। আমরা হাঁটতে হাঁটতে পার্কের পর পার্ক, স্ট্রিটের পর স্ট্রিট পেরিয়ে গেলাম। এদিকে বিকেলটা আরও পড়ে এসেছে। দিনের আলো খানিকটা কমে এসেছে। নীলের গায়ের রঙ যেহেতু নীল, তাই তাকে একটা গাছে বসে থাকলেও খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া এতটুকু একটা টিয়ে পাখি শত শত গাছের মধ্যে কোথায় খুঁজব? যেন প্রশান্ত মহাসাগরে ঝাঁপ দিয়ে হাতের বাগদানের আংটিটা খোঁজার মতো অবস্থা...!
দিনের আলো আরও পড়ে এলো। আমরা আশাহত হয়ে আবার বাড়ির দিকে ফিরলাম। মনের মধ্যে একটা আশা সঞ্চার হয়েছিল, এরই মধ্যে যদি নীল আবার নিজে নিজে ফিরে আসে! দুই-চার-পাঁচ কিলোমিটার উড়ে গিয়ে কত পাখিই তো ফিরে আসে।
বাড়ি ফিরে দেখলাম, কোথায় নীল, তার টিকিটা পর্যন্ত নেই। আমরা নীলকে ডাকলাম, নীলের মতো করে ডাকলাম। ভাবলাম, হয়তো ফিরে এসে কোনো গাছে চুপটি করে বসে আছে। আমাদের ডাকে, আমার মেয়ে অবন্তীর ব্যাকুল ডাকে নীলের কোনো সাড়া নেই। শেষে অনিম বুদ্ধি করে বলল, ‘চলো বাবা, আমরা চারজন চারটা ভাগ হয়ে কয়েকটা স্ট্রিটের প্রত্যেকটা বাসায় ছোট্ট কাগজে লিখে নীলের মিসিং রিপোর্টটা করে আছি। সঙ্গে আমাদের মোবাইল নম্বর ও বাসার ঠিকানাটা দিয়ে আসব।’
অনিমের কথাটা আমার মনঃপূত হলো। ভাবলাম, নীল হয়তো আমাদের বাসা খুঁজে না পেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে অন্য বাসায়ও চলে যেতে পারে। এখানকার প্রত্যেকটা বাসা তো দেখতে একই রকম। ব্রিক্স অ্যান্ড টাইলস বাসা।
আমরা অতি দ্রুত ছোট ছোট কাগজে আমাদের বাসার ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর লিখে অনিমকে একদিকে পাঠালাম, আমি অন্যদিকে। আর অবন্তী যেহেতু এখনও ছোট, তাই তাকে জলির সঙ্গে দিলাম।
আমরা খুব বেশিদূর যেতে পারলাম না। মাত্র কয়েকটি স্ট্রিটের কয়েকটি বাসায়। এদিকে সন্ধ্যাটা পুরোপুরি নেমে এলো। আমরা হতাশ মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
সেদিন আমার ডিউটি ছিল। নাইটশিফট। সাধারণত ডিউটিতে যাবার আগে আমি ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে যাই। কিন্তু সেদিন কীসের ঘুম! অবন্তী বাইরে থেকে এসে সেই যে নিজের রুমে ঢুকেছে, আর বের হচ্ছে না। অনিমের একই অবস্থা। জলিই শুধু জানালার কাচ গলে বাইরে উঁকিঝুঁকি মারছে যদি নীল আসে। কিন্তু বাইরের সেই অন্ধকারে নীল কোথায় থেকে আসবে? নীল যে বহুদূরে হারিয়ে গেছে।
।। চার ।।
রাতে ডিউটির ফাঁকে নার্সিং স্টেশনে আমার কলিগ ও বন্ধু লোরা হ্যামিল্টন নীলের হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুনে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, ‘কাজী, এক কাজ করো, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড প্যাট ইন গোল্ড কোস্ট’Ñ এই ফেসবুক গ্রুপে গিয়ে জয়েন করে নীলের হারিয়ে যাওয়ার একটা স্ট্যাটাস দাও। গত বছর যখন আমার বিড়ালটা হারিয়ে গিয়েছিল, তখন এই গ্রুপের মাধ্যমে পেয়েছিলাম। সম্ভব হলে প্যাসিফিক পাইনস কমিউনিটি গ্রুপে গিয়েও জয়েন করে একটা স্ট্যাটাস দিতে পারো। আফটার অল নীল তো প্যাসিফিক পাইনস এরিয়াতেই হারিয়েছে।
নীল প্যাসিফিক পাইনস সাবার্ব ছেড়ে কোন এরিয়াতে উড়ে গেছে জানি না। যেভাবে দুটো খয়েরি রঙের পাখির তাড়া খেয়ে উড়তে দেখলাম! তারপরও লোরা হ্যামিল্টনের উপদেশটা মনঃপূত হলো। আমি নার্সিং স্টেশনে বসেই সেই দুটো গ্রুপে জয়েন করে মোবাইলের ফটো গ্যালারি থেকে নীলের একটা ছবি নিয়ে কয়েক লাইনের একটা স্ট্যাটাস দিলাম।
ডিউটি থেকে ফিরে সকালে ছেলেমেয়ে দুটোকে স্কুলে দিয়ে আমি আবার নীলকে খুঁজতে বের হলাম। জলি তখন ডিউটিতে। মর্নিং শিফট করছে। আমি একাই পার্কের পর পার্ক, স্ট্রিটের পর স্ট্রিট পেরিয়ে গেলাম। কোনো গাছ থেকে পাখির কোনো পরিচিত ডাক শুনলেই দৌড়ে সেই গাছটার নিচে যাই। কাকের সম্মিলিত ডাক শুনলেই ভাবি, ওরা বুঝি নীলকে আক্রমণ করেছে...! কিন্তু কোথায় নীল। ঘণ্টা দুয়েক এদিক-ওদিক দেখে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে এলাম।
৩টার দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, ফেসবুকের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড প্যাট ইন গোল্ড কোস্ট’ গ্রুপের অনেকে আমার স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছে। অনেকে আমার স্ট্যাটাস শেয়ার করেছে। ফেসবুকের মেসেঞ্জারেও বেশ কয়েকটা মেসেজ। এদের মধ্যে ডেল পালমার নামে একজন। সে আরও কিছু গ্রুপে নীলকে নিয়ে আমার স্ট্যাটাসটা শেয়ার করতে চায়। এজন্য সে নীলের আরও কিছু ছবি চাচ্ছে।
আমি তৎক্ষণাৎ নীলের কিছু ছবি মেসেঞ্জারে ডেল পালমারকে দিলাম। ডেল পালমার আমাকে কিছু পরামর্শ দিল। এই যেমন, নীল যে খাঁচায় থাকে, সেই খাঁচাটা বাইরে রাখতে। নীল যে খাবার পছন্দ করে, সেই খাবার খাঁচার ওপর বা আশপাশে ছিটিয়ে দিতে। নীল সবসময় যেখানে বসে সেই বসার স্থানটা খাঁচার ওপর রাখতে।
আমি জানি নীল অনেক দূরে চলে গেছে। আর সে আমাদের হাতে-হাতে বড় হওয়া ও বেড়ে ওঠা। বাইরের জগৎ সম্বন্ধে সে একেবারেই অজ্ঞ। এরই মধ্যে ২৫ ঘণ্টা চলে গেছে। ততক্ষণ বেঁচে আছে কি না কে জানে। বিড়াল-কুকুর তো আছেই, দাঁড়কাকও ঠুকরে ঠুকরে নীলকে মেরে ফেলতে পারে। তার ওপর ২৫ ঘণ্টা সে না খেয়ে না পান করে আছে।
এরই মধ্যে জলি ডিউটি শেষে অনিম-অবন্তীকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। আমি খাঁচাটা আমাদের বাসার পেছনের উঠোনে রেখে, তার ওপর একটা বাটিতে নীলের কিছু প্রিয় খাবার রেখে জলিকে নিয়ে আবার বের হলাম। প্রথমে গাড়ি নিয়ে পুরো প্যাসিফিক পাইনস সাবার্বের পার্কঘেঁষা প্রায় প্রতিটি রাস্তা ও আনাচেকানাচে ঘুরলাম। এভাবে দেড় ঘণ্টার মতো ঘোরার পর বাসায় ফিরে পনেরো-বিশ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হলাম। এবার জলি ও আমি হেঁটেই বের হলাম। অনিম ও অবন্তী তখন মন খারাপ করে যার যার রুমে। ওরা নীলের আশা ছেড়েই দিয়েছে। আমার আর জলির মধ্যেও নীলকে পাওয়ার ব্যাপারে ক্ষীণতম আশা নেই। তারপরও মন তো মানে না। নীলকে খুঁজতে সেই পার্কের পর পার্ক, স্ট্রিটের পর স্ট্রিট হাঁটলাম।
এদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শরীর ও মনের অবসাদ নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যাটা পুরোপুরি কালি অন্ধকার হয়ে নামল। বাসায় ঢুকে আমি ওপরে নিজের স্টাডিরুমে চলে গেলাম। জলি কী মনে করে বাসার পেছনের উঠোনে গেলে। ওখান থেকেই সে চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘নীল ফিরেছে...!’
আমি দৌড়ে নিচে নামলাম। অনিম ও অবন্তী রুমে থেকে বের বাসার পেছনের উঠোনের দিকে দৌড় দিল। আমরা জানালার কাচ গলা আলোতে দেখলাম, নীল খাঁচার ওপর বসে আছে। আমাদের দেখেই নীল খাঁচার ওপর থেকে উড়ে এসে একবার আমার কাঁধে বসে তো পরক্ষণ জলি বা অবন্তীর কাঁধে। একবার অনিমের কাঁধেও বসে গেল। আমাদের সবার চোখ তখন ভিজে উঠল।
বাসার ভেতর ঢুকে নীল কতক্ষণ গোগ্রাসে খেল। তারপর তার কত কী গল্প! আমাদের নীল নামক টিয়ে পাখিটার সব ভাষা তো আমরা বুঝি না। কিন্তু তারপরও সেদিন আমরা নীলের গল্পের মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ।