হাবীব ইমন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৩২ পিএম
অপু ইসলাম বাংলা ও ইংরেজিতে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করে সাহিত্য জগতে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। তার স্বল্পগল্প ‘ছালেহার কালো বোরখা’ অনলাইন ও মুদ্রণ উভয় মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা দেখায় যে তিনি কেবল কবিতাতেই সীমাবদ্ধ নন, গল্পের মাধ্যমে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছেন। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও স্যাটায়ারধর্মী লেখাতেও তিনি পারদর্শী। ২০২৪ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত তার কাব্যগ্রন্থ ‘খেয়ালি বাতাস’ কেবল একটি বই নয়, এটি মানবমনের গভীরতা, জীবনের অস্থিরতা এবং প্রকৃতির প্রতিচ্ছবির শৈল্পিক উপস্থাপন।
‘খেয়ালি বাতাস’ গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় জীবন, আশা, হতাশা ও মানবিক
সংবেদনশীলতার গল্প ফুটে ওঠে। এই বইয়ের বড় শক্তি হলো বিষয়বস্তুর বহুমাত্রিকতাÑ প্রেম,
প্রকৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠোর সমালোচনা।
কবি প্রকৃতিকে কেবল বর্ণনার জন্য ব্যবহার করেননি, বরং মানবজীবনের রূপক হিসেবে উপস্থাপন
করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘খেয়ালি বাতাস’ কবিতায় বাতাসকে জীবনের গতি ও অনিশ্চয়তার প্রতীক
হিসেবে দেখা যায়।
কিছু কবিতা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখা, যা পাঠককে যুদ্ধ,
বর্ণবাদ ও মানবিক সংকটের দিকে ভাবায়। ‘আমি রয়ে যাবো এখানে’, ‘তার আরও বেঁচে থাকার কথা
ছিল’ এবং ‘সাদা পায়রার মৃত্যু’-এর মতো কবিতায় দেখা যায়, কেবল সমাজের চিত্র নয়, বরং
মানবিক ও ন্যায়সংগত পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা কবিতায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতি, প্রেম ও সময়ের অনন্ত খেলা প্রকাশিত
হয়ে এসেছেÑ জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, হেলাল হাফিজসহ অনেকে এই ধারার অংশ। সেই ধারাবাহিকতায়
অপু ইসলামের ‘খেয়ালি বাতাস’ পাঠে নতুন অভিজ্ঞতা লাভ বইকি।
‘মনু নদীটি উত্তাল ছিল একসময়
উপচে পড়া জলরাশি
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো
নদীর জলে সাঁতার কেটে।’
এখানে নদীর উত্তাল জল, সাঁতার কাটা ও ঝরে যাওয়া ফুলের চিত্র জীবনের
ক্ষণস্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। পাঠকের মনে সৃষ্টি হয় বেদনা ও আশার মিশ্র
অনুভূতিÑ যা জীবন ও মৃত্যু, ক্ষণস্থায়ীতা ও স্থায়িত্বের মধ্যে সংলাপ তৈরি করে। যেমনÑ
‘মৃদুমন্দ বাতাসে কেঁপে ওঠা/পাতার শব্দ ভেসে আসে,/সময়ের চাকাতে ডাইরিও/গল্প করতে থাকে;/কেউ
সুখের গল্প বলতে থাকে,/ আবার কেউ নিজেকে/চুরি করতে আসে।’
এখানে পাতার শব্দ মানুষের অন্তরের ক্ষুদ্র বেদনা ও সংবেদনশীলতার প্রতীক
হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ডাইরির গল্প হলো সময়ের ধারায় প্রতিটি মুহূর্তের রেকর্ডÑ সুখ,
বেদনা, আশা বা হতাশা সবই সমন্বিত।
সমকালীন মানুষের বড় একটি অভিজ্ঞতা হলো একাকিত্ব। নিম্নোক্ত লাইনগুলোর
মধ্যে তা ফুটে উঠেছেÑ রাতের আকাশে দেখা/নক্ষত্রের ভিড়ের মধ্যে/অনেকেই আজ মৃত,/অনেক
আবার সদ্যোজাত;/সংখ্যার হিসাব যদিও করা যায় না।’
রাতের আকাশের নক্ষত্রের ভিড়ে জীবনের মানুষদের তুলনা করা হয়েছে। এখানে
ভিড়ের মধ্যেও অন্তরের শূন্যতা ফুটে ওঠেÑ পাঠককে প্রশ্নে ফেলে দেয়, ভিড়ের মধ্যেও কেন
আমরা এত একা?
দেশপ্রেমের অনুভূতিও কাব্যগ্রন্থে গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে :
‘কজনই বা রক্ত বন্যায় চুকিয়েছে বাংলার দাম?/ বিদেশি ভাষা কি পারতো/সাতই মার্চের বঙ্গবন্ধুর
বজ্রকণ্ঠের স্রোত/বইয়ে দিতে রক্তের শিরায় শিরায়?/নাকি পারে ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায়
ভালোবাসি।’
কবির প্রশ্ন, কতজন বাংলার স্বাধীনতার জন্য আত্মদান করেছেন, এবং বিদেশি
ভাষা কি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বা মাতৃভাষার উদ্দীপনা ফুটিয়ে দিতে পারে? অন্যদিকে ‘ফরগোটেন
হিরো’ কবিতায় কবি দেশের মানুষের অমর শ্রদ্ধা স্মরণ করেছেনÑ যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে
মুক্তিযুদ্ধের সহায়তা করেছিলেন।
প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের সূক্ষ্ম দিক তুলে ধরেছে কবি :
ভালোবাসো যদি
তোমার অন্তরে আমিও প্রেম পৌঁছে দিতে পারি
হৃদয়ের খোলা দুয়ার দিয়ে।
আর যদি প্রত্যাখ্যান করো
হৃদয় দেয়ালে মাথা ঠুকরে মজনু হয়ে যাবো।
হৃদয়ের খোলা বা বন্ধ অবস্থা, প্রেম ও বেদনাÑ সবই সৃজনশীলতার উৎস হিসেবে
দেখানো হয়েছে। ব্যর্থ প্রেম ও বেদনার মাধ্যমে নতুন সৃষ্টি ও সৌন্দর্যে রূপান্তরিত হতে
পারে।
এ বইয়ে ‘সাপ ও ওঝা’ কবিতায় কবি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের বৈষম্য,
শক্তি ও ন্যায়হীনতার প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। মূল ভাব হলো : ইসরায়েলের
জঙ্গি-নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা কখনোই অ্যান্টি-সেমিটিজম নয়। ইতিহাসে ন্যায়হীনভাবে ক্ষমতাশালীদের
অপরাধ বিচার করা হয় না; তারা ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ নিয়মে বেঁচে থাকে। কবি নীরবতা
না মেনে কলম, কিবোর্ড ও মিছিলে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সহজ ভাষা, সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত। জটিলতা নেই, সরাসরি পাঠকের সঙ্গে
সংযোগ স্থাপন। চিত্রকল্প ও রূপকের ব্যবহার কবিতার ভাবকে শক্তিশালী করে। আবেগ ও বুদ্ধিমত্তার
সমন্বয় পাঠককে হৃদয় ও মনের দুই দিকেই স্পর্শ করে। তিনি প্রকৃতির সাধারণ দৃশ্যকে রূপক
করে তোলেনÑ বৃষ্টি অশ্রু, বাতাস স্পর্শ, মাটি দেশপ্রেমের প্রতীক। শব্দচয়ন মৃদু, ছন্দ
হালকা, কিন্তু ভাব গভীর। বর্তমানের দ্রুতগামী জীবনে এই কবিতা পাঠকের জন্য নিঃশ্বাস
নেওয়ার জায়গা তৈরি করে।
‘খেয়ালি বাতাস’ কখনও প্রকৃতির সঙ্গে, কখনও স্মৃতির সঙ্গে, আবার কখনও
দেশপ্রেমের সঙ্গে পাঠককে যুক্ত করে। নিঃসঙ্গতার সুর, মানবিক স্পর্শ ও জীবনচেতনার প্রতিফলনÑ
এই সব মিলিয়ে অপু ইসলামের কবিতার ভুবন আধুনিক বাংলা কবিতায় এক সতেজ, মৃদু অথচ গভীর
আবেগের হাওয়া। অনলাইনে বইটি রকমারি ডটকম-এ পাওয়া যাচ্ছে।
খেয়ালি বাতাস
অপু ইসলাম
বইয়ের ধরন : কাব্যগ্রন্থ
প্রচ্ছদ শিল্পী : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রকাশক : বোট অ্যান্ড অরস পাবলিকেশনস
দাম : ৩৫০ টাকা