হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:১০ পিএম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৮:৫৮ পিএম
উঠোনে ছড়িয়ে আছে সাদা সাদা কাঠগোলাপ। ঝরে পড়া এই পুষ্পের আঙিনা পেরোতেই দক্ষিণ দিক থেকে কানে ভেসে এলো গান। আহা! মরমি মধুর সে সুর। এই শরৎ সন্ধ্যায়। একদল গাইছেন গান। আরেক দল ছোটাছুটি করছে ছবি আঁকার সরঞ্জামাদি নিয়ে। কেউবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। এমন দৃশ্য চোখে পড়ল ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। যে দৃশ্যের কথা বলছি, সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি প্রাঙ্গণের। ওই দিন থেকে অনার্স ২৭তম ব্যাচের ১৫ জন শিক্ষার্থীর ৩৩টি চিত্রকর্ম নিয়ে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী।
মূলত এই উদ্দেশ্যেই যাওয়া। গ্যালারির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বাম পাশে ঝোলানো সৈয়দা আক্তার নাজনীনের আঁকা চিন্তামগ্ন এক তরুণীর ছবি দেখা গেল। কিছু সময় নিয়ে দেখলাম। ডান পাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে, ‘চূর্ণবিচূর্ণ’ শিরোনামের একটি চিত্রকর্ম। এটি এঁকেছেন অরণী হোসেন অথৈ। গ্যালারি ঘুরে দেখছি। প্রত্যেকের কাজ বিষয় আঙ্গিকে স্বতন্ত্র, নিরীক্ষার ছাপও যথেষ্ট।
চিত্রকর্ম : সিরাজুম মুনীরা
গ্যালারির দেয়ালে টানানো চিত্রকর্মগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন কবি ও শিক্ষক সাকিরা পারভীন। তার কাছে চলমান প্রদর্শনীর কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব শিল্পকর্মই আসলে সময়ের প্রতিবিম্ব। তার মধ্যে চিত্রকলা অনত্যম শক্তিশালী একটা মাধ্যম। যেখানে সময়ের এবং মানুষের ভেতরের যে আর্তি, বেদনা, ক্ষরণ, অস্থিরতা তুলে ধরা হয় রঙ-তুলির মাধ্যমে। এই প্রদর্শনীর চিত্রকর্মগুলো দেখে মনে হয়েছে বর্তমান বিশ্বে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার একটি প্রতিচ্ছবি যেন তুলে ধরেছেন শিল্পীরা তাদের কাজের মাধ্যমে।’ কথা বলতে বলতে গিয়ে তিনি দাঁড়ালেন, সিরাজুম মুনীরার আঁকা ‘এনিমাল ফার্ম’ শীর্ষক একটি কাজের সামনে। চিত্রকর্মটির দিকে তাকিয়ে এই দর্শনার্থী বলেন, ‘জর্জ অরওয়েলের লেখা উপন্যাস ‘এনিমাল ফার্ম’ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কাজ হয়েছে। বাংলাদেশেও বইটির অনুবাদ হয়েছে, যা আমার ভালো লেগেছে। এখানে সেই উপন্যাসের বিষয়কে ধারণ করে একজন শিল্পী ছবি এঁকেছেন, যা অনন্য এক প্রতিবাদ।’ এরপর তিনি এনিমাল ফার্মের চিত্রকরের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন, ‘প্রত্যেকের কাজ নিয়ে আলাদা আলাদা করে বলা সম্ভব নয়, প্রত্যেকের কাজ দেখলাম, তারা আসলে অস্থির পৃথিবীতে শান্তি খুঁজছেন।’
প্রদর্শনীর উদ্বোধক ছিলেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘এটা ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের অনার্স ২৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আয়োজন। প্রতি ব্যাচেই সেরা শিক্ষার্থীদের কাজ নিয়ে এমন আয়োজন হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এ প্রদর্শনী। তবে এবারে যে পনেরো জন শিক্ষার্থীর কাজ রয়েছে। তাদের কাজ সম্পর্কে বলি, ওদের শেষের দিকে ক্লাসওয়ার্ক দিয়েই এই প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে। কাজগুলো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানের। প্রত্যেকেরই কাজে সিগনেচার রয়েছে। ওদের প্রতি আমি আশাবাদী। সেই সঙ্গে এই প্রদর্শনী পরবর্তী শিক্ষার্থীদের কাছে এটি উৎসাহেরও বটে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভালো ভালো শিক্ষার্থীর কাজ একই প্লাটফর্মে দেখার সুযোগও বটে। মনে করি তরুণ শিল্পীদের জন্য এই ধরনের প্রদর্শনী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
চিত্রকর্ম : বনানী সিমলাই
যাদের কাজ নিয়ে এই আয়োজনÑ আনিকা তাবাসসুম ওশিন, অর্ণব দাস ধন্য, মাহমুদুল হাসান সিয়াম, শুভ্র দাস, তানভীর মালেক, সুরাইয়া রহমান, কৌস্তভ মানি পাঠাক (আসাম, ভারত থেকে), স্বস্তি বিশ্বাস, নিলয় রায় ও সুবর্ণ চক্রবর্তী তন্ময়।’ এই আয়োজনের নির্দিষ্ট কোনো কিউরেটর নেই। তবে অলিখিত দায়িত্ব পালন করছেন প্রদর্শনী রাকিন নাওয়ার। তার কাজও এখানে রয়েছে। তিনি সব দিক সামলে নিচ্ছেন। সঙ্গে সহপাঠীদের কাজের পরিচয় তুলে ধরছেন তিনি। প্রদর্শনীতে কাজ রয়েছে বনানী সিমলাইর। তরুণ এই শিল্পীর কাছে অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ৬ বছর একসঙ্গে ক্লাস করছি। আমার বন্ধুরা চমৎকার কাজ করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে সবার সঙ্গে এমন একটা প্রদর্শনীর অংশ হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত।’ সবার জন্য উন্মুক্ত এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। জয়নুল গ্যালারির দুয়ার খোলা বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।