ইরাজ আহমেদ
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৯ পিএম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:১৮ পিএম
চিত্রকর্ম : রফি হক
দূরে কোথাও গিয়ে ঘরে ফেরার সময় সবাইকে দেখি ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় যা কিছু ব্যাগপত্তর খুলে ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল তার সবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবার গুছিয়ে নিতে পারে দারুণ দক্ষতায়। আয়ু ফুরিয়ে আসা টুথপেস্টের টিউব থেকে শুরু করে ব্যবহৃত মোজাÑ বাড়ি ফেরার আনন্দে ক্যারোল গাইতে থাকে ব্যাগের গভীরে। আমি ছত্রখান। কত কী যে ভুল করে ফেলে আসি পিছনে! প্রায় অচেনা কোনো হোটেল ঘরের নির্জন বাথরুমে পড়ে থাকে আমাকে নিত্য তরুণ রাখতে গিয়ে ক্লান্ত রেজার, কোনো স্বজনের বাড়িতে সাময়িক শয্যাপাশে অর্ধেক পড়া দারুণ একটা বই অথবা ছোট্ট চিরুনি।
সত্যিই কি ভুল করে ফেলে আসি? নাকি রেখে আসি কিছু একটা আবার ফিরে যাব বলে? মানুষ কি ফিরে যায় কখনও! ফেরার পথটা যে ভীষণ কঠিন। ফেলে আসা নক্ষত্রের আলো এক পথে দুবার পড়ে না। জীবনে কিছু কিছু গল্প অর্ধ সমাপ্ত রয়ে যায়। কেউ একটা গল্প বলতে শুরু করে হঠাৎ থেমে যায় বাকিটা আরেকদিন শেষ করবে বলে। পেছনে ফেলে যেতে চায় কাহিনীর শেষ বাঁকটুকু আবার সেখানেই ফিরে আসবে বলে। কিন্তু ফেরা হয় না আমি জানি। একটা গল্প আরেকটা গল্পের ডালপালায় জড়িয়ে যায়। তারপর আরেকটা গল্প...তারপর আরেকটা...।
কারো মুখ পেছনে ফেলে আসি, স্টেশন ছেড়ে ক্রমশ অপসৃয়মান ট্রেনের জানালায় কারো হাতের রুমাল বাতাসে উড়ছে, ছোট বুক স্টোরের আলমারিতে শীতে একাগ্র মাকড়সার বুনে রাখা জাল, একটা পোস্ট অফিসের বারান্দায় রোদে দাঁড়িয়ে চিঠি পড়ছে কেউÑ সব, সব ফেলে চলে আসি জীবনের অন্য কিনারায়। কিন্তু স্মৃতি? ছায়াছবির রাস প্রিন্টের মতো ছবির পর ছবি, মনের পর্দায় বিশেষ ধরনের প্রজেক্টার থেকে ছবিতে আলোকরশ্মি প্রক্ষেপিত হয়। স্পষ্ট দেখতে পাইÑ সেই কবেকার কাকভোরে অবিরাম শিশিরের ফোঁটা, সেই মাঠের পর মাঠে সাবু দানার রঙের মতো ভোরের কুয়াশা; সন্ধ্যার অসাড় নিথর প্রান্তর; অন্ধকার ঘরে হ্যারিকেন রেখে যেতে এসে কারো কয়েক দণ্ড অকারণ দাঁড়িয়ে থাকা। দেখতে পাই, স্পষ্ট দেখতে পাই আজও যাদের ডাক নাম হয়তো মায়া। লিখে পরক্ষণেই ভাবছি, মায়া তো আসলে এক ধরনের চোরা টান মনের মধ্যে। ফিরে যাওয়ার আকুতি। ফেরা কাকে বলে?
এই যে আশ্বিন মাসের দুপুরে আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে নিচ্ছি, এই একই কাজ আমি বহুকাল আগে এক নির্জন দুপুরবেলা আরেকটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে করছিলাম। সেদিন হঠাৎ মনে হয়েছিল কেউ আড়াল থেকে আমাকে দেখছে। চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখি একতলা বাড়ির জানালা থেকে চকিতে একটি মুখ সরে গেল। পাশের বাড়ির চেনা কিশোরী এভাবেই তো চকিতে দেখা দিয়ে হারিয়ে যায়। আমাকে তার কিছু বলার ছিল? জানা হয়নি কখনও। সেই আয়নাও ভেঙে গেছে। পুরনো আয়না তো, ভেঙেই যায়। মাঝখানে শুধু সময়, স্পেস আর আকাশে নক্ষত্রদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে, ঘটতেই থাকে। কিন্তু স্মৃতি, যাকে একটু আগে মায়া বলে লিখলাম সে তো বেঁচে রইলো! একটি ভেঙে যাওয়া আয়নার নিয়তির ভেতর দিয়ে আরেকটি আয়নায় সে ভেসে ভেসে ফিরে আসে।
তোমার মুখ ভাবলে, এক নদী
বুকে আমার জলের ধারা তোলে...
ভোরের ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন আসে। দেখি, একটা বিছানার ওপর একটু ঝুঁকে একজন মানুষ বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে চলেছেন। তার ঠোঁট কাঁপছে, বিড়বিড় করে তিনি কিছু বলছেন। পাশেই রাখা একটা বালু ঘড়িতে ঝির ঝির করে ঝরে পড়ছে সময়!
আশ্চর্য, তিনি তো কবি আল মাহমুদ। প্রাচীন দৃষ্টি মেলে এই ভোরবেলা বসে হয়তো খুঁজছেন সেই মায়া! চমকে দেখি, কবি লিখছেন,
‘ফিরলে আজও পাব কি সেই নদী
স্রোতের তোড়ে ভাঙা সে এক গ্রাম?’
ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নও হারিয়ে যায় নিমেষে। কবি কি তার উত্তর খুঁজে পেয়েছেন? ভোরবেলা বিছানায় বসে ভেবে চলেছি।
কিছু মুখ ভীষণ বিদ্যুতের ফলার মতো মনের আকাশের দিগন্তকে চকিতে চিরে দিয়ে আবার আবার অন্ধকারে ডুব দেয়। সময় এমন কত মুখ পেছনে ফেলে আমাকে বয়ে নিয়ে চলে অন্য স্রোতে।
তখনও এই রাজধানী শহর পায়ে-মাথায় এত বেড়ে উঠেনি। সেই শহরের আপাত নিরীহ এক পাড়ার ছোট্ট বাড়িতে কারা তাকে তুলে এনে আটকে রেখেছিলÑ তা আজ বিস্মৃতই থাক।
তার মুখে শ্রাবস্তী রাজ্যের ঘরবাড়ির দেয়ালের কারুকাজ ছিল না। তবু কবেকার এক রাতে তার বিপর্যস্ত মুখের রেখা কয়েকটা দোমড়ানো সাদা কালো ছবি হয়ে মনের মধ্যে বেঁচে রইল। শেফালি এক নাগপাশে বাঁধা পড়া জীবন থেকে মুক্তি চেয়েছিল।
কবে কোথায় এক চিহ্নহীন কোনো গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। তখন তাই জেনেছিলাম। সেখানে অবিরল বয়ে চলা এক নদী ছিল কি না, ঘর ছিল কি না, ঘন পাতায় ঢাকা অরণ্য ছিল কি নাÑ কে জানে!
আমি শুধু জানি, এই শহরের আলোহীন এক মৃত বাড়ির উঠানে মরা পাখি আর সাপের খোলস দেখে শেফালি চমকে উঠেছিল। উদ্ধার করার পর বেজন্মা স্ট্রিট লাইটের আলোয় দেখা তার উদভ্রান্ত মুখ, খসখসে শুকনো গলায় বারবার বলা একটাই কথা, ‘আমারে বাঁচান। আমারে বাড়িতে দিয়া আসেন’ আমার মধ্যে আজও কেমন এক ছত্রভঙ্গ গল্প তৈরি করে। সেই ভাঙা আর আহত গল্পই তো তখন সম্বল ছিল শেফালির। মাছির হৃদয়ের মতো বেঁচে থাকা শহর, হে ধূসর শহর...কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কবি সমর সেনের লেখা একটি লাইন তখনও বেঁচে ছিল মনের মধ্যে। শেফালি বাঁচতে চেয়েছিল। এই শহর কোনোদিন কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পায় না। শেফালি বাঁচতে পেরেছিল কী?
তার মুখ মনে পড়ে আজও, তার গল্প মনে পড়ে আজও। মাঝে মাঝে সেই মুখ অন্ধকার আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে আবার মিলিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল তার? গ্রামে পৌঁছানোর পর তার জীবনের গল্পটা কেমন ছিল? এসব গল্পের ডালপালা সব মরে গেছে আমার ভিতরে। তবু শেফালি নামের সেই নিরুদ্দেশ মেয়েটিকে মনে পড়ে আজও।
গ্রামে ফিরে গিয়েছিল প্রতারিত শেফালি। হয়তো ফিরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিল অথবা আর বাঁচেনি শেফালির একরত্তি জীবন। কিন্তু সেই ছত্রভঙ্গ মুখ, সেই করুণ আকুতি তো আজও বেঁচে রইলো মনে! যদি কখনও শেফালির মুখোমুখি হওয়া যেত? এসবই কি মায়া? একটা ভীষণ গল্পের বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা উড়তে থাকে অচেনা বাতাসে।
মায়া কী ব্যাধিঘোর? নিঃসঙ্গ বুকের ভেতরে এক ভেলা, যা অনন্ত শীত অথবা বৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে মুছে যায় না। তাতে ভাসতে থাকে জীবনের বেহুলা তার স্মৃতির লখিন্দরকে নিয়ে। হয়তো আজীবন বিষাদের এক হিমবাহ আচমকা নেমে আসে মাথার ভেতরে। কোনো মুখ, ট্রেনের জানালায় রুমাল নাড়ে কেউ, পয়েন্টসম্যান সবুজ পতাকা দোলায় দূরে। ট্রেন চলে যায়। হেমন্তের বিমুখ মাঠের মতো মনে স্মৃতি রয়ে যায় আবার ফিরে আসার জন্য। একা লাগে, শীতে কাটা দিয়ে ওঠে সমস্ত শরীর। একে স্মৃতিকাতরতা বলা যায়? অথবা স্মৃতিগ্রস্ততা? মনের মধ্যে অসংখ্য দরজা খুলে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া কাজ করে। কারা এত দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আবার ফিরে চলে যাচ্ছে! তারা কি মৃত? তারা কি জীবিত?
জীবন এক আশ্চর্য গল্প মাত্র। যার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখাই হলো না মনের মধ্যে তার অজস্র চিঠি উড়ছে। আমি যেন উত্তর না পাওয়া এক ডাকঘর, কত কী ফেলে রেখে আসি আবার ফিরে যাওয়ার জন্য। ফেরা হয় না। জীবনানন্দ দাশ কী বুঝতে পারতেন সব! তাই মৃত্যুশয্যায় প্রশ্ন করেছিলেন, ‘একটা কমলা লেবু খেতে পারব?’ আহা, কী গভীর মায়া রয়ে যায় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে! পাহাড়, অরণ্য কোথাও বয়ে চলা শান্ত নদী কথা বলতে চায় হয়তো আহত আত্মার সঙ্গে।
নক্ষত্ররা অবস্থান বদলায় উত্তর আকাশে। দিনের আয়ু সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে।
‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সঙ্গে দেখা হয় যদি
আবার বছর কুড়ি পরে...’
দেখা হয় না আর জানি। তবু মায়া রয়ে যায় এই ভ্রমণে। শেষ হয়ে আসা পরিক্রমণের গল্পে কত কী ফিরে দেখার ইচ্ছে জাগে। বাতিঘর অন্ধকার রাতে যেরকম ছোট ছোট নৌকার ওপর স্বল্পায়ু আলো ফেলে ঠিক সেরকম। এক পুরনো কাঠের জাহাজের রাতের মাস্তুলে অস্থির হাওয়া আশ্রয় নেয়, চাঁদ ডুবে গেলে দিকভ্রান্ত পুরনো নাবিক চিৎকার করে ওঠে ভয় পেয়ে। আমি শুধু দেখতে পাই আর কোনো সমুদ্র যাত্রায় অনিচ্ছুক কাঠের জাহাজের গায়ে কবেকার সাদা নুন লেগে আছে, লেগে আছে সামুদ্রিক শ্যাওলার দাগ।