শুক্লা পঞ্চমী
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৪ পিএম
‘মায়া সবচেয়ে বিপজ্জনক ভালোবাসা, যার মোহে পড়ে মানুষ সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। অথচ বুঝে ওঠে না। কখন সে আবদ্ধ হয়েছে।’ এভাবেই বলেছেন, হুমায়ূন আহমেদ। সত্যি মায়া মানুষের অদ্ভুত অনুভূতি। এই অনুভূতির কোনো মাপ-জোখ নেই, যা সম্পর্কের টানাপড়েনের বেড়াজালে আটকে রাখে এবং হৃদয়ের গভীরে এক মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা দেহ ও মানের প্রতিটি কোনায় শিহরন তোলে ও আন্দোলিত করে। যেখান থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে পারে না।
মায়ার অর্থ কী? যদি আভিধানিকভাবে জানতে চাই তাহলে মায়ার অর্থ ব্যাপক। এটিকে একটি অর্থে সংজ্ঞায়িত করে। পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। কারণ মায়াকে কখনও একটি ছকে বাঁধা যায় না। যদি আমরা ভালোবাসা অর্থেই মায়ার ব্যাখ্যা দিতে চাই তবুও তা হবে ব্যাপক। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, সংসারের প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা, ঘরবাড়ির প্রতি ভালোবাসা। অর্থাৎ এই সংজ্ঞার কোনো ইয়ত্তা নেই। মায়া আছে, যা দৃশ্যবস্তুর আড়ালে। চোখ দিয়ে দেখা যায় না, চেনা যায় না, শুধু প্রাণ দিয়ে অনুভবের বিষয়। যেমন কোনো গল্প-কিচ্ছা। সেই না দেখা, না জানা গল্পটিকে সত্য বস্তু ভেবে মানুষ ভালোবাসায় এবং মায়ায় জড়িয়ে যায়। তাহলে কি মায়া আর ভালোবাসা আলাদা? অবশ্যই মায়া এবং ভালোবাসা আলাদা সত্তা।
ভালোবাসা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া যা পরিচর্যার ভেতর দিয়ে স্থায়ী এবং গভীর অনুভূতির তৈরি করে। আর মায়া হলো একটি ক্ষণস্থায়ী অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ দেখে বা শুনে যার প্রতি আসক্তি জন্মে। ভালোবাসাহীন মানুষ পৃথিবীতে নেই। এমনকি একজন ডাকাত লোকও ভালোবাসার দ্বারা, মায়ার দ্বারা আবদ্ধ হয়, যা আমরা বহু প্রাচীনকাল থেকে দেখে আসছি। প্রসঙ্গক্রমে আমরা মহুয়া নাটকে হুমরা বাইদ্যা ডাকাত সর্দারের কথা স্মরণ করতে পারি। ডাকাতি করতে গিয়ে ফুটফুটে সুন্দর এক কন্যাশিশু দেখে তার মায়ায় আবদ্ধ হয় এবং শিশুকে কোলে করে নিয়ে আসে। তাকে নিজের কন্যারূপে লালন-পালন করে।
আমরা আরও উদাহরণ দেখতে পাই শরৎচন্দ্রের বিভিন্ন গল্প এবং উপন্যাসে ধরা যাক তার ছোটগল্প ‘মহেষের’ কথা। গফুর তার প্রিয় গরুটির একটি নাম দিয়েই ক্ষান্ত হন নাই, এটির প্রতি যে ভালোবাসা এবং অগাধ মায়া দেখিয়েছেন এটি তা সম্পর্কের একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের কাবুলীওয়ালা ও বলাই গল্পের কথা ধরি।
বলাই তার নিঃসন্তান কাকিমার কাছে থাকত। মাতৃহারা বলাইয়ের কাকি নিজ সন্তানরূপে মানুষ করেছেন। বড় হলে পড়াশোনার জন্য বাবার কাছে চলে যায়। যাওয়ার সময় রান্নাঘরের চাইয়ের গাদার ওপর অযত্নে একটি শিশু গাছ বেড়ে ওঠে। বলাই সেই গাছটিকে যত্ন করত। চলে যাওয়ার সময় তার কাকিকে দায়িত্ব দিয়ে যায় যেন গাছটিকে আদর যত্ন করে বড় করে তোলে। কাকিও সেইমতো গাছটির যত্ন করে। বলাই তার কাকিকে চিঠি লেখার সময় গাছটি কত বড় হয়েছে, কেমন হয়েছে, জানতে চাইত। একসময় গাছটি এমন বড় হয়ে যায় যে কাকা গাছটিকে কাটতে বাধ্য হন। সেই সময় কাকিমার কাছে বলাইয়ের চিঠি আসে এবং কাকি গাছটির মোকে বিছানা নেন। বৃক্ষের প্রতি এমন ভালোবাসা ও মায়া রবীন্দ্রনাথ দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গাছটির প্রতি কাকিমার মমত্ববোধ দেখে বিস্মিত হতে হয়।
শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম তিনি তার প্রিয় বন্ধু ছেলে বেলার বন্ধু বিভূতিভূষণকে সোনার কলম পাঠিয়েছিলেন। উত্তরে বিভূতি লিখেছিলেন। ‘সোনার কলম দিয়ে কী করে লিখব?’ শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘তোকে এটা দিয়েই লিখতে হবে’ বিভূতিভূষণ জবাবে আবার বলেন ‘এ তো গয়না, এ দিয়ে কিছুতেই লিখতে পারব না। যেমনটা দিয়ে তুমি লেখো তেমনটিই দিও।’ তখন শরৎচন্দ্র সেই রকম কলমটি আবার পাঠিয়ে দেন। সেই সময় শরৎচন্দ্র তার ছেলেবেলার সব বন্ধুকে একই কলম পাঠিয়ে দেন। এই যে ভালোবাসার লেনা-দেনা মায়ার অনুভূতি তা যুগ যুগ ধরে চলমান।
ভালোবাসা এবং মায়া এই দুটির কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে যেভাবে গ্রহণ করে ঠিক সেভাবেই হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। ভালোবাসার কথা ভাবতে ভাবতে কত কবি সাহিত্যিক দার্শনিক ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের মতো প্রশ্ন রেখে গেছেনÑ ‘সখি ভালোবাসা কারে কয়?’
বই-পুস্তক বাদেও নাটক-সিনেমায় আমরা ভালোবাসা এবং মায়ার প্রগাঢ় অনুভূতি দেখতে পাই। বইতে যা পড়ি সিনেমায় তা দ্বিগুণ আকারে উদ্বেলিত করে। হৃদয়ে দাগ কাটে। পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী এমনভাবে ঘটনাকে সাজান তা সত্য বলে মনে হয়। তখন মানুষ সিনেমার চরিত্রের দুঃখে কাঁদে এবং জিতে গেলে আনন্দিত হয়। মানুষ সব সময়ই চায় ভালোবাসা জিতে যাক। প্রিয় চরিত্রটি যেন হেরে না যায়। আমাদের সবারই নাটকটির কথা মনে আছে যার ফাঁসির হুকুমের জন্য সারা বাংলায় মিছিল হয়েছিল। যেন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি না হয়। অর্থাৎ এ কথার অর্থ হলো মানুষ তার ভালোবাসার ব্যক্তিটির কোনোরূপ কষ্ট দেখতে পারে না। আবারও সেই দেবদাসের কথায় আসি। এই সিনেমা দেখে কাঁদেনি এমন মানুষ কম আছে। এমনও দেখেছি সিনেমা দেখে বের হয়ে পার্বতীকে গালিগালাজ করছে।
সিনেমার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকলেও মানুষ সিনেমার মতোই জীবনকে ভাবে। কিন্তু বাস্তব চরিত্রে তার উল্টোটাও হয়। সমাজে প্রেম-ভালোবাসাকে মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চায় না। প্রেম মানেই অপরাধ। এভাবে কত যুবক-যুবতীর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। জোর করে পরিবার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে। অথচ এদের মন থেকে সেই প্রথম প্রেমের মগ্নতা বা ইরোশন কেটে যায় না।
মানুষের প্রেম-ভালোবাসা কখন জাগ্রত হয় এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গ্রামের মানুষ বলেÑ কায়া দেখলে মায়া বাড়ে। অর্থাৎ সামনে আমলে প্রেম জাগ্রত হয় দূরে গেলে ভুলে যায়। এটাও আমি মনে করি সেই পরিচর্যার অংশ, যা প্রেমকে দীর্ঘস্থায়ী করে বাঁচিয়ে রাখে। মায়া জিনিসটারে মানুষ রোধ করতে পারে না। কারণ আবেগের সঙ্গে মায়া অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেজন্যই যখন মানুষের বেদনা অনুভূত হয় তখনই কান্না আসে। আমরা সামান্য জিনিস নিয়েও আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। মানুষের রাগ, অভিমান, বিচ্ছেদ সবকিছুর সঙ্গেই অশ্রু অনিবার্য।
ভালোবাসা নেই এমন মানুষকে বিষণ্নতায় ফেলে। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেনÑ ‘সকলেই আমাকে ভালোবাসে এই অনুভূতি উদ্দীপনা বাড়াতে যত সাহায্য করে অন্য কোনো কিছু তা করে না। অনেককেই বলতে শুনি আদর করে কথা বললে না কি যা বলে তাই করে মানুষ। অথচ একটু অনাদর করে কথা বললে ভালো কথাও খারাপ মনে হয়। নেগেটিভ কথা মানুষকে ভয়ংকর পথে ধাবিত করে এমনকি মৃত্যুর মতো কঠিন সত্যকেও তারা গ্রহণ করে ফেলে অর্থাৎ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।’
ভালোবাসা না পাওয়ার অনুভূতি থেকে নানা রকম মনোভাবের উদ্ভব হতে পারে। এ রকম লোক হয়তো মরিয়া হয়ে ভালোবাসা জন্যে নানা রকম দয়াশীলতার কাজ করে ফেলে। স্নেহ-ভালোবাসা, বিশ্বাস এই সবই আসে মায়া থেকে। ভালোবাসার মানুষটা যত খারাপই হোক ওই ব্যক্তি তা বিশ্বাস করতে চায় না। মানুষটি সারা জীবন হয়তো ঠকে তবুও বিশ্বাস ছাড়ে না। একটা উক্তি পড়েছিলামÑ কিছু মায়া বাইরে থেকে মতোই সাত্যের অভিনয় করুক ভেতরে ভেতরে তা আত্মাকে নিঃশেষ করে দেয়। মায়ার নামে যারা মিথ্যা আশা জাগায় তারা হয়তো একদিন ভুলে যায় কিন্তু যার মন ভেঙে যায় সে আর কখনও উঠে দাঁড়াতে পারে না।
এই কঠিন সত্যগুলো আবেগ দ্বারা এতই পরিচালিত যে ওই ব্যক্তি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না বা মেনে নিতে চায় না।
লেখার শেষ পর্যায়ে এসে আমি জীবনানন্দ দাশের কয়েকটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করতে চাই। জীবনানন্দ দাশের মতো কবিতার মায়া বা ইরোশন আর কোনো কবির আছে বলে আমি মনে করি না। আমি তার কবিতার অন্ধ ভক্ত বললেও অযৌক্তিক হবে না। কবিতা-জুড়েই মায়া আর মায়া। যেমন আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে মস্ত বড় মায়াদান। এই মস্ত বড় মায়াদানটাই বোধহয় পৃথিবী। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।’ এসব কী কথা! ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতার অসুখ এখন; আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়।’