× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ডুবসাঁতারের মোহে

স্নিগ্ধা বাউল

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০০ পিএম

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:১৯ পিএম

চিত্রকর্ম : অরণী হোসেন অথৈ

চিত্রকর্ম : অরণী হোসেন অথৈ

আমরা যখন বাঁশের কঞ্চিমতো জলের ভেতর ঢুকে যেতাম নিজের শরীর লয়ে, মাছেদের কিঞ্চিৎ কষ্ট ভুলে গিয়ে তাকিয়ে দেখতাম জলের টলটলে শরীর। ওখানে ঘোলাটে চোখের সামনে নিজেকে নির্লজ্জ রকমের বিন্যাসের সঙ্গেই একেবারে যুক্ত করে দিতাম ঊরুর কাছে, এরপর হাতের আঙুলগুলো বাঁকিয়ে সাপের ফণার মতো করে কিছু একটা টেনে টেনে দেখেছি বহুদিন, ওটার নাম ছিল শৈশব। কেবল মেঘনার নিঃসঙ্গ জলের ভেতর আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছি বহুদিন যতক্ষণ বাঁকের মুখে নিঃশ্বাসটা আটকে না আসে। আর যারা একটানা কয়েকটা গুনটানা নৌকার মাঝি তাদের কাছে জানতে চাইছিলাম, 

-ও মাঝি ভাই, কেরায়া নৌকায় কার লাশ যায়!

-জানি না! 

 মনে আছে, এক বর্ষায় ঘাটে ভিড়েছিল এক নগ্ন নারীর শরীর, মাছেরা তখনও তারে খেয়ে শেষ করতে পারেনি। এমন সময় রাতে কি আর ঘুম হয়! দশ বছর বয়সি আমার মনে হলো এ নদীটাই তো তার হয়ে গেছে যে মরে ভেসে এসেছে এই নদী ধরে আমাদের কাছে। এরপর প্রতিবার মনে হয়েছে আমিও মরে গেলে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হোক আমার দেহ। হয়তো অনার্য সন্তান পেটে ল্যাক্টোজ হজম করার মতো একটি নতুন কিছু! মরে গিয়েও মানুষ হারায় তার চরিত্র, ঠিক মানুষ নয়, নারী মরে গিয়েও হারায় তার চরিত্র!

পালোয়ানের মতো মন্না নামের লোকটি তারে ঠেলে দেয় লম্বা বাঁশ দিয়ে। তার হাতের পেশিগুলো দৃঢ়। লাশটাকে ভাগিয়ে সে দুপুরের ভাত খায় আমের ডাল দিয়ে মেখে। আঙুলের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে আসা ভাতের দলাগুলো লাশের মতো সাদা সাদা খই হয়ে ওঠে। বড় হয়ে উঠতে উঠতে জেনেছি সে কেমন পাশের বাড়ির দিদিটারে মেনীমাছ বলত, আর আঙুলের ফাঁকে সুকৌশলে আঙুল ঢুকিয়ে টিকিটের দাম চাইত হয়তোবা। অথবা কুৎসিত কার মতো করে ছিলে খেত সাগর-কলাগুলো। যেন তার মোটা তাজা কালবাউশ মাছ টাইপ এক অঙ্গের রকমারি সুখ।

আমি আরও বড় হচ্ছিলাম, এবার ঘাটে ভিড়েছিল মস্ত বড় একটা ভেলা, আমি ততদিনে পড়েছি বেহুলা ভাসান এবং ঘাটে যাওয়ার সময় একটা গামছা মা ঝুলিয়ে দিতেন শরীরে। ভেজা নীলাম্বরি না হোক, নারীর শরীর তো। ঘাটের জল যখন সরে যায় দূরে দূরে কচুরিপানার কাছে, বেলা বাড়লে আমরা শেষ লঞ্চের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতাম বটতলার কাছে। কোনোদিন হয়তো জুটে গেলেও যেতো একটা অচেনা যুবকের চোখেমুখের পাশবিক হিংস্রতা।

আমরাও আরও বড় হই, প্রেমপত্র জুটে, স্কুলের ড্রেসের ক্রসবেল আর মায়ের চোখের কড়া ভাষা। আমার চিঠিগুলো সংগ্রহের জন্য একটা ড্রয়ার খুব দরকার ছিল, অথচ মায়ের আলমারিতে একটা ড্রয়ারের মালিক তখন দাদা, এক দুপুরে গোপনে খুলে দেখি ওর পেনফ্রেন্ডের সব চিঠি, অথচ মেয়েটি ওকে মেয়ে ভেবেই চিঠি লিখত। দাদার ড্রয়ারে পেয়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রক্তমাংস উপন্যাস! সে এক শিহরন জাগানো উপন্যাস ঠিক চরিত্রের ভেতর ঢুকে গিয়ে আমি হয়ে যাই আজব হংস। যেমন লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ, ‘অনেক মুহূর্ত আমি ক্ষয়/ক’রে ফেলে বুঝছি সময়/যদিও অনন্ত, তবু প্রেম সে অনন্ত নিয়ে নয়।’

লকডাউনে আবার পড়ছিলাম রক্তমাংস, অথচ আমি আবিষ্কার করি আমি পাঠক হিসেবে মরিনি, কেবল বড় হয়ে গেছে জীবন বয়সের কাছে। এ জীবনটা আমার কাছে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়েই আছে, আর জীবনে হয়তো এ জীবন থেকে তুলে রাখব কয়েকটি চরিত্র। আমাদের পুরাতন বাড়িতেই থাকব আমি বেশ কয়েকটি রাতের জন্য, আমায় সেই রাতগুলো কৈশোরীয়, যেন রূপকথার তোলপাড়। কাকিমাকে আমার মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ, কেমন দাবার ছককাটা তাদের ঘরের মেঝেটা, বিকালে লম্বা চুল ছাড়ায়ে যিনি বসে থাকতেন নদী লাগোয়া বাগানটায়, বিপরীতে আমার মায়ের তখনও শেষ হয়নি গোবর মাটিতে ঘর লেপার কাজ! ভাবতাম মা কেন কাকিমা নয়!

আমাদের কলতলায় যেখানে লম্বা পাইপটা ধরে বিকালে টাইমের জল আসত ওতে মুখ লাগিয়ে কতক্ষণ জল খাওয়ার রেকর্ড করেছি মনে নেই, তবে জলের বিল দিতেন বলে জ্যাঠা তো তার মুখে লোহার বাক্স বসিয়ে দেন, আমার মা স্নান সেরে উঠবেন সন্ধ্যা নাগাদ, আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম মায়ের কাপড় পেটিকোট নিয়ে, আর দেখতাম কলতলার জল গড়গড়িয়ে নামছে হিজলতলার পুকুরে! ঠিক তখন সন্ধ্যা নামতো নিশ্চিন্দিপুরের অন্ধকার লয়ে। আমি যেন দুর্গা আর দূরের কাশফুলে ভেসে যাচ্ছে আমার মায়ের দুঃখ। 

যে বার বন্যা বয়ে যায়, জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ঘরের চৌকাঠ অবধি। মাঝে মাঝেই নিরীহ সাপগুলো এসে পড়লে তাদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিত মা! আমি মা মেজোদি আর ছোটভাই আমাদের চালাঘরের অচ্ছ্যুত সংসার যেন তখন, বাবা আটকে গেলেন তার কেরানি জীবনে, কেননা মাইনে না পেলে বাড়ি এসে কী করবেন! মা আমাদের গল্প শোনাতেন তখন জলের ভেতর মাছের জীবনের। কিলবিল করতে করতে মাছেরা আমাদের ঘরগুলো তখন ভরে দিত, আমাদের মাছ খাওয়ার লোভ হয়নি তখনও, কেবল মাছ ধরতে চাইতাম লোভীর মতো। আঙটা আর নিক্তির জীবনে মানুষ মূলত নিক্তিকেই বেছে নেয় আর তারপর নিজেকে ঝুলিয়ে রাখে নয়নচারা গল্পের আমুর স্বপ্নের হলুদ কলার মতো।

আরও বড় হয়ে লোভী হয়ে গেলাম কেমন! একটা আলাদা ঘর হলো, জীবন হলো এবং ঘর ছেড়ে আসার সময় আমার সবচেয়ে মায়া হয় আমার ঘরের ফ্যানটার জন্য ও যখন অনবরত ঘুরছে অনেক রাত অবধি আমি কথা বলেছি প্রেমিকের সঙ্গে ও সব জানত। গোপনের কথাগুলো ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে ফেলে নিজেদের ভাষা, হারায় প্রেম প্রক্রিয়াটি। তবুও কেমন ছেড়ে আসা যায় পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে অস্বীকার করে! যেন মানুষেরাই গিলে নেয় ঘুরন্ত রোদের কাফেলা, বৃষ্টি নামায় আকাশে ঘাসে একলা। তখন মনে হয় ‘আমার একলা আকাশ থমকে গেল রাতের স্রোতে ভেসে কেবল তোমায় ভালোবেসে…’ আমার দিনগুলো সব রঙ চিনেছে তোমার কাছে এসে, শুধু তোমায় ভালোবেসে! আহা অদ্ভুত সুন্দর গানেরা কানে ভেসে আসে স্মৃতির রঙের ঝাঁপি নিয়ে! জীবনে তবে কি স্বপ্ন বাস্তব না অতীত কিংবা বর্তমানের মতো না থাকা উদ্বায়ী কিছু! 

আমার ঘরের ভেতর আমার নিজেকে সেই শৈশবের মাছ মনে হয়, একবার যেখানে শামুকে কাটছে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল, আমি মাছ হয়ে আমার ঘরে ঢুকে যাই। সাঁতার কাটতে কাটতে ভীষণ কান্না পায়, পাশে তাকিয়ে দেখি সামাজিক দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বিষণ্নতা দীর্ঘশ্বাস লয়ে মরে যায়। আমি আমার ব্যক্তিগত ড্রয়ারে রাখা চিঠিগুলো খুললে যত্রতত্র নির্বিকার হয়ে যায় আমার নিজস্ব চোখ, কোথায় হারিয়ে গেছে জীবনের গল্প বসন্ত প্রত্যাখ্যান কিংবা খুনির প্রাপ্য দুঃখ! কোথায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আমাকে অক্ষরের আলোর বেগের ধ্রুবক করে। আমি জানতে চাইলাম বৃত্তের পরিধির উড্ডয়ন পরিভাষা, আর কত বড় হলে দেখা যাবে তিন প্রহরের বিল! দেখি দূরের প্রতিটি প্রয়াসে কেবল নিরীক্ষার অব্যক্ত কায়ক্লেশ। আর আমি প্রতিটি সূর্যাস্তের কাছে একটা একটা চিঠিকে পাঠানোর ম্যাপটাই হারিয়ে এসেছি।

ভালো লাগে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারার সীমারেখা। আবিষ্কার করা যায় পরিযায়ী পাখি গাইছে গুনগুন করে একা, মজা পুকুরের জলে ব্যাঙাচিও আমার মতো একা। নিঃসঙ্গ মাছরাঙাটা জলের কাছে বসে থাকে দুপুরের কাছাকাছি তৃষ্ণা লয়ে, বিকালের পানিকৌড়িও জানে তার ডানার বাতাসে ঝাউপাতা হয়ে যায় আকাশের সমভূমি। স্বামীহারা বিধবা পিসিমার উলের কাঁটা একটানা কতগুলো আঙুল বুনে গেছে ভাবতেই আমার ভালো লাগে, আমার ভালো লাগে বৈধব্যের লাগাতার শব্দ, তারা বাঁচতে বাঁচতে জীবনে শিখিয়ে দিচ্ছে পরদিন আবার না ফিরেও গান গাওয়া যায় নিজেরই জীবন থেকে!

এরপর আরও চিঠি আসে, দম হারিয়ে চিঠির খামে থাকে ঠিকানাহীন গহিন অন্ধকার। ভালোবাসারা তো চুটিয়ে সংসার করছে, জানছে জীবন থেকে তুলে দিতে হয় মাখনের মতো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। জীবন তবে কেমন আমার কাছে? আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা শুধু অনুভব করি, কেবল মনে হয় জীবন মানে আমি অজস্র দিন একা দাঁড়িয়ে গুনছি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের তারাগুলো। আবার ভাবছি আপাতত তীর্থই হয়তো আকাশ, আমি হলে নিজেরে দিতাম সপ্তর্ষীর একটা সময়, কেউ তো ভালোবেসে খুঁজে বেড়ায় তাদের যৌথ জীবন! আমারে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে না যেহেতু কোনো অর্বাচীন হৃদয়, প্রশ্নের জবাবে কেবলই নিজস্ব আত্মজ তার কাছে বন্ধকী রাখার অভিঘাতিনীও জানছে মানুষ ফিরে আসে কেবল নিজস্ব জানালার কাছে প্রয়োজন হলে। এখানে বুদ্ধদেব বসুর সেই কবিতা আমাকে রাতভর জাগিয়ে রাখেÑ‘বিছানায় শুয়ে আছি, ঘুম হারায়েছে/ না জানি কখন কত রাত;/Ñকখনো সে হাত ছুঁই, জানিবো না,/ এ-ই সেই হাত।’ 

এক রাতের অন্ধ দোকানি জানিয়েছিল কীভাবে আবিষ্কার করতে হয় তারাদের পথ, অথচ সে অন্ধ ছিল না। আমি জানতাম মানুষের মতো সাদা থকথকে চোখগুলোই আলো, আলোর আবার অন্ধকার জমিয়ে রাখা হয় নাকি! সেখানে তো পৃথিবীর সমস্ত মরীচিকা হয়ে সুখের কথা বলে! সুখও তো আমার বইয়ের পাতায় মরে যাওয়া প্রজাপতির ডানায় কার্তিকের গন্ধ হয়ে গেছে।

এরপর থেকে আমি একাই এক বৃহৎ ইন্দো-ইরানীয় হিজল, নুয়ে আছি পুকুরের জলে ভেসে আসা সেই লাশটার অপেক্ষায়, আমি তারে ঠাঁই দিতাম সপ্তর্ষী পুলস্ত্যের দরবারে। এরপর আরও লাশ ভেসে এলে আমিও ভেসে যাব ইন্টেলেকচুয়াল লাশের মতো।

এমনতর হিজল গাছ একাই বাঁচে, বাঁচতে হয়, আমিও বাঁচি। আবারও চিঠি পেয়েছি এক লকডাউনে; খুঁজে পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রস্তাব, প্রস্তুতি নিচ্ছে ভীষণ করে শরীর ভাগ করে নেওয়া, যেন এসব শরীরকে কেবল উত্তপ্ত লোহিত সরণের কাছাকাছি লয়ে যতদূরে যাওয়া যায় সেখানেই দেয়াল ঘেঁষে গড়ে ওঠে ঘর সংবাদ বিয়ে, আমি সব চুকিয়ে টিকিট কাটছি আমার জলের ঘরে ফিরে আসার মতো ময়ূরপুচ্ছ লয়ে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কার কথা মনে করে লিখলেনÑ

‘ভুলে গেলে ভাল হত, তবু ভোলা গেল না এখনও।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা