× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

একজন ফরিদা পারভীন

বাংলার ভাব আকাশে প্রজন্মোত্তর কিংবদন্তি

বাউল শফি মন্ডল

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৪ পিএম

বাংলার ভাব আকাশে প্রজন্মোত্তর কিংবদন্তি

লোকায়ত শিল্পের সমৃদ্ধ ভান্ডার এই বঙ্গভূমি। যেখানে আত্মা এবং আধ্যাত্মিকতা মিশে আছে বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে। যার মূল স্তম্ভ আবেদন। প্রকৃতির কাছে প্রকৃতির আবেদন। গুরুর কাছে শিষ্যের আবেদন। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টি জগতের এক হয়ে যাওয়ার আবেদন। সেই আবেদনময়ী সুরের মহীরুহ হিসেবে আমি ফরিদা পারভীনকে চিনি এবং জানি। ভাবকুলের শিরোমণি মরমী সাধক লালন ফকির তার ভাববাণীর মধ্যে যে আত্মদর্শন ও পরম সাধক সন্ধান দিয়ে গেছেন, সেই তত্ত্ববাণী সুরের মায়াজালে ফরিদা পারভীন পৌঁছে দিয়েছেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। আশির দশকে যখন ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাঙালি সংস্কৃতি ম্লান হতে বসেছিল তখন যে কয়জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বাঙালি সুর ও সংস্কৃতিকে জিইয়ে রেখেছিলেন ফরিদা পারভীন তাদের মধ্যে অন্যতম।

আমি আর ফরিদা পারভীন একই পথের পথিক। কিন্তু গান-বাজানার ধারাটি ছিল দুইজনের দুইমুখী। ফরিদা আপা যে গানগুলো করতেন, সেখান থেকে নিজেকে আলাদা করে লালন ফকিরের অন্য গানগুলো আমি সুর করেছি। আমাদের কাজ অধ্যাত্মবাদতকে সারথি করে সুর সাধনার মধ্য দিয়ে পরমাত্মার সান্নিধ্য পাওয়া। 

আমার বেশি ঘোরাঘুরি হয়েছে সাধু, গুরু, বৈষ্ণবদের মধ্যে। আমি তাদের সঙ্গে বেশি মিশেছি। আখড়া বাড়িতে আমার কম যাওয়া হতো। আর ফরিদা আপা আখড়া বাড়ির কাছে ছিলেন। এজন্য তার প্রাপ্তি বেশি। আমরা একজন ফরিদা পারভীনকে মাথায় করে রেখেছি। লালনের গান মানেই ফরিদা পারভীন। তার গাওয়া গানগুলো আমিও গেয়েছি কখনও কখনও। তবে সেগুলোর সুরের ধারা অক্ষুণ্ন রেখেছি। যদিও কেউ কারও মতো গাইতে পারেন না বা হতে পারেন না। তবু আমি চেষ্টা করেছি আপার সুরটা বজায় রাখতে।

আমি আখড়া বাড়িতে ফরিদা আপার অনেক পরে গিয়েছি। আমি থাকতাম দৌলতপুরে, যা শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। একটা জিনিস বলে রাখা দরকার বলে মনে করছি। আমাদের দুইজনের শেকড় কিন্তু এক জায়গাতেই। ফরিদা আপা ও আমি দুইজনেই গুরুজি মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে গান শিখেছি। আমি অবশ্য গুরুজির সান্নিধ্য খুব কম পেয়েছি। ফরিদা আপা বেশি পেয়েছেন। তার গান গাওয়ার ব্যাপারটি ছিল একটু ভিন্ন। গুরুজির কাছ থেকে গানের ভেন্ডর ভাগ হয়ে যেত। গুরুজি যে গানগুলো করতেন সেইগুলো আমিই করতাম। আর ফরিদা আপাকে যে গানগুলো শেখানো হতো সেগুলো আলাদা একটু মডার্নাইজ করতেন। আমি জানি না মডার্নাইজ আপা করতেন, নাকি গুরুজি করে দিতেন! বলা যায় গুরুজির সবচেয়ে কম সময়ের ছাত্র ছিলাম আমি।

ফরিদা আপা আরও একজন গুণীর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তিনি ফরিদা আপার স্বামী ছিলেন। ওস্তাদ আবু জাফর স্যার। স্যারের অনেক গান আপা গেয়েছেন। গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে পাঠকমহলে। আপার সুললিত কণ্ঠে গানগুলো খুব অল্প সময়ে পৌঁছে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে। আবু জাফর স্যারের যে গানগুলো আপা গেয়েছেনÑ ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে’, ‘পাথরগুলো সরানো গেল না গেল না’, ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদী তটে; ‘বিধিরে আমায় ছাড়া রঙ্গ করার মানুষ দেখলি না’। এই গানগুলোর আদলেই সাজানো হতো। আমাদের সংগীতজগতের মহীরুহ তিনি। তাকে নিয়ে বিস্তর গবেষণার দরকার এখন।

আমার খুব শ্রদ্ধার মানুষ তিনি। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কখনোই ভাবিনি আমি তার পাশাপাশি, কাছাকাছি আসতে। গান নিয়ে একসঙ্গে বসেছি দুইজন। গান নিয়ে কথা হয়েছে। আমাদের মধ্য সখ্য ছিল।

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা, আপা যেন সব সময় ভালো থাকেন। প্রার্থনা আল্লাহ যেন সবচেয়ে ভালো জায়গায় রাখেন আপাকে। এটা আমি সব সময়ই করব। আমি তার গানগুলো অনুসরণ করেছি। একপ্রকার বলা বলা যায়, মাথায় রেখে করেছি। বয়সে তিনি আমার ছোট, কিন্তু শিল্পী হিসেবে তার তুলনা শুধু তিনিই। আমি পঞ্চাশ বছর বয়সে মিডিয়াতে। আর তিনি শিশুকালেই স্টার। এত ব্যবধান। এত মহান শিল্পী। স্মৃতিপাতা কোনো কোনো সময় মনে ধরে। আমারও বয়স হয়েছে। অনেক স্মৃতি হারিয়ে গেছে। তাকে যে হারাব এটা ভাবিনি। তার আগে তো আমারই চলে যাওয়ার কথা।

বাস্তবিক অর্থে আমরা ভাইবোনের মতো ছিলাম। তিনি আমাকে ভাই বলে ডাকতেন। একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। বিভিন্ন প্রোগ্রাম করেছি, কখনও স্টুডিওতে গান গেয়েছি, বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে একসঙ্গে বিচারকার্য করেছি। বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থার উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

ফরিদা পারভীন ইহলোক ত্যাগ করেছেন হয়তো পৌঁছে গেছেন তার আসল ঠিকানায়। আমার বিশ্বাস তার সুরের যে আবেদন সেটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে লালন করবে এবং প্রবহমান ভক্তকুলের মধ্যে তিনি হাজার তারার মাঝে চাঁদ হয়ে চিরজাগ্রত থাকবেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা