× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লালন অধীশ্বরী

ড. আবু ইসহাক হোসেন

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫২ পিএম

ফরিদা পারভীন

ফরিদা পারভীন

ফরিদা পারভীনের (১৯৫৪-২০২৫) নাম নিলেই লালন ফকিরের গান মানসপটে ভেসে ওঠে। মহাত্মা লালন ফকির ও ফরিদা পারভীন নামটি যেন অভিন্ন এক সুতায় গাঁথা। লালন ফকিরের গানের চর্চার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, সেই ১৮৭২ সালে কাঙাল হরিনাথ, মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘পাক্ষিক হিতকরী’ হয়ে লালন ফকিরের শিষ্য-প্রশিষ্যের ধারায় ফরিদা পারভীনÑ এ এক দীর্ঘযাত্রা। সময়ের হিসাবে ১০১ (১৯৭৩-১৮৭২) বছর। কিন্তু লালন চর্চার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় লালন ফকিরকে যথার্থভাবে চিনতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবি লালন ফকিরের গান, সংগ্রহ, প্রকাশ, অনুবাদ এবং সভা-সেমিনারে বক্তৃতার মাধ্যমে সুধী সমাজের দৃষ্টিগোচরে আনেন। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এবং বোধহয় একমাত্র বাঙালি, যিনি লালনকে যথার্থভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্র-পরবর্তী লালন চর্চার বেহাল দশা আমাদের তার ইঙ্গিতই দেয়। 

লালন ফকিরের গানকে একসময় এমনকি গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত ‘জানালার ওপারের গান’ বলে নাক সিটকানো হতো। এমনকি খোদ কুষ্টিয়া শহরেই লালন ফকিরের গানকে নাপাক গান বা অশ্লীল গান বলে তার বিরুদ্ধে, লালন ফকিরের অনুসারীদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, লালন ফকিরের মৃত্যুৎসব ও লালন ফকির প্রবর্তিত ‘দোল পূর্ণিমার উৎসব’ পার্বণে বাধারও সৃষ্টি করা হয়েছে বহুবার। লালনপন্থীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার কথা তো বলাই বাহুল্য। শুধু কি কুষ্টিয়ার সুধী সমাজ? তৎকালীন রাষ্ট্রের কাছেও লালন ফকিরের গান ছিল অশ্লীল গান। একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন মকছেদ আলী সাঁইয়ের সংগীত-সাথি বড়ে কুদ্দুস (যিনি বছর তেরো আগে মারা গেছেন)। ফরিদা পারভীনের লালন সংগীতের গুরু মকছেদ আলী সাঁইয়ের ওপর গবেষণার কাজে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে তিনি এই ঘটনাটি বলেছিলেন। তার বর্ণনা মোতাবেক ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে। তখন মকছেদ আলী সাঁই লালন সংগীতের অনেক বড় শিল্পী। তিনি বর্ণনা করছিলেন, ‘সাঁইয়ের তখন দেশজোড়া নাম। সাঁইয়ের সঙ্গে গান নিয়ে আমরা সারা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। সাঁইয়ের গলা ছিল অত্যন্ত দরাজ ও সুরেলা। সেবার আমরা ঢাকার হাইকোর্ট মাজারে গেছি গান করতে। সাঁই লালন ফকিরের গান করছেন। সামনে হাজার হাজার শ্রোতা। সবাই তন্ময় হয়ে গান শুনছেন। হঠাৎ দাঙ্গা পুলিশ এসে সবাইকে পেটানো শুরু করল অশ্লীল গান পরিবেশনার দায়ে। মঞ্চ ভাঙচুর করা হলো। আমরা কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরে এলাম (সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ২০০৮ সালে)। এই ছিল গত শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত লালন ফকিরের গানের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের মনোভঙ্গি। 

ফরিদা পারভীন তখন কুষ্টিয়া শহরে থাকেন। নজরুলের গানে বেশ নামও করেছেনÑ রাজশাহী বেতারে ১৯৬৮ সালে নজরুল সংগীতের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্তও হয়েছেন। কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়া পাড়ায় থাকেন মকছেদ আলী সাঁই। সংগীতগুরু হিসেবে তার বেশ সুনামও ছিল। মূলত কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি তিনি ছিলেন। আব্দুল জব্বারসহ অনেক প্রথিতযশা শিল্পীই তার স্নেহধন্য হয়েছেন। 

ততোদিনে মকছেদ আলী সাঁই লালন ফকিরের মতে দীক্ষা লাভ করেছেন। তিনি লালন ফকিরের গানের প্রচার ও প্রসারের নিবেদিত প্রাণ। কিন্তু কেন যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তিনি খুঁজে নিলেন ফরিদা পারভীনকে। শেখাতে শুরু করেন লালন ফকিরের গান। ফরিদা পারভীন মগ্ন নজরুরের গানে। লালন ফকিরের গানÑ তিনি খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু গুরু মকছেদ আলী সাঁই নাছোড়বান্দা। অবশেষে একটা গান তিনি শিখলেন, ‘সত্য বল সুপথে চল’। 

ইতোমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার পর লালন ফকিরের সমাধি প্রাঙ্গণে দোল পূর্ণিমার উৎসব। মকছেদ আলী সাঁইয়ের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে লালন ফকিরের গান গাইতে রাজি হলেন ফরিদা পারভীন। তখন উৎসবের সীমানা সমাধি চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফরিদা পারভীন গাইলেন ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’। ভাব সাগরের ভাবের মানুষগুলো যেন ভাবসমুদ্রে অবগাহন করতে থাকে। ভাবসাগরে ডুব দিলে এত অল্পেতে কি সে ভাব মেটে! তাই আরও গাইবার অনুরোধ আসতে থাকে। ফরিদা পারভীনের সরল স্বীকারোক্তি, ‘ক্ষমা করবেন। আমি এই একটি গানই শিখেছি।’ কিন্তু ভাবের বুদবুদ কি আর এত সহজে থামে! লালন ফকিরের ভাবের ঘরের ভাবের মানুষগুলো যেন এই প্রথমবার ভাবের ফল্গুধারায় স্নার করলেন। এত অল্পে কি সাধ মেটে!

ভাবের মানুষদের সেদিনকার সেই উচ্ছ্বাস এবং আবেগে তাড়িত হতে থাকেন ফরিদা পারভীন। লালন ফকির যেন ক্রমেই টেনে নিচ্ছেন তাকে ভাবের সাগরে। যিনি ক্লাসিক গান করেন, নজরুল যার ধ্যান-জ্ঞান Ñ সেই ফরিদা পারভীনের ভেতর যেন এক অমোঘ পরিবর্তনের খেলা চলতে থাকে। তিনি লালন ফকিরের আরো কয়েকটি গান শিখলেন। 

পরের বছর লালন ফকিরের মৃত্যুবার্ষিকী। তখন শুধু সাধকদের উপস্থিতি ছিল। সমাধি চৌহদ্দি ছিল তাদের গণ্ডিÑ সাধনার নির্মল ও স্নিগ্ধ পরিবেশ। সাধকেরা গান করেন, নেমে যান। ভাবুকেরা ভাবে থাকেন। কিন্তু সেই ভাবের শান্তস্রোতে অশান্ত হয়ে ওঠে ফরিদা পারভীনের গানে। সাধকেরা যেন উপলব্ধি করেন মনের মানুষের বিহ্বলতাকে। ফরিদা পারভীনের সুরের জোয়ারে যেন ভাব মন্থন হতে থাকে Ñ সে ভাবের ফল্গুধারা খরস্রোতা হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চায় সমাধি চৌহদ্দির গণ্ডি ছাপিয়ে, বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত অসীম দিগন্তে। বড়ে কুদ্দুস বলছিলেন, ‘সেবার ফরিদা পারভীনের গানের সুর এত মানুষকে টেনে এনেছিল যে মানুষ চৌহদ্দির ওপার থেকে সমাধি সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে, প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে সে সুরের সুধা পানে বিমোহিত হতে থাকে। মানুষের ভাবের ভারে ভেঙে পড়ে সমাধি চৌহদ্দির সীমানা। তখনই বুঝতে পেরেছিলামÑ সাঁইজি ফরিদা পারভীনের মাধ্যমে সীমানার আগল ভেঙে অসীম দিগন্তে বেরিয়ে পড়তে চান।’ 

সেই থেকে ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে আসীন হয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন লালন ফকির। জানালার ওপারের গান হয়ে উঠেছেÑ অভিজাত শ্রেণির আত্মশুদ্ধির মোকামÑ বিশ্ব সংগীতের অপরিহার্য সংগীতধারা। বাংলার কুটিরবাসী ফকিরের সাধনসংগীত হয়ে উঠল রাজদরবারের রাজন্যদের ভাবের মুক্তির নিয়ামক। স্পেনের রাজদরবার ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালন ফকিরের ভাবের সুরে নিমজ্জিত হয়, ঝলকে ওঠে স্বর্গীয় অনুভূতি ও দ্যুতি। সেই দিব্যজ্যোতিতে অবগাহন করে মুক্তির আকাশ ছোঁয় স্পেনের রানি। 

সাধু ভক্তরা আদর করে তার নাম দিয়েছেন ‘লালন সমারাজ্ঞী’। সম্রাজ্ঞীই বটে। রবীন্দ্রনাথের পর তিনিই তো লালন ফকিরের গানের সীমানা বাড়িয়েছেনÑ সাধকের কুটির থেকে নাগরিক অভিজাত শ্রেণির ড্রয়িংরুম এবং জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। লালন আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের এক গর্বিত স্মারক। এ স্মারক যাচিত নয়Ñ স্বোপার্জিত। আর সেই স্বোপার্জিত স্মারকের অন্যতম প্রধান অনুঘটক ফরিদা পারভীন। আজ ফকিরেরা সারা বিশ্ব ভ্রমণের পথে হেঁটে চলেছেন। সেই পথ তৈরি করে দিয়েছেন ফরিদা পারভীন। 

একদা কেবলই শিল্পী হিসেবেই লালন ফকিরের গানকে কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন তিনিÑ পেয়েছিলেন যশ-খ্যাতিও। কিন্তু গানই যে একদিন তার সর্বস্ব হবে, হবে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চূড়ান্ত পরিণাম কেইবা ভেবেছিল। মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মীমাংসা হলো জীবনের উদ্দেশ্য তালাশের মাধ্যমে সৃষ্টির হেতু জেনে অনন্তকে আলিঙ্গন করা। ফরিদা পারভীন লালনের গানেই জীবনের মানে খুঁজেছেন, পেয়েছেন উত্তরও। সে কারণেই লালনের গানেই খুঁজেছেন পরমার্থিক মুক্তি। সেজন্য তাকে পার্থিব অনেক কিছুই হারাতে হয়েছেÑ সে শূন্যতার বেদনাকে তিনি আলিঙ্গন করেছেন সুরের মাধুর্যে ধারণ করেছিলেন অনন্ত রহস্যের অতলান্ত মাণিক। চেয়েছিলেন অন্যের জীবনের গূঢ়-সত্যকে উপলব্ধি করাতে। বলাই বাহুল্য, তার মাধ্যম ছিলÑ অবশ্যই লালন ফকিরের গানÑ যার মাধ্যমে গূঢ় নিজেকেও করেছিলেন আবিষ্কার। বুঝেছিলেন সত্য-সুপথের তত্ত্বতালাশেই মিলবে জীবনের জটিল রহস্যের সন্ধান। সে ব্রতে ২০০৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’। তার মাধ্যমেই খুঁজেছেন অচিন ‘আমি’কে। আত্মশুদ্ধি ও লালন ফকিরের গানের শুদ্ধতা এবং স্বকীয়তাকে স্থায়ি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’-এর ব্যবস্থাপনা ও প্রকাশনায় লালন ফকিরের গানের শুদ্ধ সুরের স্বরলিপি করে গেছেনÑ লালনের গানের এই শুদ্ধ সাধক।  

তিনি লালন সম্রাজ্ঞী। হ্যাঁ সম্রারাজ্ঞীই তোÑ তার আসন অনন্তকালের। কিন্তু এর বাইরেও বাংলা গানের ইতিহাসে কোথায় নেই ফরিদা পারভীন! বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসের এক অনিবার্য নাম ফরিদা পারভীন। তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস। ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিবে গায়’ অথবা ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম’ ছাড়া কি আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে পূর্ণতা আসবে? যতদিন আধুনিক বাংলা গান থাকবে ততদিন আধুনিক বাংলা গানের মল্লিকাদি থাকবেন ইতিহাসের ভাস্বর তারাটি হয়ে। শুধু আধুনিক গান কেন, দেশের গানের ইতিহাসের প্রথম পাতায় রাখতে হবে ফরিদা পারভীনের নাম। যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা নদীর নাম থাকবে, ততদিন ফরিদা পারভীন অনিবার্য।

লালন সংগীতের সমার্থক আর বাংলা গানের অপরিহার্য এই কিংবদন্তি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক, ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘ফুকাওয়া’ পুরস্কারে বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, থাকবে বাংলা গান; ততদিন ফরিদা পারভীন অবশ্য উচ্চারিত এক নাম হয়ে ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে দ্যুতি ছড়াবেন।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরে নাটোর জেলার সিংড়া থানার কলম গ্রামে জন্ম। বাবার চাকুরি-সূত্রে, কুষ্টিয়াতে বেড়ে ওঠা ও ফরিদা পারভীন হয়ে ওঠা। অনন্তলোককে আলোকিত করার জন্য পাড়ি জমালেন ১৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু বাঙালির আত্মানুসন্ধানে বারবার ফরিদা পারভীন প্রথপ্রদর্শক হয়ে পথ দেখাবেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা