আসমা অধরা
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৪৯ পিএম
ক্ষত যখন কাঁচা থাকে, তখন তাতে কথার চাইতে ব্যথাই বেশি থাকে। প্রকৃতির নিয়মে সব ক্ষত বা বেদনাই ধীরে ধীরে উপশম হয় কিছুটা, তখন সেখানে হয়তো অনেক কথাই তৈরি হয়। অথচ দেখুন আমাকে তরতাজা ব্যথা সহ্য করে কিছু লিখতে বলা হলো।
যার জন্য এই আয়োজন তিনি একজন কবি। তার ডাকনাম মণি, কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ পার্থিব জীবনের এক অনন্য উদাহরণ, যার এতটুকু ছোট্ট আয়ুষ্কালেও সাহস, সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতা দিয়ে পূর্ণ। জন্মগ্রহণ করেন ১২ অক্টোবর ১৯৯২ সালে জামালপুরে। জন্ম থেকেই শ্বেতা ছিল বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগে আক্রান্ত। এমন একটি কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যার স্বাভাবিক জীবনের প্রতিটি কাজ করতে পারাটাও বিশেষ সংগ্রামের মতোই ছিল। এটা এজন্যই বলা যে ভীষণ অসুস্থ হয়ে বারবার ভারতে যেতে হতো চিকিৎসার জন্য, তা শরীরের জন্য সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে, তবু একমুখ হাসি কখনও কারও সামনে মলিন হয়নি।
হাসি মলিন হয়নি তার মায়ের, বোনের, বাবারও। হয়তো যার বাঁচার কথা ছিল ৬ কি ৭ বছর, সে যে বেঁচে আছে তার চাইতে বড় আশীর্বাদ তো কিছু হতে পারে না। শ্বেতার জন্য একটা গোটা জীবন যে যুদ্ধ তার পরিবার, তার বোন করেছে, এমন ভাগ্য পৃথিবীতে হয়তো হাতে গোনার চাইতেও কম। এমন ভাগ্য নিয়েও সবাই জন্মায় না, যাকে প্রতিটা মানুষ কেবল অকুণ্ঠ ভালোই বেসেছে। এক জীবনে এত ভালোবাসা পাওয়া দুঃসাধ্যেরও অতীত।
শারীরিক কষ্ট ছাপিয়ে দুর্দান্ত মেধাবী শ্বেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিল। চেয়েছিল একটি কর্মজীবন, চেয়েছিল বাংলা একাডেমিতে কাজ করতে। সেখানেও প্রতিবন্ধিকতা ছিল। ওর শরীরে অতিরিক্ত আয়রন থাকার জন্য একসময় প্লীহা অপসারণ করতে হয়। প্রতিমাসে দুই ব্যাগ রক্ত, সি ভাইরাসের আক্রমণ, এরপর লিভার ক্যানসার, ট্যার থেরাপি। এত এত প্রতিবন্ধকতা, যন্ত্রণা নিয়ে যে জীবনটা চলছিল তাকে কোন নামে ডাকলে যথার্থ মনে হবে বলুন!
সে ভীষণ যুদ্ধবাজ, কখনও হাল না ছাড়া মানুষ। ছোটবেলা থেকেই লেখালিখি শুরু। ৬টি কবিতার বই, তার কবিতায় সৃজনশীলতার যে তৃষ্ণা ছিল তা কখনও কমেনি। তার সেই কবিতায়ও দেখা যায় জীবনের গভীর দুঃখ, প্রেম, আশা আর অস্তিত্বের ভীষণ প্রগাঢ় অনুভূতি। শ্বেতার শেষ কাব্যগ্রন্থের নামÑ ফিরে যাচ্ছে ফুল। নামটাই স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি একটি কাব্যিক নামই ভেবে নেওয়া সহজ। কিন্তু শ্বেতার জীবন যারা জানেন, তারাই বুঝবেন এই নামটি হয়তো তার ঘোষণা, সংকেত। তার সংগ্রাম। তবে এটাই যে শেষ তা তো জানা ছিল না। হয়তো সে জেনেছিল, বুঝেছিল।
থাক, তার কবিতা নিয়েই সবাই বলবে হয়তো, আমি সেদিকে যাচ্ছি না। এসবের বাইরে সে ছিল নৈমিত্তিক জীবনে আমার বোন। শ্বেতা আমাকে দিদি বলে ডাকত। দেখা হলেই সঙ্গে সঙ্গে বলত, ‘দিদি আসছ! তুমি এত কম আসো কেন!’ তার চোখ হাসত। শ্বেতার চোখ এত্ত ঝকঝকে ছিল। চোখের ভেতর যেন আকাশ ঝুঁকে আছে সবসময়। কাচের মতো, ছায়া পড়ে, ছায়া ফেলেও। কারণ ও সবাইকে নিয়ে যেমন হাসত, তেমনি সবাইকে একসঙ্গে কাঁদানোর ক্ষমতাও সহসা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। আমি হয়তো ওর কবিতাও কোট করতে পারতাম, কিন্তু আমি চাইনি নিয়মমাফিক কিছু বলতে। একান্ত বুকের ফুল, হৃদয়ের ঐশ্বর্য নিয়ে তেমন বলা যায় না মনে হয়।
আমার মা মারা যাওয়ার পর ওরা দুই বোনই বলেছিল ওদের মা-ই এখন থেকে আমারও মা। এ ছাড়াও আমাদের ছিল নিবিড় রক্ততুতো সম্পর্ক। সেই শ্বেতার কথা বলছি যে জন্মের পর থেকে হাড়ে, মজ্জায়, প্রতি রোমের গোড়ায় গোড়ায় কেবল যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে ছিল। শুধু বেঁচে থাকার আকুতি ছাড়া আর কোনো আকাঙ্ক্ষা আমি তার মধ্যে দেখিনি। একটা সময় ভীষণ অপরাধী মনে হতো নিজেকে। সেটা আমার নিজের অপারগতা, অক্ষমতার জন্য। আমরা চাইলেই অনেক কিছু করতে না পারার অক্ষমতা।
আমরা দিনের পর দিন, রাত একসঙ্গে কাটিয়েছি! একটা সময় এমন ছিল পাশাপাশি থাকার সুবাদে প্রতিদিন দুপুরের পর থেকে গভীর রাত অবধি আমরা একসঙ্গে থাকতাম, আমাদের অনেক গল্প হতো ছাদে, বারান্দায়। হালকা খুনসুটি, অল্প ঝগড়াও। ঝগড়া বলতে শরীরের তীব্র যন্ত্রণা প্রকট হলে খানিকটা রেগে যেত হয়তো। সেটা স্বাভাবিকও। আমরা রাত গভীর হলে ছাদে চলে যেতাম মাকে লুকিয়ে। খোলা আকাশের নিচে বসে থেকে মাঝেমধ্যে এত গভীর কোন কথা বলত শ্বেতা, আমরা স্তব্ধ হয়ে যেতাম। অতটুকু আয়ুষ্কালে জীবনের যে বোধ সে জড়ো করেছিল, তা বিস্ময়কর। শেষ কিছুদিন ওর ক্লিষ্ট মুখটা দেখার সাহস আমার হতো না। ওকে ফেস করার মতো সাহস হারিয়ে ফেলেছিলাম।
অনেক কিছু বলতে চাইলেও হয়তো কখনও মানুষ তা পারে না। সুদীর্ঘ সময়ের চলাফেরায় হয়তো অনেক কিছুই বলা যায়, যেত, কিন্তু পারছি কই! এই লেখার তাগিদ ছিল বলে হয়তো এটুকু। কিন্তু এতো স্তূপ স্তূপ কথার মধ্য থেকে কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। একবার মেসেঞ্জারে কথা হচ্ছিল, হঠাৎ নেই। পরে বলল, তার হাত-পা ফুলে ভীষণ জ্বর চলে আসছিল, ব্যথায় অস্থির হয়ে তাই আর কথা বলতে পারছিল না। আমি গেলাম দেখতে, আসার সময় বলল, থাকো, যাইও না। কিন্তু চলে আসতে হয়েছিল। জীবনের ব্যস্ততা, দূরত্বের কারণে যাওয়া-আসা কমে যায়। আরও কমে অপরাধবোধে। অপারগতায়। শেষ দিন শুনলাম সে মন্দিরাকে বলেছিলÑ ‘তুমি কি আর আমাকে বাঁচায় রাখতে পারবা না! এ কথা শুনে কেউ কি ঠিক থাকতে পারে?’ যদিও শ্বেতার কথা বলছি, তবু অনিবার্য ভাবেই মন্দিরা চলে আসে। অক্লান্ত যুদ্ধটা এ পর্যন্ত সেই তো টেনে এনেছে।
আমরা এমন অনেক মানুষকে জীবনে কখনও ভুলতে পারি না। সে হয়তো পৃথিবী বিখ্যাত হতে পারে আবার না-ও পারে। জন্মদিনের ঠিক এক মাস আগে চলে যাওয়া শ্বেতাকেও কখনোই ভোলা যাবে না। মৃত্যুও সবকিছু শেষ করে না; মৃত্যুরও সবাইকে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এমন সাহসী, সহনশীল, অপ্রতিরোধ্য আর ভালোবাসায় ভরপুর ব্যতিক্রমী শ্বেতাকে তো নয়ই।
অথচ যেদিন চলে গেল, হাসপাতালে সেদিন তার বরফ শীতল কপাল, চুল, পা স্পর্শ করেছি। হাতটা ধরে বসেছিলাম কতোটা সময়, তার আর দেখার ফুরসত হয়নি। অচেতন সে বলেনি হাত ধরে, ‘দি, যাইও না, থাকো।’ সে নিজেই তখন চোখের দীর্ঘ পল্লবের ছায়া গালের ওপর ফেলে আধো ঘুমে পাড়ি দিচ্ছিল জীবন আর মরণের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সুবর্ণরেখা।
হ্যাঁ, সে ফুলটি ফিরে গেছে। রেখে গেছে চিহ্ন, ছাপ। তার পরিচিত প্রত্যেক হৃদয়ে একটি স্বাক্ষর রেখে গেছে, অমোচনীয় কালিতে। পার্থিব দেহের যন্ত্রণা অবসান হওয়ার প্রয়োজন বা জীয়নকাল নির্ধারণ করার নিয়মাবলি কোথায় নির্ধারিত হয় আমার জানা নেই। শুধু এটুকু বলা যায়, এটাই প্রস্থান নয়। আরও বেশি, আরও তীব্র থেকে যাওয়াও তো।