টোকন ঠাকুর
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৪৭ পিএম
এটা অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার। আমাদের জন্য, আমরা যারা বাংলা কবিতার পাঠক এবং লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। অনেকটা সময় আমিও কবিতার সঙ্গে থেকে গেলাম। এখনও আছি। যে কারণে দুঃখ বলছিলাম, গতকাল ঢাকা শহর থেকে আমাদের একজন তরুণ কবি, শ্বেতা শতাব্দী এষ প্রয়াত হলো। পৃথিবী থেকে বিদায় নিল। ওর মৃত্যু আকস্মিক নয়। ও যে টিকে থাকতে পারবে না, সেটা বুঝতেই পারছিলাম সবাই। কারণ আমরা জানি ওর কর্কট রোগের কথা। ক্যানসার ওকে পিষে পিষে মারছিল। কেমো চলছিল। নানারকম খবর পাচ্ছিলাম ওর বন্ধুদের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে ফেসবুকে ওকে নিয়ে লেখালিখিও হচ্ছিল। ওর চিকিৎসার ফান্ড গঠনের প্রচেষ্টাও ছিল। কারণ এত ব্যয়ভার। ক্যানসার চিকিৎসার সামর্থ্য বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষেরই নেই। খুব কোটিপতি, শিল্পপতির সন্তানদের বিষয় হলে আলাদা। আমরা যারা একেবারে সাধারণ মানুষ। আমাদের ছোটখাটো অসুখ সামাল দিতেই অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ভেঙে যায়। সেখানে ক্যানসারের মতো অসুখের প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন ব্যাপার। কতগুলো বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিল আমাদের তরুণ কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ। ওর শ্যামাময়ী মুখটি আমাদের মনে থেকে যাবে।
এখন তরুণ কবি শ্বেতা শতাব্দী এষের কবিতা নিয়ে আমি দুই চারটি কথা বলি। তারপর ওর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় এবং বোঝাপড়া ছিল সেটা নিয়েও আলোচনা করব। আর বাংলাদেশের এই সময়টা নিয়েও কিছু বলব। যে সময়ে একজন তরুণ কবির মৃত্যুতে সমাজের কিছু যায় আসে কি না! সেই রকম একটা সময়ের মধ্যে আমরা এসে পড়েছি। সেই আলোকে আমার এ আলোচনা।
শ্বেতার কবিতা নিয়েই কথা বলি প্রথমে। কবিতার সঙ্গে আমি প্রায় সাড়ে তিন দশক অতিক্রম করে ফেলছি। কবিতার সঙ্গেই জীবনযাপন করছি। বাংলা কবিতায় সাড়ে তিন দশক জীবনউদযাপনের সঙ্গে থাকা অবস্থায় আছি। সেই হিসেবে আমাদের অগ্রজদের কবিতা পড়ে আসছি। পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। লাইব্রেরিতে পড়েছি। তখন মফস্বলে, গ্রামে-গঞ্জে বড় হচ্ছিলাম। পরে ঢাকায় যখন এলাম অনেক বড় বড় কবিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁদের সান্নিধ্য লাভ করলাম। অনেক শিখলাম। জানলাম এবং ঋণী হয়ে থাকলাম। কবিতায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামুসল হক, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, ফরহাদ মাজহার, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিকÑ সবারই সঙ্গ পেলাম। গদ্যের অনেক লেখককে কাছাকাছি পেলাম। হাসান আজিজুল হক, আহমদ ছফা, হুমায়ুন আজাদ, শহীদুল জহিরসহ অনেককেই পেয়েছি। এ সমস্ত বড় লেখকদের সান্নিধ্য পেতেও ভালো লাগত। তাদের কাছ থেকে শিখতে পারতাম। জানতে পারতাম। বুঝতে পারতাম। লেখার পাশাপাশি তাদের জীবনাচরণ দেখারও একতা প্রাপ্তিবিশেষ। সেটা হয়তো লেখালিখির জায়গা থেকে চাওয়াও থাকে একজন তরুণ লেখকের। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই নব্বইয়ের দশকে। তারপর থেকে এই ২০২৫ সাল পর্যন্ত, অতিক্রান্ত হলো তিন দশক। এ সময়ের মধ্যে অনেক তরুণ কবিকে আসতে দেখলাম। বাংলা কবিতা চর্চা করতে দেখলাম। সম্ভাবনাময় কাউকে কাউকে ইতোমধ্যে হারিয়ে যেতে দেখলাম। কেউ কেউ নিজ যোগ্যতায় টিকে আছে দারুণ বাক্যে, দারুণ বুননে। নিজের প্রতিভা-শক্তি প্রদর্শন করছে কবিতা রচনায়। সচেতন কেউ কেউ কবিতার বিষয়-বক্তব্য উপস্থাপনে। তাদের নিজ নিজ ভঙ্গি প্রতিষ্ঠার এক ধরনে লড়াই থাকে, থাকবে। স্বাভাবিক। তাই-ই হয়। সেই লড়াইয়ে অনেকের মধ্যে শ্বেতা শতাব্দীও যুক্ত হয়েছিল।
এখন আমি বলতে চাই যে, কী কারণে শ্বেতা শতাব্দী এষের কবিতা নিয়ে একটু আলাদা করে বলার সুযোগ নিতে পারি। এ কারণে পারি যে, একজন কবিতার লেখক এবং কবিতার পাঠক হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবে আমি অন্যদের কবিতা পড়ি। যার কবিতা পড়ে কোথাও একটা ঈর্ষা তৈরি হয় আমার মধ্যে, হয়তো কারও কবিতা রচনার ভঙ্গিতে, বিষয় বৈচিত্র্যের প্রশ্নে আমার মধ্যে একটা ঈর্ষা তৈরি হয় কখনও কখনও। তখন সেই কবিকে আমার ভালো লাগে। শক্তিশালী মনে হয়। তিনি আমার সমকালীন হোক, সিনিয়র হোন বা জুনিয়র হোক। আবার সেই কবি যে দেশের, যেই ভাষারই হয়ে থাকুন না কেন!
শ্বেতার কবিতার সঙ্গে আমি যখন পরিচিত হতে শুরু করি, দেখলাম ওর কবিতার মধ্যে এমন কিছু ভঙ্গি আছে, বলার এবং বাক্য গঠনের এমন একটা রেওয়াজ ও রপ্ত করছে। তাতে একধরনের অচেনা কিছু পাচ্ছিলাম, যা বলতে চাচ্ছে সেই বিষয়টিতেও নিজের অভিনব নির্মাণ ফুটে উঠছে। কবিতায় নিজের মতো করে একটা প্রচেষ্টা ও নিচ্ছে। সেটা আমার কাছে কখনও কখনও মনে হয়েছে দারুণ শক্তিশালী। কোথাও কোথাও গিয়ে মনে হতো ঈর্ষাযোগ্য। যখনই কারোর কবিতার কোনো একটা নবনির্মিত লাইন পড়ে মনকে আলোড়িত করে, নাড়া দেয়, তখনই সেটি ঈর্ষাযোগ্য। ঈর্ষাযোগ্য বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি আরে ও কীভাবে পারলো! এই পারার প্রতি আমার সমীহ করাই ঈর্ষাযোগ্য বলছি আমি। হিংসাযোগ্য নয় কিন্তু, ঈর্ষাযোগ্য। একটা গোলাপ ফুলেরও ফুটে ওঠা দেখে আমার ঈর্ষা লাগে। মনে হয় ইশ! আমি ওর মতো ফুটতে পারব না। ধানের ক্ষেতের দুলে ওঠা দেখেও মনে হতে পারে এরকম আমি দুলে উঠতে পারব না। আমার মানবকুলই ওরকম দুলতে পারে না। এটা মানবকুলের সীমাবদ্ধতা সে ধানক্ষেতের মতো দুলতে পারে না। গোলাপের মতো সৌরভ ছড়াতে পারে না। ওই গোলাপের প্রতি ঈর্ষা লাগে তখন। কোনো একজন কবির কবিতাতেও কখনও কখনও ওই ঈর্ষা এসে আমার মধ্যে অভিঘাত হানে। শ্বেতা শতাব্দী এষের কবিতায় সেই ভঙ্গিটা পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম বাহ! দারুণ তো। নিজস্ব একটা ভঙ্গি উপস্থাপন করতে পারছে এই তরুণ কবি।
সেইভাবে আস্তে আস্তে ২০১০ সালে শ্বেতার কবিতার বই বের হলো ‘অনুসূর্যের গান’ ২০১৩-তে বের হলো ‘রোদের পথে ফেরা’ তারপর ২০১৬-তে ‘বিপরীত দূরবীনে’ ‘আলাহিয়ার আয়না’ বের হলো ২০১৭ সালে। ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’ শ্বেতার আরও একটা বই। আরও একটা বই হচ্ছে ‘হাওয়া ও হেমন্ত’Ñ ছয়টি কাব্যগ্রন্থ রেখে কবি ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে পৃথিবী থেকে চলে গেছে। ও চলে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগেই ওদেরই এক বন্ধু লোপার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। লোপা বা লুইপা জানালো, শ্বেতা বাসায় আছে। সেভাবে জ্ঞান নেই। কাউকে চিনতে পারছে না। এর মধ্যে আমি এক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে বলেছিলাম, শ্বেতার দুটি কবিতা এবং একটা ভূমিকা সমেত সাময়িকীতে ছোট করে একটু জায়গা দিয়েন। উনি আমার কথাটি রাখলেন। বললেন, করবেন। শ্বেতা সেদিনই আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ফেসবুকে ওর অনেক ছবি, কবিতা ভেসে বেড়াচ্ছে। বইয়ের প্রচ্ছদ অনলাইনে ভেসে বেড়াচ্ছে। স্বয়ং কবি আর আমাদের মাঝে নেই। ও অনলাইনে সাবজেক্ট হয়ে হয়ে গেল। গণমাধ্যমের সংবাদ হয়ে গেল। আমাদেরও স্মৃতির মধ্যে চলে এলো। এই যে আমি কথা বলছি এখন, এই পৃথিবীতে শ্বেতা বলে কেউ আর এখন নেই। কিন্তু ওর কবিতাগুলো আমাদের মুখে মুখে আছে। ওকে বুঝবার জন্য ওর বইগুলো আছে। ওকে চিনে ওঠার জন্য। কি সুন্দর নাম না! ফিরে যাচ্ছে ফুলে। তার মানে ও কি ফুলেই ছিল! ওর একটি বইয়ের নাম ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’। তার মানে ও ফুল থেকে এসে কি ফুলেই ফিরে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে এসে যেমন কেউ গ্রামেই ফিরে যায়! ফিরে যাচ্ছে ফুলে বলতে ওর উপলব্ধির এ জায়গাটা এই যে ও ফুলেই ফিরে যাচ্ছে। কিংবা হাওয়া ও হেমন্ত। কোথাও একটা বিষণ্নতা ছড়ানো নামের মধ্যে। একটা বিষণ্নতা আছে হাওয়া ও হেমন্তের মধ্যে। আর সেটাই স্বাভাবিক। শ্বেতার রক্ত কণিকা যেখানে কর্কট রোগের শিকার। বার বার কেমো দিয়েও ভালো হচ্ছে না। তখন ও বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হবেই। কিন্তু বিষণ্নতাকে পুঁজি করে ঠিক কাতর স্বরে ও কবিতা লেখেনি। এটা ওর শক্তি। এই বিষণ্নতাটা শ্বেতার মধ্যে এমনভাবে ভর করেছে ওর কবিতাগুলো হয়ে উঠছে হেমন্তের মাঠের মতো। হেমন্তের হাওয়ার মতোই। হেমন্তের আকাশের মতোই। সেই শক্তিশালী কবিকে আমরা হারালাম। আমাদের জন্য বেদনার, দুঃখের। কোনো অনুজ কবির মৃত্যু অবশ্যই ব্যথিত করবে আমাকে বা আমাদেরকে। কারণ তার অনেক সম্ভাবনা সে রোপণ করতে পারল না! পৃথিবীতে সে নিজেকে ব্যাপ্ত করবে, পারল না! ডানা মেলে দেবে। তার কবিতার পঙ্ক্তিগুলো ছড়াবে। শব্দগুলো ছুটে যাবে পাঠকের মস্তিষ্কে। সেখানে জায়গা হবে ওর। অবশ্য সেটা হচ্ছে বা হয় কবিতা দিয়ে। কিন্তু সেই ব্যক্তি মানুষটা অর্থাৎ কবি আর আমাদের মধ্যে থাকল না! সেই দুঃখটা থেকে যাচ্ছে। অনেক তরুণ কবির অকাল প্রয়াণের সঙ্গে শ্বেতার নামটি যুক্ত হয়ে গেল। বাংলা কবিতায় আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আপন মাহমুদসহ আরও অনেকেই। আমাদের এই তরুণ কবিরা তাদের শক্তিশালী সম্ভাবনার জায়গাটা তৈরি করে ঝিলিক দিয়ে চলে গেল। প্রয়াত তরুণ কবিদের তালিকায় আরেকটি নাম সংযোজিত হলোÑ শ্বেতা শতাব্দীর নাম। কিন্তু এই সংযোজন আমাদের প্রত্যাশা ছিল না। আরও কবিতা লিখবে। জীবনকে দেখবে। বাঁচবে। জীবনকে যাপন করবে। কর্কট রোগের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসবে। অনেকের মতো আমারও এমন প্রত্যাশা ছিল। আশা ছিল। হয়নি। একটা স্নিগ্ধ সকাল এসে ওকে ঘুম ভাঙাবে। ওর একটি বইয়ের নাম, ‘রোদের পথে ফেরা।’ ফেরা হলো না। এরকম না পারা, না হওয়া অনেক হাহাকার আমাদের জীবনকে পুঞ্জীভূত করে। অনেক প্রাপ্তির সঙ্গে অনেক হাহাকার-সমগ্র নিয়ে আমরা বাঁচি। শ্বেতার মধ্যে তা ছিল। ওর কবিতার মধ্যেও সেটা ছড়াচ্ছিল। ওকে হারানোর পর আমাদের মধ্যে সেই বিষণ্নতা থেকে গেলে। বিষণ্নতা প্রতিষ্ঠা পেল। আমার মনে হয় বাংলা কবিতার পাঠক এবং কবিরা শ্বেতার কবিতা লক্ষ করলে, তাকে একটু বুঝতে পারার জায়গায় পৌঁছাবেন। আমি আমার অন্তর থেকে শ্বেতার জন্য, তার কবিতার জন্য ভালোবাসা জানাচ্ছি।
শ্বেতা শতাব্দী এষ। ওর ইমিডিয়েট বড় বোন মন্দিরা এষের সঙ্গেও আমার পরিচয় আছে। ২৪ নম্বর পুরানা পল্টন লেনে শিল্পী ধ্রুব এষের চারতলার বাসায় আড্ডা হতো। ওখানে আমরা অনেক দিন আড্ডা দিয়েছি। সেখানে মাঝে মধ্যে মন্দিরা আসত। শ্বেতাও আসত। তবে কম। মন্দিরা বেশি আসত। শ্বেতার সঙ্গে বইমেলায় দেখা হয়েছে, শাহবাগে দেখা হয়েছে। মূলত শ্বেতার সঙ্গে আমার বা আমাদের দেখা হয়েছে বাংলা কবিতায়!
শাহবাগ প্রান্তরে সারা দেশ থেকে প্রতিভাবান তরুণ কবি, গদ্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, চিন্তাবিদ, স্বপ্নবাজ, ফিল্মমেকার সবাই যেমন এসে হাজির হয়। আমিও একদিন সেভাবে এসেছি। শ্বেতাও একদিন সেভাবে এসেছে জামালপুর থেকে। তারপর আলাপ পরিচয়। বোঝাপড়া হলো। ও একটু রুগ্ন ছিল সব সময়ই। ‘রুগ্ন ব্যথিত কুসুম’ আবুল হাসানের মধ্যেও ছড়ানো আছে। সেই শ্বেতা কয় বছর ধরে অসুস্থ। জানি। কিন্তু আমার জানা অনেকের মতোই জানা। কাজেই ওই রোগের চিকিৎসা হবে না। সেই রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা পৃথিবীর মানুষের কাছে অতটা সহজ হয়ে ওঠেনি। যে কয়টি রোগকে এখনও অতিক্রম করতে পারেনি চিকিৎসাবিজ্ঞান, তার মধ্যে এখনও ক্যানসার একটি। ক্যানসার একটি সন্ত্রাস। সেই রোগের কাছে সে হেরে গেল। শ্বেতাকে হারালাম মানে আমাদের একজন তরুণ বন্ধুকে হারালাম। একজন তরুণ কবিকে হারালাম। কষ্ট পাই। দুঃখও পাই। খারাপ লাগে। বিষণ্ন হয়ে পড়ি নিজের অজান্তেই।
এখন ২০২৫ সাল। বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদল ঘটেছে এক বছর আগে। তারপর থেকে দেশের রাজনীতির গতিমুখ, অর্থনৈতিক প্রবাহ এবং সাংস্কৃতিক কাযক্রমÑ এসবের কথা যদি বলি। তাহলে রাজনীতি প্রচণ্ড ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। অর্থনৈতিক অবস্থা মন্দা। আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়েছে। গান নেই। মঞ্চে থিয়েটার নেই। ভালো ফিল্ম নেই। আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনী হচ্ছে না। এরকম একটা স্থবির সময়ে গরিব রাষ্ট্রে একজন তরুণ কবি অসুস্থতায় যখন মারা যায়, তখন গোটা সমাজে তার কি কোনো প্রভাব পড়ে আদৌ? সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই সমাজ তো ব্যস্ত আছে রাজনীতি নিয়ে। দুর্নীতি নিয়ে। ক্ষমতা নিয়ে। ক্ষমতার পাল্টা ক্ষমতায়ন নিয়ে। অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন নিয়ে। গণমাধ্যমের লিড নিউজ হয় এসব বড় বড় বিষয়। সেখানে একজন তরুণ কবির প্রয়াণ এরকম একটা রুগ্ণ সমাজ কতটুকু ধারণ করতে পারে। শ্বেতা তো অসুস্থ ছিলই ক্যানসারে। কিন্তু বাংলাদেশ নামক পুরা রাষ্ট্রটাই তো ক্যানসার আক্রান্ত। সেই ক্যানসার আক্রান্ত সমাজ আরেকজন ক্যানসার আক্রান্ত কবির পাশে কতটুকুই আর দাঁড়ায়! কতটুকু দাঁড়াতে পারে! কবিতার পাঠক এবং কবিতার মূল্যায়ন ও কাব্যের রস গ্রহণের ক্ষমতা খুব কম লোকেরই থাকে। কারণ অধিক পড়াশোনা করা প্রস্তুতিসম্পন্ন পাঠকই মূলত কবিতার রস গ্রহণে সক্ষম। সেরকম লোক বা পাঠক তো আমাদের এখানে কম। কেননা জীবন সংগ্রামে এখনও মানুষ বেশি ব্যস্ত। এরকম একটা নষ্ট ভঙ্গুর সময়ে বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ১২ সেপ্টেম্বর ৩৩ বছর বয়সে একজন মেধাবী কবির প্রয়াণ হলো। এই সংবাদে এরকম একটি অশিক্ষিত সমাজে তার কোনো আলোড়ন নেই। কারণ একজন সন্ত্রাসী মারা গেলে অনেক আলোড়ন হতো। একজন ব্যাংক লুটকারী মারা গেলে বা একজন দাগি আসামির মৃত্যুতেও গণমাধ্যমে যে কাভারেজ দেওয়া হয়, একজন প্রতিভাবান তরুণ কবির মৃত্যুতে তো ওই রকম স্পেস দেবে না। আর সাধারণ মানুষও সেভাবে ঠিক অভ্যস্ত নয়। এই যে ক্ষমতাসীনের প্রতি আনুগত্যের অভ্যাস, এটা গণমাধ্যম থেকে সমাজের এবং সবার। সবারই আনুগত্য দেখি দুর্বৃত্তায়নের প্রতি, ক্ষমতার প্রতি। একজন তরুণ কবি কবিতা লিখে এ সমস্ত দাসত্বের অভ্যাসের বিপরীতে তার অবস্থান ব্যক্ত করে। ফলে এক ধরনের দ্বন্দ্বই তো কাজ করে। দুর্বৃত্তায়নে আক্রান্ত সমাজের সঙ্গে একজন তরুণ কবির চিন্তার তো টক্কর থাকে। দ্বন্দ্ব থাকে। তখন একজন কবি মারা গেলে কিছু যায় আসে না দুর্বৃত্তায়িত সমাজের। অন্ধ সমাজের। নির্বোধ সমাজের।
এর মধ্যে থেকেও জীবনকে নিয়ে বাজি ধরে কেউ কেউ, তারা জীবনকে জীবনের মধ্যে রোপণ করে কবিতা লিখে যায়। তারা তো অবশ্যই একটা সংগ্রামে থাকে, যা অন্তর্গত সংগ্রাম। যা সামাজিকভাবে খুব একটা দেখা যায় না। একজন কবি তার নিজের সঙ্গে আগে লড়াই করে। তার নিজের মতো করে লিখতে হবে। তার আগের সমস্ত কবিতার সঙ্গে গোপনে তার একধরনের প্রতিযোগিতা থাকে। সেখান থেকে নিজের কবিতাকে নিজের মতো করার একটা প্রচেষ্টা থাকে। সেটা তার নিজের লড়াই। এর সঙ্গে তার অর্থনৈতিক লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াই। পেশাগত লড়াই। এগুলো থাকে। সাধারণ অসুখ বিসুখের সঙ্গে লড়াই থাকে। সেখানে ক্যানসারের মতো একটা বড় পরাক্রমশালী অসুখের সঙ্গে সবাকে হয়তো লড়াই করতে হয় না। তরুণ কবি শ্বেতা শতাব্দী এষকে সেই লড়াই করতে হলো। লড়াই করতে করতে ও হেরে গেল ক্যানসারে কাছে। কারণ ক্যানসার তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এখনও অপ্রতিরোধ্য অবস্থায় আছে। এখানে জ্বর ঠান্ডা, নিউমোনিয়াতে মানুষ মারা যায়। সেখানে ক্যানসার প্রতিরোধ করে টিকে থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার। পশ্চিমা বিশ্ব বা এশিয়ার জাপান হলেও একটা ব্যাপার ছিল। আমাদের সেই সুযোগ নেই। একজন কবির জন্য অতটা দরদ কাজ করে না আমাদের দেশে। গরিব সমাজ। অথচ নিরিবিলি বনভূমির কোথাও একটি গাছের মতোই শ্বেতা থেকে যাবে একটা গাছ হয়ে। শ্বেতা সে গাছের ফুল হয়ে থেকে যাবে। সে গাছে উড়ে আসা যত পাখি তার একটি পাখির নাম অবশ্যই শ্বেতা থাকবে।
হেমন্তের হাওয়ায় শ্বেতাকে পাব আমরা। বেঁচে থাকবে কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ। ভালোবাসা তোমার জন্যে, অকালপ্রয়াত তরুণ কবি, তোমার জন্যে। মনে থাকবে তুমি।