শিবলী মোকতাদির
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৪ পিএম
ছোট কাগজ এবং বড় কাগজ কতকটা অজাতশত্রুর মতো। এ ওকে আড়াল করে ছুটে চলা পাড়াতো, আরও গভীর করে বললে বলা চলেÑ চিরচেনা আমাদেরই সেই মামাতো ভাই। ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ বা ম্যাগাজিনÑ বলা হচ্ছে প্রচল বা চলিত বা প্রচলিত ধারাকে অস্বীকার করে সাহিত্যের যে পালাবদলকে ধারণ করে বা লালন করে তাই-ই লিটলম্যাগ।
মূলত দৈনিকের নানা বাহানা, ঢং, অভিরুচি মতান্তরে দাবরানির হাত থেকে রেহায় পেতেই জন্ম হয়েছিল ছোট কাগজের। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দুইটি শব্দÑ প্রতিষ্ঠান আর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। বলা হয়ে থাকে ক্ষমতার শারীরিক রূপই হলো প্রতিষ্ঠান। যদিও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যুগে যুগে জন্ম নেওয়া বিবিধ কাগজের জন্ম যেমন হয়েছে, মৃত্যুও হয়েছে ততধিক। টিকে থাকার লড়াই, নৈতিকতার প্রশ্নে অনেকেই হেরে গেছেন কালের বিচারে। তবু দৈনিকের সাহিত্যকে টেক্কা দিয়ে অ্যান্টি কাউন্টার হিসেবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আজও বেঁচে আছে প্রকৃত লিটলম্যাগগুলো।
১৯৬০ সালের পরে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নতুন এক পালাবদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। পঞ্চাশ দশকের মধ্যবর্তী সময় থেকে খুব গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে সমাজ ব্যবস্থায় লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, ধর্মান্ধতা, টালমাটাল রাজনীতি আমাদের সমাজ জীবনকে করে তুলেছিল অশান্ত, ক্লেদাক্ত। সংগত কারণেই ওই সময়কালটা ছিল অবক্ষয় আর নৈরাজ্যে ভরপুর। মূলত ছয়ের দশকে এসে স্বাতন্ত্র্যভিলাষী তরুণরা নতুন সাহিত্য আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত সামনে রেখেই লিটল ম্যাগাজিনকে হাতিয়ার করে সাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সূত্রপাত করেছিল।
ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ বিষয়টা নিয়ে বিগত সময়গুলোতে এমনই লেখালেখি, বকাবকি এবং ক্ষেত্রবিশেষে হাতাহাতিও হয়েছে যে, তাকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে আগ্রহ জাগে না। আসলে হয় কী, এই যে আমরা লিখছি এরপর প্রকাশের ব্যাপার থেকে যায়। সেক্ষেত্রে আপনাকে হয় দৈনিক, অনলাইন নতুবা ছোট কাগজ নয়তো গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে হবে। এখন দেখা যায় দৈনিকগুলো হয়তো ছয় মাসে একটা কবিতা ছাপবে। তা ছাড়া নীতিগত কারণে সেখানে লেখা প্রকাশ করতে আপনার ইচ্ছা না-ও জাগতে পারে। আর একক গ্রন্থ প্রকাশ, সেখানেও নানা হ্যাপা। তো এই দুই কূল হারিয়ে সহজ ও সচ্ছল পথটি হবে সেই ছোট কাগজ। বিশেষত, একেবারে নতুনদের জন্য ওপেনিং ম্যাচের মতো ছোট কাগজের জায়গাটা আজও খুবই আইডিয়াল।
সত্তরের শেষ থেকে আশির দশক জুড়ে দুই বাংলাতেই ছোট ছোট কিছু ম্যাগাজিন বের হতো। এক ফর্মার, দুই ফর্মার। বেশিরভাগ পত্রিকার তথাকথিত প্রচ্ছদ থাকত না। শুরু থেকেই, প্রচ্ছদ থেকেই লেখা প্রিন্ট হতো। সেইসব ছিপছিপে, হিলহিলে লিটল ম্যাগাজিনগুলোর যে জোর ছিল, যে দাপট ছিল, যে ছোবল ছিলÑ সেটা বর্তমানে হাজার খুঁজলেও চোখে পড়ে না। লিটল ম্যাগাজিন অর্থই তারুণ্য, উৎসাহ, উদ্দীপনা, বিদ্রোহ, অচলায়তন ভাঙা। তার চারিত্রিক রূপরেখা হবে প্রতিষ্ঠাবিরোধী হওয়া, অপ্রতিষ্ঠদের জায়গা দেওয়া, প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ, অতি-তরুণ লেখকদের একত্রিত করা। যেকোনো টেক্সটকে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে মাধ্যমের দ্বারস্থ হতে হয়। আমাদের কথা আমাদের মতো উচ্চারণে ভূতগ্রস্ত পৃথিবীকে ঘিরে ধরবে। প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যবুদ্ধির দুঃস্বপ্নে ভীত হব নাÑ এমন মন্ত্রই জম করে প্রকারন্তরে করে যাচ্ছেন প্রকৃত লেখকরা।
কিন্তু বিপত্তিটা ঘটেছে অন্যখানে। হাতে গোনা দু-চারটি ছাড়া বেশিরভাগ ছোট কাগজ দিনকে দিন বহু ব্যবহারে তার পূর্বের মহত্ব, গৌরবের প্রাণশিখা, সাধনা পরিবর্তন করে অন্তরের স্বপ্নদেখা বন্ধ করে দিয়েছে। ত্রিশঙ্কুর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক চকচকে, অনেক স্থুল কিন্তু দেখে বুঝতে পারি এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে গেছে তার। তা ছাড়া অনেক ছোট কাগজের প্রকাশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, এটাও তো সত্য অনেক লিটলম্যাগ তার শুরুটা করেছে ভুল স্কুলিং দিয়ে। নিবেদিত লেখকের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ফায়দা লুটতে চেয়েছে। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতাও জমে আছে আমাদের হৃদয়ে।
আসলে প্রচলিত ও প্রথাগত ধারার বাইরে নতুন কিছু উচ্চারণ করাই একটি লিটল ম্যাগাজিনের আদর্শ। লিটল ম্যাগাজিন প্রচলকে ভেঙে নতুন নতুন পথের হদিস দেয়, সে ম্যারম্যারে ধ্যান-ধারণাকে সরাসরি প্রশ্নের বানে বিদ্ধ করবে। লিটলম্যাগের মূল অহংকার তার স্বাতন্ত্র্যের, সে হবে সংস্কারমুক্ত, স্বাধীন ও প্রগতিমনস্ক। লিটল ম্যাগাজিন এক ধরনের আন্দোলন। যে আন্দোলন প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, চেনা কাঠামোকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে। গড্ডলিকা প্রবাহের বাইরে নতুনকে খোঁজার অন্বেষা এবং সব সময় প্রতিকূল স্রোতের দিকে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত থাকে। একজন তরুণের যে বোধ, কথা, অনুভূতি ব্যক্ত করতে চান, তা অধিকাংশ সময় পূর্ব-পথযাত্রীদের সুদৃষ্টি পায় না। যিনি একদা ভয়ংকরভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, আজ তিনি বয়স্ক এবং সবচেয়ে ভয় পান বিদ্রোহকে। তাই তরুণরা আত্মপ্রকাশের তাগিদে সম্মিলিত হন একটি বিশেষ স্কুলে, নিজেরা পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং সেখানে মুদ্রিত করেন তাদের মিত-অমিত সমস্ত পাপ-পূণ্যবান বোধকে। খুব সহজ করে ভাবলে একটা বিশেষ সময় এবং সে সময়ে এগিয়ে থাকা ভাবধারাকে একীভূত করে, মিলিয়ে নিয়েই লিটল ম্যাগাজিনগুলো কাজ করে, তাদের অস্তিত্বকে আরও সাবলীল করে গড়ে তুলবার প্রয়োজনেই।
টেকনোলজির টো-টো করে এগিয়ে চলার সঙ্গে প্রকৃত লিটলম্যাগের কোনো সংঘাত নেই। ছোট কাগজ তৈরিই হয় বিশেষ একটি বলয়কে কেন্দ্র করে। এটা নিছক এক খণ্ড হাড় জিরজিরে পলকা শিল্পরূপের উপঢৌকন নয়, কেন্দ্রবিমুখ, প্রচলিত সংকলনের সর্পিল পথ থেকে ছিটকে আসা স্বকীয় প্রকরণ। এ যুদ্ধে মস্তিকের কোষে কোষে জড়িয়ে থাকে তার চৈতন্য। ছোট কাগজ কোনো ব্যবসা নয়। এখানে শঠতার স্থান নেই। অর্থলোভের সম্ভাবনাকে সব সময় সে বা-চোখের ইশারায় তাড়িয়ে দেয়। যিনি ছোট কাগজের জন্ম-মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেন তিনি এর প্রকৃত সম্পাদক হতে পারেন। তমসার সংহত রূপ যিনি উপলব্ধি করতে পারেন তিনিই কেবল জন্মের মৃত্যুসাক্ষী হতে পারেন। ছোট কাগজ প্রকাশ পায় বছরান্তে একটি। বলি তা কেন, তিন বছরে একটি হলেও ক্ষতি কী? সুতরাং টেকনোলজির বিষের ধারে কাছেও আসবে না। ভয় পাবে। প্রকারন্তরে বলতে পারেন পাত্তাই দেবে না।
যে আকৃতিতেই প্রকাশ হোক, লিটল ম্যাগাজিনের অর্থকে বড় করে দেখার প্রবণতা ইদানীং নেই, যারা বের করেন তারাও ব্যাপারটা মুলার মতো ঝুলিয়ে রাখেন। লিটল ম্যাগাজিন তরুণ, প্রতিশ্রুতিশীল, রাগী-লেখকদের দ্বারাই সম্পাদিত হতে হবেÑ এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু বরাবর তাই-ই হয়ে আসছে, কেননা এখানেই রয়ে গেছে লিটল ম্যাগাজিনের প্রকৃত চরিত্র। প্রতিশ্রুতিশীল অথচ প্রতিভাবান তরুণ লেখকরা যখন প্রতিষ্ঠিতদের বিরুদ্ধবাদী হয়ে ওঠেন, প্রতিষ্ঠিত কাগজগুলো বাজারি মনোভাব তাদের ক্রিয়াশীল চেতনা যখন ভিন্ন খাতে বইতে দিতে চায়, তখন এস্টাবলিশমেন্টের প্রতি ‘না’ সূচক মনোভঙ্গি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে সহায়ক হয়ে ওঠে। লিটল ম্যাগাজিনের পাতা তারুণ্যের সদম্ভ পদপাদে উচ্চকিত, মূলত তারুণ্যনির্ভর, পাণ্ডিত্যনির্ভর নয়, রচনার ভালো-মন্দের বিচার এখানে গৌণ, প্রকাশকাঙ্ক্ষাই হবে মূখ্য। চঞ্চল অথচ মেধাসম্পন্ন, রক্তবর্ণ তলোয়ারসদৃশ্য লিটল ম্যাগাজিনই হতে পারে সাহিত্যের সর্ববাঁক শরীরে ধারণ করতে, নতুনত্বের দুয়ার খুলে দিতে। একজন লেখকের অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনা থেকে জন্ম নেয় প্রতিষ্ঠাবিরোধিতা। যারা এককালে প্রতিষ্ঠানবিরোধী, তারাই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুবাদে কি এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে সাফাই গাইবেন, প্ররোচিত করবেন? পুরস্কার ও নানাবিধ সুবিধাদি পেয়ে তিনি কি ভুলে যাবেন যে তিনিও ছিলেন একদা প্রতিষ্ঠাবিরোধী? প্রয়াত দীপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় যখন বলেন, এস্টাবলিশমেন্টের উদ্দেশ্য পাঠকগোষ্ঠীকে করায়ত্ব করা এবং মুনাফা লুটা এবং কখনই পাঠককে শ্রেণি ও শিল্পসচেতন করা নয়, তার মনোরঞ্জন করা। এই মনোরঞ্জনের দায়িত্ব নেন বাজারি সাহিত্যিকরা, কারণ তাদের নিহিতার্থ উদ্দেশ্য হলো ‘জনপ্রিয়’ হওয়া।
প্রবীণ প্রতিষ্ঠিতদের বিরোধিতা করে ষাটের দশকে যে আন্দোলনের সূত্রপাত সে সময়ে লিটলম্যাগের পৃষ্ঠায় যেন এক নতুন অন্ধিসন্ধির পটভূমিকাকেই স্পর্শ করা। যে আর্তি ও অভিলাষ নিয়ে ষাটের অতিতরুণ সাহিত্যপ্রেমী এগিয়ে গিয়েছিল উজ্জ্বল আলোর দিকে যার কবোষ্ণতাপে শরীর ছিল কম্পমান, তাড়িত যার চিন্ময় কণ্ঠে উচ্চারিত হতো শোণিতশোভন হাতিয়ার ‘লিটল ম্যাগাজিন।’ কোথায় এগিয়ে যাবে, অথচ সময়ের জাঁতাকলে সে গেছে পশ্চাতে। প্রতিষ্ঠাবিরোধী, প্রতিবাদী সেই প্লাকার্ড কখন খসে পড়ে গেছে সে টেরও পায়নি! যদিও এমন অভিযোগও ধরা পড়ে ষাটের দ্রোহী তরুণ কবিদের দ্বন্দ্ব অন্য সময়ের তুলনায় সুস্থিত ছিল না, তাদের রোমান্টিক দৃষ্টি ছিল মচকানো, ক্লিষ্ট, যা প্রবীণ প্রতিষ্ঠিতদের কাছে নাক সিটকানোর পর্যায়ে প্রতিভাত হয়েছে। ষাট দশকে যে লিটলম্যাগ আন্দোলন তা একচ্ছত্র কবিতার আধিপত্যকেই উন্মেচিত করেছে। ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, এখনও এ অবস্থার খুব একটা হেরফের হয়নি। ইদানীং অর্থনৈতিক এবং ভাবের মতাদর্শে লিটলম্যাগ তার জন্মলগ্নেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
লিটল ম্যাগাজিনের আলাপে নান মতভেদ, চিন্তার পার্থক্য থাকলেও এর প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে সামষ্টিক পুঁজি বা পুঁজিবাদী মানসের বিরুদ্ধে জুতসই লড়াই চালিয়ে যাওয়া। যেহেতু লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম বৈশিষ্ট ‘অপর্যায়িক’, সে কারণেই এইসব পত্রিকার দীর্ঘ স্থায়িত্ব কোনোক্রমেই আশা করা যায় না। এতে থাকে না সম্পাদকীয় বিধিনিষেধ অথবা প্রবীণের প্রচণ্ড বিমুখতা। লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের পশ্চাতে তরুণদের যে পরিমাণ কায়িকশ্রম, অর্থ, ব্যয় হয় সেই পরিমাণে অর্থ দ্বারা লাভবান হওয়ার আশা দুঃসাধ্য-লাভ কেবল আত্মতৃপ্তি। যথার্থ লিটলম্যাগ, তার অভীষ্ট ক্ষেত্র হবে ভিন্ন, সঙ্গতি রক্ষা নয়। প্রবীণ প্রতিষ্ঠিতদের ভজনালয়ে নিজেকে দাঁড় করানোর কোনো ইচ্ছে প্রকাশ করে না, মুগ্ধ করার চাতুর্য তার নেই। তার মূলে থাকবে ঐতিহ্য, সব অস্তিত্ব আর অনাগত ভবিষ্যতের অনুসন্ধান।
তবে দুঃখের বিষয় আমাদের অনেক ছোট কাগজের সম্পাদকরা নানাভাবে আপসের মানসিকতা নিয়ে চলছে। সংগ্রামী আপসহীন বা দারুণ মেধাবী সম্পাদকের অভাব আমাদের আছে। প্রত্যেক ব্যক্তি যেমন একান্তভাবে অনন্য, তার দৃষ্টিভঙ্গিও তেমনই একান্ত অনন্য। ছোট কাগজের কনসেপ্টটা বলতে গেলে আজ এপার-ওপারে কিছুটা হলেও বেঁচে আছে। যে উদ্দেশে, যে ব্রত নিয়ে সমাজ, রাজনীতি বলতে গেলে নিজের বিত্তকে ভেঙে তারুণ্যের অগ্নি আস্ফালন ঘটেÑ আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আপনি কি বলতে পারবেন তাদের সেই স্টেমিনা আছে? কাজেই ছোট কাগজ করি, দুমদাম করে বলাটা যত সহজ করাটা তত সহজ নয়। এসট্যাবলিশমেন্ট কে না চায়! হটকারীর এই দুনিয়ায় কে আর অ্যান্টি থাকতে চায় বলুন! যে বীজটা সবেমাত্র রোপিত হয়েছিল তাকে তো বাড়তে দিতে হবে। কোন ওয়েদারে কোন কীটনাশকে, কোন খাদ্যে কতটুকু বড় করবেন, কী ফল আশা করছেনÑ এসবই আজ গোড়ার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে তো সে সময়টুকুই দেওয়া হলো না। বোঝার আগেই বুঝে গেলাম আমরা। গাছে না পাকিয়ে অর্থের লোভে কাঁচাতেই কেমিক্যালে চোবালাম। ফলে যা হওয়া তাই হয়েছে। হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে প্রকৃত লিটলম্যাগ।
যদি বলি আপসজ্বরে আক্রান্ত হয়েই নব্বইভাগ ছোট কাগজ সম্পাদক এ পথে এসেছিলেন, আছেন এবং আসবেন। সাহিত্যের আলোকসামান্য শক্তি ও সম্ভাবনা আছে। এটা মানতে হবে। কল্পনার নয়, সত্যিকারের পুঁজিবাদ কেবল ভূগোল-রাজনীতি-ইতিহাস হিসেবি কাঠামোগুলোকে নসাৎ করে দেয় না, আমাদের মনে ও চেতনায় সে তার সদর দপ্তর বসায়। আপনি তাকে ডাইভার্ট করে যে ইমারত বানাবেন তাকে ভাঙতে, আপনার টুঁটি চেপে ধরতে তাকে তো বেগ পেতে হবে না। কাজেই আপস নয় তো মৃত্যু। তো দুচারজন হাতে গোনা শ্রদ্ধেয় যারা আপসের অজুহাতে আসেনি। তারা আজ ডেড। বাকিরা ‘তাল সে তাল মেলাও’। ফলে যা হওয়া তাই হচ্ছে।
আপনাকে স্থির হতে হবে। কেন ছোট কাগজ করবেন? ধরলাম একটা উত্তর : নিজস্ব চেতনার স্বাধীনতার জন্য। রাষ্ট্র কিংবা সমাজ আমাদের শুধুই একভাবে ভাবতে বলে, এক পথে চলতে শেখায়। আজকের উদার আধুনিক সমাজ এবং রাষ্ট্রও যতেচ্ছ প্রয়োগ করে চলে তার নিজস্ব রেজিমেন্টেশন। আর হয় কী সেসব ছকের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাঁচতে বাঁচতে আমরা ভুলে যাই, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের একটা স্বাধীনতার হক আছে। ছোট কাগজের সাহিত্য আমাদের সেই সামর্থের কথা জানায়।
ছোট কাগজের দুনিয়ায় এই সমস্যা আজ ঘনীভূত হয়ে এসেছে। ক্রমবর্ধমান ধনবৈষম্য আমাদের দৃষ্টিকে দিনকে দিন পাতলা করে দিচ্ছে। বিলিয়ে দিতে দিতে রক্ত-মাংস বলতে কিছুই আর নেই। শুধু কঙ্কাল আর কঙ্কাল!
সম্পাদকের মেধা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমি বলব আমরা কে মেধাবী! সবাই আমরা নৈব নৈব চ। আমরা পাশের জন্য প্রস্তুত হই, কখনোই জ্ঞানের জন্য নয়। এটা দুঃখজনক। আমরা কেবলই মিউমিউ করি। ভুলে গেছি হুংকার ছাড়তে। এতটাই নির্জন হয়ে গেছি, ভুলে গেছি কোলাহলে মাততে। সমুদ্র গর্জন করে যাচ্ছে। বাজ পড়ছে। ছলাৎ ছলাৎ করছে নদী। শোঁ শোঁ করে বয়ে যাচ্ছে বাতাস। মড়াৎ করে ভেঙে পড়ছে গাছ। খসখস করছে পাতা। চতুর্দিকে শব্দের তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা বলছে শব্দবাজি বন্ধ করতে হবে। এখানেই লিটলম্যাগের কণ্ঠ জেগে উঠবে।