জিললুর রহমান
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩২ পিএম
লিটল ম্যাগাজিন বলতে যা বুঝি তা হচ্ছে, প্রচলিত প্রকাশনার বিকল্প এবং অবদমনহীন তারুণ্যের রাগী ও প্রতিবাদী উচ্চারণ; বলা চলে একটা লড়াইয়ের হাতিয়ার। কার বিরুদ্ধে লড়াই? শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কিংবা আত্মমর্যাদা ও বাক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই। নতুন চিন্তাচেতনা-দর্শন-বিজ্ঞানভাবনা-কাব্য-সাহিত্যের বাঁকবদলের আন্দোলনেও প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে লিটল ম্যাগাজিন।
লিটল ম্যাগাজিনের লেখক এক ধরনের শ্লাঘাবোধ নিয়ে কাটিয়ে দেয় সারা জীবন। ভেতরে ভেতরে অনুভব করে আত্মসৃষ্ট মানসিক শক্তি, যা তাকে এমন বোধ জাগিয়ে দেয় যে, লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখা টিকে যাবে ভাবীকালের পাঠকের জন্য। এক বিচিত্র আত্মতৃপ্তিবোধ এমন ধারণা তৈরি করে যে, তথাকথিত খ্যাতিমান, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার লেখকদের লেখা দিনান্তে চলে যাবে ঝালমুড়িওয়ালার কাছে। যদিও সম্পর্কহীন, তবু টিকে থাকার লক্ষ্যে অনেক তরুণ জীবন-যৌবন পার করেছেন লিটল ম্যাগাজিনের পেছনে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রার সূচনা বিপ্লবের প্যাম্ফলেট হিসেবে। বোস্টনে প্রথম প্রকাশিত ‘লিটল ম্যাগাজিন’ রালফ ওয়াল্ডো এমারসন এবং মার্গারেট ফুলারের সম্পাদনায় ১৮৪০-১৮৪৪ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। ১৮৯৬ সালে আর্থার সিমন্সের সম্পাদনায় লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দ্য সেভয়’ ভিক্টোরিয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখকদের প্রধান বাহন; রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এর লেখকরা ছিলেন উদারপন্থী-সাম্যবাদী।
লিটল ম্যাগাজিনের স্বরূপ চিহ্নিত করতে গেলে প্রচলিত রীতিনীতি ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং পরিপন্থা, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও সীমিত প্রচার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। একটি নির্দিষ্ট মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে কোনো ব্যক্তি বা সমমনা লেখকদের গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট চিন্তার প্রতিফলনের জন্য নিজ উদ্যোগে পত্রিকা প্রকাশ করে। নিজেদের কথা বলাই মূলত লিটল ম্যাগাজিনের কর্মব্যাপ্তি।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে সাহিত্যের সবচেয়ে নামি লিটল ম্যাগাজিন হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ডের সম্পাদনায় ১৯১২ সালে ‘পোয়েট্রি’ যাত্রা শুরু করলে পাঠক-লেখকমহলে দারুণ সাড়া পড়ে যায়। পোয়েট্রিকে ‘এ ম্যাগাজিন অব ভার্স’ বা ‘কবিতার পত্রিকা’ নামেও ডাকা হতো। ‘পোয়েট্রি’তে কোনো কবির কবিতা ছাপা হলে তাকে আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হতো না। ফরাসি সিম্বলিস্ট কবি-সমালোচকরা ১৮৮০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ছোট কাগজের মাধ্যমেই আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। ১৯২০-এর দশকে জার্মান সাহিত্যেও ছোট কাগজের অবদান ছিল।
হেমিংওয়ে তার বিভিন্ন স্মৃতিচারণে গভীর সন্তুষ্টিতে স্মরণ করেন, তার গল্পগুলো প্রতিষ্ঠিত কাগজগুলো ছাপতে অস্বীকার করলে তিনি প্যারিসে গিয়ে লিটল ম্যাগাজিনে গল্প ছাপাতে শুরু করেন, যা শিগগিরই তাকে সাফল্যের দুয়ারে নিয়ে আসে। এক অচেনা লেখকের জন্য ‘আভাঁগার্দ’ ছিল সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার। সেসময় প্যারিস ছিল অলাভজনক প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। জেমস জয়েসেও লেখা ছাপানোর জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছিলেন। জয়েসের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মার্গারেট অ্যান্ডারসন সেন্সরদের সঙ্গে লড়াই করে ‘দ্য লিটল রিভিউ’তে ইউলিসিস সিরিয়াল নির্বিঘ্নে প্রকাশ করেছিলেন।
সে হিসেবে ব্রিটিশ ভারতে বাংলার তরুণ লেখকরা কিন্তু তেমন পিছিয়ে ছিলেন না। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে গোকুলচন্দ্র নাগ, দীনেশরঞ্জন দাশ, সুনীতা দেবী এবং মনীন্দ্রলাল বসুসহ অনেকেই সাহিত্য, ললিতকলা, সংগীত ও নাটক সৃষ্টি-চর্চার জন্য আড্ডার সূচনা করেন। প্রথমে ‘ঝড়ের দোলা’ নামে চারজনের একটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তার পর দীনেশরঞ্জন এবং গোকুলচন্দ্র মিলে ১৯২৩ সালে বের করেন ‘কল্লোল’ পত্রিকা। কল্লোলের প্রথম সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। কল্লোল সাহিত্যগোষ্ঠীই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক নবজাগরণের সূচনা ঘটায়, যদিও রবিঠাকুরের নিছক মানবপ্রেমী সাহিত্যের বৃত্ত থেকে দূরে সরে গিয়ে আধুনিক সাহিত্যের এই ঝড়কে সাধারণ পাঠক সহজে মেনে নেয়নি। সেদিনের আর এক বিখ্যাত সাময়িক পত্র ‘শনিবারের চিঠি’র সঙ্গে কল্লোল গোষ্ঠীর বেশ কিছু বছর বিখ্যাত সাহিত্যের লড়াই চলেছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করে কল্লোলে বেশ কিছু রচনা লিখেছিলেন। তিনি নব্য সাহিত্যের এই উদ্যোগের প্রশংসা করলেও বাস্তবমুখী সাহিত্যকে মানুষের আদিম ইচ্ছার বশবর্তী করে আনার সারশূন্যতাকেও অস্বীকার করেননি। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতার অমিত রায়ের বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের মানবিক সাহিত্য স্রষ্টা লেখার সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকরা ফ্রয়েড ও মার্কসের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কল্লোলের সাহিত্য আলোচনা সেকালের বহু প্রগতিশীল সাহিত্যিককে প্রভাবিত করেছিল। তারাশঙ্করও অনিয়মিতভাবে কল্লোলের আলোচনায় মাঝেমধ্যে যোগ দিয়েছিলেন। কল্লোলের লেখার সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৫ বছর, প্রেমেন্দ্র মিত্রের বয়স ছিল কুড়ির নিচে আর বুদ্ধদেব বসুর বয়স মাত্র পনেরো। কল্লোলের প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে জন্ম নেয় প্রগতি, উত্তরা, কালিকলম, পূর্বাশা পত্রিকাগুলো। নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে কালিকলম আত্মপ্রকাশ করে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়। যৌবনের উদ্ধত উদ্দামতায় বাধা বন্ধনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, স্থবির পচে যাওয়া সমাজকে আলোড়িত করার জন্য প্রকাশিত কল্লোল ও কালিকলমের আদর্শেরও গভীর ঐক্য ছিল; দুই পত্রিকারই সব লেখক তরুণ ও নতুন।
যদিও পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ মূলত একই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তবু মেধা ও মননের বিকাশ বিচারে পূর্ববাংলা বিশেষ গুরুত্ব রাখে। তখন ঢাকার বাবুবাজার থেকে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রকাশিত হতো। তা ছাড়া ঝালকাঠির ঈশ্বর চন্দ কর সম্পাদিত ‘বরিশাল বার্তাবহ’, আবুল হোসেন সম্পাদিত ‘শিখা’, বগুড়া থেকে এম মেছের আলী সম্পাদিত দ্বিমাসিক ‘তরুণ’, চট্টগ্রাম থেকে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও আবদুর রশিদ সিদ্দিকী সম্পাদিত মাসিক ‘সাধনা’, কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে মীর মোশাররফ হোসেনের প্রকাশনা-সম্পাদনায় পাক্ষিক ‘হিতকরী’ ও কুমারখালী গ্রাম থেকে ‘গ্রাম বার্তা প্রকাশিকা’, যশোরের পালুয়া-মাগুরা গ্রাম থেকে বসন্ত কুমার ঘোষ ও শিশির কুমার ঘোষ প্রকাশিত পাক্ষিক-পত্রিকা ‘অমৃত প্রবাহিনী’, মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার গিরিশচন্দ্র রায় চৌধুরীর ‘বিজ্ঞাপনী যন্ত্র’, রাজশাহীর বোয়ালিয়া ধর্মসভা থেকে প্রকাশিত ‘হিন্দুরঞ্জিকা’, বিক্রমপুরের লোনসিংহ গ্রাম থেকে নারী-বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা ‘অবলা বান্ধব’, ঢাকার ব্রহ্মসমাজের সংগত-সভার মুখপাত্র বঙ্গচন্দ্র রায় সম্পাদিত পাক্ষিক ‘বঙ্গবন্ধু’। এসবের মধ্যে দুয়েকটি বাদে বাকি সব পত্রিকাই পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলা, মহকুমা, গ্রামাঞ্চল থেকে ছাপা হতো। এটা সুস্পষ্ট যে এসব পত্রিকাই পরবর্তীতে আমাদের ছোট কাগজে মনোনিবেশে বিশেষ ইন্ধন জুগিয়েছে। পুঁজিবাদী সভ্যতার নিষ্ঠুরতার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলো নিত্যযুদ্ধ চালিয়ে পিঠ সোজা রেখে, নৈতিকতা বিসর্জন না দিয়ে টিকে থাকার প্রাণান্তকর লড়াই সব যুগেই বিদ্যমান। লিটল ম্যাগাজিনকে এই লড়াইয়ের মধ্যেই নতুন সৃষ্টি, নতুনতর লেখক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হয়। লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রায়শ ক্ষণস্থায়ী, তবে ভয়হীন সাহসে বিদ্রোহে অঙ্গীকারবদ্ধÑ এই চেতনাবীজ সুদূরপ্রসারী। তাই ব্রিটিশ পরবর্তী নবসৃষ্ট ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে বাঙালির জাতিসত্তা এবং বাংলা ভাষার অন্তর্গত শক্তির বীজের উৎসের সন্ধান দিয়েছে লিটলম্যাগ। ষাটের দশকে প্রকাশিত সপ্তক, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, প্রতিধ্বনি, বক্তব্য, যুগপৎ, স্যাড, সমকাল আমাদের জাত্যাভিমান তৈরিতে গভীর বিস্তৃত ভূমিকা রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি ছোট কাগজ মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সময়কার কর্মসূচি এবং পুনর্গঠনের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করত। অনিক ইসলাম সম্পাদিত ‘প্রজন্ম’, প্রবীর সিকদার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘উত্তরাধিকার ‘৭১’সহ বেশ কিছু ছোট কাগজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘উত্তরাধিকার ৭১’ প্রথম সংখ্যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তীব্রতা ভয়ংকরভাবে ফুটে উঠেছে। এই সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন নিজ অভিজ্ঞতা, কোনো বোন লিখেছেন ভাইকে হারানোর অনুভূতি। বীরাঙ্গনা তুলে ধরেছেন অত্যাচার-বিভীষিকার নির্মমস্মৃতি, ক্যাম্পে গণহত্যার বর্ণনা।
আশির দশকে লিটল ম্যাগাজিনগুলো স্বৈরাচারী শাসনের বিপক্ষে তাদের চেতনাকে শানিত করে। এই সময়ে মিনার মনসুর সম্পাদিত এপিটাফ, রাশেদ মাহমুদ সম্পাদিত ‘শামা’সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তপন বড়ুয়ার সম্পাদনায় গাণ্ডীব, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের একবিংশ, সরকার আশরাফের নিসর্গ এবং এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত লিরিক স্বৈরাচার বিরোধিতার পাশাপাশি বাংলা কবিতা ও বাংলা সাহিত্যের ভাষা-আঙ্গিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন আদর্শিক চেতনা বিকাশে ভূমিকা রাখে। ‘তৃণমূল’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে সাম্যবাদী চেতনার প্রসারে, মানবিক সংস্কৃতির বিকাশে। নব্বই দশকেও প্রান্ত, নদী, পেঁচা, সমুজ্জ্বল সুবাতাসসহ সারা দেশ থেকে নানান চিন্তা ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্যে অনেক উজ্জ্বল পত্রিকা লেখক তৈরি এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। এখনও দেশের নানাপ্রান্তে তরুণরা নতুন কাগজ প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের সৃজনশীলতাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসছে।
তবে ইদানীং দেখি, লিটল ম্যাগাজিন ছাপা হয় বড় জোর দুই কী তিনশ কপি। প্রায় ১৬ কোটি, মতান্তরে ২০ কোটি, মানুষের এই জনপদে একটি কাগজ সর্বোচ্চ ৫০০ কপি ছাপা হয়। পাঠক-সংখ্যা আরও কম। তাই জনরুচি কিংবা জনমত তৈরিতে আজ লিটল ম্যাগাজিন কতটুকু ভূমিকা রাখে, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তবে কেন এই অহমিকা লিটল ম্যাগাজিনের লেখকের?
অহমিকার পেছনে লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস ভীষণভাবে দায়ী। কলেবরে লিটল হলেও, পাঠক সংখ্যা লিটল হলেও, এর ভেতরে রয়েছে বিপ্লবী চেতনার আগুন। লিটল ম্যাগাজিন সব সময় নতুন চিন্তাদর্শন এমনকি নতুন রাজনীতির সূচনা ঘটানোর প্রয়াস পায়। সব সময় লিটল ম্যাগাজিন মানেই একটি বিপ্রতীপ ধারার চিন্তাচর্চার আধার। লিটল ম্যাগাজিনে লেখেন রাগে ফুসতে থাকা তরুণ এবং প্রেমে টগবগ করা যুবক, সামনে প্রেম ও সাম্য ছাড়া যার আর কোনো লক্ষ্য থাকে না; স্বার্থান্ধ হওয়ার কিংবা ধান্দায় লিপ্ত হওয়ার প্রয়াস পায়নি, শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছুই থাকে না। তরুণ নিঃস্বার্থ কবি-লেখকদের চিন্তার ভেতর মানবকল্যাণ এবং নিপীড়নবিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটে। যদি লিটল ম্যাগাজিনের শক্তি থাকে, তা এই দারিদ্র্যই, যা লেখক-কবিদের অকপটে সত্য উচ্চারণ করার সাহস জোগায়। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে অপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠাবিরোধ। কিন্তু সময় এমন এক উড়ালপঙ্খী যে, কালক্রমে প্রতিষ্ঠাবিরোধীরা দীর্ঘ জীবন পার করতে করতে অর্জন করেন সুনাম বা খ্যাতি। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থবিত্ত এবং সামাজিক মর্যাদা। তখন তাদের লেখায় ধীরে ভুঁড়ির মেদের মতো জমতে থাকে আপস। আপসের ঘুণ এমন মারাত্মক যে, লেখক হয়ে পড়েন ছদ্মবিপ্লবী, প্রকৃতার্থে পাতিবুর্জোয়া। তাদের তখন জমে থাকা বিত্তের উত্তাপে বৃহদাকার কাগজ করার সক্ষমতা অর্জিত হয়, কাগজ প্রকাশও করে। কিন্তু সে কাগজ পরিসরে বৃহদাকৃতি হলেও দীপ্তিতে নিস্তেজ। সে কাগজ তখন আর আলোড়িত করতে পারে না নতুন প্রজন্মকে। এমনিতেই লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যালঘু পাঠকের কাগজ; নতুন চিন্তার পক্ষে এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থানে তার জায়গা নির্ধারণ করে, কিন্তু আপসকামী লেখকের হাতে তা ধীরে ধীরে নিষ্প্রাণ-নিষ্প্রভ হয়ে বই দোকানে বা বাইন্ডারের ঘরে কাগজের অযথা স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে। চেতনায় শানিত না হলে নতুন চিন্তাচর্চার স্ফুরণ না ঘটলে বিপ্রতীপ ধারার পাঠক কেন গ্রহণ করবে এসব কাগজ? এখন প্রশ্ন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগেও কি লিটল ম্যাগাজিন কেবলই প্রিন্ট-ফর্ম নিয়ে বসে থাকবে? তা বোধহয় সম্ভব নয়। এখন সহজে অধিক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হলে অবশ্যই ওয়েবম্যাগে নিজেকে উন্নীত করতে হবে। ওয়েব লিটলম্যাগ করতে হলে তেমন ওজস্বী লেখা, শানিত চেতনা এবং বৈপ্লবিক মনোবৃত্তি থাকা জরুরি। বর্তমান সময়ে পৃথিবী শাসন করছে পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদকে মদদ দিচ্ছে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা। সে আপনি ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতাহীন যে দলের দিকেই তাকান, দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্রই পুঁজিবাদ ও ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িকতার সম্মিলিত চেতনারই কেতন উড়ছে। তাই সাধারণ সাহিত্য পত্রিকা বা বাণিজ্যিক কাগজের সাহিত্য এই স্থিতাবস্থার ব্যাপারে ব্যাপক সন্তোষের সঙ্গে সৃজন করছে আপস-রফার সাহিত্য। এসব সাহিত্যে পাতিবুর্জোয়ার সঙ্গে ছদ্মবিপ্লবীরও পদচারণা থাকে। কিন্তু ছিটকে পড়ে সত্যিকার নিরাপস চরিত্রের তরুণ অনভিজ্ঞ কিন্তু তেজোদ্দীপ্ত লেখকটি এবং ফিরতে থাকে নানা সম্পাদকের দুয়ারে দুয়ারে। কিন্তু তার কথাটি ছাপানোর যোগ্য কাগজ সে খুঁজে পায় না। কারণ এসব বাণিজ্যিক কাগজে লেখা ছাপাতে হলে লেখাকে তাদের ছাঁচে ঢালাই করে লেখতে হবে। যারা চতুর-লেখক তারা তথাকথিত স্বতঃস্ফূর্ততায় পত্রিকার নীতি বজায় রেখে ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি চ্যালেঞ্জ না হয় এমনভাবে লেখাটি তৈরি করে নেন। নিয়মিত ছাপা ও প্রচার তখন তার জন্য ডাল-ভাত হয়ে পড়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে তার শিকার লেখক সত্তা। আর যে যুবক প্রতিস্পর্ধী, সাহস যাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সে যথাবাক্য উচ্চারণে স্থির থাকে। তখন তার জন্য সব পত্রিকার গন্তব্যে তালা ঝুলতে থাকে। এই তরুণ-সাহসী-শানিত বিপরীত চিন্তার সংখ্যালঘু লেখকের চিন্তাচেতনা ও সাহিত্য প্রকাশের একমাত্র জায়গা কেবলই লিটল ম্যাগাজিন। আর এই লেখকই লিটল ম্যাগাজিনের শক্তি। মনে রাখা দরকার এই তারুণ্য বয়স দিয়ে নয়, চেতনা ও তেজ দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
লিটল ম্যাগাজিনের আরেকটি বড় শক্তি বা বৈশিষ্ট্য এক ধরনের গোষ্ঠীবদ্ধতা। যদিও সৃজনশীলতা এক ধরনের একাকী সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকার যজ্ঞ, তবু কিছু বিষয়, ধারণা বা স্বপ্ন সামনে রেখে কবি-লেখক-শিল্পীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোনো ম্যানিফেস্টো নিয়ে বা ম্যানিফেস্টো ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট লিটল ম্যাগাজিনের ব্যানারে এক ছাতার তলায় সংঘবদ্ধ হতে পারে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই গোষ্ঠীবদ্ধতা চিরস্থায়ী তো দূরের কথা, দীর্ঘস্থায়ীও হয় না। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যে বা যারা মেধাবী ও প্রতিভাবান থাকে, সে একসময় টের পায় মাঝারি মেধার সম্পাদকের কোচড়ের মধ্যে অবস্থান করতে করতে নিজ প্রজ্ঞা ও মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তখন সে গোষ্ঠীর গণ্ডি ছেড়ে একটি একাকী ঘুড়ির মতো উড়তে থাকে দিগন্তে। অধিকাংশই বোকাট্টা হয়ে হারিয়ে যায় বটে, তবে দুয়েকজন দীপ্তি ছড়িয়ে যেতেই থাকেন। সত্যিকার লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক এই লেখকদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। যারা তা করেন, কালের করালগ্রাস থেকে নিজেকে এবং কাগজকে তারা হয়তো উদ্ধার করতে পারেন। যদিও অধিকাংশই কৃষ্ণবিবরে হারিয়ে যায়, তবু কোন কোন কাগজ কোন কোন লেখকের সৃষ্টি বিগ ব্যাং হয়ে নতুন গ্যালাক্সির সূচনা ঘটায়।
আমরা যারা লিটল ম্যাগাজিনের লেখক হিসেবে বেড়ে উঠেছিলাম, আমাদের কাছে এ কাগজ পরিসরে লিটল হলেও চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপকতায় অনেক বিস্তৃত বা বড় বলে মনে করি। এই লিটল ম্যাগাজিনের শক্তি বিত্ত নয় চিত্তের উত্তাপ; তার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য উদ্দেশ্য বা ম্যানিফেস্টো নিয়ে গোষ্ঠী সমন্বয়ে একটি আন্দোলন পরিচালনা করাও লিটল ম্যাগাজিনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তির নিয়ামক।