চন্দন চৌধুরী
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:২৯ পিএম
তারা উদ্যমী, রক্তের মতো ভাবনায় উত্তাল, যেন বাঁধনহারা নদীর জোয়ার, সব ভাঙতে চায় নতুন করে গড়তে, সমাজকে নিতে চায় অনন্য সভ্যতায়, সাহিত্য জগতে তরুণ লেখকদের এমনই কণ্ঠস্বরÑ যেগুলো প্রচলিত ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের সেই চেতনার ফসল লিটল ম্যাগাজিন। বাণিজ্য ও জনপ্রিয়তার মোহ থেকে দূরে থেকে, এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো হয়ে ওঠে নতুন চিন্তা, ভিন্ন দর্শন এবং নিরীক্ষাধর্মী লেখার এক মুক্ত মঞ্চ। এদের মূল লক্ষ্য, প্রচলিত সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানো এবং সমাজের গতানুগতিক চিন্তাভাবনায় এক নতুন ঢেউ আনা।
লিটল ম্যাগাজিন কেবল কিছু লেখার সমষ্টি নয়, বরং এটি আপসহীনতা, বাণিজ্য-বিমুখতা এবং নতুনত্বের প্রতিশ্রুতির এক অকুতোভয় দৃষ্টান্ত। লিটল ম্যাগাজিনের ধারণাটি মূলত উনিশ শতকের ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে এসেছে। রাল্ফ ওয়াশ্চো এমারসনের সম্পাদিত ‘The Dial’ (১৮৪০) এবং হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ড-এর ‘Poetry : A Magazine of Verse’ (১৯১২) ছিল এই ধারার পথিকৃৎ। এই ম্যাগাজিনগুলো নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ভিন্নধর্মী ভাবনাকে প্রকাশ করত, যা মূলধারার প্রকাশনাগুলো ছাপতে চাইত না।
বাংলা সাহিত্যে এই ধারণার প্রথম প্রবর্তন করেন প্রমথ চৌধুরী। তার সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪)-কে বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের আদি রূপ ধরা হয়। প্রমথ চৌধুরী, যিনি বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রচলন করেন, ‘সবুজপত্র’-এর মাধ্যমে সাহিত্যকে রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে নতুন এক স্বাদ দিতে চাইলেন। এরপর আসে ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৪), ‘কালিকলম’ (১৯২৭), এবং ‘প্রগতি’ (১৯২৭)। এই পত্রিকাগুলোর লেখকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জীবন, মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করা। এই পত্রিকাগুলো ছিল অনেকটা সাহিত্যিক বিদ্রোহের মতো, যা বাংলা সাহিত্যের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সাহিত্য পত্রিকা থেকেই মূলত বিবর্তিত ধারায় বাংলা সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) লিটল ম্যাগাজিনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যবিত্তের উত্থান এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নতুন সাহিত্যিক চেতনার জন্ম দেয়। প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো যখন পুরনো ধারা ধরে রেখেছিল, তখন তরুণ লেখকেরা বিকল্প প্লাটফর্ম খুঁজতে শুরু করেন। এই প্রেক্ষাপটেই লিটল ম্যাগাজিনগুলো নবচেতনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
এই দশকের প্রথম উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন ছিল চট্টগ্রামের মাহবুব-উল আলম চৌধুরী ও সুচরিতা চৌধুরী সম্পাদিত ‘সীমান্ত’ (১৯৪৭-৫২)। এটি ছিল শুধু একটি সাহিত্য পত্রিকা নয়, বরং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এর একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। এরপর ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘অগত্যা’। এটি মধ্যবিত্ত, নব্যনাগরিক জীবনের এবং বুর্জোয়া মানবতাবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তরুণ ও প্রগতিশীল লেখকেরা এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই তাদের সাহিত্যচর্চা গড়ে তোলেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আসে আবদুল আলীম চৌধুরী ও আহমদ কবিবের ‘যাত্রিক’ (১৯৫৩), যা তরুণ সাহিত্যিকদের চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এরপর সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে প্রকাশিত হলেও এর সমৃদ্ধি ছিল ষাটের দশকজুড়ে। এটি প্রগতিবাদী ও সৃষ্টিশীল লেখাকে স্থান দিত এবং তরুণ লেখকদের জন্য একটি নতুন সুযোগ তৈরি করে। এই সময়ে ফজল শাহাবুদ্দিন সম্পাদিত ‘কবিকণ্ঠ’ এবং সাঈদুর রহমান সম্পাদিত ‘খাপছাড়া’-ও আন্দোলনকে গতিশীল করে। পঞ্চাশের দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলো ছিল মূলত প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এবং নতুন লেখকদের জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরির প্রথম সাহসী পদক্ষেপ।
ষাটের দশক বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে সাহিত্য কেবল গতানুগতিক ধারায় বয়ে চলেনি, বরং তরুণ লেখকদের হাতে পেয়েছিল এক নতুন গতি ও মাত্রা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন এবং সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার প্রতি তীব্র ঘৃণা এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এই দশকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে ‘স্যাড জেনারেশন’ (১৯৬৩) ছিল এক বিস্ফোরণসম বুলেটিন। পশ্চিমা ‘অ্যাংরি জেনারেশন’ বা ‘বিট জেনারেশন’-এর প্রভাবে রফিক আজাদের মতো কবিরা এটি প্রকাশ করেন। এটি তৎকালীন সময়ের অবক্ষয়ী চেতনার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ ছিল। এরপর ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩) ছিল দুঃসাহসিকতার এক অনন্য উদাহরণ। এর প্রচ্ছদ থেকে প্রতিটি শব্দ ছিল নির্ভীক ও তীক্ষ্ণ উচ্চারণে ভরপুর। এই পত্রিকাটি বিশৃঙ্খল ভাবনার তরুণ কবিদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করেছিল।
তবে এই দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী লিটল ম্যাগাজিন ছিল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কণ্ঠস্বর’ (১৯৬৫)। এটি প্রায় ১২ বছর ধরে অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রথাগত সাহিত্যের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। এর ঘোষণাপত্রই ছিল এই পত্রিকার আদর্শের সবচেয়ে বড় প্রমাণ : ‘যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, বিবরবাসী; যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত; যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাস্পৃষ্ট কণ্ঠস্বর তাদেরই পত্রিকা। প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধ্যাপক, পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, ‘পবিত্র’ সাহিত্যিক এবং গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায় অনাহূত।’
এই ঘোষণাই লিটল ম্যাগাজিনের মূল দর্শনকে তুলে ধরেÑ তা হলো আপসহীনতা ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা। এই দশকে গল্প বিষয়ক প্রথম পত্রিকা ‘ছোটগল্প’ (১৯৬৬) কামাল বিন মাহতাবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়, যা গল্পকেন্দ্রিক একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
এই সময়ের লিটল ম্যাগাজিনগুলো কেবল কিছু লেখার সংগ্রহ ছিল না, বরং একটি আদর্শিক আন্দোলন ছিল। সপ্তক (১৯৬২), বক্তব্য (১৯৬৩), যুগপৎ (১৯৬৩), সাম্প্রতিক (১৯৬৪) এবং ঢাকার বাইরে থেকে বিপ্রতীক (১৯৬৭)-এর মতো পত্রিকাগুলো এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। এই আন্দোলন দেখিয়েছিল, কীভাবে বাণিজ্যিক লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল মেধা ও নিষ্ঠার জোরে একটি সাহিত্যিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সত্তরের দশকটি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। স্বাধীনতার পর মানুষের চেতনাজগতে যে স্বতন্ত্র পরিবর্তন আসে, তা সাহিত্যেও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই সময়ে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ষাটের দশকের মতো একই গতিতে প্রবাহিত না হলেও, এটি তার নিজস্ব পথে নতুন ধারা সৃষ্টি করে। এই সময়ে দৈনিক ও সাপ্তাহিক বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোর আধিপত্য বেড়ে যাওয়ায় লিটল ম্যাগাজিনগুলো কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিছু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে থাকে, যা সত্তরের দশকের সাহিত্যচর্চাকে গতিশীল রাখে। এই পত্রিকাগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা এবং নবীন লেখকদের জন্য একটি স্বাধীন প্লাটফর্ম তৈরি করা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ছিল ওবায়দুল ইসলাম ও মুহম্মদ হাবিবুল্লাহর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মুখপত্র’ (১৯৭২)। এটি নতুন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের পুনর্গঠনের একটি সাহসী উদ্যোগ ছিল। মফিদুল হক সম্পাদিত ‘গণসাহিত্য’ (১৯৭২) পত্রিকাটি প্রগতিশীল লেখকদের নিয়ে সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলে। এ ছাড়া আবু সাঈদ জুবেরী, জাহিদ হায়দার ও আহমদ বশিরের ‘বিপক্ষে’ এবং তিতাশ চৌধুরী-এর ‘অলক্ত’ এই দশকে কথাসাহিত্যকে বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবিদ আজাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কবি’ (১৯৭৫) সমকালীন কবিদের বিশ্লেষণধর্মী কবিতাকে গুরুত্ব দিত। সত্তরের দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রমাণ করে যে, সংকট বা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার প্রকাশ কখনও থেমে থাকে না। আশির দশকটি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের জন্য একটি জটিল সময় ছিল। এই সময়ে একদিকে যেমন লেখা ও চিন্তার গভীরতায় এক ধরনের সংকট দেখা দেয়, তেমনি মুদ্রণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু পত্রিকা তাদের আদর্শ ও সততাকে ধারণ করে আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখে।
এই দশকের উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন ছিল আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ (১৯৮২)। বদরুদ্দীন উমরের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সংস্কৃতি’ বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। এটি কেবল নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যচর্চাই নয়, বরং সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিল্পকলা নিয়েও আলোচনা করত। খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ ছিল মূলত কবিতা ও কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ। এই দশকেই বগুড়া থেকে সরকার আশরাফের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘নিসর্গ’ লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, বরং লিটল ম্যাগাজিন চেতনার একটি প্রতিষ্ঠান-বিরোধী আন্দোলনের নাম।
আশির দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রমাণ করে যে, সংকট বা প্রতীক‚ লতার মুখেও সৃজনশীলতা ও আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা কখনও থেমে থাকে না। তারা বাণিজ্যিক আগ্রাসন, সরকারি স্বৈরতন্ত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
নব্বইয়ের দশকটি ছিল বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের জন্য এক নতুন যাত্রার সময়। এই দশকে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা সমাজে ছিল, তেমনি বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন নতুন চিন্তা যুক্ত হচ্ছিল। এই পরিবর্তিত পরিবেশে লিটল ম্যাগাজিনগুলো তাদের চিরাচরিত আদর্শের সঙ্গে নতুন ধারার নিরীক্ষাধর্মী লেখাকে যুক্ত করে সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। এই সময়ে কামরুল হুদা পথিক এর ‘দ্রষ্টব্য’ (১৯৯২) এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘তৃণমূল’ প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা ও প্রগতিশীলতার চর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ওবায়েদ আকাশের ‘শালুক’ (১৯৯৯) এবং অনিকেত শামীম-এর ‘লোক’ (১৯৯৯)-এর মতো পত্রিকাগুলো অসংখ্য নতুন লেখকের জন্ম দেয়।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অর্থাৎ প্রথম বা শূন্য দশকে, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন নতুন এক বাঁক নেয়। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারের ফলে লিটল ম্যাগাজিনগুলো তাদের চিরায়ত কাগজের রূপের পাশাপাশি অনলাইন প্লাটফর্মেও নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করে। এর ফলে এক নতুন প্রজন্ম নিজেদের সাহিত্য ভাবনা প্রকাশের সুযোগ পায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘চিহ্ন’ (২০০০) এই দশকের একটি অন্যতম সফল উদ্যোগ। এটি শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, বরং এটিকে ঘিরে নবীন লেখকদের একটি নিয়মিত পাঠচক্র এবং সৃজনশীল চিন্তাচর্চার কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
দ্বিতীয় দশকে (২০১০-এর দশক) এসে লিটল ম্যাগাজিনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যম। ফেসবুক, ব্লগ, অনলাইন পোর্টাল এবং ওয়েবজিনগুলো লিটল ম্যাগাজিনের নতুন প্লাটফর্ম হয়ে ওঠে। এই সময়ে কাগজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ করে দেয় ডিজিটাল মাধ্যম। লেখকেরা কোনো সম্পাদকের অনুমতির অপেক্ষা না করে নিজেদের লেখা সরাসরি অনলাইনে প্রকাশ করতে শুরু করেন, যা বৈশ্বিক পরিধি বাড়িয়ে দেয়।
বুদ্ধদেব বসু লিটল ম্যাগাজিনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। লিটল ম্যাগাজিন কখনোই জনপ্রিয়তার জন্য কাজ করে না, বরং এটি মনকে জাগাতে চায়। এটি নতুন সুরে নতুন কথা বলতে চায়, গতানুগতিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে। এই পত্রিকাগুলো ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু তাদের প্রভাব স্থায়ী ও গভীর। লিটল ম্যাগাজিন মূলত একটি আন্দোলন, যা প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, বাণিজ্যিক আগ্রাসন এবং গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই করে। এটি আপসহীনতা, বাণিজ্য-বিমুখতা এবং নতুনত্বের প্রতিশ্রুতির এক অকুতোভয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন চর্চা এক দীর্ঘ এবং সংগ্রামী ইতিহাসের ফসল। এটি কেবল কিছু কাগজের প্রকাশ নয়, বরং নতুন চিন্তা, নতুন সাহিত্য এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতির এক সজীব দলিল। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, লিটল ম্যাগাজিনগুলো আমাদের সাহিত্য ও মননশীলতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, যা বারবার প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কণ্ঠস্বর কখনও স্তব্ধ হয় না। এই চলমান আন্দোলন সাহিত্যের ভবিষ্যৎকে নতুন দিশা দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে এত এত লিটল ম্যাগাজিন, এই ছোট পরিসরে সবকিছু তুলে ধরা সম্ভবপর নয়। যারা লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে জড়িত সবাই আমার নমস্য। এই লেখার সঙ্গে তাদের কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ থাকল।