× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছোটকাগজ বেড়ে ওঠার দার্শনিক প্রেক্ষাপট

এজাজ ইউসুফী

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:২৫ পিএম

ছোটকাগজ বেড়ে ওঠার দার্শনিক প্রেক্ষাপট

প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা দার্শনিক প্রত্যয়কে আঘাত করার মধ্যেই ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য নিহিত থাকে। একসময়কার বৈপ্লবিক চেতনা ও তাত্ত্বিকতা জাগতিক ও সামাজিক অগ্রগতির নিয়মেই radicalism-এ পরিণত হয়। লিটল ম্যাগাজিন সত্যিকার অর্থে এ অর্বাচীনতার তফাত দেখিয়ে দেয় আমাদের। দ্ব্যর্থকভাবেই, জ্ঞানতত্ত্বের এ পর্যায়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলো সমাজের ও চিন্তার রুদ্ধ-স্রোতকে ভেঙে দেয় অনায়াসেই। তাই অনেক সময় দেখা যায়, চিন্তা ও দার্শনিকতার ওই স্তরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলো হয়ে ওঠে পরস্পরবিরোধী এবং অসংলগ্ন। নানা জন্মগত টানাপড়েন একটি লিটল ম্যাগাজিনের চেহারায় ফুটে উঠবেইÑ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই খুব একটা। একটি সৎ ছোটকাগজ আমাদের বলে দেয়; বিপ্লবের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। আসলে রাষ্ট্র ও সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের মধ্যেই বিরোধিতার বীজ সুপ্ত থাকে। ছোটকাগজগুলো তার অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রতিষ্ঠান ও প্রথাবিরুদ্ধতার ক্ষেত্র হিসেবে নতুন ভাবুকদের জন্য একটি মুক্তির মোর্চা গড়ে তোলে।

লিটল ম্যাগাজিনগুলো পুরনো হেজিমনির বিরোধিতা করে। বুদ্ধিভিত্তিক ও বিপরীতধর্মী ক্রমঃমনন কর্ষণের ক্ষেত্র এটি। সমস্ত কিছুর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় সে। প্রযুক্তি আমাদের চেতনা এবং ক্ষমতাকে আলাদা করে দিয়েছে। আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে তত্ত্বের বিশ্বজনীনতা। লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে আত্মপুনঃনিরীক্ষণের ব্যবস্থা আছে। তা আমাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে সচল রাখে। কারণ সাহিত্য পত্রিকাগুলো গতানুগতিক চিন্তার সেবাদাস। তাই গোষ্ঠীবদ্ধতা কিংবা ইজমÑ কোনটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য জরুরি তা ঠিক করতে হবে। মৌলপন্থীরাই সবচেয়ে শক্তিশালী ও গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে ও বিশ্বে। বিভিন্ন চেহারায় সে নিজেকে বৈধতা দেয়। তাই তাকে সুশৃঙ্খল হতে হয়। তাকে পুষতে হয় পেটোয়া বাহিনী। লিটল ম্যাগাজিনের সমস্যার কেন্দ্র এখানেই। যে ভাঙতে চায়Ñ তাকে কিছুটা বিশৃঙ্খল, কিছুটা স্বেচ্ছাচারী হতেই হয়। প্রতিষ্ঠিত হেজিমনির বিরোধিতা করতে গিয়ে হয়তো বা কখনও আপন নিবাসটি হারিয়েও ফেলে। 

প্রতিষ্ঠিত সামাজিকতা ও চেতনাশক্তির ব্যূহ ভাঙার তাগিদ থেকেই কিছু স্বাধীন কল্পনাশক্তির অধিকারী তরুণ শুধু ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করেই একটি লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে সমবেত হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা ও পরাজয় লিটল ম্যাগাজিনের নিয়তি হওয়া সত্ত্বেও আলোকপ্রাপ্তির আশায় ১. কনসেপ্টের দিক থেকে, ২. এস্টাবলিশমেন্ট ভাঙার প্রত্যয় থেকে তাকে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হয়। যুক্তির মাধ্যমে মুক্তি শুধু নয়, অনিবার্যভাবে এসে পড়া আঘাত সামলাতে পারস্পরিক সমঝোতাও জরুরি। তাই লিটল ম্যাগাজিন একটি মিশন, একটি আন্দোলন।

সব ছোটকাগজই লিটল ম্যাগাজিন নয়, কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন। এসব প্রশ্নেরও সমাধান করতে হয়। বাংলাদেশে এমন দুয়েকজন আছেন, যারা চরিত্রে মৌলবাদী এবং আচরণে প্রতিক্রিয়াশীল। এরা প্রতিষ্ঠানের তৈল-মর্দনকারী। অর্ধশিক্ষিত মানবকুলের এসব প্রতিনিধিরা ছদ্মবেশী সেজে গরম গরম বুলি কপচে লিটলম্যাগের ধুয়ো দিচ্ছে। অন্যদিকে মার্কসবাদকে অর্ধহজম করে, পুঁজিবাদের সঙ্গে অ-বনিবনাকে পুঁজি করে, আত্মবিকৃতিকামী অবুঝ পাণ্ডিত্যের অহমকে সঙ্গী করে, অল্পবিস্তর লিটলম্যাগের শিককাবাব বানাচ্ছে। সামাজিক প্রেক্ষিতের তাবৎ সুখ সুবিধাকে বগলদাবা করে এরা আসলে মিডিয়ার ঘাড়ে সওয়ার হতে চায়। এ ধরনের একসময়কার কিছু লিটল ম্যাগাজিন কর্মী (লিটলম্যাগের ক্ষেত্রে বিপ্লবের দাবিদার) সম্প্রতি ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী বহুজাতিক ডানার তলে সমবেত হয়েছেন। তারা এখন ‘কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি’র সোল এজেন্সি নিয়ে বসেছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস এসব বুদবুদ মুখ থুবড়ে পড়বেই। অন্যদিকে যথার্থ ছোটকাগজটি বেঁচে থাকবে মানুষের আশায়, দূর-স্বপ্নের প্রেরণায় এবং স্বকীয় মহিমায়।

এসব বিবিধ ভাবনা থেকেই ছোটকাগজ ‘লিরিক’ প্রকাশ করে যাচ্ছি। ১৯৮২ সালে যখন এক ফর্মার একটি কবিতা সংখ্যা বের করি তখন লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল বলা যাবে না। দুয়েকটা পত্রিকা হয়তো দেখে থাকতে পারি। কিন্তু সে সম্পর্কে পাঠ ছিল না। পরবর্তীকালে কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পর ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে। তৃতীয় কি চতুর্থ সংখ্যা করার কাজ শুরু করেছি। ভাবলাম বিখ্যাত লেখকদের লেখা ছাপানো দরকার। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও বংশীবাদক সুচরিত চৌধুরী তখন নিউমার্কেটে আজমীর স্টোরে আড্ডা দেন। সেটি কবি সৈয়দ রফিকুল আলমের স্টোর। রফিক ভাই আমাদের সবুজ আড্ডার একজন আড্ডারু। তাকে ধরলাম সুচরিত চৌধুরীর একটি লেখা জোগাড় করে দিতে। কয়েক দিন পরে রফিক ভাই বললেন, লেখার জন্য ১০০ টাকা সম্মানী দিতে হবে। সেটা আশির দশকে অনেক টাকা। পুরো ম্যাগাজিন বের করতে দেড়/দুই হাজার টাকা লাগত। আমি রফিক ভাইকে জানালাম, পঞ্চাশ টাকা জোগাড় করে দিতে পারব। সেই টাকার বিনিময়ে সুচরিত চৌধুরী ছোট্ট একটা লেখা দিলেন ‘বাঁশির কান্না’ নামে। এক বন্ধু (নাম মনে নেই) সম্মানী ছাড়াই এনে দিলেন তখন খুবই বিখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গ‍ুণের একটি কবিতা। আমি তো দারুণ খুশি। বিখ্যাত দুজনের লেখা আছে আর কী লাগে! কিন্তু বেরোবার পর তৎকালীন সাপ্তাহিক ‘সন্ধানী’-তে রিভিউ করলেন কথাসাহিত্যিক সুশান্ত মজুমদার। লিখলেন : একটি ছোটকাগজে দুজন বড় লেখকের লেখা ছাপানো ঠিক হয়নি। তিনি সার্বিকভাবে ছোটকাগজ ‘লিরিক’-এর প্রশংসা করলেন। এই সমালোচনা আমার চোখ খুলে দেয়। পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস। তার কমিটমেন্ট কী। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কাকে বলে। বিপ্রতীপ তরুণ প্রজন্মের লেখকদের যুক্ত করে গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

‘লিরিক’-এর প্রথম শুরু ও অতঃপর ‘লিরিক’-এর আগেও পত্রিকা বের করতাম, মতপার্থক্যের কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ‘কবিতা’ নামে একটি কবিতার কাগজ ’৮১ সালের দিকে বের করতাম। পরে যৌথ সম্পাদনা থেকে সরে পড়ি। ‘ঘাঁটি’ নামে আরও একটি কাগজের একটি সংখ্যা বের করি। এটিও যৌথসম্পাদনায় বের হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামীকরণের কারণে সরে আসতে বাধ্য হই।

চার দশকে ‘লিরিক’-এর ১৫টি সংখ্যার জন্ম হয়েছে। অবশ্য এখানে একটি বিকলাঙ্গ ‘লিরিক’ও আছে। অর্থাৎ ৪ পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েড সাইজের ‘লিরিক’ ১ সংখ্যার মর্যাদা পেয়েছে। এরশাদের সামরিক শাসনামলের প্রথম দিকে প্রেস ও ছোটকাগজগুলোর ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বের করার ফলে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে সংখ্যাটি।

‘লিরিক’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় সমস্যা অনেক। ‘লিরিক’ যখন এক ব্যক্তির হাত ধরে বের হতে শুরু করে তখন অর্থের সমস্যা ছিল প্রকট। যখন বৃত্ত তৈরি হলো তখন অর্থ কোনো বড় সমস্যা হয়নি। তখন সমস্যা হলো লেখা নির্বাচন ও সামগ্রিক চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে পত্রিকার চরিত্র বজায় রাখা। এখন আসা যাক, মূলত কী কী বৈশিষ্ট্যের জন্য একটি পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন অথবা লিটল ম্যাগাজিন নয়, এবং লিটল ম্যাগাজিন বলতে আমি কি বুঝি তা পরিষ্কার করা। 

বাংলাদেশের ছোটকাগজ আন্দোলনের শীর্ষ কাগজের মধ্যে সমকাল, কণ্ঠস্বর, পেঁচা, গাণ্ডিব, লিরিক, নিসর্গ, সংবেদ, প্রতিশিল্প, এ রকম একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা করলে তাতে ‘লিরিক’-এর জায়গা করে নেয়াটা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

‘লিরিক’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা

১৯৯২ সালে ‘লিরিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা’ প্রকাশ ছিল যুগান্তকারী একটা ঘটনা। বাংলা কথাসাহিত্যের ক্ষত্রিয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি কীভাবে যেন হাতে পেয়ে যাই। উপন্যাসের প্রতি আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। এখনও বিশেষ নেই। কিন্তু এটি ঘোরগ্রস্তের মতো পড়ে শেষ করে ফেলি। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কথাসাহিত্যিক ‘হাসান আজিজুল হক সংখ্যা’ বের করেছে কলকাতার লিটলম্যাগ ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’। একদিকে উপন্যাস পাঠের ঘোর। অন্যদিকে হাসান সংখ্যার অনুপ্রেরণা আমাকে ‘আখতারুজ্জমান ইলিয়াস সংখ্যা’ প্রকাশে উৎসাহিত করে। কাজ শুরু করে দিই। প্রথমে তার রচনাবলি সংগ্রহ। পাশাপাশি মগ্ন হই পাঠে। প্রতিদিন তাকে যেন নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করতে থাকি।

এ পর্যায়ে ‘লিরিক’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিই। তার ওপর প্রকাশিত এই সংখ্যাটিতে লিখবার জন্য বাংলাদেশ এবং ওপার বাংলার বিভিন্ন ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিকদের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করি। কিন্তু তেমন করে সাড়া পাচ্ছিলাম না। অনেকেই লেখা দেবেন বলে কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। অনেকে বিমুখ করেছেন। কথাসাহিত্যিক সুশান্ত মজুমদার ও মঞ্জু সরকার খুবই সহযোগিতা করলেন। নিজেরা লিখলেন। অন্যদের উৎসাহিত করলেন লিখতে। সুশান্তদা বড় একটি প্রবন্ধ রচনা করে সেটি ‘পাঠক সমাবেশ’-এর বিজুর কাছে দেন। ঢাকাস্থ বন্ধুবর সেলিম উল্লাহ সেটি সংগ্রহ করে আমাকে পাঠানোর কথা। এর মধ্যে ‘রূপম’ পত্রিকার সম্পাদক আনোয়ার আহমেদ বড় একটি জালিয়াতি করলেন। বিজুর কাছ থেকে লেখাটি নিয়ে ফটোকপি করে ‘আজকের কাগজ’-এর সাহিত্য পাতায় ছাপিয়ে দিলেন। এতে এই বিজ্ঞের কী লাভ হলো জানি নাÑ আমার মনে দাবাগ্নি জ্বলে ওঠে। তার সঙ্গে রফাদফা করতে ঢাকায় চলে আসি। শাহবাগে তাকে আর খুঁজে পাইনি। সুশান্তদা আমার রাগ প্রশমিত করতে আরও একটি লেখা তৈরির অঙ্গীকার করলেন। পরে ইলিয়াস সংখ্যায় সুশান্ত দা’র দুটো লেখাই ছাপা হয়। একটি পুনর্মুদ্রণ হিসেবে।

ইলিয়াস ভাইয়ের অনুমতির জন্য আমি, জিললুর রহমান এবং সোহেল রাব্বি (বর্তমানে মৃত) তার কর্মস্থল ঢাকা কলেজে দেখা করতে যাই। তিনি বললেনÑ ‘আমি কী খাই কী পরি, এসব জানতে চাও?’ বললাম, ‘না, আমরা টেপ রেকর্ডারে আপনার কথা ধারণ করতে চাই।’ তিনি খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। বললেনÑ ‘তোমরা এক কাজ কর আমাকে লিখিত প্রশ্ন দাও, আমি উত্তর লিখে দিব।’ তার সঙ্গে আর বেশি কথা বলার সাহস হলো না। সন্ধ্যায় লেখক শিবির অফিসে প্রশ্নগুলো পৌঁছে দিতে বললেন। সোহেল রাব্বির বাসায় গিয়ে বিকালের মধ্যে প্রশ্নগুলো তৈরি করলাম। জিললুরের হাতের লেখা স্পষ্ট বলে তাকে দিয়ে কপি করালাম। সন্ধ্যায় লেখক শিবির অফিসে গেলাম প্রশ্নগুলো নিয়ে। কিন্তু তিনি ব্যস্ত বলে দেখা করলেন না। একজনকে পাঠিয়ে প্রশ্নগুলো তার হাতে দিতে বললেন। তা-ই দিয়ে এলাম। তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর কিন্তু দিলেন না। তা আজও আমার কাছে এক রহস্য হয়ে আছে। তার মৃত্যুর পর, ‘নিরন্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানকে লেখা একটি চিঠিতে দেখলাম; ইলিয়াস ভাই লিখেছেন, এজাজ আমাকে কিছু কঠিন প্রশ্ন দিয়ে গেছে। তুমি এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে আমার একটি সাক্ষাৎকার নিলে ভালো হয়। একদিন আমরা বসি।’

তারপর এক শীতের সকালে শাহাদুজ্জামান আমার বাসায় এলেন। জানালেন, তারা ইলিয়াস ভাইয়ের ওপর (সম্ভবত আতিকের ‘নৃ’ পত্রিকা) একটি সংখ্যা করতে চান। আমি বললামÑ ‘ভাল তো।’ তিনি আমাকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বললেন। বললাম, ‘আমি অনেকটুকু কাজ করে ফেলেছি। কারও সঙ্গে আমার কাজ করা সম্ভব নয়।’ শাহাদুজ্জামান বললেন, ‘আপনার সংগৃহীত লেখাগুলো দেখতে পারি।’ তাকে সব লেখাপত্র দেখালাম। পরিকল্পনার কথাও তাকে জানালাম। তিনি ইলিয়াস ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা বললে আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। শাহাদুজ্জামান জানালেন, দুপুরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। আমি তার সঙ্গে যেন যাই। আমার পক্ষে হঠাৎ করে যাওয়াও সম্ভব না। তাকে নিয়ে সবুজ আড্ডায় গেলাম। গিয়ে অনুজ মাসুদজামানকে বলতেই রাজি হয়ে গেল। নব্বই মিনিটের ৩-৪টি ম্যাক্সাল ক্যাসেট দিয়ে বাসে তাদের ঢাকার পথে তুলে দিলাম। মাসুদ ফিরে এসে জানাল; পুরো একটা দিন আলাপ হয়েছে শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে। মাসুদ কথাগুলো ক্যাসেটে রেকর্ড করতে সাহায্য করেছে। এভাবেই তৈরি হয়ে গেল বাংলা ভাষার এক বিরলপ্রজ ঔপন্যাসিকের দুর্লভ সাক্ষাৎকার। এখনও আমি হলফ করে বলতে পারি, বাংলা ভাষায় এরকম মাস্টার পিস সাক্ষাৎকার আর দ্বিতীয়টি নেই।

এরপর আমার প্রশ্নগুলোর কথা ভুলেই গেলাম। ঢাকা রওনা হওয়ার পথে শাহাদুজ্জামান আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ আমি সাক্ষাৎকারের জন্য কয় পৃষ্ঠা দিতে পারব। আমি তাকে অভয় দিয়ে বললাম, পৃষ্ঠার কথা চিন্তা করবেন না। সেটি আমি দেখব। আপনি যত ইচ্ছে স্পেস নিতে পারেন। পরে কম্পোজ হয়ে ছাপানোর পর এটি প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার সাক্ষাৎকারে দাঁড়ায়। সাক্ষাৎকার তো ভালোভাবে নেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু ইলিয়াস ভাই সেটি কোনোভাবেই ছাড়তে চান না। আমি তাগাদা দিইÑ তিনি সময় বাড়ান। অন্যদিকে ভয়ও কাজ করছিল। সাক্ষাৎকারটি না অন্য কোথাও ছাপা হয়ে যায়। একদিন শেষ পর্যন্ত এই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি, অর্থাৎ ইলিয়াস ভাইয়ের টাইপ করা কপি আমার হাতে এসে পৌঁছে। এটি ‘লিরিক’-এ ছাপা হয়ে আজ তা ইতিহাস।

এই সংখ্যাটি প্রকাশ করতে সেই সময়ে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। ’৯০-এর প্রথম দশকে এটা অনেক টাকা, যা দিয়ে তখন চট্টগ্রামের শহরতলির ফয়’স লেকে কয়েক বিঘা জমি পাওয়া যেত। সংখ্যাটি এক হাজার কপি ছাপাতে ১০ রিম+ কাগজ লেগেছিল। এক বন্ধুর পরামর্শে কর্ণফুলী পেপার মিলের জি.এম. এর সঙ্গে দেখা করি মিল রেটে কাগজের জন্য। তিনি পরিকল্পনার শুনে ২২ রিম কাগজ দিতে চাইলেন। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘এত কাগজ দিয়ে আমি কী করব?’ তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘বাকিটা বাজারে বিক্রি করলে বেশ কিছু টাকা পাবেন। ওটা আপনার কাজে লাগবে।’ বন্ধু কবি আহমেদ রায়হান ও আমি দুজনে মিলে আগ্রাবাদ থেকে ঠেলাগাড়িতে করে কাগজগুলো আন্দরকিল্লাস্থ গিনি পেপার হাউসে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিই। সেই বাড়তি কাগজ বিক্রি করে চার কি পাঁচ হাজার টাকা পেয়ে যাই। তারপর ফটোম্যাক্সের মালিক বন্ধু এনাম দিয়েছিলেন দশ হাজার টাকা। অনুদান ও বিজ্ঞাপন মিলিয়েও প্রেসের টাকা দেওয়া যাচ্ছিল না। সদ্য বিয়ে করেছি। বউকে বললাম টাকার অভাবের কথা। সে আমার মায়ের উপহার দেওয়া দুই ভরির বেশি একটি সোনার ব্রেসলেট আমাকে দেয় বিক্রির জন্য। সেটা বিক্রি করে প্রায় ১৪ হাজার টাকা পেলে সংখ্যাটি আলোর মুখ দেখে। তাকে ২০১৮ সালে এসে সেই ব্রেসলেটের বর্তমান বাজারমূল্যে টাকা পরিশোধ করেছি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে আমার ‘খড়িমাটি’ থেকে প্রকাশিত ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার ও বিবিধ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) গ্রন্থটি তাকে উৎসর্গ করে লিখেছি : সোনার ব্রেসলেট ফেরত দিইনি

পুষে রেখেছ কি মনে ক্রোধ,

জ্ঞান-গ্রন্থ এই তুলে দিলাম

যদি কিছু তার হয় শোধ।

Ñআফরোজা ইউসুফীকে

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা