ফারুক মাহমুদ
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৫ পিএম
চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান
প্রকৃতি, পরিবেশ, পরিস্থিতিÑ আমাদের বড় শিক্ষক।
যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, শরীর ভিজে ওঠে, শরীর তেতে ওঠেÑ বুঝে যাই এখন গরমকাল।
আকাশের মুখ কালো। মেঘছেঁচা জল গড়িয়ে পড়ছে। মাঝে-মধ্যে ঘরবন্দি। রাস্তাঘাট প্যাঁককাদায় সয়লাবÑ বুঝে যাই এটা বর্ষাকাল।
হাড়ে কাঁপন ধরে। বাড়তি পোশাক জড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজি। যতটা সম্ভব ঘরে থাকতে চাই। লেপ-কাঁথা অনিবার্যÑ বুঝে যাই এটা শীতকাল।
এতদঞ্চলে ‘কাল’ বা ‘ঋতু’ বলতে মুখ্যত গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতই বেশি অনুভূত হয়। আমাদের আরও তিনটি ঋতু রয়েছে। শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত। আদতে এটা ছয় ঋতুর দেশ। উল্লিখিত তিনটি ঋতুর বাহ্যিকতা সহজে চোখে পড়ে না। নীরবে আসে, নিঃশব্দে চলে যায়। এরা আমাদের যাপিত জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না। তবে প্রকৃতির রূপাঞ্জলি দেখে এদের চেনা যায়।
বসন্তে কোকিল ডাকে, ফুল ফোটে অজস্রÑ রঙিন। বাতাসের বাউল-স্বভাব। থেকে থেকে উন্মনা মন।
নাগরিক জীবনে হেমন্তের কোনো আঁচ থাকে না, গ্রামবাংলায় থাকে। কবি জীবনানন্দ দাশই ‘হেমন্ত’ আবিষ্কার করেছেনÑ ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরেÑ/ হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে/ শুধু শিশিরের জল/ অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে/ হিম হয়ে আসে/ বাঁশপাতাÑ মরা ঘাস আকাশের তারা/ বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা :/ ধানখেতেÑ মাঠে/ জমিছে কুয়াশা/ ঘরে গেছে চাষা/ ঝিমায়েছে এ পৃথিবী...’
গ্রীষ্মের তাপদাহ সরিয়ে আসে শরৎকাল। দূরবর্তী শীতপদশব্দ, কুয়াশার সর। এ ঋতু বিখ্যাত হয়ে আছে কাশের কেশর দোলানো, শিউলির হাসি, আকাশে সাদা মেঘ আর চাঁদের আলোর জন্য। কবির ভাষায়Ñ ‘এমন চাঁদের আলো/ মরি যদি সে-ও ভালো/ সে মরণ স্বর্গ-সমান।’
প্রাত্যহিকতায় ততটা নেই, শরৎ আছে কবিতায়, গানে। মহাকবি কালিদাশ মেঘবন্দনায় খ্যাত হলেও লিখেছেন ‘ঋতুসংহার’Ñ ছয় ঋতুর কবিতা। তাঁর শরৎ হচ্ছেÑ
শরৎ-সুন্দরী আজ পরে আছে গাঢ় সাদা শাড়ি
কাশের আঁচল ওড়ে, হাসি যেন শিউলিসকাল
পুঁটির ঝাঁকের মতো চঞ্চলতা কটিমেঘলায়
নির্জল মেঘের আলো ঝলোমলো ছায়া ফেলে আছে
আকাশের গোমরা মুখ ঢেকে যায় নীল চাঁদোয়ায়
যথেষ্ট রঙিন রাত্রি। চাঁদ যেন স্তনের উচ্ছ্বাস
মোমের মুখর মতো গলে পড়ে জ্যোৎস্নার ফোটা
তারাঠোঁটে চাপাহাসি। রমণীরা আরো রমণীয়
আনন্দ শ্রেষ্ঠত্ব চায়। নির্বাসন রতিপ্রশমনে
ভাসুক হৃদয়তরী প্রেমময় আলিঙ্গনস্রোতে’
এ তো গেল আদিকালের এক কবির শরৎ-কাব্য। এ-কালের কবিদের চোখে শরৎ-সৌন্দর্য আঁকা হয় কোন কোন রঙে! একটি উদাহরণÑ
ভোরের শিউলি তলা। এ তো
থালা ভরতি ধোঁয়াওঠা শঙ্খসাদা ভাত
বাগানে বিষণ্ন গাছ। ওর মরা ডালে
ম্লানমুখ সকালের মতো
ঝুলে আছে ছায়াঝরা রোদ
বাতাসের হাতে হাতে ওড়ে বাবার পুরোনো সাদা শার্ট
মায়ের কাঁচানো নীলছাপা শাড়ি
শরতের স্মৃতিমুখ আমি কিন্তু যথাযথ ভেবে নিতে পারি’
দিনপঞ্জিকা ধরে ঋতু বা কাল চিহ্নিত করা যায় বটে। কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তনের ঋতুরেখা আঁকা যায় না। ধরা যাক, গ্রীষ্ম গিয়ে পঞ্জিকার হিসেবে বর্ষা এসে গেল। গ্রীষ্মের যে ঋতুবৈশিষ্ট্য তা কি বর্ষার আগমনে একেবারে সাফ হয়ে যাবে! তা কিন্তু না। বর্ষায়ও গ্রীষ্মের কিছু চিহ্ন থেকে যায়। ক্রমশ গ্রীষ্মের সব বৈশিষ্ট্য মুছে পরিপূর্ণ বর্ষাবৈশিষ্ট্য ধারণ করে। আবার উল্টোটাও হয়। বর্ষা শেষ হওয়ার আগ থেকে শরতের কিছু বৈশিষ্ট্য চোখ মেলতে শুরু করে।
এ কথা সকল ঋতুর বেলায়ই প্রযোজ্য। তবে আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ঋতুগুলো খ্যাতি লাভ করে থাকে।
সময় বিবেচনায় বাংলা সনের ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে শরৎকাল ধরা হয়। এটি বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে তৃতীয়। শরৎকে ইংরেজিতে ‘অটাম’ বলা হলেও উত্তর আমেরিকায় একে ‘ফল’ নামে ডাকা হয়। পৃথিবীর ৪টি প্রধান ঋতুর একটি হচ্ছে শরৎকাল। উত্তর গোলার্ধে সেপ্টেম্বর মাসে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মার্চ মাসে শরৎকাল শুরু। এটি গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের মধ্যবর্তী ঋতু। এ-সময় রাত তাড়াতাড়ি আসে এবং আবহাওয়া ঠান্ডা হতে থাকে। গাছ যখন এর ‘অঙ্গশোভা’ পাতাদের হারাতে থাকে, বোঝা যায় শরৎ আসছে। কেশর দোলানো কাশফুল, নির্মেঘ আকাশ শুধুই নীল রঙে আঁকা, মাঠে মাঠে সবুজ বাতাসÑ বুঝতে আর বাকি থাকে নাÑ শরৎ আসছে। ‘বসন্ত’ হলো বাঙালির ‘ঋতুর রানী’। তা হলে ঋতুর রাজা কে? উত্তরটি হলোÑ শরৎ। এই ঋতু নিয়ে বাঙালি কবিদের মুগ্ধতার শেষ নেই।
‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি।/ ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি॥/ শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে/ বনের-পথে-লুটিয়ে-পড়া অঞ্চলে/ আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি॥/ মানিক-গাঁথা ওই-যে তোমার কঙ্কণে/ ঝিলিক লাগায় তোমার শ্যামল অঙ্গনে।/ কুঞ্জছায়া গুঞ্জরণের সঙ্গীতে/ ওড়না ওড়ায় একি নাচের ভঙ্গীতে,/ শিউলিবনের বুক যে ওঠে আন্দোলি॥
এভাবেই শরতের সৌন্দর্য উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তার অনেক কবিতা-গান রয়েছে শরতের রূপমাধুর্য নিয়ে। বিভিন্নভাবে শরৎ সম্পর্কে নিজের আবেগকে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। শরৎ হচ্ছে চমৎকার মেঘের ঋতু, স্পষ্টতার ঋতু। কেননা শরতের আকাশ থাকে ঝকঝকে পরিষ্কার। নীল আকাশের মাঝে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। গদ্যভাষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন, ‘গ্রামের বধূ যেমন মাটি লেপন করে নিজ গৃহকে নিপুণ করে তোলে, তেমনি শরৎকাল প্রকৃতিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। বর্ষার পরে গাছগুলো সজীব হয়ে ওঠে। আকাশে হালকা মেঘগুলো উড়ে উড়ে যায়।’
দুই.
প্রকৃতি-আশ্রিত ঋতু হচ্ছে শরৎ। প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব তেমন নেই। প্রকৃতির রূপবৈশিষ্ট্য দেখে চিনতে হয়Ñ এটা শরৎকাল। বর্তমান নগরায়ণের এই যুগে প্রকৃতির স্বাভাবিকতা সরে সরে হয়ে উঠছে নগরবাস্তবতা। ইট-পাথরের নগরে কোথায় পাব কাশফুল! সাপের ফণার মতো দালান দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশ চলে যায় চোখের আড়ালে। যেখানে দৃষ্টিতে আকাশ থাকে না, সাদা মেঘের চঞ্চলতা কী করে দেখব! শরতের বিখ্যাত চাঁদ, জোছনা ঝরা কোথায় পাব! আমরা যারা গ্রাম থেকে উঠে-আসা মানুষ, তাদের শৈশবের স্মৃতিতে ‘শরৎ’ আছে। আমার ব্যক্তিগত দুটি শারদ-স্মৃতিগল্প আপনাদের শোনাইÑ
ক.
আমাদের শৈশবে, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে লম্বা ছুটি পাওয়া যেত। এই ছুটিতে নানাবাড়ি বেড়াতে যেতাম। আমার নানাবাড়ি অজপাড়াগাঁয়ে। ওখানে বাঁশঝাড়ের শিন্ শিন্ শব্দ আর পাখির কূজন ছাড়া কোনো শব্দ শোনা যেত না। নানা আনন্দে আমাদের সময় কাটত।
নানাবাড়ির কয়েক ‘ইশা’ পরেই ছিল মামার বন্ধু বেনুমামাদের বাড়ি। সচ্ছল কৃষক-পরিবার। বাড়ির সামনে প্রশস্ত উঠান, লাগোয়া পুকুর। পুকুরপাড়ে ফলদ-বনজ গাছ। এর মধ্যে ছিল দুটি শেফালি গাছও। সকালে ঝরে থাকত অজস্র ফুল। নতুন কুয়াশার মৃদু ছোঁয়া-লাগা হলুদ বোঁটার সাদা ফুল। খুব ভোরে, তখনও চোখে সদ্যভাঙা ঘুমের আমেজ, কুয়াশার পর্দা সরিয়ে সরিয়ে শিউলি কুড়াতে যেতাম। সঙ্গী মামাত ভাই মোসলেম। পাড়ার কিছু বালক-বালিকা আসত, হাতে ডালি। কোনো কোনো দিন দেরি হয়ে যেত, ততক্ষণে ফুল কুড়ানো শেষ। মন খারাপ হতো। আমার মামাত ভাইটি বুদ্ধি বের করল, বালিকাদের ফুলভরতি ডালি ছুঁয়ে দিত। বালকদের ছুঁয়ে দেওয়া ফুল বালিকারা নেবে না। রাগ করে সব ফুল ঢেলে দিতে। কী আনন্দ! আমরা অন্যের কুড়ানো ফুল দিয়ে কোঁচড় ভরতাম।
একদিন, শিউলিতলায় পৌঁছতে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। ঝরে থাকা ফুল কুড়িয়ে নিশ্চয় চলে গেছে। তবু গেলাম। বালক-বালিকাশূন্য শিউলিতলা। চোখে পড়লÑ অদূরে একটা বড় গাছের গোড়ায় একজন বসে আছে। ওর নাম জ্যোৎস্না, ফুল কুড়ানো-দলের নিয়মিত সদস্য। অনেক দিনই ওর ডালি ছুঁয়ে দিয়েছি। কখনও রাগ করেনি।
আমাদের দেখে ছুটে এলো। হাসতে হাসতে বলল : দে, ডালি ছুঁয়ে দে।
খ.
আমি ভৈরবের মেঘনাপাড়ের ছেলে। বুঝ হওয়ার বয়স থেকে এ নদীকে জানি। অনেক স্মৃতি।
প্রতিবেশী কাদির আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়। মেধাবীরা যেমন হয়Ñ সবার থেকে একটু আলাদা, অকারণে নৈসঙ্গ্য-বিলাস। অনেক সময় দেখেছিÑ থেমে থেমে একা হাঁটছে, হাসছে, নিজের সঙ্গে কথা বলছে। ওর এ স্বভাবটা আমরা পছন্দই করতাম।
একদিন হলো কী! প্রায় মধ্যরাত। কাদিরের বাবা এলেন আমাদের বাড়ি, কাদির এখনও ঘরে ফেরেনি। কাদির সাধারণত এ-রকম করে না। সন্ধ্যা হতেই বাড়ি ফেরে, হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসে।
ক’জন মিলে কাদিরের খোঁজে বেরুলাম। খুঁজে খুঁজে হয়রান। শেষে গেলাম নদীর ঘাটে। কাদিরকে পেলাম। দেখি, একটা অনুচ্চ পাথরপর ঢিবির ওপর আরামে শুয়ে আছে। এদিকে জোয়ারের পানি এসে পাথরের ঢিবিটার চারপাশ ঘিরে ফেলেছে। এদিকে কাদিরের কোনো খেয়াল নেই। পায়ের ওপর পা ঠেকিয়ে আকাশ দেখছে। আমাদের ডাকাডাকি শুনে একটু বিরক্ত, উঠে বসল। এতগুলো মানুষের উৎকণ্ঠার বিষয়টা গায়েই মাখল না। যেন কিছুই হয়নি। বাড়ি যেতে বললাম, বলল, পরে যাব।
ঠিক আছে, সবাইকে বিদায় করে, জল ডিঙিয়ে আমি গেলাম কাদিরের পাশে। ঘটনা কীÑ চেপে ধরলাম। কিছু বলে না, হাসে। চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত মুখ খুলল। বলল, সন্ধ্যা হয়-হয় সময়ে গিয়েছিল নদীর ঘাটে, দেখে চাঁদ উঠেছে। কী যেন একটা ঘোর, চাঁদ দেখা শেষই হচ্ছে না।
এবার আমার রাগ ধরল। বললাম, এত সময় ধরে চাঁদ দেখার কী আছে?
কাদির একটু হেসে বলল, আছে, দেখছি, মন ভরছে না।
আরও জানাল, আজকের চাঁদটা অন্যরকম। স্বাভাবিকের চেয়ে বড়, স্বচ্ছ, উজ্জ্বল!
কাদিরের কথার সত্যতা পেলাম। চাঁদটা যেন অনেক কাছে নেমে আছে। জোছনাধারায় ভেসে যাচ্ছে মেঘনা নদীর জল!
সেদিনের সেই রাতটি ছিল শরতের পূর্ণচন্দ্র রাত।