× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুলের জলসায় নীরব কবি

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০৯ পিএম

ফুলের জলসায় নীরব কবি

কবি নজরুল ফুল ভালোবাসতেন। তার প্রমাণ মেলে তার বিভিন্ন জন্মদিন পালনের সময়। তিনি যখন বাকশক্তিহীন, স্মৃতিক্ষয় রোগে জর্জরিত, সে সময় তার জন্মদিনে তারা তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে তার বাড়িতে আসতেন, প্রায় সবাই তার জন্য ফুল নিয়ে আসতেন। ফুলে ফুলে ফুল্ললিত হয়ে উঠতেন কবি। ফুলগুলো দেখলেই কবিমন অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে যেত। তার অস্থিরতা প্রশমিত হতো।

কবির ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন ডা. দ্বিজেন্দ্রকুমার রায়। তিনি অসুস্থ অবস্থায় কবিকে দেখতে তার বাসায় মাঝে মাঝে যেতেন। তিনি তার স্মৃতিচারণমূলক ‘কবিকে যেমন দেখেছি’ রচনায় লিখেছেন, ‘কবির জন্য দরকার ছোট একটি সুন্দর সাজানো-গোছানো বাড়ি, সামনে খানিকটা সুন্দর বাগান, কবি ফুল ভালোবাসেন, ফুল দিয়ে ভরা থাকবে সেই বাগানটি। ফুল যে কী রকম কবি ভালোবাসেন তার পরিচয় পাওয়া যায় যখনই কবি তার জন্মদিনে নানা ধরনের লোকের আনাগোনার মধ্যে অস্থিরতা প্রকাশ করেন তখনই তার বাল্যবন্ধু সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাকে ফুল দিয়ে উত্তেজনা কমিয়ে দেন, ফুল পেয়ে খুশি হন তিনি। আবার কখনও কখনও কবির অস্থির ভাব কেটে যায় যখন তিনি তার নিজের রচিত কোনো গান শোনেন। মনে হয় কবি ভালোবাসেন পুত্রবধূ উমা দেবী, কল্যাণী ও বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ ও ছেলেদের। এরাই কবির অস্থিরতা খুব অল্প সময়ে শান্ত করতে সক্ষম হন। এইসব দেখে মনে হয় কবির অনুভূতিশক্তি এখনও লোপ পায়নি।’ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ১৯৭২ সালের ২৪ মে। তাকে ধানমন্ডির এক বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল, যে বাড়ির প্রাঙ্গণে ছিল একটি ফুলের বাগান।

কবি সত্যি সত্যি একদিন এক ফুলের জলসায় গিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য ক্ষমতায় সেই বিরূপ পরিস্থিতিকে সামলে সবার মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন তিনি, সে আর এক গল্প। বিশ্বনাথ দে শুনিয়েছেন সে গল্প তার স্মৃতিচারণমূলক এক লেখায়। কলকাতার শ্যামবাজারে ছিল কে. বি ক্লাব। একবার সে ক্লাবে দোলপূজার দিনে সারা রাত ধরে এক জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। বাড়ির উঠোনের বিরাট নাটমঞ্চের ওপর প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি। অজস্র ফুলের সমারোহের মধ্যে দোলনায় দুলছিল রাধা-কৃষ্ণ।

এই জলসায় গান গাইবার জন্য বন্ধু নলিনীকান্ত নিয়ে এলেন কবি নজরুলকে। বসতে দেওয়া হলো কবিকে নাটমঞ্চের ওপর, ফুলের জলসায়। কবি নজরুল সেখানে বসে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠলেন। এমন সময় ক্লাবে সেই জলসার উদ্যোক্তাদের ডাক এলো বাড়ির অন্দরমহল থেকে। বাড়ির গৃহিণী ঠাকুরের নাটমঞ্চের ওপর পুষ্পিত আসনে একজন মুসলমানকে বসতে দেখে ভীষণ রেগে গেলেন ও তাকে সেখান থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুকুম দিলেন। উদ্যোক্তা সারদা বাবু অপ্রস্তুত হলেন, কী করে নজরুলকে সেখান থেকে নামাবেন? সবাই মিলে যুক্তি করে ঠিক করলেন, কাজীদাকে প্রথমে গান গাইতে দেবেন। গান শেষে নিশ্চয়ই নজরুল নাটমঞ্চ থেকে নেমে আসবেন। তাই জলসার শুরুতেই কবিকে গান গাইবার জন্য অনুরোধ করা হলো। কবি নাটমঞ্চে তখন রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির সামনে বসে ভাবে বিভোর হয়ে গেলেন। আধা চোখ বুজে গাইতে শুরু করলেনÑ ‘আমি শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে/ জপি আমার শ্যামা-মা’র নাম।/ শ্যামা হলেন মোর মন্ত্রগুরু/ আর ঠাকুর হলেন রাধার শ্যাম।’

ভাব-বিভোর কবির সেই গান শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আশ্চর্য এক জ্যোতির্ময় আভায় কবির সমস্ত মুখ উদ্ভাসিত। পরম যোগীর মতো তিনি যেন ধ্যানমগ্ন। গানশেষে হলেই বাড়ির ভেতর থেকে সেই গৃহিণী, যিনি কবিকে নাটমঞ্চ থেকে নামিয়ে দিতে বলেছিলেন তিনি কবিকে প্রণাম করার জন্য বাইরে আসতে চাইলেন। কিন্তু এত লোকের ভিড়ে সেখানে তার যাওয়া অশোভন হবে ভেবে আর সেখানে গেলেন না। এই হলো কবি নজরুল। ফুলের জলসায় তিনি দ্রুত হয়ে উঠতে পারেন চাঁদ বা সূর্য, সব ফুলগুলোর সেরা ফুল।

কবি নজরুল ফুলকে দেখেছেন নানাভাবে, নানা রূপে। সে দেখায় একদিকে যেমন ছিল কবিহৃদয়ের কোমলতা, অন্যদিকে ছিল দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য কঠোরতা। ‘বড়র পীরিতি বালির বাঁধ’ রচনায় ফুল নিয়ে কবির সে অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। সে রচনার এক জায়গায় তিনি নিজেকেই যেন লিখেছেনÑ “বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া রোগÑ এ স্বদেশ-প্রেমের বাই উঠল। কোথায় তুই হাঁ করে খাবি গুলবদনীর গুলিস্তানে মলয় হাওয়া, দেখবি ফুলের হাই-তোলা, গাইবি ‘আয় লো কুসুম-কলি’ গান, তা না করে দিতে গেলি রাজার পেছনে খোঁচা! গেলি জেলে, টানলি ঘানি, করলি প্রয়োপবেশন, পরলি শিকল-বেড়ী, ডান্ডাবেড়ী, বইগুলো একধার থেকে করাতে গেলি বাজেয়াপ্ত, এ কোন্ রকম রসিকতা তোর? কেনই বা এ হ্যাঙ্গাম-হুজ্জুৎ!” তখন তিনি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদি। তিনি কুসুমকলি ফেলে যে হাতে তুলে নিয়েছিলেন যুদ্ধের অস্ত্র, সে হাতেই আবার পূজারীর কাছে ভিক্ষা চাইলেন, বললেন, ‘ওগো পূজারী, কোথায় অর্ঘ্য দিতে চলেছ? বুকে বুকে দেবতার তপ্ত শ্বাস হু হু করে বয়ে যায়Ñ তুমি কার কাছে ডালি নিয়ে যাও? ও কী নিয়ে যাচ্ছ তুমি! ফুল আর পাতায় তোমার দেবতা কি তুষ্ট হবেন? বুকে তার তীব্র জ্বালা চোখে তার হিংসার বহ্নি। ওগো সে তো ফুল পাতা চায় না, সে চায় কাঁচা তাজা প্রাণ! ওগো বলি দাও, বলি দাও!’ ফুলের রাজ্য কবির খুব প্রিয় হলেও ঔপনিবেশিক-সামন্ত বাস্তবতায় সেই ফুলকে তিনি ছুড়ে ফেলতে মোটেই ছাড় দেননি। 

তার চক্রবাক কাব্যে সামান্য হলেও আলোকসম্পাত দেখা যায় যৌবন-বাণবিদ্ধ নজরুলের ওপর কবির তিন মানসীর ছবিÑ ফজিলাতুন্নেসা, রানু সোম ও উমা মৈত্র। বলা বাহুল্য যে, রূপবতী গুণশ্রী তরুণীর উষ্ণ সঙ্গ বোহেমিয়ান রোমান্টিক নজরুলকে কবি বায়রনের মতো চিরদিনই উদ্ভ্রান্ত করত। ফজিলাতুন্নেসার কুঞ্জকানন থেকে যখন ভেসে আসছিল পুষ্পসুরভিত বাতাস, সেই সুগন্ধি বাতাস ও ফুলের রেণু কবি তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ তারিখে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফেরার স্টিমার ধরেছিলেন। পথেই মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে লিখেছিলেন প্রথম চিঠি। সে চিঠিতে লিখেছিলেন, আমার কেবলই মনে পড়ছে (বোধ হয় ব্রাউনিংয়ের) একটি লাইনÑ 

‘Hwo sad and bad, and mad it was

But then, hwo it was sweet.’

আর মনে হচ্ছে, ছোট্ট দুটি কথাÑ ‘সুন্দর’ ও ‘বেদনা’। এই দুটি কথাতেই আমি সমস্ত বিশ্বকে উপলব্ধি করতে পারি। ‘সুন্দর’ ও ‘বেদনা’ এ দুটি পাতার মাঝখানে একটি ফুলÑ বিকশিত বিশ্ব। একটি মক্ষীরানী, তাকে ঘিরেই বিশ্বের মধু-চক্র।’ বাগানের মালী লাঠি হাতে বাগান পাহারা দেয়, একজন মানুষও সে বাগানের ফুল ছুঁতে পারে না। কিন্তু মৌমাছি ঠিকই মালীর মাথার ওপর দিয়ে গজল-গান গেয়ে বাগানে ঢোকে, সুন্দরের মধুতে ডুবে যায়, অস্ফুট কুঁড়ির কানে বিকাশের কামনা জাগায়।

নজরুলেরই এক স্বীকারোক্তিতে দেখি, তিনি বলছেন, হৃদয়ের পুষ্পচর্চাই তাকে সোনা করে তুলেছে। সেজন্য যে কাব্যগ্রন্থগুলোকে তিনি একসময় নিজেই তার ‘শ্রেষ্ঠ ফুলগুলি’ বলে অভিহিত করেছেন সেগুলো অর্পণ করতে গিয়ে তিনি নিজেই উপলব্ধি করেছেন, ‘পোকা-খেকো ফুল দিয়ে কি দেবতার অর্ঘ্য দেওয়া যায়?’ প্রিয়তমার কাছে সম্পূর্ণ ও শুদ্ধ সমর্পণই কেবল একজন প্রেমিককে সার্থক ও সুন্দর করে তুলতে পারে।

কবি নজরুলের পুষ্পপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় তার অসংখ্য গানে ও কবিতায়, গল্পে ও উপন্যাসে। কবি নজরুলের সমগ্র সাহিত্যকর্মে ৬৮টি ফুলের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো অলকানন্দা, আশোক, অতসী, অপরাজিতা, কদম, কনকচাঁপা, করবী, কল্কে ফুল, কাঁঠালী চাঁপা, কামিনী, কাঞ্চন, কাশফুল, কুন্দ, কেয়া, কৃষ্ণচূড়া, গন্ধরাজ, গাঁদা, গিরিমল্লিকা (কুরচি), গোলকচাঁপা, গোলাপ, ঘাসফুল, চন্দ্রমল্লিকা, চাঁপা, চামেলী, চেরীফুল, ছাতিম, জবা, ঝিঙেফুল, ঝুমকোলতা, ঝুমকা জবা, গুলে লালা (টিউলিপ), দোলনচাঁপা, দোপাটি, দুলালচাঁপা, নয়নতারা, নাগকেশর, নার্গিস বা ড্যাফোডিল, পদ্ম, পলাশ, পারুল, পিয়াল, পুন্নাগ চাঁপা, বকুল, বন-অতসী, বাসন্তিকা, বেলী, ভাঁট ফুল, ভূঁইচাঁপা, মণিমালা, মল্লিকা, মহুয়া, মাধবীলতা, মালতী, জুঁই, রজনীগন্ধা, রঙ্গন, লালি গুরাস (রডোডেন্ড্রন), শাপলা, শিমুল, শেফালি, সন্ধ্যামণি, স্থলপদ্ম, সেঁউতি, সোনালু, সূর্যমুখী, হিজল ও হাসনাহেনা। 

ফুলপ্রিয় এই মানুষটির ছিল অদ্ভুত এক দূরদর্শী ক্ষমতা ও দার্শনিক সত্তা। সুস্থ অবস্থায় তিনি হয়তো অনুভব করেছিলেন তার জীবন সায়াহ্নের ছবি। একদিন কবিকে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়ার আগেই তিনি যেন বুঝেছিলেন, পৃথিবীতে সেদিনও অনেক ফুল ফুটবে, তাকেও সে ফুলের জলসার মধ্যমণি করা হবে, কিন্তু সে জলসায় সে দিনটি যেন হবে তার শুধুই নীরব থাকার দিন: ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি?/ ভোরের হাওয়ায় কান্না পাওয়ায় তব ম্লান ছবি/ নীরব কেন কবি \’ নীরব হয়েছিলেন আগেই কবি, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র) তিনি চলে যান বিশ্ব ছেড়ে অনন্তলোকে। তার এ প্রয়াণ দিবসে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা