× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্কেচবুকে নীরব গিটার

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৪১ পিএম

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১৫:৫৭ পিএম

অলংকরণ : অরণী হোসেন অথৈ

অলংকরণ : অরণী হোসেন অথৈ

ডিসেম্বর মাস। আবহাওয়া এলোমেলো হয়ে গেছে। ডিসেম্বর মাসেও কুড়িগ্রামে তেমন শীত অনুভব হচ্ছে না। শীত স্বাভাবিক মাত্রায়। গতকাল বিকালে কুড়িগ্রামে এসেছি। এখানে এবারই প্রথম আসা। আমার ভার্সিটির ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান এখানে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। যেখানে কাজ সেখানেই থাকা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণার জন্য মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা জানতে উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে আসতে হয়েছে। স্থানীয় একজন আইনজীবী নিজ বাড়িতে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাড়িটা পছন্দ হয়েছে। শহরতলির মতো জায়গা। রেললাইনের ধার ঘেঁষে দোতলা বাড়ি। বাড়ির দোতলায় রেললাইনের দিকে একটা ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশে বেশ বড় বারান্দা। সারাদিনের জার্নির ধকলে টায়ার্ড ছিলাম। ডিনার শেষে ঘুমিয়ে পড়েছি।

ট্রেন যাওয়ার শব্দে অদ্ভুত কিছু আছে। সেই অদ্ভুত কিছুটা কী তা কখনও বুঝতে পারিনি। ট্রেনের শব্দ আমার কাছে খানিকটা বিষণ্নতা আর ঝিমুনিভাব, সেই সঙ্গে খানিকটা ছুটে চলার তীব্রগতি একসঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো মনে হয়। বাড়ির পাশ দিয়ে রাতে ট্রেন যাওয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমভাঙা চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। কুয়াশা ঘন হয়ে আছে। তার ভেতরে ট্রেনের হেডলাইটের আলো ম্লান দেখাচ্ছে। হুইসেল দিয়ে আওয়াজ করে ট্রেন এগিয়ে এলো। ঘুরে ঘুরে একই রকম আওয়াজ করতে করতে দূরে চলে গেল। পুরো ব্যাপারটা মনে হলো স্বপ্নে ঘটেছে, বাস্তব কিছু নয়। 

পরের রাতে আমার জীবনে নতুন এক গল্পের শুরু হলো। সেই গল্পের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। রাত তখন সাড়ে ১০টা মতো বাজে। বেশ খানিকটা আগে রাতের খাবার খেয়েছি। ঘরে এসে কাগজপত্র দেখলাম। ইম্পরটেন্ট নোট লেখার ছিল। ল্যাপটপ ওপেন করে কিছুক্ষণ ধরে সেগুলো লিখলাম। ঠান্ডা বাতাস ভালো লাগছিল। আমার গিটার সঙ্গে এনেছি। এক সপ্তাহ মতো এখানে থাকব বলে এসেছি। অবসর সময়ে গিটার বাজিয়ে সময় কাটানো যাবে ভেবেই গিটার সঙ্গে আনা। অল্প খানিকটা সময় গিটার বাজালাম। জানালার পাশে বসে গিটার বাজাতে বাজাতে উইয়ার্ড এক খেয়াল চাপল মাথায়। মনে হলো রেললাইন ধরে হেঁটে আসি। রাতে হুটহাট বের হয়ে ঘোরার বাতিক আছে আমার। ঘর থেকে বের হতে অসুবিধা হলো না। বাড়িতে একজন কেয়ারটেকার আছেন। তার নাম কোরবান আলি। কোরবান আঙ্কেল বাইরের দরজা খুলে দিলেন।

রেললাইন ধরে হাঁটছি। চাঁদের আজ কতদিন জানি না। তবে কাছাকাছি সময়ে পূর্ণিমা হবে বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোতে কুয়াশাকে কেমন যেন ছাড়া ছাড়া মেঘের মতো দেখাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে আচমকা থমকে গেছি। দেখলাম সামনে রেললাইনের পাশে উঁচু ঢিবিতে একজন মেয়ে বসে আছে। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে অতিপ্রাকৃত বোধ হচ্ছে। কোনো এক অসম্ভব আকর্ষণে সামনে এগিয়ে গেলাম। মেয়েটির গায়ে লম্বা কালো কোট। মুখের একপাশ মাথার ঘন চুল দিয়ে ঢেকে রেখেছে। স্থির দৃষ্টিতে রেললাইন ধরে দূরে তাকিয়ে আছে।

গতরাতে যখন ট্রেন পাস করেছে সেই সময় ঘুমাচ্ছিলাম। ট্রেনের শব্দে ঘুম ভেঙেছে। তখন কয়টা বাজছিল মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে করতে পারলাম না। হয়তো ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। মেয়েটি সেই ট্রেনের শব্দের অপেক্ষা করছে। পরক্ষণে মনে হলো যদি তা না হয়। ট্রেন কাছাকাছি আসতেই হয়তো মেয়েটি রেললাইনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কী করব বুঝতে পারছি না। মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেলাম। আশ্বস্ত করার মতো গলায় বললাম, ‘ঠিক আছেন আপনি?’

মেয়েটি আমার দিকে তাকাল না। রেললাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ট্রেন আসবে।’

আমি এসেছি এটা যেন সে বুঝতে পেরেছে। কথা বলেছে শীতল গলায়। উত্তেজনা বা ভয় কিছু নেই। বরং বিষণ্ন উদাস ভাব মনে হলো।

জানতে চাইলাম, ‘আপনি এখানে একা বসে আছেন কেন?’

মেয়েটি স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘আপনি একা হাঁটছেন কেন?’

থতমত খেয়ে গেছি। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে এ রকম পাল্টা প্রশ্ন করতে পারে ভাবিনি। কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। তখন খেয়াল করলাম তার কাছে বেশ বড় স্কেচবুক। সে কি তবে ছবি আঁকতে এসেছিল! এই রাতের বেলা! হতে পারে রেললাইনে জোছনার ছবি আঁকছিল। আঁকা হয়ে গেছে। মেয়েটি ঘুরে চলে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে বুঝতে পারলাম না। মেয়েটিকে আর দেখতে পেলাম না। যেন কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে।

মেয়েটির সঙ্গে আমার আবার দেখা হলো পরদিন রাতে। একই সময়, একই জায়গায়। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল সে আসবে। মাটির উঁচু ঢিবির ওপর স্কেচবুক কোলের ওপর নিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে গত রাতের ভঙ্গিতে বসে আছে।

বললাম, ‘আপনি প্রতিরাতে এখানে আসেন?’

‘যে রাতে আপনি আসবেন সে রাতে আমাকে দেখবেন। যে রাতে আসবেন না, সে রাতে দেখবেন না।’

হেঁয়ালি করে কথা বলছে মেয়েটি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার বাড়ি কি এখানেই?’

মেয়েটি বলল, ‘আপনি বা আমি কেউ কোথাও স্থায়ী নই।’

নিজের নাম বললাম, ‘আমার নাম আরিয়ান। আপনার?’

‘শাকিরা।’

‘ছবি আঁকেন!’

‘আপনি জানালার ধারে বসে গিটার বাজান।’

ভীষণ বিস্ময় নিয়ে বললাম, ‘দেখেছেন আপনি!’

শাকিরা বলল, ‘দোতলার খোলা জানালা।’

অমনি দারুণ ভালো লাগতে শুরু করল আমার। কেন এমন ভালো লাগছে ধারণা করতে পারছি না। কেউ আমাকে খেয়াল করে সেটা ভেবেই হয়তো ভালো লাগছে। শাকিরার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘রেললাইন ধরে হাঁটবেন?’

শাকিরা উঠে দাঁড়িয়েছে। মানে সে হাঁটবে। বলল, ‘আমার উনিশ। আপনার?’

বললাম, ‘একুশ।’

শাকিরা বলল, ‘আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন।’

বললাম, ‘বয়স কিন্তু কোনো ওয়াল নয়। তুমিও আমাকে তুমি করে বলতে পারো।’

আমরা দুজন রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকলাম। আশপাশে জমাট নিস্তব্ধতা। কখনও পায়ে রেললাইনের মাঝখানের পাথরে ঠোকা লাগার হালকা আওয়াজ হচ্ছে। আর কোনো শব্দ নেই। আমাদের যেন কোনো তাড়া নেই। আমরা কোথাও যাচ্ছি না। শুধু হাঁটছি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি কারও জন্য এখানে এসে অপেক্ষা করো?’

শাকিরা ছোট্ট করে বলল, ‘হয়তো।’

আমরা দুজন কিছু না বলে চুপচাপ হেঁটে যেতে থাকলাম। যেন আমাদের সব কথা ফুরিয়ে গেছে। কথা ফিরিয়ে আনার জন্য বললাম, ‘তুমি অন্ধকার ভালোবাসো!’

শাকিরা বলল, ‘আমি আমাকে ভালোবাসি। আমি নিজে অন্ধকার। তার মানে আমি অন্ধকার ভালোবাসি।’

‘তুমি কি সবসময় এমন হেঁয়ালি করে কথা বলো?’

‘তুমি নিশ্চয় অন্ধকার ভালোবাসো। তুমি প্রতিরাতে তবে এখানে আসবে এই অন্ধকার দেখতে।’

মনে মনে বললাম, ‘অবশ্যই আসব।’

বিষণ্ন গলায় শাকিরা বলল, ‘আচ্ছা, অন্ধকারকে কি কেউ মনে রাখে! এই যে আমাদের দেখা হলো। তুমি কি আমাকে মনে রাখবে! আমি থাকি কিংবা না থাকি। তোমার কি মনে থাকবে কোনো একদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। একসময় আমি কোথাও ছিলাম!’

কেন জানি আমার গলা বুজে এসেছে। গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। এর আগে এমন নিঃসঙ্গ গলায় কেউ আমাকে বলেনি, ‘মনে থাকবে আমাকে!’

আবারও মনে মনে বললাম, ‘তোমাকে মনে থাকবে, শাকিরা। তুমি যখন থাকবে না তখনও মনে থাকবে।’

পরপর গত দুই রাত শাকিরা আসেনি। আমি একা এসে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকি। রাত বাড়তে থাকে। রাতের ট্রেন এসে চলে যায়। আমি কুয়াশার ভেতর দিয়ে ট্রেন আসা আর চলে যাওয়া দেখি।

আমার এখানকার কাজ শেষ হয়ে গেছে। আগামীকাল ঢাকায় ফিরব। আজ রাতে শাকিরা না এলে আর দেখা হবে না।

শাকিরা এলো কিছুক্ষণ পর। তার চেহারায় উদ্ভ্রান্ত ভাব। চোখ লাল। নিঃশ্বাস নেওয়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। কোটের সব বোতাম খোলা। মুখজুড়ে ক্লান্তি।

অস্থির গলায় জানতে চাইলাম, ‘শাকিরা, তুমি ঠিক আছ?’

শাকিরা বলল, ‘একদম ঠিক নেই। সম্ভবত তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’

আতঙ্ক বোধ করছি। জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে তোমার?’

শাকিরা আমার কথার উত্তর না দিয়ে ম্লান হেসে বলল, ‘কিছু মানুষ কেবল অপেক্ষা করবে বলেই জন্ম নেয়। তারা কখনও কোথাও যাবে বলে রওনা হতে পারে না। প্রতিরাতে এখানে এসে অপেক্ষা করেছি রাতের ট্রেনে কেউ আসবে। কেউ আসেনি।’

দাঁড়াল না শাকিরা। সে চলে যাচ্ছে। তার চলে যাওয়া পথের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। সে এখানে এসে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে কার আসার অপেক্ষা করত জানা হলো না।

শাকিরার সঙ্গে আমার ফের দেখা হলো আগস্ট মাসে। ঢাকায় ইউনাইটেড হাসপাতালে। সপ্তাহে একদিন আমাকে আসতে হয় কেমো নিতে। আমার ক্যানসার হয়েছে। হজকিন লিম্ফোমা। এই ক্যানসারে ৮৫% মানুষ পাঁচ বছর বাঁচে। আমিও মারা যাব। মারা যাওয়ার আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাই বিশেষ কিছু কাজ করে যেতে চেয়েছি। আমার সবসময় মনে হয়েছে জীবনকে সিরিয়াসলি নেওয়ার মতো কিছু নেই। গিটার নিয়ে কেমো নিতে আসি। হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটে জানালার পাশে আমাকে একখানা চেয়ার দেওয়া হয়েছে। সেখানে বসে কিছুক্ষণ গিটার বাজাই। যে কয়দিন বাঁচব, আনন্দ নিয়ে বাঁচতে চাই।

পুরো ঘটনা যেন আচমকা ঘটেছে। জানালার পাশে বসে গিটার বাজাচ্ছি। দূরে সোফায় একজন মেয়ে বসে বই পড়ছে। গলায় রঙিন স্কার্ফ, পরনে টি-শার্টের ওপর হালকা গোলাপি কালারের স্লিভলেস গাউন, কার্লি চুল খোঁপা করে রেখেছে, মুখে ক্লান্তি কিন্তু চোখে গভীর কৌতূহল। অপূর্ব দেখাচ্ছে মেয়েটিকে। তাকে আগে দেখে বুঝতে পারিনি। চোখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পেরেছি, শাকিরা। অনেক শুকিয়ে গেছে। তা ছাড়া এর আগে যে কয়বার তাকে দেখেছি তা রাতে। শাকিরা তখন কালো কোট পরা থাকত।

গিটার বাজানো থামিয়ে শাকিরার কাছে গেলাম। প্রচণ্ড ক্লান্তি তাকে জাপটে থাকলেও কথায় বেশ সতেজ আর স্বতঃস্ফূর্ত দেখলাম। শাকিরা বলল, ‘তুমি কি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবো হাসপাতালে নেই, নাকি আমাকে দেখে ভয় পেয়ে তাকাও না!’

অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি এখানে!’

শাকিরা ফিসফিস করে বলল, ‘কোথাও যাইনি। শুধু একটু দূরে ছিলাম।’

আকুল হয়ে বললাম, ‘তোমাকে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোথায় গিয়েছিলে!’

শাকিরা বলল, ‘মুম্বাইতে। একটা ট্রায়ালথেরাপি ছিল। শেষ চেষ্টা। কনফার্ম ছিলাম না।’

অমনি আমার চারপাশ দুলে উঠল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছি। শাকিরা আরও ঘন হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। আমার পুরো পৃথিবী মনে হলো রাতের অন্ধকারে রেললাইনের ধারের জমাট কুয়াশায় ঢেকে গেছে। শাকিরাকে জড়িয়ে ধরলাম। শাকিরা আলতো করে তার বাঁহাত আমার মাথার পেছনে রেখেছে। ডান হাতের নরম লম্বা আঙুল দিয়ে আমার মাথার চুল আউলে দিল। প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে মুখ তুলে শাকিরার দিকে তাকালাম। কিসের তৃষ্ণা জানি না। শাকিরা শান্ত গলায় বলল, ‘আমার ক্যানসার ফিরে এসেছে। শেষ ট্রায়াল কাজ করেনি।’

শাকিরার সঙ্গে আমার সেই শেষ কথা। সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে শাকিরা মারা গেল। আমার মনে হলো কিছু মানুষ কখনও হারিয়ে যায় না। তারা কেবল এক জায়গা থেকে অন্য কোথাও থেকে যায়। শাকিরা আছে অন্য কোথাও।

শাকিরা স্কেচবুকে ছবির পাশে ছোট ছোট কবিতা লিখত। সে স্কেচবুকে একটা ছবি এঁকেছিল, গিটার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি শাকিরার পেছনে কাঁধের কাছে। ব্যাকুল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। সেই ছবির পাশে আমরা দুজন একসঙ্গে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম, ‘তুমি আমার খোলা আকাশের ঘুড়ি, তুমি কাছে এলেই কেবল আমি উড়ি। তুমি ছাড়া থমকে পড়ে বাতাস...।’

আমাকে শাকিরা বলত, ‘এটা কবিতা নয়, আমাদের গান। তুমি সুর দিয়ে গাও, আমি শুনি।’

একটু একটু করে সুর দিতাম আর আমাদের গান খানিকটা করে বেড়ে যেত। শাকিরা বলেছিল, ‘গানটা বোধহয় শেষ করে যেতে পারলাম না। তুমি যদি বেঁচে যাও, আমাদের গান শেষ কোরো। যদি না পারো, তবু জানবে আমি আছি। ভালো থাকবে সবসময় তুমি। তুমি ভালো থাকলে আনন্দে থাকব আমি।’

আমি ভালো আছি। কেমো নেওয়া শেষ হয়েছে আমার। রেডিওথেরাপি নিচ্ছি। ধানমন্ডিতে ছোট্ট এক মিউজিক ইশকুল খুলেছি। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা আর ক্যানসার থেকে সেরে ওঠা শিশুরা এখানে এসে গান শেখে, নাচে, খেলায় মেতে ওঠে, আনন্দ করে। মিউজিক ইশকুলের নাম দিয়েছি, ‘সুরে আঁকা মানুষ’।

দেয়ালে বাঁধানো শাকিরার আঁকা ছবি। গিটার হাতে শাকিরা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা, ‘যে গল্প শেষ হয় না তা সবসময় মাথায় ঘুরে বেড়ায়।’

শাকিরা আমাদের শেষ করতে না পারা গানের নিচে এই কথা লিখে রেখেছিল। শাকিরা আমার মাথায় থেকে গেছে। আমার মনে হলো, জানালার বাইরে আকাশ সবসময় একই থাকে, শুধু আমরা বদলে যাই। তবু কিছু তাকানো, কিছু গান আর প্রতীক্ষা কখনও বদলায় না। শাকিরা চুপচাপ ট্রেনের দিকে তাকিয়ে কাকে খুঁজত জানি না। তবে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সবসময় আমি শাকিরাকে খুঁজতে থাকি সেটা জানি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা