সরকার মাসুদ
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২৪ পিএম
জহির রায়হান, ১৯ আগস্ট ১৯৩৫-৩০ জুন ১৯৭২
দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫Ñ৩০ জুন ১৯৭২) তার সংক্ষিপ্ত জীবনে মোট সাতটি উপন্যাস লিখে গেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘হাজার বছর ধরে’। সিনেমা নির্মাতা জহিরের সাহিত্যিক সামর্থ্যের খবর যারা রাখেন তাদের অনেকেই তার অন্য উপন্যাসগুলো না পড়লেও হাজার বছর ধরে পড়েছেন। আর যারা পড়েননি তাদের কাছেও এ উপন্যাসের কাহিনী পৌঁছে গেছে। কারণ এ বইয়ের গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আজকের এ প্রবন্ধ জহির রায়হানের দুটি উপন্যাস নিয়ে।
মকবুল নামের এক নিম্নবিত্ত গৃহস্থের আশা-নিরাশা, জীবন পরিকল্পনা ও জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের গল্প। ষাটোর্ধ্ব এ জোতধারের স্ত্রী তিনজন। সবচেয়ে ছোটটির বয়স পনেরো বা তার কিছু বেশি। মকবুল তার সহায়-সম্পদ ও সামন্তসুলভ চিন্তাধারা নিয়ে মোটামুটি তৃপ্ত। সে তার স্ত্রীদেরকে চাষাবাদ সংক্রান্ত কাজেও ব্যবহার করেন। রাতের বেলা বাড়ির আঙিনায় পুঁথিপাঠের আসর বসায়। গ্রামের মানুষ তাকে মান্য করে। তরুণী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য মেয়েদেরে প্রতি তার দৃষ্টি লোলুপ। তার কনিষ্ঠ স্ত্রী টুনি কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধ মকবুলকে ভালোবাসতে পারে না। এ মেয়ের টান তাদেরই বাড়ির গোমস্তা মন্তুর প্রতি। মন্তু যুবক ও স্বাস্থ্যবান পুরুষ।
এ উপন্যাসের পটভূমি সত্তর/পঁচাত্তর বছর আগের গ্রাম-বাংলাদেশ। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, পুঁথিপাঠ প্রভৃতি ছাড়াও বিয়ের আলাপ পাকা করার আসর, ঢেঁকিতে ধান ভানা, ভূতের আছরপ্রাপ্ত হওয়া ও ভূত ছাড়ানোর দৃশ্য, চুরি করে মাছ ধরার বর্ণনা, নদী ও বিস্তীর্ণ জলাভূমি পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে ছোট বউ টুনিকে মন্তু কর্তৃক তার বাপের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসাÑ এসব কিছু বেশ দরদের সঙ্গে, বিশ্বাস্য ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে। মকবুল, টুনি, মন্তু ছাড়াও মকবুলের বোন, বউপেটানো আবুল, যৌবনবতী আম্বিয়া, অভাবে পড়ে জমি হারানো সুরত আলী প্রভৃতি চরিত্র বেশ জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে জহির রায়হানের কলমে। গ্রামবাংলার আচার-অনুষ্ঠান, কুসংস্কার, সাধারণ মানুষের ভীরু ও শান্তপ্রিয় মনোভাব, নদী ও জলাশয় অধ্যুষিত গ্রামীণ জনপদের গীতিকাব্যসুলভ ছবি উঠে এসেছে চমৎকারভাবে। জীবন সংগ্রামের বা শ্রেণি সংগ্রামের কথা বলা এ উপন্যাসের উদ্দেশ্য নয়। শোষণক্লিষ্ট, দারিদ্র্য জর্জরিত, ঝগড়া-বিবাদলিপ্ত প্রায় নিস্তরঙ্গ গ্রামবাংলার চিরন্তন রূপকেই লেখক তুলে ধরেছেন স্নিগ্ধতার আমেজ মেশানো ভাষায়। উপন্যাসের শুরুতে আছে পুঁথিপাঠ। কাহিনী শেষও হয়েছে পুঁথিপাঠের ভেতর দিয়ে। এই পাঠ আবহমান কালের সুর নিয়ে আসে। লেখকের ঐতিহ্যপ্রীতির ও রোমান্টিক মনের প্রতিভাস হয়ে ওঠে পুরো উপন্যাস।
তারপরও কথা থেকে যায়। যে ছায়াশীতল কাব্যময়তার ভেতর দিয়ে জহির এগিয়ে নিয়েছেন হাজার বছর ধরের গল্প; মমত্বের সঙ্গে চিত্রিত করেছেন যেসব পাত্র-পাত্রীকে এবং তাদের মনোভাবকে তারা খানিকটা নাড়া দিয়েই আমাদের মনের গহ্বরে হারিয়ে যায়। আমি ভাবি, যদি এর চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা ফোটানো যেত; টুনি মকুবলের বিধবা বোন, আম্বিয়া প্রভৃতি চরিত্রের মাধ্যমে নারীর মনস্তত্ত্ব জোরালোভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতো, মকবুল-মন্তুর মনোজগতের আলো-ছায়া যদি অনেকটা সময় ধরে চিত্রিত করতে পারতেন ঔপন্যাসিক, তাহলে ‘হাজার বছর ধরে’ হয়ে উঠত সর্বার্থে আধুনিক এক উপন্যাসÑ দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলী উভয় দিক থেকেই। এ গ্রন্থে যে ধরনের জীবনচেতা ও গদ্য প্রযুক্ত হয়েছে, লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টির অভাবে তা শেষ পর্যন্ত সুফল আসতে পারেনি। ফলে হাজার বছর ধরে মাঝরি মানের উপন্যাসের বেশি কিছু হতে পারেনি।
সবদিক বিবেচনায় রাখলে মনে হয়, ‘বরফ গলা নদী’ জহির রায়হানের শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস। এ গ্রন্থের পটভূমি গ্রামবাংলা নয়, বাংলাদেশের একটি শহর। নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবন এখানে গভীর সহানুভূতির এবং গ্রহণযোগ্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রিত। এটা প্রধানত একটি পরিবারের গল্প। মুখ্য চরিত্রগুলো হচ্ছে বাবা হাসমত আলী, মা সালেহা বিবি; তাদের ছেলে মাহমুদ, খোকন, মেয়ে হাসিনা ও মরিয়ম। এ ছাড়া আছে ছেলেমেয়েদের বন্ধু ও তাদের স্ত্রী, মরিয়মের ছাত্রীর আত্মীয় মনসুর এবং আরও কয়েকটি গৌণ চরিত্র। অবিচ্ছিন্ন দারিদ্র্যের ও জীবন ঝামেলার ভেতরেরও মনের প্রসন্নতাকে ক্ষুণ্ন হতে না দেখা এ উপন্যাসের অন্যতম বিষয়বস্তু। তরুণী মরিয়ম টিউশনি করে সংসারের খরচ জোগায়। সাংসারিক কাজে মাকে সাহায্যও করে। মাহমুদ সমাজের অন্যায়-অব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ ও অসহিষ্ণু। বাইরে যেমনই হোক এ যুবকের ভেতরটা কোমল। হাসিনা সব সময় হাসিমুখ সদাচঞ্চল এ কিশোরী সেজেগুজে থাকতে ভালোবাসে। অন্য চরিত্রগুলোও প্রাণবন্ত। এমন নিপুণ রেখায় অঙ্কিত হয়েছে এরা যেন তাদের অভিব্যক্তি ও চলাফেরা দেখতে পাই।
চারপাশে ছড়ানো আবর্জনার মাঝখানে সরু এক গলির ভেতর একটা বাড়িতে থাকে এসব চরিত্র। বাড়িটা জরাজীর্ণ। যেকোনো সময়ে ধসে পড়তে পারে। উপন্যাসে বাড়িটার সংস্কার করার কথার হয়; কিন্তু নানা অসুবিধার কারণে তা আর হয়ে ওঠে না। ভয়ানক ঝুঁকির ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয় পাত্র-পাত্রীদের জীবন। গল্প এগোয় তার মধ্য দিয়েই। দারিদ্র্য, টানাপড়েন, আশা ভঙ্গ হওয়ার ও আশঙ্কার সমান্তরালে হাসিনার জেগে ওঠে রঙিন স্বপ্ন। মনসুরের প্রেমে পড়ে মরিয়ম। লিলি ভালোবাসতে শুরু করে মাহমুদকে। ভয়ংকর দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে মানসিক ভারসাম্য হারায় মাহমুদ। সে প্রায় সারাক্ষণ বিড়বিড় করে। সে বিশ্বাস করে, এ সমাজ নৈতিকতা বজায় রেখে বিত্তবান হওয়া অসম্ভব। আর এখানে যারা অল্প সময়ের ভেতরে বড়লোক হয়েছে, তারা সবাই কোনো না কোনো দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ‘গরিবের সাধ-আহ্লাদ আছে’Ñ সালেহা বেগমের এ উক্তিতে মাহমুদ ক্ষোভের সঙ্গে বলে ‘মা রোজ পাঁচবেলা যার কাছে মাথা ঠোকো তাকে কি একবার জিজ্ঞেস করতে পারো না, এত সাধ-আহ্লাদ দিয়ে যদি গড়েছেন তোমাদের, সেগুলো পূরণ করার সামর্থ্য দেননি কেন?’
কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টির পর এক রাতে ওই বাড়ি ধসে পড়ে। বাড়িতে যারা ছিল সবাই মারা যায়। মাহমুদ জরুরি কাজে ওই রাতে প্রেসে ছিল; সে বেঁচে যায়। লিলিকে নিয়ে এগোয় তার জীবন। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার ও অভাবনীয় বৈচিত্র্যের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে। বিষয়টি প্রায় দার্শনিক মাত্রা অর্জন করেছে উপন্যাসে।
শ্রেণি সংগ্রামের কিংবা বিপ্লবের ধারণা এখানেও অনুপস্থিত। এ উপন্যাস নিছক অভাব-অনটনের আর ভালোবাস-ঘৃণার ইতিবৃত্তও নয়। অসৎ রাজনীতি, চরিত্রহীন ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্বিকার সমাজের নির্লিপ্ততা, ক্ষুব্ধ ও বিষণ্ন ব্যক্তিমানস প্রভৃতির বেশ শিল্পিত প্রকাশ লক্ষ করা যায় এ গ্রন্থে। ‘বরফ গলা নদী’র পাত্র-পাত্রীদের মনের টানাপড়েন তার কাহিনীর ধরনের সঙ্গে সামঞ্জস্য। যাবতীয় অব্যবস্থা, অন্যায়-অবিচার, বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও লেখক জীবন সম্বন্ধে আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন।
এ উপন্যাসের রচনারীতি লক্ষ করার মতো। গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদের নাম উপসংহারের আগে কালজীর্ণ বাড়ি ধসে পড়ার পরবর্তী সময়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। দুজনের মনেই একটা স্বপ্নিল সুখী যৌথ জীবনেরর ভাবনা ঘনীভূত হচ্ছে। শেষ পরিচ্ছেদটির নাম ‘উপসংহার’। এখানে বর্ণিত হয়েছে বাড়ি ধসে যাওয়ার পাঁচ বছর পরের সময়। দুদিনের গল্প।
জহির রায়হান এ উপন্যাসে সহজ ভঙ্গিতে জীবনের কঠিন বাস্তবতার নানাদিক চিত্রিত করেছেন। অল্প কথার ও ডায়লগের মাধ্যমে চরিত্রসমুদয় হয়ে উঠেছে জীবন্ত। পরিবেশ-পরিস্থিতি বর্ণনার জন্য যে ডিটেল ব্যবহৃত হচ্ছে, তা বিস্তৃত না হলেও লক্ষভেদী হতে পেরেছে।
সবকটি উপন্যাসেই কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের সক্ষমতা প্রমাণিত। গুণাগুণের পার্থক্য অবশ্যই আছে। তারপরও বলব, লেখক আলোচিত এ দুটি গ্রন্থেই তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন তুলনামূলকভাবে বেশি।