শুভাশিস সিনহা
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৩০ পিএম
আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৫৭ পিএম
সেলিম আল দীন ১৮ আগস্ট, ১৯৪৯ - ১৪ জানুয়ারি, ২০০৮
সেলিম আল দীন তিনটা রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় লিটারারি এনিমিজমের ক্লাসিক রূপ দিয়েছেন : প্রাচ্য, ধাবমান ও স্বর্ণবোয়াল। আর পুত্র তার ইকোলজিকাল নিওট্র্যাজেডি।
শরৎচন্দ্রের মহেশ ছিল এই ধারার উজ্জ্বল নমুনা।
একদিন সন্ধ্যাবেলা, আমি তখন স্থায়ীভাবে গ্রামে চলে এসেছি, স্যার উচ্ছ্বসিত ফোন দিলেন, ‘স্বর্ণবোয়াল’ পড়েছি কিনা। বললাম, অসাধারণ! হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দি সী’র কথা মনে পড়ল...
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন।
তারপর একগাল হেসে বললেন, তোর আগে কেউ বলে নাই, ঠিক বলেছিস, বাট... এটা ওরিয়েন্টাল।
হ্যাঁ স্যার। একদম।
আরেকদিন ডিপার্টমেন্টের ছাদে কথায় কথায় মজা করে বলেছিলাম, কালিদাস প্লাস আলাওল প্লাস রবীন্দ্রনাথ প্লাস তারাশঙ্কর প্লাস সেলিম আল দীন ইজ ইকুয়াল টু সেলিম আল দীন।
স্যারের চোখ রক্তবর্ণ। আমি ভয়ে আছি।
পরক্ষণেই একগাল হেসে বললেন, মন্দ বলিস নি রে...
এমনই নানান খুনসুটি হতো স্যারের সাথে।
তবে সেদিনের সেই পর্যবেক্ষণ আরও গভীর অভিনিবেশ দাবি করে, যা পরবর্তীকালে করা হয়ে ওঠে নাই। আমাদের সাহিত্যে এই তিনটি টেক্সট কেবল প্রাণকেন্দ্রিক গল্পের কারণে বিশেষ নয়, মানুষকে তার অন্তর্ঘাতে বিপর্যস্ত করে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে প্রচলকে ভেঙে দেবার সাহস সেখানে জ্বাজ্জল্যমান। যে মানুষ দখলদারিত্বের সবক নিয়ে ফেলেছে, দুনিয়াব্যাপী মানুষ যেখানে দখলের মধ্য দিয়েই তার আসনটাকে পাকাপোক্ত করতে চায়, অপরাপর মানুষকে বশ করে, বধ করেই তার জয়যাত্রা সূচিত হয়, সেখানে তথাকথিত ইতরবাচক পশু-প্রাণির সামনে গিয়ে শেষতক নতজানু মানুষকে তিনি মহিমান্বিত করে হাজির করেন, তাদের ঘাম আর অশ্রুর সকল দায়কে পাশ কাটিয়েই।
সারারাত মাটি খুড়ে খুড়ে খুঁজে পাওয়া সাপকে বাস্তুসাপের মহিমায়, সংস্কারে ক্ষমা করে দেবার আকুতিতে সামনে দাঁড়ানো দাদীমা যে ক্ষণিকেই প্রশান্ত জলস্রোত হয়ে যান, তার মাজেজা বুঝতে আমাদের সমস্যা হয় না। (প্রাচ্য)
তেমনি ধাবমান-এর বেপরোয়া গরুটি যে এতটা দাপিয়ে বেড়িয়েও ফের প্রভুর কাছে এসে সবিনয় ধরা দেয়, সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষার সাথে প্রাণিটির প্রতি প্রেম এক মধুর দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে গ্রন্থিত হয়। স্বর্ণবোয়াল-এও সেই শিকার আর শিকারির মনোবিপর্যাস।
দখলদারির, সর্বজয়ের, আগ্রাসের দুনিয়ায় সেলিম আল দীনের এই পশু-প্রাণীর সাথে মানুষের অস্তিত্বের নবতর সম্পর্কের রসায়নে গড়া ক্লাসিক আখ্যানত্রয় কেবল বাংলা নাটকেই নয়, বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যেই দুর্লভ রচনা!
তাঁর সকল সাহিত্যকর্মের মাঝেও ভাবনার অভিনবত্বে, বয়ানের বিশেষত্বে, অনুভবের মহত্ত্বে এই তিনটি রচনা ভিন্ন এক আলোয় ঝলমলাবে কাল থেকে কাল।
জন্মদিনে এই অসামান্য শিল্পীর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।