শামসুর রাহমানের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শিহাব শাহরিয়ার
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১৬:০৯ পিএম
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৩৮ পিএম
মায়ের আশির্বাদ নিচ্ছেন শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯- ১৭ আগস্ট ২০০৬) ছবি : কবির পারিবারিক অ্যালবাম থেকে। ২০২৩ সালে ১৮ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশে কবি শামসুর রাহমানের অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি। আজ কবির ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি অনলাইনে তুলে দেওয়া হলো
কবি শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতিকথা’ লেখার শুরুটা হয়েছিল আমার মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে। আমি তখন ‘পূর্ণতা’ সাহিত্য পত্রিকার দায়িত্বে ছিলাম। সম্পাদকের প্রস্তাব অনুযায়ী রাহমান ভাইকে অনুরোধ করলে, তিনি স্মৃতিকথা ‘কালের ধুলোয় লেখা’ লিখতে শুরু করেন। আমি এ লেখার জন্য তার শ্যামলীর বাসায় যেতাম। তিনি ডেকে নিয়ে দোতলায় তার কক্ষে বসিয়ে রোল করা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লিখতে শুরু করতেন ‘স্মৃতিকথা’। তিন কিস্তি লেখা ছাপার হওয়ার পর আমি ‘পূর্ণতা’ ছেড়ে দিলে রাহমান ভাইয়ের স্মৃতিকথা লেখা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরে কবি নাসির আহমেদের সম্পাদনায় জনকণ্ঠের সাময়িকীতে ‘কালের ধুলোয় লেখা’ শিরোনামের সেই স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে; যা বর্তমানে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।
একদিকে সোবহানবাগ, একদিকে রাজারবাজার, অন্যদিকে সংসদ ভবনÑ এর মাঝখানে ছোট্ট তল্লাবাগ। সেই পাড়ায় শামসুর রাহমান কিছু সময় বসবাস করেছেন। সেখানে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম বড় ভাই সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সঙ্গে। এর কয়েক দিন আগেই তিনি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। গিয়ে দেখি বিছানায় শুয়ে আছেন। আমরা গিয়ে বসলাম পাশে। বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো তার সঙ্গে। এ সময় তার একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা ‘হাসপাতালের বেড থেকে’ বেশ আলোচিত হচ্ছিল, যেটি হাসপাতালে থাকাকালে লিখেছেন। কবিতাটি প্রেমের। একজন সুন্দরী নারী হাসপাতালে তাকে দেখতে যেতেন, তাকে নিয়েই লেখা কি নাÑ অগ্রজ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল জিজ্ঞেস করলে ইংরেজি সাহিত্যের ফরফা-পরিপাটি মানুষটির মুখ একটু লজ্জায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আহা প্রেম ও বিরহের নিবেদন? এর কিছুদিন পরই তিনি চলে আসেন শ্যামলীর ছায়াস্নিগ্ধ বাসায়। ছিলেন পুরান ঢাকায়, তারপর এলেন নতুন ঢাকায়। আর মেঘনাপাড়ের পাড়াতলি গ্রামেও থেকেছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কিছু সময়। সেই গ্রাম নিয়ে লিখেছেন ‘নায়কের ছায়া’ চমৎকার কবিতাটি, আমার খুবই পছন্দের একটি কবিতা। কয়েকটি চরণ এখানে দিই : ‘...পাড়াতলি/গ্রাম, নদী চিরে জেগে ওঠা, গাছপালা, ইদারা পুকুর হাট/বাজার নিঝুম গোরস্তান নিয়ে আছে। তাকে মেঘনার অঞ্জলি বলা যায়।’ কবিতাটি এ কারণে পছন্দ যে, আমিও এরকম ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের একটি গ্রাম সাতানিপাড়ায় ১৭ বছরের জীবন কাটিয়েছি। মনে হয়েছে, কবি যেন আমার গ্রামের কথাই বলছেন।
বাড়িয়ে বলছি না, শুধু কবি, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও কবির শুভানুধ্যায়ী ছাড়া কবির শেষ জীবনের দিনগুলোয় কেউ এগিয়ে আসেনি। মনে আছে একসঙ্গে কবি শামসুর রাহমান, কবি নাসির আহমেদ ও কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের বেতারে প্রচারিত গানের রয়ালটির চেক আনতে গিয়ে আনতে পারিনি। কর্তৃপক্ষ বলেছে, গীতিকারকে আসতে হবে। কিন্তু শামসুর রাহমানের পক্ষে নিজে এসে চেক নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই চেক শামসুর রাহমান কোনো দিন পাবেন কি না জানি না, কিন্তু আমি তাকে চেকটি কোনো দিন পৌঁছাতে পারব না। প্রায় সবাই জানেন, দৈনিক বাংলার চাকরি ছাড়ার পর প্রায় ২০ বছর কর্মহীন থেকে, শুধু লেখালেখি করে জীবন ও সংসার চালিয়েছেন কবি। লেখালেখির সম্মানিই ছিল তার একমাত্র উপার্জন। যাকে বলি বাংলার কবিতার প্রধান স্তম্ভ, তাকে অর্থকষ্টে কাটাতে হয়েছে জীবন। যিনি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আর বাংলার কবিতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন, তার সংসার এখন চলছে কীভাবে? যিনি দিয়ে গেছেন অনেক কিন্তু পেয়েছেন শূন্য। কবি বলেছেন : ‘যাবার সময় বস্তুত কারো/দোষত্রুটি আমি ধরিনি;/বৈরী ঋতুতে কোমল তাকায়/চর্যাপদের হরিণী।’ যে চর্যাপদের কবিতা দিয়ে বাংলা কবিতার শুরু, সেই বাংলা কবিতায় নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি করে বিশাল অবদান রেখে গেছেন কবি শামসুর রাহমান। তার লেখা গানটি আমাকে আজীবন আকুলিত করবে, সেই যে : ‘স্মৃতি ঝলমল সুনীল মাঠের কাছে/পানি টলমল মেঘনা নদীর কাছে/আমার অনেক ঋণ আছে...’
২০০৬ সাল। জুলাই মাস। আমার অগ্রজ কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালকে বললাম, রাহমান ভাইয়ের একটি লিখিত দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে চাই, কী বলো? বললেন, নে। ১০০টি প্রশ্ন লিখে একদিন তার ৯১১৬৩৫০ ল্যান্ডফোন নম্বরে ফোন করলাম, অন্য প্রান্ত থেকে বললেন, চলে এসো একদিন। তারিখটা মনে নেই, তবে তখন সময়টা ছিল মধ্যদুপুর। আমার অবাধ বিচরণ ছিল তার বাসায়। ১/২ শ্যামলী, দুই তলার নির্জন বাড়ি। নিচে থেকে কলিংবেল বাজালেই কাজের লোকটি খুলে দিল দরোজা। তবে দরোজায় তালা লাগানো থাকত, কারণ কিছুদিন আগে হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা তাকে হত্যা করতে এসেছিল এবং এর পর থেকে বাড়িতে পুলিশ পাহারা থাকছে। পাহারারতরাও আমাকে চেনে, তাই ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি চলে গেলাম রাহমান ভাইয়ের শয়নকক্ষে। রঙিন বাটিকের লুঙ্গি আর রুচিশীল ফতোয়া পরা রাহমান ভাই বললেন, ঠিক সময়ে এসেছ, বসো। আমি পরিচ্ছন্ন বিছানায় বসলাম। দরোজা-জানালা খোলা, দুপুরের রোদের আলো ছিটকে পড়ছে কক্ষটিতে। সুপুরুষ কবি শামসুর রাহমানকে দরোজা ভেদ করে আসা রোদে আরও মোহনীয় লাগছে। সাদা ধবধবে চুল, ফরসা চেহারার কবিকে মনে হচ্ছিল ছবিতে দেখা চল্লিশের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো। এই ৭৯ বছর বয়সেও কবি তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ঝলঝল করছেন। আর তার বিনয়ে মুগ্ধ হওয়ার মতো। তিনি চেয়ারে বসলেন, বললেন, শুরু করো। আমি এক এক করে প্রশ্ন করলাম, তিনি উত্তর দিতে থাকলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা। সেদিনের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলো। রাহমান ভাই বললেন, আজ শেষ করো। দুই দিন পর আবার এসো। এরপর দুই দিন গেল, ফোন করলাম, ওপাশে ফোন ধরলেন তার পুত্রবধূ টিয়া, যিনি সেবাযত্নে আগলে রেখেছেন কবিকে। তিনি বললেন, ‘আব্বা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, শরীরটা বেশি খারাপ করেছে, বাসায় এলে জানাব, এরপর কবে আসবেন।’ আমি কদিন পর আবার ফোন করে জানতে চাইলাম তিনি কেমন আছেন? পুত্রবধূ জানালেন, বাসায় এসেছেন, তবে শরীরটা ভালো না। এরপর আরও কয়েক দিন ফোন করলে জানালেন, খুবই নাজুক অবস্থায় তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছে! খবরটা শুনে খারাপ লাগল। তারপর তাকে দেখতে গেলাম হাসপাতালে... সে-ই শেষ দেখা... আর হলো না কথা, বাকি প্রশ্নের উত্তরগুলো রয়ে গেল... অসমাপ্ত, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত এই সাক্ষাৎকারটি নিচে পত্রস্থ করছি। উল্লেখ্য, সাক্ষাৎকারটির পরিকল্পনায় ছিল ধারাবাহিক তার জীবন ও বর্ণাঢ্য লেখালেখির ইতিহাস তুলে আনা। কিন্তু শেষ করতে পারিনি, বড় দুঃখই রয়ে গেল... এটুকুই আপনারা পড়ুন।
আপনার ডাকনাম ‘বাচ্চু’। কে রেখেছিলেন এই নাম? এ নামে এখন কেউ কি ডাকে?
শামসুর রাহমান : আমার ঠিক মনে নেই, তবে যতদূর সম্ভব আমার নানি। এ নামে ডাকার মতো আত্মীয়স্বজন দুয়েকজন আছেন।
‘রহমান’ থেকে ‘রাহমান’ হলেন কীভাবে? এবং চৌধুরী বাদ দিলেন কেন?
শামসুর রাহমান : ‘রহমান’ শব্দটা আররি বা ফারসিতে ‘রাহমান’ হয়, তাই আমি অরিজিনাল উচ্চারণটার জন্যই রাহমান করেছি। আর চৌধুরী আমার কাছে ভালো লাগেনি, তাই গোড়া থেকেই বর্জন করেছি।
আপনি আপনার নানিকে ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়ে শোনাতেন। সেই বিষাদ সিন্ধু কি আপনার লেখায় কোনো ধরনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে?
শামসুর রাহমান : না, ঠিক না, আমি তখন বিষাদ সিন্ধু পড়ে শোনাতাম, বুঝতাম না, নানিও বুঝতেন বলে মনে হয় না। বিষাদ সিন্ধুকে উনি ধর্মগ্রন্থ মনে করতেন, তবে তা ভালো লাগত। নানি লেখাপড়া জানতেন না।
আপনার বাবা ও মা কবে মারা যান?
শামসুর রাহমান : আমার বাবা মারা যান ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল রাত ১২টার পর আর মা মারা যান ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সালে।
আপনার বাবা কি আপনার লেখালেখি পছন্দ করতেন?
শামসুর রাহমান : আমি যে লিখি গোড়ার দিকে আব্বা পচ্ছন্দ করতেন না, তবে আমি যখন আমার প্রথম বই ‘রৌদ্র করোটি’র জন্য পুরস্কার পাই, তা শুনে উনি খুশি হন। লেখালেখি পছন্দ না করার কারণ তার এক বন্ধু আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্ন, যিনি দারিদ্র্য ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এজন্য আব্বা লেখালেখি পছন্দ করতেন না।
আপনার ভাইবোনদের কথা জানতে চাই...
শামসুর রাহমান : আমার বড় ভাইয়ের বয়স এখন ৮২ বছর। তিনি অসুস্থ এবং শয্যাগত। তিনি স্ট্রোক করেছেন। তিনি এখন সামান্য কথা বলতে পারেন, তবে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। দিলদরাজ, হাসিখুশির মানুষ। চার পুত্র ও এক কন্যার জনক তিনি। আমার ছোট ভাইটি ব্যবসায়ী ছিল, মারা গেছে। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। তার পরের ভাই ব্যারিস্টার, তিন সন্তানের পিতাÑ এক ছেলে, দুই মেয়ে। তার ছোট আর এক ভাইÑ সে ব্যবসায়ী। তিন পুত্র, এক কন্যার জনক। আমার ছয় ভাইবোন সবাই জীবিত আছেন।
আপনার ছেলেমেয়েদের কথা জানতে চাই...
শামসুর রাহমান : আমার দুই পুত্র। ছোটজন মারা গেছে, খুব অল্প বয়সে আমাদের গ্রামের বাড়ির পুকুরে ডুবে। বড় ছেলে বিবাহিত। দুই কন্যার জনক। আর আমার তিন মেয়ে, তারা বিবাহিত। বড় মেয়ের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেজো মেয়ের তিন ছেলে আর ছোট মেয়ের এক ছেলে। তিন মেয়েই বিদেশে থাকে।
আপনার প্রিয় পুত্রবধূ টিয়া সম্পর্কে বলবেন?
শামসুর রাহমান : আমি এবং স্ত্রীর সৌভাগ্য টিয়ার মতো একটি মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে পেয়েছি। সে আমার নিজের মেয়ের মতোই। আমার সংসারকে অনেক কষ্ট করে গুছিয়ে রেখেছে। তার কোনো চাহিদা নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেকেরই কিছু শখ-আহ্লাদ থাকে কিন্তু ওর কোনো কিছুই নেই বলে আমার খারাপ লাগে। আমরা ওকে কিছু দিতে চাইলেও অনেক সময় নিতে অস্বীকার করে। বহু পীড়াপীড়ির পর কখনওসখনও সে গ্রহণ করে। আমাদের অসামান্য শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে বলেই।
জোহরা রাহমান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শামসুর রাহমান : জোহরা সম্পর্কে আমি যত প্রশংসাই করি, তা কম হবে। যখন আমি তাকে বিয়ে করি, তখন বেকার ছিলাম এবং এক কন্যার জনকও হয়ে যাই বেকার অবস্থায়। একজন নববধূর বেকার স্বামীকে নিয়ে যে বিড়ম্বনা সইতে হয়, তা মুখ বুজে সে সয়েছে। পরে আমার কম বেতনের চাকরিতে যে অসুবিধাগুলো হয় সংসারে তাও সে হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। এবং পাঁচ সন্তানের লালনপালনের সব রকম ঝামেলাও কোনোরকম নালিশ ছাড়াই মেনে নিয়েছে। আমি খুবই বাউণ্ডুলে ধরনের মানুষ ছিলাম। সংসারের দিকে, ছেলেমেয়ের দিকে কোনো মনোযোগই দিইনি যদিও; তাদের জন্য ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। গোড়ার দিকে আমার স্ত্রীর প্রতিও আমি কোনো মনোযোগ দিইনি। ঘোরাঘুরি, আড্ডা এবং লেখালেখি নিয়েই ছিলাম। এখনও সে অভ্যাস রয়ে গেছে। তবে পরবর্তীকালে তাকে আমি অভাব-অনটন থেকে মুক্ত রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি এবং এদিক থেকে অখুশি হওয়ার কারণ আমি দিইনি। কখনও কখনও আমার কোনো কোনো আচরণে মর্মাহত হয়েছে কিন্তু আমাকে কখনও সেজন্য অপছন্দ করেনি।
আপনি এত এত প্রেমের কবিতা লেখেন, আপনার প্রিয় প্রেমিকাদের সম্পর্কে স্ত্রী কী ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন?
শামসুর রাহমান : একটু আগে আমি যা বলেছি, মানসিক পীড়নÑ সে বাক্যতেই তা রয়ে গেছে।
কবি নয়, ব্যক্তি শামসুর রাহমান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শামসুর রাহমান : কোনো মানুষই সম্পূর্ণ দোষত্রুটিমুক্ত নয়, আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমার কিছু দোষ আছে, কিছু গুণও আছে। এটাই আমার ধারণা। এ ধারণার আমাকে দিয়েছেন আমাকে যারা চেনেন এবং জানেন। তাদের কাছে আমার দোষের চেয়ে গুণটাই বেশি ধরা পড়েছে। সে কারণে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
শামসুর রাহমানের মন্দ দিকগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
শামসুর রাহমান : এটা তো আমি নিজে বলতে পারব না। অন্যের চোখে ধরা পড়বে। তবে আমি যে কাজ করতে চাই অনেক সময় উচিত কথা বলা থেকে বিরত থাকি। আমি সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করি। সহজে বিশ্বাস করি বলেই আমাকে কখনও ঠকতে হয়েছে। মাঝে মাঝে আমি মাত্রাতিরিক্ত রেগে যাই। এত রেগে যাই যে, যাকে যে কথা বলা দরকার, তা না বলে হয়তো তোতলাতে থাকি অথবা অন্য কথা বলে ফেলি।
শামসুর রাহমানের মন্দ দিকগুলো কী কী বলে মনে করেন?
শামসুর রাহমান : আসলে আমার পূর্বপুরুষের ভিটা হলো গ্রাম। গ্রামে আমাদের বাড়ি আছে। এক হিসাবে আমাকে দ্বিজ বলা যায়। কারণ আমার রক্তে গ্রামের প্রবাহ এবং আমার গড়ে ওঠায় রয়েছে শহরের ঢেউ। এজন্য আমি এবং আমাদের অনেকেই ঢাকাইয়া ভাষা দখল করে নিতে পারিনি। দখল করে নিলেও যে এটা খুব খারাপ হতো, তাতে আমি কিছু মনে করি না। কারণ সব ভাষারই একটা মর্যাদা আছে। আমার গ্রামের ভাষা ও ঢাকার ভাষা কোনোটাকেই আমি খাটো করে দেখিনি। তবে আমি চেষ্টা করেছি শুদ্ধ করে বাংলা ভাষা বলার।
আপনার প্রিয় পুত্র?
শামসুর রাহমান : বহুদিন দেখি না... তবে প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। ছেলেটি বড় ভালো ছিল।
আপনাদের মাহুতটুলীর বাড়ি ও আওলাদ হোসেন লেনের প্রেসটি বর্তমানে কী অবস্থায় আছে?
শামসুর রাহমান : মাহুতটুলীর বাড়িও নেই, আওলাদ হোসেন লেনের প্রেসও নেই; সেগুলো এখন অন্যদের দখলে।