× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রকৃত প্রস্তাবে আমিও আর বেঁচে নেই, জীবিত আছি মাত্র...

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:২০ পিএম

যতীন সরকার, ১৮ আগস্ট ১৯৩৬-১৩ আগস্ট ২০২৫

যতীন সরকার, ১৮ আগস্ট ১৯৩৬-১৩ আগস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের অগ্রগণ্য প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও লেখক যতীন সরকার। কয়েক দশক ধরে সৃজনে, মননে, কর্মে, প্রজ্ঞায় তিনি দেশ ও সমাজ আলোকিত করে গেছেন। জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি কখনোই নীতিচ্যুত হননি। গত ১৩ আগস্ট তিনি অনন্তকালে পাড়ি জমান। ২০২৩ সালে তার ৮৮তম জন্মদিনে প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছিল অধ্যাপক যতীন সরকারের দুই পর্বে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন তৎকালীন ফিচার সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ। মহান এই শিক্ষকের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তার সেই সাক্ষাৎকারটির পুনর্মুদ্রণ করা হলো

কেমন আছেন স্যার?

যতীন সরকার : এই প্রশ্নটা করলেই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, বিপ্লবী সরদার ফজলুল করিমের কথা আমার মনে পড়ে। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো প্রীতির সম্পর্ক ছিল। উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাকে যদি জিজ্ঞাস করতাম, সরদার ভাই কেমন আছেন? উনি বলতেন ‘ম’ বাদ দেন, ‘ম’ বাদ দেন। কথাটা প্রথমে বুঝতে পারি নাই। পরে বুঝলাম ‘কেমন’-এর ‘ম’ বাদ দিলে হয়, কেন আছেন?

এই কথার তৎপর্য কিন্তু অনেক গভীর। এখন আমাকে জিজ্ঞেস করলে এই কথাটাই আমার মনে হয়। এখন আমি জীবিত আছি মাত্র। বেঁচে নাই। কাজেই এই থাকার কোনো মানে হয় না। কিছুই করতে পারি না, দিতে পারি না। পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট লেখক এবং পাভলভীয় মনস্তত্ত্বের ধারক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, তার বই আমি খুব মনোযোগসহকারে পড়েছি। তার বই পড়ার মধ্য দিয়েই আমার চিন্তাভাবনা অনেকখানি দানা বেঁধে উঠেছে। তার বই থেকেই পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে এবং পাভলভীয় মনোবিজ্ঞান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে জীবনের বোধ-বুদ্ধি বিশ্লেষণ করা যায় এটা আমি মনি করি না। সেই ধীরেন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন। এই ‘বেঁচে’ শব্দের মধ্যে আবার সিঙ্গেল কোটেশন দেওয়া। এটা তো খুব স্বাভাবিক, মানুষ তো বেঁচেই থাকে। ‘সারা জীবন বেঁচে ছিলেন’-এর অর্থ আবার কী? পরে বইটা পড়ে বুঝলাম, মানুষ জীবিত থাকে কিন্তু বেঁচে থাকে খুব অল্প মানুষ। যারা প্রতিনিয়ত নিজেকে নিজে সামনের দিকে অগ্রসর করে নিয়ে যায়, নিজেকে পরিবর্তন করে তাদেরটাই হলো বেঁচে থাকা। আর অন্যেরা জীবিত থাকে মাত্র। ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন’ কথাটার মানে হচ্ছে এই, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নতুন নতুন ভাবনায় ভাবিত হয়েছেন এবং সেই ভাবনা মানুষের মাঝে সঞ্চার করে দিয়েছেন। এই জিনিসগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ৮০ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করলেও বেঁচে থাকা মানুষ রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ নাই।

চিন্তা ও লেখনীতে আপনি এখনও সক্রিয় আছেন, আরও দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে ‘বেঁচেই’ থাকবেন।

যতীন সরকার : প্রকৃতপ্রস্তাবে আমিও আর বেঁচে নাই। জীবিত আছি মাত্র। এ ক্ষেত্রে আমি একটু রহস্য করেই বলি, রবীন্দ্রনাথ তো ৮০ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন, সে ক্ষেত্রে আমি তো রবীন্দ্রনাথের বড়। আমার বয়স ৮৭। কাজেই রবীন্দ্রনাথকে তো আমি অপমান করতে পারি না (হাসি)। কাজেই ৮০ বছর বয়স পর্যন্তই প্রকৃতপ্রস্তাবে আমি বেঁচে ছিলাম। 

রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকে আরম্ভ করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনো দিন পিছন দিকে যাননি। পিছন দিকে না যাওয়া এবং সামনের দিকে প্রতিনিয়ত অগ্রসর হওয়ার এই যে ব্যপারটা এটাই হলো বেঁচে থাকা। হ্যাঁ, এটা বলতে পারি, আমি ৮০ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলাম। তারপর দেখলাম, আমার পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যে কারণে জীবিত আছি মাত্র।

এই জীবিত থাকাটা আমার জন্য খুব বোঝা হয়ে গেছে। আমি এখন কিছুই দিতে পারি না, কিছুই করতে পারি না। অসুস্থ, ঘাড়ের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে। হাত নাড়াচাড়া করতে পারি না। এ সমস্ত কারণে এখন মনে হয় জীবনমঞ্চ থেকে বিদায় নিলেই রক্ষা।

আপনার জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে জানতে চাই।

যতীন সরকার : আমি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বিত্তসম্পদে আমাদের পরিবার দরিদ্র হলেও, চিত্তসম্পদে ছিল বিত্তশালী। আমার পিতামহ ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে মারা যান। আমার বয়স তখন ১০ বছর। কিন্তু আমি আমার ঠাকুরদার কাছে যা পেয়েছি, সেটার কোনো তুলনা হয় না। সেই শৈশবেই আমি ইঁচড়ে পাকা হয়ে উঠেছিলাম। এই ইঁচড়ে পাকা হয়ে ওঠার কারণটাও আমার জন্মের মধ্যেই নিহিত আছে।

সেটা কেমন স্যার?

যতীন সরকার : আমার বাবার কোনো ভাই-বোন ছিল না। আমার জন্মের আগে আমার এক বোন হয় এবং মারা যায়। তখন আমার ঠাকুরদা, ঠাকুরমা ভাবতে লাগলেন, আমাদের বংশ বোধহয় লোপ হয়ে গেল। শুনেছি, আমার ঠাকুরমা বিভিন্ন জায়গায় মানত করতেন। হিন্দু দেবতা তো ছিলই, মুসলমান পীর-ফকিরও বাদ যেত না। আমার জন্মের পর ধাত্রী গিয়ে যখন আমার ঠাকুরদাকে খবর দিল, আপনার নাতি হয়েছে, তখন ঠাকুরদা বলে ওঠেন, আজ থেকে আমাদের শান্তি হলো। এর নাম রাখলাম শান্তি। আমার ডাকনাম শান্তি। কিন্তু আমি শান্তি কাউকে দিতে পারি নাই। ছেলেবেলায় আমি নানা কারণে অসুস্থ হয়ে যেতাম। তাই আমার ঠাকুরমা বলতেন, তোকে মাথায় রাখি না উকুনে খাবে, মাটিতে রাখি না পিঁপড়ায় খাবে। কাজেই কোলে করেই রাখতেন। কোল থেকে বের করে ঠাকুরদার কাছে দিয়ে দিতেন। ফলে আমার ঠাকুরদার কাছ থেকে দুনিয়ার কত কথা যে সেই অল্প বয়সেই শিখে ফেলেছি...। আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ছয় বছর বয়সেই কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়ে ফেলেছি।

আগেই বলেছি, আমাদের পরিবার বিত্তসম্পদে খুব দরিদ্র ছিল। আমার বাবা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৪৬ সালের দিকে এসে দেখা গেল হিন্দুরা অনেকেই গ্রাম এলাকা ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছে, অনেকে শহরে চলে এসেছে। আমার বাবার রোগী ছিল ওরাই। সেই রোগী কমে যাওয়ায় আমার বাবার জীবিকাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। এ অবস্থার মধ্য দিয়েই আমার বেড়ে ওঠা।

তার মানে দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই আপনার বেড়ে ওঠা...

যতীন সরকার : দারিদ্র্যের সঙ্গে আমি সংগ্রাম করি নাই। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করা যায় বলে আমি মনে করি না। তবে দারিদ্র্যের সঙ্গে ইয়ার্কি মারা যায়। এটা আমি মেরেছি (হাসতে হাসতে)। যেমন, ১৯৫৫-৫৭ সালে আমি যখন নেত্রকোণা কলেজে পড়তাম। তখন হলো কী, কলেজে পরে যাওয়ার মতো কোনো জুতা ছিল না। এক জোড়া কাপড়ের জুতা ছিল, যার তলা নাই। তো করতাম কী, ওপরে খড়িমাটি লাগিয়ে, তলা ছাড়া জুতা পরেই হাঁটতে হাঁটতে কলেজে চলে যেতাম। বলতাম, মানুষকে ফাঁকি দিলাম আমি। (হা-হা)।

স্কুলে গেলেন কখন?

যতীন সরকার : আমার জন্ম চন্দপাড়া গ্রামে। এটা ছিল নেত্রকোণার কেন্দুয়া থানার অন্তর্গত। সেখানে তেমন কিছুই ছিল না। একটা বাড়ির ভিটা ছিল। এর পাশের গ্রাম রামপুর। সেখানেই আমি মানুষ হয়েছি। রামপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। তখন প্রাইমারি স্কুল ছিল ক্লাস ফোর পর্যন্ত। সেইখানে পড়ার সময়ই আমি আমার শিক্ষক মহোদয়দের আদর-আপ্যায়ন-যত্ন পেয়ে যাই। আমি এমন কথা বলতাম যে, আমার শিক্ষকরা অবাক হয়ে যেত। একবার হলো কী, আমার এক শিক্ষক রামায়ণের প্রসঙ্গ টেনে কথা বলার সময় একজনের নাম ভুল বলে ফেলেছেন। আমি ঠিক করে দিতেই তিনি বিস্ময়ে বলে উঠলেন, তুমি কীভাবে জানো? আমি বলি, মাস্টারমোশাই, আমি রামায়ণ পড়েছি। তিনি তো আরও অবাক হয়ে গেলেন। এভাবে ক্লাস ফোর পর্যন্ত রামপুর স্কুলে পড়লাম। ১৯৪৬ সনে ক্লাস ফোরে পরীক্ষা দিলাম।

তখন তো দেশভাগের ডামাডোলও বেজে উঠেছিল?

যতীন সরকার : এই সময়ই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একটা উলট-পালট হয়ে গেল। বিশেষ করে হিন্দুরা ভাবল, এ দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে এখানে থাকা যাবে না। আমাদের চলে যেতে হবে। অনেকেই চলে যাবার আয়োজন করেছে। কিন্তু আমার বাবা কোনোমতেই এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলতেন, দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে কী হবে? ওখানে তো আমার ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারব না। আমার জন্মের পর আরও এক ভাই, এক বোন হয়েছে। কাজেই অনেকে চলে গেলেও আমার বাবা যেতে চান নাই এবং যান নাই।

আপনারা নিজ গ্রামেই থেকে গিয়েছিলেন?

যতীন সরকার : ওই সময় আমার মামার বাড়ি মুক্তাগাছা থানার পারুলতলা গ্রামে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওখানেও দেখতাম হিন্দুরা একত্র হয়ে বলাবলি করে, এ দেশে তো আর থাকা যাবে না। পাকিস্তান মুসলমানের রাষ্ট্র ইত্যাদি। আমার খুব খারাপ লাগত। এই সময় একদিন পারুলতলার কাছে গাবতলি বাজারে গিয়ে দেখা পেলাম এক কবির। আমাদের দেশে ৪ থেকে ৮ পৃষ্ঠার এক ধরনের কবিতা লেখা হতো। সুর করে কবিরা নিজেরাই পড়তেন। এক-দুই আনায় সেগুলো বিক্রি করতেন। সেইখানে আমি দেখলাম ইউনুস আলী নামে এক কবি পাকিস্তানের কবিতা লিখে পাঠ করছেন। সুর করে বলছেন পাকিস্তান হলে কী হবেÑ ঢাকায় রাজধানী হবে, উন্নতি হবে বাংলাদেশের ভাই। হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকতে যেন পাই। এই ব্যাপারটা আমাকে খুব নাড়া দিল। শুনে আসছি পাকিস্তান হলে হিন্দুরা এ দেশে থাকতে পারবে না। কিন্তু এই কবি বলছেন, হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকতে যেন পাই। এবং পাকিস্তান কেন হবে? মহাজন, জমিদার এদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যই আমরা পাকিস্তান চেয়েছিলাম, পাকিস্তান হবে। এবং সেখানে পাই ফজর আলী, ঠাকুর দাসের এক উঠাইননা বাড়ি। অর্থাৎ ফজর আলী আর ঠাকুর দাস একজন মুসলমান আরেকজন হিন্দু এক উঠানের বাড়ির মধ্যে থাকে, একজনের পালা-পার্বণে আরেকজন যোগদান করে। এভাবেই থাকবে এ দেশের মানুষ। এই কবিতাটা এখনও আমার মনের মধ্যে নাড়া দেয়।

সেই এক উঠাইন্না বাড়ি তো আর থাকেনি...

যতীন সরকার : আমি সেই সময় থেকেই ভাবি, তথাকথিত বড়লোকেরা এক ধরনের চিন্তা করে, আর প্রকৃতজনের চিন্তা সম্পূর্ণ অন্যরকম। পাকিস্তান হওয়াটাকে প্রকৃতজন কোনোমতেই সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিতে দেখে নাই। যেটা তথাকথিত বড়লোকেরা দেখেছে। কারণ হিন্দুদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলে জমি-সম্পত্তি দখল করা যাবে, ইত্যাদি ইত্যদি। কিন্তু ইউনুস আলীরা সেই রকম ভাবতেন না। এই জিনিসটা আমি ছেলেবেলা থেকেই লক্ষ করে আসছি।

আবার নেত্রকোণা ফিরে এলেন কবে?

যতীন সরকার : যেটা হলো, একসময় আমার মামা-মাসি ওরাও ভারতে চলে গেলেন। আমার এক দূর সম্পর্কের পিসির বাড়ি ছিল নেত্রকোণা, আমি সেখানে চলে এলাম। সেখানে চন্দ্রনাথ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। ক্লাস ফাইভে আসলে আমার কোথাও পড়া হয়ে ওঠে নাই। এই স্কুলটা খুব উন্নতমানের স্কুল ছিল। সুখরঞ্জন রায় ছিলেন সেই স্কুলের রেক্টর। আমাদের এই এলাকায় হেডমাস্টারকে রেক্টর বলা হতো। পরে জেনেছি তিনি রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যের প্রথম সমালোচক। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে ‘রবীন্দ্র কথাকাব্যের মূলসূত্র’ নামে একটি বই তার পুত্র মিহির রঞ্জন বের করেন। যার ভূমিকা লিখেছিলেন ড. সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দেখেন আরে এই লেখা তো ১৯১৮ সালের আগের! রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে এর আগেও অনেকেই লিখেছেন কিন্তু কথাসাহিত্য নিয়ে তো কেউ লেখে নাই! এই ছিলেন সুখরঞ্জন রায়।

পড়াশোনা শেষের আগেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন...

যতীন সরকার : এ প্রসঙ্গে আরেকটু বলতে হয়, আজকালকার দিনে হেডমাস্টার, প্রিন্সিপাল তারা কিন্তু পড়ান না। আমি বলি তারা কেরানিগিরি করেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, হেডমাস্টার মানে সবচেয়ে ভালো মাস্টার, প্রিন্সিপাল সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। আমরা হেডমাস্টার-প্রিন্সিপালের কাছে পড়েছি। সে সময় আমি যখন চন্দ্রনাথ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই সুখরঞ্জন রায় আমাদের ক্লাসও নিতেন। ‘স্টোরিজ ফ্রম ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ বলে একটা বই র‌্যাপিট রিডার হিসেবে আমাদের পাঠ্য ছিল, সেটা তিনি পড়াতেন। ওই সময় আমাদের স্কুলে শিক্ষাসপ্তাহ হলো। সপ্তাহ শেষে ছিল অ্যানিভার্সারি মিটিং। সেখানে বাইরে থেকে কোনো গুণী ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হতো। সেই অনুষ্ঠানে সুধেন্দু চক্রবর্তী বলে একজন এলেন, বক্তৃতা করলেন। শুনলাম উনি প্রফেসর। প্রফেসর মানে কী? সেই সময় কলেজের মাস্টারমাত্রই প্রফেসর। ওই ভদ্রলোকের বক্তৃতা শুনে আমার এমন ভালো লাগল যে সেদিন আমার মনে হলো, প্রফেসরের চেয়ে বড় কিছু নাইা। আমাকে প্রফেসর হইতে হইবে। আমি আগেই বলেছি দারিদ্র্য কীভাবে আমাকে খুবলে খুবলে খেয়েছে তথাপি সেই ক্লাস সিক্সে ‘আমাকে প্রফেসর হইতে হইবে’ যে চিন্তা করেছিলাম, সেই প্রফেসর হয়ে গেলাম। ১৯৬৩ সনে এমএ পাস করার পরে আমি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম, ‘ইউ আর প্রফেসর অব বেঙ্গলি।’(হাসি)

১৯৪৮ সালে আমি যে ভাবনা ভেবেছিলাম, সেটা ১৯৬৪ সালে এসে পূরণ হয়ে গেলÑ আমি প্রফেসর হয়ে গেছি।

এর আগে তো আপনি স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন এবং কবি নির্মলেন্দু গ‍ুণকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন... 

যতীন সরকার : বিএ পাস করার পর বারহাট্টা স্কুলে মাস্টার হয়ে গেলাম। সেইখানে নির্মলেন্দুকে আমার ছাত্র হিসেবে পাই। সে তখন ক্লাস এইটে পড়ত। তাকে স্কুলের সবাই ভালো চিনত এই কারণে, সে ছাত্র ভালো ছিল, দুষ্টামিতেও ভালো ছিল। বিভিন্ন রকমের দুষ্টামি সে করত। বারহাট্টায় খুব উন্নতমানের একটা ক্লাব ছিল। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আলোচনা, গান-বাজনা ইত্যাদি হতো। সেখানে সেই সময়ই, নির্মলেন্দু যখন ক্লাস এইটের ছাত্র, সে আলোচনা করেছে, কবিতা পাঠ করেছে। তখন তো আর কেউ ভাবে নাই যে নির্মলেন্দু কবি হয়ে যাবে। আর আমিও তাকে কবি বানাই নাই। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আমার ছাত্র, এটায় আমি গর্ববোধ করি।

সমাজতান্ত্রিক ভাবনা আপনাকে আকৃষ্ট করল কখন?

যতীন সরকার : আমি আগেই বলেছি দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে আমার চলা। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল ১৯৫৩ সালে কিন্তু অসুস্থতার জন্য দিতে পারি নাই। যা হোক, ১৯৫৪ সালে পরীক্ষা দিই এবং পাস করি কেন্দুয়ার আশুজিয়া হাই স্কুল থেকে। তারপর যে কলেজে পড়ব, সেই সঙ্গতি নাই। টিউশনি করে কিছু টাকা জমিয়ে ভর্তি হয়ে পরলাম নেত্রকোণা কলেজে। তখনকার দিনে এত কলেজ ছিল না। নেত্রকোণা কলেজে শুধু ইন্টারমিডিয়েট পড়ানো হতো। তখন এই ইন্টারমিডিয়েটটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। আমরা ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। আমি এক বাসায় লজিং থেকে পড়াশোনা শুরু করি। যাদের বাসায় লজিং থাকতাম তারাও অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। আমি তাদের কিছু চাল-ডাল ইত্যাদি কিনে দিতাম। কিন্তু তার পরও মাঝেমধ্যে আমাকে না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এভাবেই নেত্রকোণা কলেজ থেকে আইএ পাস করে ফেললাম ১৯৫৭ সনে।

তারপর বিএ পড়তে হবে। কোনোরকম সঙ্গতি ছাড়াই আমি ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। সেইখানে একটা বইয়ের দোকান ছিলÑ নয়াযামানা পুঁথিঘর। সেই নয়াযামানা পুঁথিঘর প্রকৃতপ্রস্তাবে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির অলিখিত অফিস। আমি ওখানে নিয়মিতই বসতাম। সেখানে মহাদেব সান্যাল নামে একজন ছিলেন যিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন এবং ছাত্রদের নানাভাবে সাহায্য করতেন। তিনি ময়মনসিংহ শহরে আমাকে একটা লজিং করে দিলেন। এর ফলে আমি ময়মনসিংহ শহরে থেকে বিএ ক্লাসে পড়াশোনা করতে পেরেছি। সেই সময়, ওই নয়াযামানা পুঁথিঘরেই মহাদেব সান্যালসহ কমরেড অজয় রায়, জ্যোতিষ বোস, কাজী আবদুল বারীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তারা ওখানে মার্কসিজম নিয়ে আলোচনা করতেন এবং আমি মার্কসিজম পছন্দ করতাম না। আমি রিলিজিয়ন সম্পর্কে (ধর্ম শব্দটা ব্যবহার করছি না।) ছেলেবেলা থেকেই প্রচুর পড়াশোনা করেছি। কোনো রিলিজিয়ন মনে-প্রাণে না মানলেও, সেটাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অভ্যাস ছেলেবেলা থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সমস্ত রিলিজিয়নকে আমি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতাম এবং রিলিজিয়নের যে বিশেষ প্রগতিশীল ভূমিকা আছে সেইগুলিও আমি লক্ষ করেছি এবং সেইগুলি নিয়ে আমি কথাবর্তা বলতাম। কমিউনিস্টরা ধর্ম সম্পর্কে ব্যঙ্গবিদ্রুপ ইত্যাদি করে, এটা আমার ভালো লাগত না।

আপনার ভাবনার রূপান্তর শুরু হলো কখন?

যতীন সরকার : অজয় রায়, জ্যোতিষ বোস, মহাদেব সান্যালরা তখন একটা পাঠচক্র করতেন। আমি সেখানে গেলাম। সেখানে রতু রায় বলে একজন আমাকে স্ট্যালিনের ‘দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ বইটা পড়তে দিলেন। সেটা পড়ে আমার মাথার জট যেন খুলে গেল। এরপর আমি তাদের পাঠচক্রে যোগদান করলাম। আমি আস্তে আস্তে ডায়লেকটিক্যাল বস্তুবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। এবং আমার মনে হলো ডায়লেকটিক যে না বোঝে, সে যতই লেখাপড়া করুক আসলে কিছুই বোঝে না। এগুলো আমি লিখেছিও। সেই ডায়লেকটিক বস্তুবাদের মধ্য দিয়েই আমি কমিউনিস্ট হয়েছি। আমি কারও কথায় কমিউনিস্ট হই নাই। পড়াশোনা করে নিজে বুঝেশুনে আমি মার্কসিস্ট হয়েছি। মার্কসিজম কথাটাও আমি পছন্দ করি না। মার্কস তৈরি করেছে বলে মার্কসিজম, তারপর লেনিন করল লেনিনিজম; এরপর আবেদ যদি কিছু করে সেটা আবেদিজমÑ এই কথাটাই আমার পছন্দ না। আমি বলি, ডায়লেকটিক্যাল ম্যাটারিলিজম। সেটা কোনো সময় এক জায়গায় থেমে থাকে না। ডায়লেকটিকের ভিত্তিতে সবকিছু দেখলে, নতুন নতুন পদ্ধতি, নতুন নতুন ব্যাপার বেরিয়ে আসে। সেইভাবেই আমি আমার জীবনকে দেখেছি।

আপনি প্রায়ই বলে থাকেন বাঙালি ঐতিহ্যগতভাবে সমাজতন্ত্রের ধারক। কিন্তু এ দেশে সমাজতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠা পায়নি...

যতীন সরকার : আমি কিন্তু একটা বইই লিখেছি, ‘বাঙালীর সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’ নামে। যেটা সত্য সেটা সর্বত্র বিদ্যমান। নানা পদ্ধতিতে সেটা বিদ্যমান থাকে। সমাজতন্ত্র হচ্ছে বৈজ্ঞানিক সত্য। কাজেই, পৃথিবীর সমস্ত দেশ, সমস্ত জাতিই সেই বৈজ্ঞানিক সত্য ধারণ করে। যদি বলেন, কীভাবে ধারণ করে? আমি বলব, সমাজতন্ত্র হচ্ছে ইতিহাসের ধারা।

একবার গোপাল হালদার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি মার্কসবাদ কার কাছে শিখেছেন? তিনি উত্তর দিলেন, রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। (হাসি) তখন বদরুদ্দীন উমরের পত্রিকায় লিখল, রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে যে মার্কসবাদ শেখে সে কেমন মার্কসবাদী বোঝা গেছে।

প্রকৃতপ্রস্তাবে, রবীন্দ্রনাথের কাছে গেলে সব পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি লিখেছেন। গীতাঞ্জলি মানে গীতের অঞ্জলি। কাকে দিয়েছেন? ঈশ্বরকে। কিন্তু ঈশ্বরকে তিনি কীভাবে দেখেছেন? গীতাঞ্জলির মধ্যেই একটি গান আছে, ‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা/সমস্ত থাক্‌ পড়ে।/রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে/কেন আছিস ওরে।/

অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে/কাহারে তুই পূজিস সংগোপনে,/নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে/দেবতা নাই ঘরে।/তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে/করছে চাষা চাষ--/পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,/খাটছে বারো মাস।/রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,/ধুলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে;/তাঁরি মতন শুচি বসন ছাড়ি/আয় রে ধুলার ’পরে।/মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি,/মুক্তি কোথায় আছে।/আপনি প্রভু সৃষ্টিবাঁধন ’পরে/বাঁধা সবার কাছে/রাখো রে ধ্যান, থাক্‌ রে ফুলের ডালি,/ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক ধুলাবালি,/কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে/ঘর্ম পড়ুক ঝরে।’

এই যে গীতের অঞ্জলি এটা কাকে দেওয়া হলো? মেহনতি মানুষকে। অর্থৎ মেহনতি মানুষের জন্যই সবকিছু। যারা মেহনত করে না, তাদের কোনোমতেই রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন না। তাঁর কবিতায় আরও পাই, নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,/ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।/শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,/শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো। অর্থাৎ ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা ভালো, এটা রবীন্দ্রনাথের কথা।

কাজেই গোপাল হালদার এমনিই বলেন নাই যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে মার্কসবাদ শিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের দিকে যদি তাকাই দেখব, তার সেই সময়ের লেখায় ঈশ্বরের কথা নাই। একবার অন্নদাশঙ্কর রায় রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কবিগুরু, আপনি কি এখন ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না?

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, দেখ আমি কবি। যা আছে, আমার কবিতার মধ্যেই আছে। (হাসি) মজার কথা হলো, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর তিন মাস আগে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, ‘সভ্যতার সংকট’, সেখানে সভ্যতার সংকট নিয়ে, ইউরোপের ধনতান্ত্রিক সভ্যতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। শেষে বলেছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে যাব।

কাজেই আমি বুঝি, মানুষের প্রতি বিশ্বাস না রেখে যারা আল্লাহ আল্লাহ করে, তারা আল্লাহর কিছুই বোঝে না। কাজেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা এটা শিখতে পারি।

যেহেতু সমাজতন্ত্র মার্কসের কোনো আবিষ্কার না, বা তৈরি কোনো বিষয় না। এটা সমস্ত জনসমাজের মধ্যেই আছে। কিন্তু বিভিন্ন জনসমাজে বিভিন্নভাবে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা বিদ্যমান আছে। বাঙালি সমাজে সমাজতন্ত্রের যে চিন্তা আমি সেগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছি।

এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্র হয় নাই কেন এরও ব্যাখ্যা আছে। কারণ ধনিক দেশগুলা সাম্রাজ্যবাদ তৈরি করছে। এই সাম্রজ্যবাদ তৈরি করে বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থসম্পদ লুণ্ঠন করে তার নিজের দেশের শ্রমিকদের জন্য কিছু সুবিধার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। তাদের দেশের শ্রমিকরা আমাদের দেশের অনেক ধনিকের চাইতেও সুখে থাকে। এ অবস্থাগুলো সাম্রাজ্যবাদের জন্য তৈরি হয়েছে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদ যুগের যে প্রগতি তাকে বলা হয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। বলা হয়, সমাজতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন আর সমাজতন্ত্র নাই। এখন সমস্য কী, কমিউনিস্টরাও মার্কস-এঙ্গেলসের প্রকৃত রচনাগুলোর সঙ্গে পরিচিত না। ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বের হলো। এইটার মধ্য থেকেই কমিউনিস্টরা সবকিছু দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু এর আগের লেখাগুলো আবিষ্কৃতই হয় নাই। পরবর্তীকালে সেগুলো বেরিয়েছে, ১৯৩০-এর পরে। ইকোনমিক্যাল ফিলোসফি ম্যানুস্ক্রিপ্ট অব ১৮৪৪ অসাধারণ বই। তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বিষয়গুলো আছে। ১৮৪১ সালে বের হলো এঙ্গেলসের জার্মান ইডিওলজি। এর মধ্যে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। আমাদের কমিউনিস্টরা পড়ে না তো কেউ। ওরা আমাদের তথাকথিত মোল্লার মতোই আর কি। জার্মান ইডিওলজিতে এঙ্গেলস পরিষ্কার বলেছেন, পৃথিবীতে দুইটা সমাজব্যবস্থা কখনও একসঙ্গে থাকতে পারে না। যতদিন পর্যন্ত ধনতন্ত্র বিদ্যমান আছে বা চলতে পারবে, ততদিন পর্যন্ত সমাজতন্ত্র হতে পারবে না। সেখানে এঙ্গেলস নিজেই প্রশ্ন করেছেন, তাহলে কি কোনো লোকাল কমিউনিজম হবে না? তিনি বলেছেন, হতে পারে। কিন্তু সেগুলো টিকে থাকতে পারবে না। পৃথিবী সামনে এগিয়ে চলে, এটা বাস্তবতা। কিন্তু সোজাসুজি যায় না, যায় ঘোরানো সিঁড়ির মতো। তাই কখনও কখনও মনে হতে পারে, এটা বুঝি পেছন দিকে ফিরে গেল। কিন্তু এই পেছন দিকে ফিরে যাওয়াটা হলো আপাতদৃষ্টিতে। কাজেই সমাজতন্ত্র হবে। সেটা কতদিনে হবে? মাও সে তুং একবার বলেছিলেন, সেটা হয়তো ২০ বছর, ২০০ বছর কিংবা ২ হাজার বছর লাগতে পারে। কিন্তু সমাজতন্ত্র, এটা হচ্ছে ইতিহাসের ধারা। ইতিহাসের ধারার বিরুদ্ধে কেউ নামতে পারে না। এটা হলো বিজ্ঞান। ইতিহাসের বিজ্ঞানটা মার্কস-এঙ্গেলস আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছেন।

আপনাকে একবার জেলেও যেতে হয়েছিল।কারণটা একটু যদি বলতেন…

যতীন সরকার : জেলে তো যায় চোরেরা (হাসি)। একবার হলো কী, জেলখানার পাশে বাচ্চারা খেলতে ছিল, সে সময় একটা নেকরার বল দেওয়ালের ওপর দিয়া ভিতরে আসে। তখন এক ছেলে দেওয়ালের উপরে উঠে ডাকা শুরু করল, ও চুর ভাইয়েরা, চুর ভাইয়েরা। আমরার বলডা দিয়া দেন।

আমি তো সব সময়ই বকবাজি করতাম। এমনিতে আমি খুব সাহসী লোক না। ভীরুই বলতে পারো। কিন্তু সভায় বক্তৃতা দিতে উঠলে সব ভীরুতা চলে যায়। তখন আমি সব কথা বলে যেতে থাকি। পাকিস্তান আমলে, সংগ্রামের সময়ও আমি সব কথা এভাবে বলতাম। এই বলার মধ্য দিয়া, খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার বিরুদ্ধে কিছু লোক খেপে গিয়েছিল।

স্বাধীনতার পর আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি নিয়া বক্তৃতা দিই। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হলেন সপরিবার, যারা ক্ষমতায় এলো তারা বঙ্গবন্ধুর অনুসারীÑ বাকশাল; তাদের নানাভাবে হ্যারেজ করা শুরু করল। আমি কলেজে মাস্টারি করি। আমাকে সবাই বলছে তোমাকে কিন্তু ধরবে। তুমি চলে যাও। আমি বললাম, আমি এখানে মাস্টারি করি। এখন কোথায়, কীভাবে যাব? আমি তো কোথাও যেতে পারব না। আমি সেভাবেই কলেজে যেতাম।

এরপর ১৯৭৬ সালের মার্চের ৩ তারিখ রাতে, হঠাৎ আমার বাসায় দরজার মধ্যে ধাক্কা... স্যার, স্যার ওঠেন, ওঠেন। এই কইয়া, দেওয়াল ডিঙ্গাইয়া কয়েকজন লোক ভিতরে চলে গেল। আমি বিছানা থেকে উঠলাম। সঙ্গে দেখলাম দুজন লোক, গামছায় মুখ বাঁধা। পুলিশ আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলল। আমি তো বুঝছিই। আমি বললাম, কাপড় পরে আসি। তারা বলল, হ্যাঁ কাপড়চোপড় পরেন। আমাকে বলে, স্যার আপনার এখানে তো বইটই আছে মেলা। আমি বললাম বই দেখতে পারেন। তখন মুখ বাঁধা ওই লোকগুলো স্যার, স্যার এই বইডা দেখেন বলে একটা বই দিছে। সে বইটা দেখে বলে ওঠে, ধুস শালা, এটাতো ব্যাকরণ বই (হাসি)।

কিন্তু পুলিশরা আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যাবহার করল।আমাকে থানায় নিয়া, লকাপে ঢুকাল। সেই সময় দারোগা বাইর হয়া আইসা বলে, না না না। ওনাকে এখানে রাখবেন কেন? উনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তখন আমাকে, রিয়াজুল ইসলাম নামে আমার এক কলিগ ছিল দুজনকে নিয়া এলো। সেখানে দেখলাম পরে জজ হইছিলেন, রশিদসহ চারজনকে নিয়া আসলেন। আমাদের থানার মধ্যেই চেয়ার দিয়া বসাইয়া দিল। পরের দিন খবর পেয়ে, সমানে লোকজন দেখা করতে আসতে লাগল। এই লোকের জন্য কত যে অসুবিধা হইছে থানার, কিন্তু তারা কিছু মনে করে নাই। তিন দিন আমাদের ওখানেই রাখল। থানার মেঝেতেই বিছানা করে দিল। আর বারবার বলতে লাগল, কোনো অসুবিধা হলে বলবেন। আমরা দেখব। মনে হলো, পুলিশরা তো আমাদের স্বাধীনতার প্রথম শহীদ। কাজেই, স্বাধীনতা এই পুলিশরার মধ্যে যে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন আনছে সেই দিন লক্ষ করলাম।

তারপর তো জেলখানায় নিয়ে গেল। একটা কম্বল বিছায়ে, আরেক কম্বল ভাঁজ করে মাথায় দিয়া শুইয়া থাকতাম। সেখানে হামিদ সাহেব, মহামান্য রাষ্ট্রপতি; উনি আর আামি পাশাপাশি বেডে থাকতাম। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন। এরকম অনেকেই ছিলেন।

সম্ভবত জেলেই আপনার লেখালেখির শুরু…

যতীন সরকার : জেলে বিভিন্ন বিষয় নিয়া আলোচনা হইত। আমি আলোচনা করতাম। সবাই বলে আপনি এত সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, তো লেখেন না কেন? আমি বলি, আমি তো লেখতে পারি না। লেখার ওপর আমার বিশ্বাস নাই। অনেকে আমাকে লেখতে বলছে, কিন্তু লেখি নাই। লেখাটা আমি কেন লেখব? আমার নিজের যদি কোনো কথা থাকে, তাহলে লিখব। আর না হলে, আমার নিজস্ব স্টাইল যদি হয়, তাহলে লিখব। তারা বলে, না লিখতে হবে। আপনি যে কথাগুলো বলেন, সেগুলো অনেক উন্নতমানের কথা, এগুলোই আপনি লেখেন। আমাকে ওরাই লিখতে বাধ্য করল। কাজেই জেলখানায় কিন্তু আমি লেখক হয়ে গেলাম।

এই সময় ফরহাদ নামে একজন ডেপুটি জেলার ওখানে এলো। ওই ভদ্রলোক গিয়েই আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে বলল, কোনো সমস্যা থাকলে বলবেন, আমি সব দেখব। পরে বুঝলাম উনি একটু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই ফরহাদ সাহেব আমার বাসায় আসত। আইসা জিনিসপত্র, খবরাখবর ইত্যাদি নিয়া যাইত। জেলের পুকুরে যে বড় বড় মাছ মারত, সেগুলো আমার স্ত্রীর কাছে দিয়ে গেছে। এইসব করত। (হাসি)

জেলখানায় আমি তো লিখতাম খাতার মধ্যে। একদিন ফরহাদ সাহেব বললেন, খাতায় যে লিখতেছেন এইগুলা তো নিয়া যাইতে পারবেন না। আইবিরা এইগুলা নিয়া গেলে আর ফেরত পাবেন না। আমি বলি, সর্বনাশ! তাহলে আমি কী করব? উনি বলেন, দেন আমার কাছে। আমি একেকটা খাতা লিখতাম, আর সেই খাতাগুলো ফরহাদ সাহেব নিয়া আমার বাড়িতে দিয়া যাইত। এই ভাবে আমি কিন্তু জেলখানায় গিয়া লেখক হইছি। তারপর সেই লেখাগুলো বাংলা একাডেমির শামসুজ্জামান খানসহ বন্ধুরা বলল, তুমি এই লেখাগুলি দাও। দুয়েকটা লেখা পত্রিকায় বাইর হওয়া শুরু হলো। একটা লেখা বের হলো সমকালে। ইসমাইল মোহম্মদ তখন তার সম্পাদক। সমকাল থেকে আমার কাছে লেখা চাইলে আমি শরৎচন্দ্রের উপরে লেখলাম। উনি চিঠি লিখে জানাল, আপনার লেখাটা এই সংখ্যায় ছাপাতে পারলাম না। কারণ, এই লেখা ফার্স্ট আর্টিকেল হিসেবে ছাপাতে হবে। এ সংখ্যায় অন্য লেখা আছে। পরের সংখ্যায় ফার্স্ট আর্টিকেল হিসেবে ছাপা হলো। তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা আসা শুরু হলো। তারা বলে, এই রকম, এত চমৎকার লেখা আমরা আগে দেখি নাই। এইগুলো বাইর করতে হবে। তারপর বলতে গেলে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শামসুজ্জামান খানেরা আমার লেখা মুক্তধারায় দিয়া দিল। সেই মুক্তধারা থেকে ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ নামে আমার প্রথম বই বের হলো। আমার বয়স তখন ৫০।

সত্যেন সেন বলতেন, আমার উপকার করছে সেই লোকটা, যে লোকটা দেশের মানুষের সবচেয়ে ক্ষতি করছে। আইয়ুব খানের আমলে ছয় বছর আমি জেলখানায় ছিলাম। যদি না জেলে যাইতাম আমার এই লেখাগুলি হইত না। আমার অত উপকার না হলেও আমাকে বলতে হবে, জিয়াউর রহমানের যে জেলখানা, সেই জেলখানায় গিয়াই আমি লেখক হইলাম।

আমার সঙ্গে সরদার জয়নুদ্দিনের খুব খাতির হয়ে গেছিল। উনি আমাকে লেখক বানায়া ফেললেন। জোর কইরা তার বই পত্রিকায় লেখাইত। ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ বাইর হওয়ার পর আমি তখন লিখতে বাধ্য হলাম। আমার নিজের লেখার ওপর বিশ্বাস ছিল না। রাত ২টা পর্যন্ত লিখতাম। লিখি আবার কাটি। একটা শব্দের জন্য আমি হয় তো এক মাস ভাবি। এভাবেই একসময় আমার মেলা বই বাইর হইয়া গেল। ৫০ বছর বয়সে আমার প্রথম বই বাইর হইল ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’, আর ৮০ বছর বয়সে আমার শেষ বই বাইর হইল ‘প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা’। আশির পরে..., রবীন্দ্রনাথকে তো আর অপমান করা যায় না। (হাসি) আমি আর লেখি নাই।

আপনি একাধারে চিন্তক, লেখক, শিক্ষক। কোন পরিচয় আপনাকে গর্বিত করে?

যতীন সরকার : আমার লেখাটেখা নিয়া অনেকে কথা বলে। আমি কিন্তু লেখক বইলা নিজেকে মনে করি না। প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতিভা বলে একটা জিনিস, যার বাষ্প মাত্র আমার মধ্যে নাই। আমি কিন্তু গর্ববোধ করি যে জিনিসটার জন্য সেটা হলো, আমি খুব ভালো মাস্টার। এবং আমি অহংকারের সঙ্গে বলি, আমার চাইতে ভালো মাস্টার বাংলাদেশে নাই। যদি এতে কেউ অহংকারী বলে, আমি মানতে দ্বিধা করব না। আমার চাইতে ভালো মাস্টার নাই।  (সমাপ্ত)

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা