হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:১৩ পিএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ২০:১৮ পিএম
গত ৯ আগস্ট সকালে উপস্থিত হয়েছিলাম রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১২ নম্বর সড়কের ১৩/১ নম্বর বাড়ির ‘দেশ আর্ট গ্যালারিতে। এখানে সমসাময়িক ৩৮ শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে চলছে প্রদর্শনী। পাশাপাশি প্রদর্শন করা হয়েছে দেশের কয়েকজন মাস্টার পেইন্টারের চিত্রকর্ম। গ্যালারি ঘুরে চিত্রকর্মগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ নজর গিয়ে পড়ল উজ্জ্বল রঙের একটি চিত্রকর্মের ওপর। ছবিটির কাছে গিয়ে দেখি সেখানে শিল্পীর স্বাক্ষর নেই। বাঁধাই করা ছবিটির নিচের আলাদা একটি কাগজে লেখাÑ শিল্পী মুর্তজা বশীর। শিল্পীর নামের নিচে লেখা ১৯৫৫ সাল। কিন্তু ছবির কোথায়ও শিল্পীর কোনো স্বাক্ষর নেই। চিরকুটের আরেক পাশে লেখাÑ ১৯৫৫ সালে অঙ্কিত ঐতিহাসিক এই ছবির বিষয়বস্তু ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন…।
এটা মনকে আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলল। চিরকুট থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে কথা বলি ছবিটির বর্তমান সংগ্রাহক সাবিনা জোহার সঙ্গে। তিনি জানান, ‘১৯৫৫ সালে শিল্পী কলকাতায় ছিলেন। তখন শিল্পী তার বন্ধু কামাল আহমেদকে চিত্রকর্মটি উপহার দিয়েছিলেন।’ কিন্তু এ ছবিটি সাবিনা জোহা কীভাবে পেলেন? এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমার ফুপা ডা. খন্দকার আলমগীর উনিশশ একাত্তর সালে নিউইয়র্কে ফিরে যাওয়ার সময় ছবিটি কামাল আহমেদ উপহার দিয়েছিলেন। তখন থেকে ছবি ফুপার কাছেই ছিল। সেই ছবিটি আমি পাই ২০০৩ সালে ফুপার আমেরিকার নিউইয়র্কের বাসায়। দেখি ফ্লোরে পড়ে নষ্ট হচ্ছিল। তখন আমি সেখান থেকে নিয়ে বাঁধাই করে রেখে দিই।’
ছবির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়, শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছবিটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনরত জনতা সেই সময় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল করেছিল রাজপথ। আমার দৃষ্টিতে এই ছবিতে শিল্পী ফুলকে নিরীহ জনতার প্রতীক হিসেবে অঙ্কন করেছেন। নির্বিচারে গুলি জনতাকে হত্যা করার রূপক হিসেবে পাতায় কালো রঙ ব্যবহার করেছে। কাঁটাতারকে ব্যবহার করেছেন প্রচণ্ড বাধার মুখেও ১৪৪ ধারা ভ্ঙ্গ করে আন্দোলনরত রক্তাক্ত এক নারীর কণ্ঠ রোধ করার দৃশ্যপট বিবেচনায় রেখে। পটভূমিতে লাল রঙকে তাজা রক্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পুরো ছবিটি একটি প্রতিবাদী শিল্প হিসেবে গণ্য করা যায়, মুর্তজা বশীরও সেই সময় যারা আহত/নিহত হয়েছিলেন তাদের নিয়ে মিছিলে যোগদান করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। তিনি একুশকে কেন্দ্র করে অনেক ছবি এঁকেছেন। সেগুলোর মধ্যে এই চিত্রকর্মটি নতুন করে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলো।’
চিত্রকর্মটির প্রেক্ষাপট বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। সূর্যমুখী এবং জনতার অদম্য প্রাণস্পৃহা ফুটে উঠেছে চিত্রকর্মটিতে। সেদিন গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন শিল্পসমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ। ঐতিহাসিক এ চিত্রকর্মটি নিয়ে তার সঙ্গে কথা হলে বলেন, ‘ফিগার দেখলে বোঝা যায় কাজটি মুর্তজা বশীরের। তিনি যেভাবে ছবি আঁকতেন, সেখানে প্রকৃতি এবং মানুষের উপস্থিতি থাকে। দেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। এটি বায়ান্ন সালের আঁকা নয়। তখন তিনি এ ধরনের ছবি আঁকতেন না। পরবর্তী সময় তিনি কোনো কারণে ভাষা শহীদ দিবস বা শহীদদের প্রতি কথা ভেবে তিনি এটা করেছেন। ভাষার জন্য যে ভালোবাসা, সেটা আসলে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে প্রকৃতি এবং মানুষের পরস্পর উপস্থিতিতে, যা উজ্জ্বল রঙের মধ্য দিয়ে। এটা হচ্ছে ছবির মূল কথা। তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছেন ফর্মের দিক থেকে, যার জন্য ফর্মটা আমরা দেখতে পাই জিওমেট্রিফিকেশন আছে। যেটাকে আমরা জ্যামিতিকীকরণ বলি। জ্যামিতিকীকরণের মধ্য দিয়ে ফর্মের বিশেষত্ব প্রকাশ পেয়েছে। লাউড কালার ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে এটি আরও বেশি উচ্চকিত হয়েছে বা প্রদীপ্ত হয়েছে।’
ওইদিনই গ্যালারি দেয়াল থেকে ছবি তুলে শিল্পীর আত্মজা মুনীরা বশীরকে দেখাই। তার সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয়।
তিনি জানালেন, ‘এই ছবি এর আগে কখনও দেখেননি। এমন কাজ বাবা করেছেন, তার মুখেও শুনিনি।’ শিল্পীকন্যা বাবার কাজের তালিকা দেখে নিশ্চিত হন, এ কাজ তার বাবা মুর্তজা বশীরের নয়। তাহলে এ ছবি কার!