আহমেদ মাওলা
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:০৬ পিএম
বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যে যারা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, নিবিড়ভাবে তাদের লেখা পড়লে বোঝা যায়; বিষয়, প্রকরণ ও ভাষা নিয়ে তারা নানা নিরীক্ষা করছেন। অনেকের লেখায় অভিনবত্বও চোখে পড়ে। বিষয়বস্তুর নানা জায়গায়ও পা ফেলেছেন। কিন্তু ভূমি ও মানুষের মনোলোকের সজীব, সপ্রাণ, ঘাম-গন্ধময় জীবন ঘনিষ্ঠতার প্রতিফলন না থাকায় তা হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হচ্ছে না। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরের দশকে রচিত গল্প-উপন্যাস যা আন্তর্জাতিক মান ও চিরায়ত সাহিত্যের কাতারে স্থান পেয়েছে, মূলত এখনও তাদের দাপটই অব্যাহত রয়েছে। এর কারণও অজানা নয়; আমরা একটা অস্থির সময় থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।
প্রাত্যহিক জীবনে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা, রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব, নগরজীবনের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনও ভালো মানের সাহিত্য রচনায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সমকালীনতার এসব সংকট ও সাহিত্য বিবেচনার নানা নিরিখ মনে রেখে আমার এই অভিমত। জীবনকে খুলে-মেলে ধরার এক অসাধারণ শিল্পকৌশল আয়ত্ত করে বুলবুল চৌধুরী কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেছেন। উপন্যাস : কহ কামিনী (১৯৯৫), পাপপুণ্যি (১৯৯৫), জলটুঙ্গি (১৯৯৫), দখিনা বাও (২০১১), ঘরবাড়ি (১৯৯৬), দম্পতি (১৯৯৭), অপরূপ বিল ঝির নদী (১৯৯৮), অচিনে আঁচড়ি (২০০৩), মরম বাখানি (২০০৭), তিয়াসের লেখন (২০১৬), এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে (২০১৫), ইতু বৌদির ঘর (২০১৪), উপন্যাস সমগ্র-১ (২০১৩)। শিশু সাহিত্য : কাজলরেখা, নিজাম ডাকাতের পালা, লাল কমল নীল কমল, গার্ড বাড়িতে পরী, গাঁও গেরামের গল্প, প্রাচীন গীতিকার গল্প। স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী : ছোট সময় বড় সময়, মানুষের মুখ, মেঘমেদুর ছেলেবেলা, আঁকিবুকি, অতলের কথকতা। সম্পাদনা : আব্দুর রউফ চৌধুরী রচনা সম্ভার, নটীবিনোদিনী রচনাবলি। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৬), জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার (২০৩), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১১) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ও সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (২০১৪) ইত্যাদি। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও বুলবুল চৌধুরীর বিষয়-ভাবনা ও অবলোকনের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। খোলা চোখে তিনি প্রবহমান জীবনকে দেখেন। জীবন দেখার ভেতর দিয়ে বুলবুল চৌধুরী ঢুকে পড়েন মানুষের অন্দর মহলে। তার উপন্যাসগুলোর শিরোনামের দিকে তাকালেই সেটা সহজে বোঝা যায়। যেমনÑ মরম বাখানি, কহ কামিনী, তিয়াসের লেখন, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে, ইতু বৌদির ঘর উপন্যাসের এমন নামকরণ থেকে বোাঝা যায় তার মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার কথা।
তিয়াসের লেখন উপন্যাসে দেখা যায়, ফাইজুদ্দিন বাঘমারের বউ ফুলটুসি চাকরি নিয়ে বিদেশে যায়। সেখানে থেকেও পুরনো প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। দেশে যখন ছিল তখনও স্বামীর অগোচরে গোপন করেছিল টমটমওয়ালা হিরণের সঙ্গে। বিদেশে গিয়েও সে ভুলতে পারে না সুন্দর আলী গায়েনের কথা। অন্যদিকে স্ত্রীর অবর্তমানে ফাইজুদ্দিন-রাফিজার গোপন বিয়ের কথা গুঞ্জন তোলে গ্রামে। টানটান উত্তেজনা নিয়ে তিয়াসের লেখন উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে যায়। উপন্যাসটির পরিণতিতে দেখা যায়, ফুলটুসি সৌদি আরব থেকে বাড়ি আসে। সুন্দর আলী গায়েন তার দোস্ত ফাইজুদ্দিনের বাড়িতে যায় ফুলটুসির খোঁজে কিন্তু পায় না, তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফাইজুদ্দিন-ফুলটুসির ছেলে ময়জুদ্দিন বলে, গায়েন কাকা, মায় তো কোনোখানে নাই। তার ফোনও বন্ধ। বাড়ি ফিরে গিয়ে গায়েন তার স্ত্রী মালার সঙ্গে নাটকের দৃশ্য দেখে হেসে কুটিকুটি হয়। স্ত্রীর নিষ্ঠুর আচরণ সয়েও সে সংসার ধর্ম পালন করছে। প্রতিবাদ করলে স্ত্রীর কোপানলে পড়তে হয়, তার চুপচাপ থাকে। ফোন বেজে ওঠে, সুন্দর আলী গায়েন শুনতে পায় ফুলটুসির কণ্ঠস্বরÑ ‘আমি এমন দূরে আছি যে আমাগো সাক্ষাৎ পাওন দায়। এটাই ফোনে দুজনের শেষ আলাপ।’
‘শোনেন, আমার নামে আপনের দোস্ত যা কইছে সব হাছা,
সৌদি যাওনের আগে আমি নয়া জামাই লইছিলাম।
ক্যাডা তোমার হেই মানুষ?
কী লাভ তার পরিচয় জাই না?
তুমি এ রকম বদলাইয়া গেলা?
...আপনি ভালোবাসেন মালারে। আমি কিন্তুক হেমুন বহুত বেশি পাইতাম চাইছিলাম আপনেরে।
হ, আপনেরে না পাওনের দুঃখই আমি এমুন ছিডালি-বিডালিতে পড়ছি।... আমি কূলহারা কলংকিনি, আমারে কেউ ছুঁইয়ো...,
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ জাগরূক। তার বুকে অনিবার্য প্রয়োজনে নতুন পথ খুঁজে নেয়। চাঁদের কলঙ্কের মানুষের জীবনের কলঙ্কের প্রতীকায়ন খুবই চমৎকার।
মরম বাখানি উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে একটা জুটমিল এলাকার কাহিনী। পাত্রপাত্রী-দাও মুন্সি, আমিন মিয়া, ফিরোজা বেগম, রাইসু, খুদু মোল্লা, গোপাল। দাও মুন্সী মসজিদের ইমাম, কাহিনী দেখা যায় সে শয়তান খুদু মোল্লাকে খুন করে। ছয়ফুরা খানম তখন নেজাম ডাকাতের কথা বলতে থাকে। অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরোজা ফোন করে তোরাবকে বলেÑ ‘জানবাইন, আপনের সন্তান জায়গা লইছে আমার ফেটে।’ বুলবুল চৌধুরীর উপন্যাসের কাহিনী এভাবে আমাদের চেনা জগৎকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
ইতু বৌদির ঘর উপন্যাসের কাহিনী আমাদেরকে আরও নাটকীয় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাসে দেখা যায় আবু রায়হান ওমর দেশভাগের পর বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসে লক্ষ্মীবাজারে বসতি গড়ে। ‘সেনা নিবাসে’র অন্দরে নিরাভরণ সুন্দরী তরুণী অতসীর জন্য আবু রায়হানের মনে গভীর ভালোবাসা জন্মিলেও পরিণত হয় খুব করুণ। অন্যদিকে অতসীর ভাই দেবাশীষ শাঁখারী বাজারের মেয়ে মিতুয়ারিকে ভালোবেসে বিয়ের মন্ত্র পড়তে বসে দেখে ও যে তার যমজ বোন ইতুয়ারি। লেখক যেন আত্মসত্তায় কথা বলে ওঠেনÑ ‘বৌদি হেসে অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিল, বুলবুলদা, তখন আমি তোমাকে চিনব কী করে? দেখবে হাতে কালো গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে প্রেমিকা চিনবে সহজে।’
না, ইতু বৌদি তাকে চেনেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর পথ চলতে মতিঝিলে ইতু বৌদির সাক্ষাৎ পেয়ে ছুটে গিয়ে জানতে চাইলেন বুলবুল চৌধুরীÑ ‘বৌদি তুমি! কেমন আছ? আমি বুলবুল চৌধুরী, তোমার বুলবুলদা, ভুলে গেছ? কোনো জবাব না দিয়ে নির্বিকার হেঁটে চলল ইতুয়ারি দাস।’
পরিচিত ভূগোলকে এভাবে পাল্টে দেন বুলবুল চৌধুরী। তার উপন্যাসের কাহিনী মানে ভিন্ন ভূগোলে পরিভ্রমণ। তিনি আমাদের নিয়ে যান চেনা জগতের ভেতর অচেনা গলির অন্দরমহলে। এভাবে জীবনকে খুলে-মেলে দেখানোর আশ্চর্য শিল্পকৌশল রপ্ত করেছেন তিনি। বুলবুল চৌধুরীর বিচিত্র অভিজ্ঞতার আরেকটি ফসল এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে উপন্যাসটি। প্রতিবেশী আমিনুল হক থেকে তিনি জানতে পারেন, দৌলদিয়া বেশ্যালয়ে লক্ষ্মী নামে একজন আছে। সে পুরুষকে সুখ দিতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের খবর হচ্ছে, তার ঘরের দুয়ারে আলতা দিয়ে লেখা ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’। প্রেম নয়, পয়সার বিনিময়ে পতিতারা দেহ দেয়। কখনও কোনো খদ্দেরকে পছন্দ হয়ে গেলে বেশ্যারা নিজেকে উজাড় করে ঢেলে দিয়ে সুখ ছড়াতে পারে। এতে চমকিত হওয়ার মতো কিছু নেই। বুলবুল চৌধুরী কাহিনীটা বর্ণনা করেন অতিসূক্ষ্ন শিল্প দক্ষতায়। কৈশোরে একটি মেয়ে হারিয়ে যায়। তাকে নিশিপুর রেলস্টেশনে কান্নারত অবস্থায় খুঁজে পায় খিলগাঁও সরকারি স্কুলের মাস্টার হিতেশ আচার্য। স্ত্রী যশোদার কোলে তুলে দিয়ে বলেছিল এ আমার কুড়িয়ে পাওয়া লক্ষ্মী। হিতেশ বাবুর মেয়ে কৃত্তিকা দেবী, মিনতা দেবী, পুত্র ধীমান আচার্যর সঙ্গে লক্ষ্মীও অপাত্যস্নেহে বিলনা গ্রামে বেড়ে ওঠে। তারপর মৃত্তিকা দেবী ঢাকা গিয়ে লেখাপড়া করা, মিনতা দেবী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে শশীকলা ঘোষকে বিয়ে করা, ধীমান আচার্য আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে কাজরীকে বিয়ে করা, মা যশোদার অসুস্থতা, হিতেশ আচার্যও বয়োভারে ন্যুব্জ। বাধ্য হয়ে বিএ পড়াকালীন বিভাষ আচার্যের সঙ্গে লক্ষ্মীর বিয়ে এবং সংসার ভেঙে গিয়ে বিপথে নামা। কৈশোরে যে মেয়ে যশোদার শুচিতার মধ্যে বড় হয়েছে, যৌবনে তাকে হতে হয় পতিতাপল্লীর বাসিন্দা। গভীর মমতা দিয়ে লক্ষ্মী নামের মেয়েটির অন্তর্দহন, মর্মযাতনার চিত্রিত করেছেন বুলবুল চৌধুরী। লক্ষ্মীর হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলা আগুন কেবল লক্ষ্মীকে পোড়ায় না পাঠকের হৃদয়কেও দগ্ধ করে। পড়তে গেলে মনে হয়, এ কোনো পতিতা মেয়ের কাহিনী নয়, হৃদয় খুঁড়ে জাগানো বেদনা। বুলবুল চৌধুরীর রচনাশৈলী এখানে অত্যন্ত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচয়বাহী।