বুলবুল চৌধুরী
ধ্রুব এষ
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৯ এএম
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৫১ পিএম
বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে লেখক
আবদুর রব বা রউফ চৌধুরী।
ডাকনাম বুলবুল।
নিকটজনদের অনেকে ডাকতেন ‘বুলু’।
কবি আবুল হাসান ডাকতেন ‘বুলবুল’।
লেখক হিসেবে যখন আত্মপ্রকাশ করলেন, বুলবুল চৌধুরী নাম নিলেন। তা না। লিটলম্যাগ ‘সবাক’ সম্পাদনা করতেন। হাতে লিখে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে সেই পত্রিকা মুদ্রিত হতো। আমি একটা সংখ্যা দেখেছি। সম্পাদক : সুজীবিত বুলবুল। সম্পাদকের ছোটগল্প ছিল সেই সংখ্যায়Ñ ‘জোনাকি ও সন্নিকট।’Ñ ‘টুকা কাহিনী’র বুলবুল চৌধুরী সন্তর্পণে আত্মগোপন করে ছিলেন সেই গল্পে।
‘আপনার প্রথম ছাপা গল্প কোনটা বুলবুল ভাই?’
‘ওই তো মিয়া, জোনাকি ও সন্নিকট।’
‘এর আগে আর গল্প লিখেন নাই?’
‘না রে মিয়া।’
‘কবিতা লিখছেন?’
‘লিখছি মিয়া। হাসান সেই কবিতার শিরোনাম দিয়া দিছিল।Ñ প্রাকৃত কবিতা।’
হাসান মানে কবি আবুল হাসান। শীর্ষ বন্ধু তরুণ বুলবুল চৌধুরীর। আর বন্ধু কায়েস আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, গাজী আজিজুর রহমান, মাকিদ হায়দার এরা। কিছু পরে মাহবুব কামরান, আবু সাঈদ জুবেরী, শেখ আবদুল হাকিম, অলক বারী এরা।
‘একটাই কবিতা। আর লেখেন নাই?’
‘কবিতা হাসানের জিনিস রে মিয়া। আমারে দিয়া এইতান হওয়ার না বুঝলাম।’
‘গল্প লিখলেন?’
‘গল্প। হ। কায়েসরে দেখলাম গল্প লেখে, আমিও গল্প লেখা ধরলাম।’
‘টুকা কাহিনী লিখলেন?’
‘টুকারে আমি দেখছি। কুইচ্চার সালন রান্না করে খাইতে দেখছি।’
প্রচুর আনালে বিনালে ঘুরতেন বুলবুল ভাই। বলতেন মানুষের মুখ দেখেন।
‘হারিক্যান নিয়া দেখেন।’
‘ক্যান মিয়া?’
‘ডায়োজেনেস দিনে হারিক্যান জ্বালিয়ে মানুষের মুখ দেখতেন। বলতেন মানুষের মুখ খুঁজছেন।’
‘হেয় দেখি আমার মতো রে মিয়া।’
অবশ্যই।
ছিপছিপে নর্তকের মতো শরীর। চিরকালের প্রেমিক চরিত্র বুলবুল ভাই। আড়াই-তিন হাজার প্রেমে পড়েছেন জীবনে। সে কি প্রেম। আমার ‘দেখা’ একটা প্রেমের গল্প বলি।Ñ বুলবুল ভাই কিছুদিন ধরেই বলছিলেন, ‘খালায় তো আমারে চোখে হারায় মিয়া।’
বুলবুল ভাইয়ের খালা চাচি ফুফুর অভাব নাই পুরান ঢাকার অলিগলিতে। যে খালা তাকে চোখে হারায়, গেন্ডারিয়ার মাদক সম্রাজ্ঞী সে। রাতারগুলে আছে জলঅরণ্য, গেন্ডারিয়া রেললাইনের ধারে আছে জলবস্তি। পানির ওপর মানুষের ঘরদোর। খালা সেই একটা ঘরের বাসিন্দা। জলবস্তির মালিক দুলাল ভাই বিশেষ সমীহ করেন বুলবুল ভাইকে। দুলাল ভাইয়ের ডেরা গেন্ডারিয়া রেল ক্রসিংয়ের ধারে। দুলাল ভাইয়ের দরবারে গেছি এক দিন। দরবার সেরে বুলবুল ভাই বললেন, ‘ট্যাকা আছে মিয়া পকেটে? জিনিস নিয়া যাই।’
‘ট্যাকা’ আছে। রেললাইন ধরে কিছুদূর হেঁটে ডানদিকে নেমে জলবস্তির অন্তর্গত হলাম। বাঁশের সাঁকো ভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা। বুলবুল ভাই তার খালার ঘরে ঢুকলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। বাঁশের ঘর, টিনের চালা। ছয়জন বুড়া-সুড়া মানুষকে দেখলাম। তারা নিষিদ্ধ ধোঁয়াসঙ্গ করছেন। অতি কালো অতিকায়া এক মানবী বসে আছে নিকটে। পঞ্চাশ-বায়ান্নর কম হবে না বয়স। প্রসন্ন হলো সে বুলবুল ভাইকে দেখে, ‘লেখক সায়েব।’
বুলবুল ভাই উতরোল হলেন, ‘জি খালা! জি খালা! খালা, এই আমার বন্ধু। আর্টিস্ট। পাগলা।’
আমি আদাব দিলাম খালাকে।
‘আদাব।’
‘আদাব। বসেন।... সঙ্গ নেবেন এগো?’
দশ টাকা সেলামি দিয়ে আমরা সঙ্গ নিলাম বুড়া-সুড়াদের।
খালা দুধ চা আনিয়ে খাওয়াল।
বুলবুল ভাই বললেন, ‘ট্যাকা দেন মিয়া।’
একশ টাকার একটা নোট দিলাম।
বুলবুল ভাই বললেন, ‘জিনিস দেন খালা।’
‘কয়টা দিমু?’
‘পাঁচটা। পাঁচটাই দেন গো।’
খালা জিনিস দিল। টাকা নিল।
সাঁকো পার হয়ে আবার রেললাইনে আমরা। আশ্চর্য ছিল সেই বিকাল। দিন তারিখ মাস মনে নাই। অল্প রোদ ছিল, হাওয়া দিচ্ছিল। বুলবুল ভাইয়ের লম্বা সোনালি চুল উড়ছিল হাওয়ায়। আবেগের কোন পর্যায়ে আছেন মানুষটা, আমি বুঝে উঠতে পারি নাই। বললেন, ‘দেখেছেন ধ্রুব?’
‘কী বুলবুল ভাই?’
বুলবুল ভাই প্রমিত বাংলায় চমৎকার কথা বলেন। তবে সেটা সময় বিশেষে। মঞ্চ, টেলিভিশন হলে বলেন। আনন্দ আবেগে মথিত হলে বলেন।
‘খালা কি করল দেখেননি?’
‘কী করছে?’
‘ছল করে ছুঁয়ে দিল, ধ্রুব।’
ওরররে! জিনিস যখন নিলেন অতিকায়া মানবীর হাত তার হাতে লেগেছে ফ্রাকশন অব আ সেকেন্ডের জন্য, অধিক আবেগে মথিত হয়ে গেছেন তাতে। চমকে উঠে রেললাইনের স্লিপারে আমার পা আটকে গেল। ভালো যে রেললাইনে কাউক্যাচার নাই, কাউক্যাচারে পা আটকায় নাই।Ñ এত প্রেম!
বুলবুল ভাইয়ের জন্ম দেশভাগের পরের বছর। ১৬ আগস্ট।
‘১৬ আগস্ট না ১৫ আগস্ট? কামরান ভাই তো আমারে বলেছে দেশভাগের দায় নিতে চান না বলে আপনি জন্মের তারিখ চেঞ্জ করে ফেলছেন!’
‘কামরান! ওইটা তো বদ মিয়া। হাছা কথা কয় না।’
হাছা কথা কোনটা?
১৬ আগস্ট, ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন বুলবুল চৌধুরী। ৭৭তম জন্মদিন এ বছর। আমরা তার জন্মদিন পালন করি। নিজেদের গণ্ডিতে। পোস্টার বানাই, ধোঁয়ার অন্তর্গত থাকি। চার বছর আগে ২০২১-এ বুলবুল ভাইয়ের বয়স তেয়াত্তরে ফিক্সড হয়ে গেছে। চিরকাল তেয়াত্তর থাকবে। তবে ‘বাহাত্তরে বুড়ো’ কোনো দিনই বুলবুল ভাইকে বলা যাবে না। বুলবুল ভাই কখনোই তা হন নাই। এই যে;
দাঁড়িয়ে আছেন
অথবা হাঁটছেন
পুরনো গল্পের শব্দ কাটছেন
ধোঁয়ার অন্তর্গত মানুষ
ধোঁয়ার অন্তর্গত...।
শুভ জন্মদিন, ধোঁয়ার অন্তর্গত মানুষ।Ñ আসেন বুলবুল ভাই, বসি। রোদে বসে থাকি।