ইকরাম কবীর
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ২১:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
চিত্রকর্ম : দেবদাস চক্রবর্তী
আমার পিতামহকে আমি কখনও দেখিনি। তিনি এই পার্থিব জীবন ছেড়ে এগিয়ে অন্য এক ভুবনে যখন গেছেন তখন আমার পিতাই ছিলেন তিন বছরের শিশু। তিনি নিজেও তার পিতাকে ঠিকমতো দেখেননি। পিতামহকে নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল অগাধ। তাকে নিয়ে যেসব ইতিহাস-মিশ্রিত গল্প আমি আমার চাচাদের কাছ থেকে শুনেছিলাম, তা নিয়ে দিনের অনেকটা সময় তাকে কল্পনা করে ব্যয় করতাম। যখন আমি বেশ বড়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, একদিন আমার পিতা শহরের বাইরে যাচ্ছেন এবং যাওয়ার সময় তিনি আমাকে ‘খোদা হাফেজ’ বলে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। আমি কাছে গিয়ে, তার পিঠ চাপড়ে বললাম-‘সাবধানে যেও বাবা’। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিল আমার পিতামহ আমার ওপরে ভর করেছেন এবং তিনি তার পুত্রের মঙ্গল কামনা করছেন। আমি আমার পিতার পিতা। আমার পিতাও আমার ব্যবহারে বেশ অবাক হয়েছিলেন। পরে জিজ্ঞেস করেছিলেন কিন্তু আমি আর তা ব্যাখ্যা করিনি।
একজন মৃত মানুষ কি একজন জীবিত মানুষের মানসে ভর করতে পারে? যৌক্তিক ভাবে, পারে না। আমি কি তাহলে অযৌক্তিক কিছু ভাবছিলাম? নাকি আমি যা ভাবছিলাম, যা চাইছিলাম, আমার মস্তিষ্ক ঠিক সেভাবেই কাজ করেছে? গ্রামগঞ্জে ব্যাপারটাকে অলৌকিক বলবে, অকাল্ট বলবে, গুপ্ত কোনো জ্ঞান বলে মনে করবে।
গুপ্ত জ্ঞান আসলে কী? অকাল্ট অর্থ কী? কিছু না কিছু তো আছে, যা আমরা জানি না। আমার মনে হয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে সাধারণ চোখে যা দেখা যায় না, কিন্তু বোঝা যায় এবং বিশ্বাস করা যায় এমন কিছু চিন্তা এবং ঘটনাকেই অকাল্ট বলা যেতে পারে। আমাদের জীবনে অনেক অলৌকিকতা থাকে, যা জীবনযাপনের সঙ্গে মিশে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করে। এটা কি তাহলে জাদু? আমরা যখন ‘অকাল্ট’ শব্দটা শুনি, তখন অনেক সময় আমাদের মনে ভেসে ওঠে গোপন কোনো আচার-অনুষ্ঠান, গোপন সংগঠন অথবা নিষিদ্ধ কোনো জ্ঞানের কথা। কিন্তু অকাল্ট কি আমাদের আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ভেতর নীরবে মিশে নেই? ‘অকাল্ট’ শব্দের সহজ অর্থ হলো ‘লুকোনো’ বা যা ‘সাধারণ চোখে দেখা যায় না’। এমন করে দেখলে, অকাল্ট অলৌকিক কিছু নয়; এ সেই অদৃশ্য শক্তিগুলোÑ যেমন আমাদের অনুভূতি বা কাকতালীয় কোনো ঘটনা বা অজানা কোনো সংযোগÑ যা আমাদের জীবনকে নাড়া দেয় এবং জীবনকে জীবনের রূপ দেয়।
এবার কয়েকজন বড় লেখকের লেখার গল্প বলি।
আমি প্রথম অকাল্ট শব্দের অর্থ জেনেছিলাম ইংল্যান্ডের দার্শনিক কলিন উইলসনের বই ‘দ্য অকাল্ট’ বইটা কিছুটা পড়ে। তিনি মানবের অজানা ও না-জানা শক্তি ও তার গভীর সম্ভাবনার কথা বিস্তারিত বলেছেন তার এই বইতে। তিনি বলেছেন, আমাদের মনের কিছু স্তর আছে যেমনÑ স্বপ্ন, টেলিপ্যাথি, অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন বা আমরা যাকে ফ্যাকাল্টি এক্স বলে জানি। এগুলোকে প্রাচীন কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে তবে উইলসন এগুলোকে তা বলেননি, বরং ভবিষ্যতের বিজ্ঞান বলেছেন। তার মতে, জাদু বা অলৌকিকতায় আচ্ছাদিত দিকগুলোই হতে পারে মানবের উপলব্ধির পরের স্তর। তিনি লিখেছেনÑ ‘ম্যাজিক ইজ দ্য সায়েন্স অব দ্য ফিউচার’। বলেছেন, আমাদের মস্তিষ্কের এমন সক্ষমতাগুলো এখনও প্রমাণিত নয়, তবে অনুশীলন এবং সচেতন চেষ্টায় তা অর্জন করার মতো শক্তি আমাদের রয়েছে। এই ফ্যাকাল্টি এক্স-এর মাধ্যমে আমাদের অন্তর্মনের গভীর স্তর উন্মোচিত হতে পারে, যেখানে বোধগম্যতা ও অন্তর্দৃষ্টির সমন্বয়ে একটা নতুন চেতনার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা বাস্তবতায় রূপ নেয়।
আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যায় যেগুলো একেবারে কাকতালীয় মনে হয় না। ঘটনাগুলোর মধ্যে এমনই যোগসাজশ থাকে যে আমরা অলৌকিকতায় বিশ্বাস করা শুরু করি। ধরুন, অনেক বছর কথা হয় না, দেখা হয় না, এমন এক বন্ধুর কথা আপনি ভাবছেন, সেই বন্ধু ঠিক তখনই আপনাকে ফোন করে বসলেন। এটা তাহলে কী? টেলিপ্যাথি? টেলিপ্যাথি কি অলৌকিক নয়?
আমার মায়ের জীবনের শেষ দিনগুলোর এক ঘটনার কথা বলি। মা ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক বিছানায় শুয়ে তার আগুনে পোড়া দেহ নিয়ে কাতরাচ্ছেন। তিনি অনেকবার আমাদের মেজো খালার সেজো ছেলে স্বার্থহীন ভাইয়ের কথা বললেন। তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। জানতে চাইলেনÑ ‘শাহীন কোথায়, কখন আসবে?’ আমরা যেন তাকে আসতে বলি। ঠিক তার আধাঘণ্টা পরই শাহীন ভাই দরজা ঠেলে কেবিনের ভেতরে ঢুকলেন। শাহীন ভাই বসবাস করেন সেই সুইডেনে।
এই ঘটনাকে আমরা কী বলে আখ্যায়িত করব?
আবার ধরুন, আপনি বারবার একই স্বপ্ন দেখছেন এবং সেই স্বপ্নের কথা মনে করে কোনো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুচ্ছেন। এমন আমাদের অনেকের জীবনেই ঘটে। এগুলো কি কোনো অদৃশ্য শক্তি, যা আমরা বুঝি না তার প্রভাব হতে পারে? মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইউং এমন পরিস্থিতিকে বলেছিলেন সিংক্রনিসিটি বা অর্থবহ কাকতালীয় ঘটনা, যার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু এগুলোকে উপেক্ষাও করা যায় না। তিনি বলেছেন, অকাল্ট শুধু সামান্য রহস্য নয় বরং এটা আমাদের মনের গভীরে কাকতালীয় ঘটনাগুলোতে লুকিয়ে থাকে।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটুড’ আমরা অনেকেই পড়েছি। এই উপন্যাসে আমরা এমন এক জগৎ দেখতে পাই যেখানে অলৌকিক আর সাধারণ জীবনযাপন একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার। একজন নারী কাপড় মেলতে মেলতেই আকাশে উড়ে যায়, একটা গ্রামের সব মানুষ একসঙ্গে নিদ্রাহীনতায় ভোগে এবং মৃত মানুষের আত্মারা জীবিত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। মার্কেজ এগুলোকে আশ্চর্যজনক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখান না; বরং এগুলোই মেকোন্দো গ্রামের মানুষের প্রতিদিনের জীবন। আমার মনে হয়, জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে আমাদের জীবন অনেক অলৌকিকতায় ভরা, যেগুলো আমরা এখনও বুঝতে শিখিনি।
অকাল্ট শুধু আমাদের দৈনিক জীবনযাপনে নয়, আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বোঝা যায়। আমাদের ভালোবাসা এক ধরনের অলৌকিক অনুভূতি বলেই আমার মনে হয়। আমরা কেন কিছু মানুষকে খুব আপন মনে করি, আর কিছু মানুষ আমাদের কাছে আজীবন অপরিচিতই রয়ে যায়? এ কি শুধুই আমাদের শরীরের রাসায়নিক কোনো ক্রিয়া বা কাকতালীয় ঘটনা? নাকি এর কোথাও লুকিয়ে আছে অদৃশ্য কোনো তরঙ্গের টান, যা দুই আত্মাকে কাছে আনে? লেখক-দার্শনিক পাওলো কোয়াইলো তার ‘দ্য আলকেমিস্ট’ উপন্যাসে এই ভাবনাটি তুলে ধরেছেন এক বৈশ্বিক যোগাযোগের ভাষা হিসেবে। এ এক নীরব ভাষা যা কথা দিয়ে বোঝানো যায় না, যুক্তি দিয়েও নয়, যা নিজের দেশের সীমানার বাইরেও কাজ করে। এই উপন্যাসে সান্তিয়াগো স্বপ্ন, বোধ আর পূর্বাভাস অনুসরণ করে তার ভাগ্যের খোঁজে এগিয়ে যায়। কোয়াইলো আমাদের মনে করিয়ে দেন যদি আমরা মন দিয়ে শুনি তাহলে পুরো মহাবিশ্বের কথা শোনা যায়। বুদ্ধ যেমনটা ওম শব্দটা শুনেছিলেন। আমার কাছেও তাই-ই মনে হয়। এও এক ধরনের লুকানো জ্ঞান, যা নিজের প্রবৃত্তির মাধ্যমে এবং অদৃশ্য শক্তির সাহায্যে জীবনকে যাপন করা যায়।
আমাদের শোকও এক ধরনের অলৌকিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। লেখক জোয়ান ডিডিয়ন তার ‘দ্য ইয়ার অব ম্যাজিক্যাল থিংকিং’ বইতে লিখেছেন কীভাবে আমরা প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিতে চাই না এবং মনে মনে বিশ্বাস করতে চাই যে যদি কোনোভাবে কোনো কিছু যদি অন্যরকমভাবে করা যেত তাহলে হয়তো মৃত মানুষটা আবার ফিরে আসত। যদিও এই ধারণা বা বিশ্বাস একেবারেই যুক্তিহীন তবুও এই চিন্তা আমাদের মনের গভীর থেকে আসে। শোকের সময় জীবন আর মৃত্যুর মধ্যকার দেয়াল খুব পাতলা হয়ে যায়। তখন অদৃশ্য কোনো অনুভূতিÑ স্মৃতি, শূন্যতা, হারানোর বেদনা মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়ায়। শোক আমাদের মনকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় যখন আমরা অকাল্টে বিশ্বাস করা শুরু করি এবং তখন কোনো প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না।
শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকে যুবরাজ হ্যামলেট তার মৃত পিতাকে দেখতে পায় এবং আমরা দর্শকরা তাকে বিশ্বাস করি এবং আমরা আমাদের পিতামাতার কথা ভাবতে শুরু করি। হ্যামলেট নিজেও বিশ্বাস করে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উতলা হয়। নাটকের কয়েকটা চরিত্র তাকে পাগল মনে করে। কিন্তু আমরা যারা দর্শক তারা কী এই নাটক দেখতে দেখতে বা পড়তে পড়তে চাই না যে হ্যামলেট তার প্রতিশোধে সার্থক হোক? অনেকাই চাই।
এদিকে, হুমায়ূন আহমেদের হিমু তার মৃত পিতার সঙ্গে একটা যোগ খুঁজে পায় এবং তার কাছে মনে হয় পিতা তাকে ওপার থেকে নির্দেশনা দিচ্ছেন বা পথপ্রদর্শন করছেন যা হিমুর জীবনযাপনে সাহায্য করে। হিমুকে মাঝে মাঝে অস্তিত্ববাদী মনে হয়, সে দোয়া-প্রার্থনায় বিশ্বাস করে না কিন্তু অলৌকিকতার বোধ তার মধ্যে আছে এবং তা সে নিজের জীবনযাপনে প্রয়োগ করে।
হিমু দোয়া-প্রার্থনায় বিশ্বাস করে না, কিন্তু আমরা অনেকেই করি। অনেকেই পীর-ফকির-জ্যোতিষীর কাছে যাই, সৌভাগ্যের আংটি, পড়া পানি, তাবিজ ব্যবহার করি। বিজ্ঞানে অতি-বিশ্বাস করেন এমন অনেকেই এগুলোকে কোনো কুসংস্কার বলে ভর্ৎসনা করেন কিন্তু আমার মনে হয় এগুলো আমাদের নিজেদের অজানা জগৎ ছোঁয়ার এক অদম্য ইচ্ছার প্রকাশ। আমরা সেগুলোকে এলোমেলো, যুক্তিহীন বা কাকতালীয় মনে করি, কিন্তু তার মধ্যেও একটা অর্থ খুঁজে নিতে চাই। আরেকটা অভিজ্ঞতার গল্প বলে আজ শেষ করি।
অনেক বছর আগে, আমি অজীৎ নামে এক ক্ষৌরকারের কাছে চুল কাটাতে যেতাম। অনেক বছর তার কাছেই কাটিয়েছি। একবার অজীতের ছোট্ট সন্তানের খুব অসুখ করল। ডাক্তারদের কাছে দৌড়াদৌড়ি করে তেমন কিছুই হলো না। সে সিদ্ধান্ত নিল মুন্সীগঞ্জের পীরের কাছে যাবে। সেখানে সবাই পানি পড়া এনে সুস্থ হয়ে যায়। অজীৎ সেখানে গেল।
সে আমায় যখন এই কথা জানাচ্ছিল, তখন আমি জানতে চাইলামÑ ‘সেখানে গিয়ে কী দেখলে? কী করলে?’
অজীৎ উত্তর দিলÑ ‘দাদা, কাছে যেতে পারিনি; অনেক মানুষের ভিড়; আমরা বাইরে ছিলাম; উনি মাইকে ফুঁ দিয়েছেন; আমি জলের বোতলের মুখ মাইকের দিকে তাক করে রেখে দোয়া নিয়ে এসেছি।’
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম…
অজীৎ আমার চোখে অবিশ্বাস দেখতে পায়। বলেÑ ‘দাদা, বিশ্বাস করুন, মাইক থেকে আসা ফুঁ-এর বাতাস আমার গায়ে লেগেছে; আমি বুঝতে পেরেছি আর সেই জল খেয়ে আমার ছেলে ভালো হয়ে গিয়েছে।’
এই হলো অলৌকিকতায় মানুষের বিশ্বাস। আমার মনে হয়, আমরা যখন বিশ্বাস করেই ফেলি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোতে একটা পরিবর্তন ঘটে এবং যা ঘটছে না তাই-ই আমরা ঘটছে বলে মেনে নেই। কিংবা যা ঘটছে না, তাই-ই ঘটে।