হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০২ পিএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১৯:০২ পিএম
রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গতকাল মনিজা রহমানের কাব্যগ্রন্থ ও গল্পগন্থ বই দুটির পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠানে কথা বলছেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার
গত ৩ আগস্ট রবিবার। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। দিনভর ছিল মেঘ, বৃষ্টি আর রোদ্দুরের খেলা। এরই মধ্যে রাজধানীতে ছিল দুটি রাজনৈতিক দলের সভা। ঠিক এ কারণেই মনের ভেতর ভর করছিল শঙ্কা। ঠিক মতো কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে পারব তো! কেননা সন্ধ্যায় ৬টায় বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে রয়েছে মনিজা রহমানের দুটি গ্রন্থের পাঠ আলোচনা। সব সংশয় উড়িয়ে দিলো যেন শ্রাবণের উড়ো মেঘ। বোধহয় কোনো এক দৈবশক্তির বলে পৌঁছে গেলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৫০৫ নম্বর কক্ষে। এই হল ঘরটিতেই শুরু হবে পাঠসভা। নির্ধারিত সময়ের আগে উপস্থিত হয়ে লেখক মনিজা রহমান সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানা হয়ে গেল। দূর প্রবাসিনী এই লেখক বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়া প্রতিবেদক। তার সাংবাদিকতার শুরুর দিনের সহকর্মী, সতীর্থ লেখকের উপস্থিতিতে তত সময়ে কক্ষ হয়ে উঠল মনিজাময়। চলল দারুণ এক আড্ডা। পুরনো দিনের বন্ধুদের নিয়ে স্মৃতিচারণ। অপূর্ব এক আবেগঘন মুহূর্ত।
এরই মধ্যে আয়োজক জলধি প্রকাশনার প্রকাশক নাহিদা আশরাফী শুরু করলেন অনুষ্ঠান। তার প্রকাশনা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে মনিজা রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘অফেরতযোগ্য দীর্ঘশ্বাস’ ও গল্পগ্রন্থ ‘এক পশলা বৃষ্টি কেনার আগে’ বই দুটি। এই পাঠ আলোচনা সভার ব্যানারে সভাপ্রধান, আলোচক কারোই নাম উল্লেখ ছিল না। তাই উপস্থিতির মধ্য থেকে তাৎক্ষণিক মঞ্চে বসার জন্য অনুরোধ জানানো হয় সত্তর দশকের গল্পকার সিরাজুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ, ফিরোজ আহমেদ বাবুসহ মনিজা রহমানকে।
মনিজা রহমানের কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে এই হয় পাঠ উৎসব। কবিতাটি আবৃত্তি করেন শিরীন আক্তার। লাবণী মণ্ডল কথা বলেন গল্প নিয়ে। লেখক সাংবাদিক শান্তা মারিয়া স্মৃতিচারণ করেন মনিজা রহমানকে নিয়ে। তার কথায় উঠে আসে মনিজা রহমানের বেড়ে উঠার গল্প। ক্রীড়া সংগঠক আনি রহমান বলেন, ‘আমরা যারা সাধারণ মানুষ। তাদের চোখ দুটি। আর যারা লেখালেখি করেন তাদের চোখ তিনটি। লেখকের অন্তর বা মন হলো তৃতীয় চোখ। মনিজা রহমান তৃতীয় চোখ দিয়েই সমাজকে দেখেন। সমাজের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। মনিজা রহমানের লেখালিখির জগৎ নিয়ে কথা বলেন, কবি মতিন রায়হান। তার সরস আলোচনায় হলঘর আনন্দ আর উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
গল্পগ্রন্থ থেকে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার। তিনি বলেন, মনিজা রহমানের অধিকাংশ গল্পেই মানুষের গল্প। যে মানুষগুলো হেরে যেতে যেতে আবার বিজয় লাভ করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তার গল্পের মানচিত্রজুড়ে রয়েছে পুরান ঢাকার মানচিত্র। মনিজা সেই গল্পকার, যিনি পাঠকের হৃদয়ে সংবেদ রচনা করতে জানেন।’
এই ব্ক্তার পাঠ আলোচনা শেষে কথা বলেন, ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া। তিনি কবিতা নিয়ে আলোচনায় বলেন ‘এই বইয়ে যে কথাগুলো বলতে পারেনি সেটিই মূলত কবিতা।’
গল্পকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘লেখকের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণতির দিকে যায়। আমি অনুজ লেখক মনিজাকে অনুরোধ করব, সামনে তিনি উপন্যাস লেখায় হাত দেবেন।’ ফিরোজ আহমেদ বাবু বলেন, ‘মনিজা রহমানের কবিতা মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে সংযোগ ঘটায়।’
শুভেচ্ছা জানান, মনির হায়দার, আশিষ-উর রহমান শুভ, আলোকচিত্রী আক্কাস মাহমুদসহ অনেকেই।
অনুভূতি ব্যক্ত করছেন মনিজা রহমান
মনিজা রহমান নিজের অনুভূতি প্রকাশের সময় বলেন ‘স্রোতের বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে আমাকে কতটুকু সংগ্রাম করতে হয়েছে, তা শুধু আমিই জানি। যে সময় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে পেশা শুরু করেছিলাম। সেই সময় নারীদের কেউই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। যাদের সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছি তারা পুরুষ, মাঠে যারা খেলছেন তারও পুরুষ। আবার যারা আয়োজক তারাও পুরুষ। এখন মনে হয় সেই গভীর কষ্টের দিনগুলো এবং সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোই আমার লেখালিখির ভূগোল তৈরি করে দিয়েছে।’
কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ'র আলোচনা দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। প্রবীণ এই সাহিত্যিক অনুজ লেখক মনিজা রহমানের গল্পের জগৎ নিয়ে বক্তব্যে বলেন, ‘গতকাল আমি আমার জন্ম ভিটে পাবনাতে গিয়েছিলাম। পঞ্চাশ বছর পর যাওয়া। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের সময় আমার চোখে জল গড়িয়ে পড়ছিল। জন্মভিটের প্রতি যে টান, গভীর মমত্ব সেটি আজকে মনিজার গল্প পড়তে গিয়ে আবারও অনুভব করেছি। কি অদ্ভুত কাককাতলীয় ব্যাপার ঘটে গেল!’
অনুষ্ঠানের আলোচনার ফাঁকে লেখকের কবিতা আবৃত্তি করেন লিপি কাজী, মাহি ফারহানা প্রমুখ।জলধি-সন্ধ্যার ২৭তম আসর ছিল। লেখক, কবি, আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গল্পকার দিলতাজ রহমান, কবি ইসমত শিল্পী, কবি শফিক হাসানসহ প্রমুখ।