× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমার প্রথম পড়া বই

রাজিয়া সুলতানা ঈশিতা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৯ পিএম

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১২:৪৩ পিএম

আমার প্রথম পড়া বই

১৯ জুলাই, ২০১২। এসএসসি পরীক্ষায় বসব। দিন-রাত একাকার করে পড়ছি। একটু সময়ক্ষেপণ করা চলবে না। খবর এলো কথার জাদুকর হ‍ুমায়ূন আহমেদ নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলেভ্যু হাসপাতালে মারা গেছেন। দেশজুড়ে শোকের মাতম। যেন একান্ত কোনো স্বজন চলে গেলেন। থমথমে মুখ গোমরা সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে দুপুরের দিকে। টিভি স্ক্রিন থেকে ঝলসে উঠছে কথার কারিগরের মুখ। আশ্চর্যের ব্যাপার কারও বাসার টিভি চ্যানেলই পরিবর্তন করছে না কেউ। আমার বড় বোন তখন ইডেন কলেজের ছাত্রী। সে মাস্টার হিসেবে খুব ভালো। তার এক ছোট ছাত্রের কথা বলি—

সেদিন হঠাৎ সে কান্না করতে করতে বন্ধুর বাসা থেকে দৌড়ে এসেছে। এসে বলছে ‘মা, হ‍ুমায়ূন মারা গেছেন।’ বলে এসে কী কান্না! দমকে দমকে কাঁদছে ছেলেটা। সে যেন ওর কত চেনা! এসে বলছে ‘হ‍ুমায়ূন’। 

আমি অগত্যা বই খুলে বসে আছি। টপটপ করে কান্না ঝরে পড়ছে আর বেজে চলছে তার লেখা আমার খুব প্রিয় গানÑ 

এখন খেলা থেমে গেছে মুছে গেছে রঙ

অনেক দূরে বাজছে ঘণ্টা ঢং ঢং ঢং

এখন যাব অচিন দেশে, অচিন কোন গায়

চন্দ্রকারিগরের কাছে ধবল পঙ্খী নায়।

এসব ভালোবাসা তো মিছে কিছু নয়। এই কথাশিল্পী বিশাল পাঠক সমাজকে অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি দিয়ে বেঁধে রেখেছেন। এই শিল্পীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। সারা দিন মুখ গুজে পড়তে বসে থাকা পরিবেশ নিয়ে বেড়ে উঠেছি। বাড়িতে অনেক বইপত্তর পেয়েছি ছোট থেকেই। কিন্তু ওই যে মধ্যবিত্তের মানসিক টানাপড়েন সেটাও তো ছিল এত বইপত্রের ভিড়েও। পাঠ্যবই ব্যতীত অন্যান্য বই পড়ার অনুমতি মিলত না সব সময়। কাজেই খানিকটা কৌশল অবলম্বন করেই সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে হয়েছে সে সময়গুলোতে।

স্কুল থেকে ফিরে হঠাৎ একটা বই চোখে পড়ে আমার। নামটা একটু অন্যরকম মনে হতে থাকে আমার কাছে। ‘আমার আছে জল’। ভাবলাম বইটার এমন নামকরণ হওয়ার সার্থকতা কী? আরেকটা বিষয়— বয়স বা ক্লাসের তুলনায় অনেক ছোটবেলাতেই আমি সব ধরনের সাহিত্যের বই পড়েছি হাতের নাগালে যা-ই পেয়েছি। তো সেই মানসিকতার জায়গা থেকে মনে হলো এই বইয়ের নামকরণের বিষয়বস্তুটা পড়তেই হবে। স্বভাবতই খুব সংবেদনশীল মানুষ আমি। অন্যের দুঃখ কষ্টে সহজেই কান্নায় বুক ভারী হয়ে ওঠে। আমার আছে জল পড়ার সময়েও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। নিশাত আর দিলশাতের জন্য মনটা কেমন করে উঠেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়া যায়, কিন্তু কান্না লুকানো যায় না। 

বই পড়তে পড়তে হুট করে আম্মা যখন চলে আসত, তখন বইটা লুকিয়ে ফেলতাম। মনে আছে সোফার নিচে বেশি লুকোতাম। অনেক আগ্রহ নিয়ে, উত্তেজনা নিয়ে পড়তাম। শুধু ভাবতাম তারপর কী হবে, তারপরে কী? শেষের দিকে এসে খুব কান্না পেত। টপটপ করে জল পড়ে বইয়ের পাতা ভিজে যেত। কাঁদতে গিয়ে আম্মার কাছে ধরে খেয়ে যেতাম। তখন বাস্তব-অবাস্তব, সাহিত্য এসবের আর কীইবা বুঝতাম! সবই চরম সত্য হয়ে ধরা দিত তখন। কিন্তু বইয়ের শেষের কয়েকটা পাতা না থাকায় জলভরতি চোখ নিয়ে মেয়েটা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা অনেক দিন অবদি জানা হয়নি। একেকটা সময় আমার মতো করে একেক রকমের সমাপ্তি কল্পনা করতাম। অনেক দিন পর এসে জেনেছি নাটকে সিনেমায়, দিলু তার প্রিয় লাল স্কার্ট পানিতে ভেসে উঠেছে। সংবেদনশীল মন আমার দিলুর আত্মহননে আমিও এক দিন লাল একটা স্কার্ট পরে আমাদের পুকুরে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে ভেবেছি দিলুর মনটা কেমন করছিল ভেসে ওঠার আগ মুহূর্তে?

এরপর আরেকটু বড় হয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা দিয়েছি তখন দেখলাম হ‍ুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’। আমার মন খারাপ হলে তার গান শুনতাম, নাটক, সিনেমা দেখতাম। আমার নানাভাইয়ের পছন্দের সিনেমা ছিল ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। ছোটবেলায় দেখেছি বারী সিদ্দিকীর ‘সোয়া চাঁন পাখি’ গানটা ছেলেমেয়েরা মুখে মুখে গাইত আর মেহের আফরোজ শাওন অভিনীত শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমার কাহিনী জনে জনে ঘুরত।

এক দিন কোনো এক অজানা কারণে মনটা ভীষণ খারাপ। তখন কলেজে হোস্টেলে থাকি। রাতে ঘুম আসছে না। ভাবলাম হ‍ুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখব ঘুম না আসা পর্যন্ত। রুমমেটরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি কোথাও কেউ নেইÑ এর এক একটা পর্ব দেখি আর রাতের সমস্ত চরাচরের কান্না এসে আমার গলায় জমতে থাকে। জানি না, কোথাও হয়তো মুনাদের জীবনের সঙ্গে একই ফল্গুধারায় মিলে গেছে আমাদের জীবনের বেদনা আর ক্লান্তি। জীবন থেকেই উৎসারিত হয় সিনেমা। আবার সিনেমাই আমাদের আনন্দ-বেদনার মর্মস্থলে নিয়ে ভাসিয়ে দেয়। তখন আর মুনা এবং বাকের ভাইয়ের কষ্ট নিজের কষ্টের থেকে আলাদা কিছু মনে হয় না। যুগে যুগে একই মানবসত্তা আমরা। তাই বুঝি যে কারও বেদনাও আমাদের এসে নাড়িয়ে দেয় অদ্ভুতভাবে। 

অনেকে একে হাস্যরসাত্মকধর্মী নাটক বললেও এটি মূলত প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার কালো অধ্যায়ের স্বরূপ তুলে ধরে। সবকিছু হারিয়েও জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্যক আহ্বান দেয়। সমাজের ওপরের তলার মানুষদের সুসজ্জিত বেডরুমের চিত্র প্রদর্শিত করে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা