× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এমন একটি বই-ই খুঁজছিলাম

আসিফ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৭ পিএম

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১২:৪৪ পিএম

এমন একটি বই-ই খুঁজছিলাম

আমার শৈশব কেটেছে বন্দরনগর নারায়ণগঞ্জে। আমরা থাকতাম যে জায়গাটিতে সেটি বেশ মজার। এর একদিকে ত্রিবেণী খাল। এই খালের একদিকটা শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশেছে। যেখান দিয়ে ধলেশ্বরী বাইপাস করে মেঘনা নদীতে চলে যাওয়া যায়। আরেক দিকটা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে যুক্ত। আমরা থাকতাম মেরিনে। পাশেই ছিল একসময়কার বেলিং কোম্পানি। ইরেজরা থাকত। কাজেই আমাদের ছোটবেলাতে লংটেনিস খেলার মাঠ, বড় ঘাট বাঁধানো বিশাল পুকুর দেখার সুযোগ হয়েছে। যেখানে বিশাল নান্দনিক ফুলের বাগান আর অদ্ভুত সুন্দর বাংলো টাইপের বাড়িও ছিল। ওই ত্রিবেণী খাল বেয়ে অল্প কিছু দূরেই মীরজুমলার কেল্লা। এটি বানানো হয়েছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঠেকানোর জন্য, যা সোনাকান্দা কেল্লা নামে পরিচিত। ওই জায়গার পাশে নুরুল হক চেয়ারম্যানের বাড়ি বলে একটি স্থান আছে, স্থানীয়রা যেটি সবাই চেনে। সেখানকার চারতলা একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। ওই বাড়িতে চিলেকোঠার একটা ঘর ছিল। ঘরটিতে অনেক কিছু থাকত। মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর বই আসত। মজার ব্যাপার হলো চিলেকোঠাটি নির্দিষ্ট কারও জন্য ভাড়া দেওয়া ছিল না। যে যার মতো সেখানে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারতাম।

তো ওই জায়গাতেই হঠাৎ একদিন আমি একটা বই পাই। সেই বইটির নাম এর আগে কখনও শুনিনি। অবশ্য ক্লাস ফাইভে পড়া এক কিশোরের তা জানার কথাও না। বইটি প্রকাশ হয়েছিল সেবা প্রকাশনী থেকে। অনুবাদ যে কার ছিল সেটা এখন আর মনে পড়ছে না। এই প্রকাশনীর বইয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল খুব স্বাচ্ছন্দ্যে পড়া যায়। বাংলাদেশের বইয়ের পাঠক তৈরির জন্য কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছে আমরা আক্ষরিক অর্থেই ঋণী। ফিরে আসি চিলেকোঠার ঘরে পাওয়া বইটির প্রসঙ্গে। খেলাচ্ছলে বইটির পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকি। এক পৃষ্ঠা দুই পৃষ্ঠা করে এক রাতের মধ্যে পুরোটা পড়ে শেষ করে ফেলি। সেই বইটির নাম ‘সাগরতলে। মূল লেখক জুল ভার্ন। ইংরেজি নাম ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’। সায়েন্স ফিকশন পড়ার প্রথম জার্নি বলতে ওই বইটি দিয়ে শুরু। সাগরের তলদেশ দিয়ে অভিযান নিয়ে লেখা। এটা আমার ভেতরে এক দুর্দমনীয় আবেগ তৈরি করেছিল, যা চিন্তা করা যায় না। 

এর পরে আমার পরিচয় হয় বন্দর শিশুবাগ বা বন্দর গার্লস হাই স্কুলের পাশের এক দোকানদারের সঙ্গে। আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড় হয়তো। আমি শিশুবাগে পড়ার কারণে, স্কুলের ম্যাটেরিয়াল কেনার কারণে তার সঙ্গে সখ্য তৈরি হয়। ওই দোকানদারও আবার বই পড়তেন। আমি তখন পড়তাম ক্লাস সিক্সে, তিনি যদি সত্যি পড়ে থাকেন তাহলে তিনি পড়তেন ক্লাস টেনে বা আরও দুই এক ক্লাস ওপরে। তার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে কেবল বইকে কেন্দ্র করে। তিনি আমার কাছে নানা রকম বইয়ের কথা বলতেন। সেই বইগুলোতে যে কাহিনী আছে তার বর্ণনা দিতেন। অমুক বইয়ে এই আছে, মানুষ মাছ হয়ে যায়। আকাশে উড়ে বেড়ায়। সেই বইগুলোও নাকি বাংলা ভাষাতেই লেখা। আমাকে বলতেন, তুমি চাইলে এই বইগুলো বদল করে পড়তে পারো। আবার কিনতেও পারবে। ভাড়াও নেওয়া যাবে। তার একটা হিসাব-নিকাশও করতেন। বইয়ের সঙ্গে ওই টাকা-পয়সার ব্যাপার ওঠায় মাঝে মাঝে আশ্চর্য লাগত। ভাবতাম, বই পড়া এবং দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে টাকা-পয়সা আসে কেন! এখন বুঝি আসলে টাকা ছাড়া তো জগতে কোনো কিছুই হয় না। সে যাক। আমি তাকে একটা বই দিলাম। তিনিও আমাকে একটা বই দিলেন। তার দেওয়া বইটির নাম আলেক্সান্দর বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’। আমি এখনও ভাবি একজন কিশোর দোকানির কাছ থেকে আমি পড়েছিলাম উভচর মানুষ। 

জুল ভার্নের ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ বইটিতে ক্যাপ্টেন নিমো নামে একটা চরিত্র আছে। এই নিমো ইলেকট্রিক সাবমেরিন তৈরি করেছিল। সে পানির তল দিয়ে মহাসাগরগুলো চষে বেড়াত। তার দেশ ছিল ফ্রান্সে। কিন্তু সে সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য ভাবতেন। মানুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করা বিভাজন, অন্যায়কে প্রতিরোধ করার সংগ্রাম ছিল নিমোর মধ্যে। আসলে নিমোর জার্নিটি ছিল মানবিকতার পথে। নিমোর চরিত্রটি আমার ওপর দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। এর পর ফিরে আসি ‘উভচর মানুষের ডক্টর সালভাদর চরিত্রে। যে নানা রকম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোড়া লাগাতে পারে। অনেক রোগীকে সে ভালো করে দেয়। এ রকম মরণাপন্ন এক শিশু রোগীর ফুসফুস পরিবর্তন মাছের ফুলকা লাগিয়ে দেয়। সুস্থ হয়ে সে পানিতেও চলতে পারে আবার ডাঙাতেও চলতে-ফিরতে পারে। সেটা নিয়ে সেই সময়কার সমাজ মেনে নিতে পারেনি, ধর্মান্ধরা সালভাদরের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে যে সে ঈশ্বরের নিয়মকে ভঙ্গ করেছে। সেখানে আলেক্সান্দর বেলায়েভ তার প্রণীত চরিত্র সালভাদরের মধ্যে দিয়ে উক্তি দিয়েছেন, মানুষ যে নিম্নস্তর থেকে ক্রমশ উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে, সমস্যা এ জায়গাতে না। সমস্যা হলো মানুষ বিজ্ঞান প্রযুক্তির এতটা পথ পাড়ি দিয়েও পশুই থেকে গেল।

এরপর আমি একটি বই পড়লাম। তার নাম গ্রহান্তরের আগন্তুক, যা আমি আজও পড়ি। পাঁচটি গল্প নিয়ে এই সংকলন। প্রত্যেকটা গল্প অনুবাদ করেছে ননী ভৌমিক। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ, হৈটি টৈটি বইটি পড়ি আর ভাবি কীভাবে এ রকম একটি গল্প লেখা সম্ভব! আইভা গল্পেতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলেজেন্সির আভাস পরিষ্কারভাবে দেওয়া আছে। এগুলো পড়তে গিয়ে ১৯৭৭ থেকে ৮২ সালের কথা। সে সময়ে সুধীগঞ্জ লাইব্রেরিতে একটি বইমেলা হয়েছিল। স্বাতীর কিরতি, বার্নাদের তারা, ‘বঙ্গোপসগারের শৈবাল হৃদ’সহ আরও কয়েকটি বই সংগ্রহ করি সেখান থেকে। বইগুলোর মধ্যে বিদেশি কাহিনীর প্রভাব থাকলেও দেশীয় প্রেক্ষাপটে অসাধারণ আত্তীকরণ ছিল। আমি আরেকটি বই পড়ি। বইটি কিনে দেন আমার মা। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কপোট্রনিক সুখ দুঃখ’। যেটি পড়ে আমি সত্যি ভীষণ আলোড়িত হয়েছিলাম। একটি গল্পের উপস্থাপনা যে কত সুন্দর হতে পারে, যা ওই বইটি না পড়লে জানতাম না। এই লেখকের আরও একটি বই হাতে আসে। নামÑ মহাকাশে মহাত্রাস। এ বইটি আমাকে তেমন টানেনি। এর মধ্যে আরও কিছু বই পড়ি। সেগুলোও অবশ্য সায়েন্স ফিকশন ছিল। কিন্তু ওই রকম কৌতূহল উদ্দীপক বই আর পাচ্ছিলাম না। আক্ষরিক অর্থেই বাংলায় লেখা বা রূপান্তর আমি তেমন কোনো সায়েন্স ফিকশন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাংলায় পড়ার একটা মজা আছে। মজা এবং কৌতূহল সৃষ্টি করা বই আমি মনে মনে খুঁজতে থাকি ।

এর মধ্যে এক সিনিয়র বন্ধু, আমার বড়ো ভাই আরিফ বুলবুলের বন্ধু শিহাব, আমেরিকায় ডাক্তারি করেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তিনিও খুব পড়াশোনা করতেন। হঠাৎ তিনি একদিন আমাকে বলেন, তুমি তো জুল ভার্নের ‘মাস্টার অব দ্য ওয়ার্ল্ড উপন্যাসের চরিত্র এবং ‘নিমো, আলেক্সান্দর বেলায়েভের ‘ডক্টর সালভাদর’-এর মতো চরিত্র খুঁজছ। তাই তো! যেখানে সমগ্র জগৎ ও প্রকৃতিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার অভিজ্ঞান রয়েছে। আমি তার কথা শুনে চুপ করে থাকি। আর মনে মনে ভাবি এ রকম আরেকটি বই যদি পাওয়া যেত। তখন তিনি ‍হ‍ুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বইটি পড়ে দেখার পরামর্শ দেন। বলেন পড়ে দেখতে পারো।

হ‍ুমায়ূন আহমেদ তখন কেবল জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। এ ছাড়া তার প্রথম প্রকাশিত বই ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ বইয়ের কারণে তাকে নামে চিনি।

একাশি-বিরাশি সালের কথা। আমি দুই-একদিনের মধ্যে নদী পার হয়ে চলে যাই নারায়ণগঞ্জের ডিআইটি মার্কেটে। সেখানকার বইয়ের দোকানগুলোতে তখন টেক্সট বইয়ের পাশাপাশি অল্প কিছু গল্প-উপন্যাস রাখত। আমি অনেকটা ভয়ে ভয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি। হ‍ুমায়ূন আহমেদের অমুক বইটি আছে কি না! দোকানদার কোনো কথা না বলেই আমার হাতে তুলে দিলেন ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বইটি। আমিও কোনো কথা না বলে কিনে ফেলি বইটি। কারণ আমার সেই বিশ্বাস এ বইটির মধ্যে নতুন পৃথিবীর সন্ধান রয়েছে। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমি কিনে নিয়ে মেরিনের লঞ্চে উঠে বসি। ডেকে বসে বইয়ের পাতাগুলো উল্টাচ্ছি, চুলগুলো উড়ছে, আগামীর পরিকল্পনার ভীষণ প্রণোদনা জাগছে হৃদয়ে, যা একজন বাংলাদেশি কোনো লেখক লিখছেন কি না আমার জানা নেই। একদম বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লেখা, যা বাংলাদেশি কোনো লেখকের লেখায় পাইনি। বইটি পড়ছি আর নিজেকে একটা গাইডলাইন দেখতে পাচ্ছি বইটির পরতে পরতে। মানুষের জন্য কী আর্তি! আবেগ। যাকে আমরা বলি হ‍ুমায়ূনী আবেগ। সেই আবেগটি আমি নিজেকে কল্পনা করছি আর পড়ে এগিয়ে যাচ্ছি। 

যাই হোক প্রথম রাতেই বইটি পড়ে ফেলি। পড়ে আমি খুব সন্তুষ্ট হই। দোতলা বাড়ির ছাদে হাঁটতে থাকি। আনমনে ভাবি। আমার নিজের জীবনের পরিকল্পনায় যেন বইটির মধ্যে আঁকা হয়েছে। যেখানে পৃথিবী নিয়ে কথা রয়েছে। বইটির বৈশিষ্ট্য হলো কীভাবে সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা যায়। হ‍ুমায়ূন আহমেদের একটি ছোট্ট টেক্সটকে আরও ছোট করে আমি ও আমার বড় ভাই লিখিÑ‘ঠিক সন্ধ্যাবেলা পুবের আকাশে যে ছোট্ট তারাটি অল্প কিছুক্ষণের জন্য নীল আলো জ্বেলে আপনিতে নিবে যায় পৃথিবীর মানুষ সেটা তৈরি করেছে ফিহার স্মরণে। সেই কৃত্রিম উপগ্রহটির সিলকিন নির্মিত কক্ষে পরম যত্নে রাখা হয়েছে ফিহার প্রাণহীন দেহ। সেসব কতকাল আগের কথা।’

আজ সেই উপগ্রহটি ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর চারদিকে হিসাবমতো জ্বলে উঠেছে মায়াবী নীল আলো। পৃথিবীর মানুষ যেন বলছে ‘তোমাকে আমরা ভুলিনি ফিহা, আমাদের সমস্ত ভালোবাসা তোমার জন্য। ভালোবাসার নীল আলো সেই জন্য তো জ্বেলে রেখেছি।’ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা