× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হ‍ুমায়ূন আহমেদ কেন আজও জনপ্রিয়

মুম রহমান

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৩ পিএম

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১২:৪৭ পিএম

হ‍ুমায়ূন আহমেদ।                   প্রতিকৃতি মামুন হোসাইন

হ‍ুমায়ূন আহমেদ। প্রতিকৃতি মামুন হোসাইন

একটা সহজ আর সরস ভঙ্গিই হ‍ুমায়ূনের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মধ্যদুপুরে ‘অপেক্ষা’ কিংবা সকালে চা খেতে খেতে ‘নির্বাসন’ কিংবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ‘কে কথা কয়’-এর মতো হ‍ুমায়ূনের যেকোনো উপন্যাস হাতে নেয়া যায়। এমনকি তার ভ্রমণ কাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, স্মৃতিকথা, শিশুতোষ রচনা যেকোনো কিছুই আদতে সুখপাঠ্য। হ‍ুমায়ূন জনপ্রিয় হয়েছেন এই সুখপাঠ্যতার কারণেই। 

অনেক লেখকই ভাষার কারুকাজ করেন, আঙ্গিক নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেন কিন্তু হ‍ুমায়ূন আহমেদ এসব কিছুর খুব একটা গুরুত্ব দেন না। সরল কাহিনী বয়ান, সরস সংলাপ, চেনা চরিত্র তার লেখাকে একান্ত আপন করে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। 

হ‍ুমায়ূনের যেকোনো উপন্যাসই হুট করে শুরু হয়। এমন কোনো একটা জায়গা থেকে শুরু হয় যেন আপনাকে তারপর এগোতেই হবে। মাত্র এক দুই পাতা পড়ার পরই আপনি বর্ণনার টানে এগোতে থাকবেন। 

‘কেরোসিনের চুলায় জাম্বো সাইজের এক কেতলি। মজনু পাশে বসে আছে- একটু পরপর কেতলির মুখ তুলে পানি ফুটছে কি না তা দেখার চেষ্টা করছে। তার হিসেবমতো ইতোমধ্যে পানি ফুটে যাওয়া উচিত। অথচ ফুটছে না। ব্যাপারটা কী?’ (সাজঘর) এত সামান্য বিষয়কে সহজ-সরল বাক্যে তিনি তুলে ধরেন যে সূচনাতেই পাঠক আটকে যায়। কেতলিতে পানি ফোটানোর মতো বিষয় দিয়ে তিনি ‘সাজঘর’-এর মতো ঠাস বুননের উপন্যাস শুরু করে দেন। আর শুরুর ওইটুকু পড়ে তার বই রেখে দেওয়া প্রায় দুরূহ। ‘সাজঘর’-এর পাঠ শুরু হয়েছে কেরোসিনের চুলা দিয়ে আর নক্ষত্রের রাতের পাঠ শুরু হয় একটা ঘড়ি দিয়ে। এ উপন্যাসের সূচনাও পাঠককে সঙ্গে সঙ্গে গল্পের দিকে টানতে থাকে, ‘দেয়ালে অদ্ভুত আকৃতির একটি জার্মান ঘড়ি। অন্ধকারে এর ডায়াল থেকে সবুজ আলো বের হয়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেয়ালের দিকে তাকালে মনে হয় ট্রাফিক সিগন্যাল। খাটটাকে মনে হয় একটা গাড়ি। সবুজ আলো পেলে চলতে শুরু করবে।’ 

একটা গতিময় সূচনা, ছোট ছোট বাক্য, কোনো জটিল, কঠিন শব্দ ব্যবহার না করে হ‍ুমায়ূন মুহূর্তে পাঠকের সঙ্গে নৈকট্য তৈরি করে ফেলেন। আর গতিশীল ধারায় পাঠক এগোতে থাকে সাধারণ ভাষা, সাধারণ বিষয়ের অসাধারণ অনুভব সঙ্গে নিয়ে। পাঠকের হৃদয় ছোঁয়ার এই রেসিপি জানতেন তিনি। 

আরেকটি বড় দিক হলো হ‍ুমায়ূন রচনার চরিত্ররা। রুনু, পরী, কামাল, আসিফ, ফরহাদ, গণি, বাকের সবাই যেন আমাদের খুব চেনা মানুষ। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশের মানুষ। এমনকি রহস্য সন্ধানকারী মিসির আলীও যেন আমাদেরই কারও বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী মামা, চাচার দোসর। হিমু, এত রহস্য নিয়েও ঢাকা শহরে আসা অনেক আগন্তুকের মতো পথে হাঁটে। হিমু চরিত্রের সঙ্গে আমরাও হাঁটতে থাকি। হিমুর মাজেদা খালা, খালু সাহেব, হিমুর রূপা মনে হয় আমাদেরই ঘরের মানুষ। মোটা কাচের চশমায় প্রায় অন্ধ ধনীর দুলাল শুভ্রকেও ‘কানাবাবা’ ডেকে তার বন্ধুদের মতোই আপন করে নিতে পারি আমরা অনায়াসে। চরিত্রকে এই অনায়াসে আয়ত্ত করে নেওয়ার কারণেই হ‍ুমায়ূন আমাদের আপন লেখক, নিজের লেখক মনে হয়। মনে হয় তিনি আমার চারপাশের মানুষের কথাই বলছেন। এই চেনা মানুষের স্পর্শ যোগ করাতেই তিনি জনপ্রিয়তম লেখক হয়ে ওঠেন। 

হ‍ুমায়ূনের রচনার অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষকে নিয়ে গল্প তৈরি করা। আমাদের মামা, খালা, চাচা, দাদারা তার কাহিনীতে আমাদেরই প্রতিনিধি হয়ে আসেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখকে তার মতো করে নিটোল-নিখুঁতভাবে আর কেউ তুলে ধরতে পারেনি। বাবার বেতন হয়নি, পরিবারের সদস্যরা অনেক দিন বড় মাছ খায়নি, মাঝরাতে বড় ভাই আঙিনার কোনায় গিয়ে সিগারেট টানে আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এ সবই হ‍ুমায়ূনের গল্প-উপন্যাসের অনুষঙ্গ। আর পাঠকের মনে হয় এ তো আমারই গল্প। নিজের মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতে পারে হ‍ুমায়ূনের লেখা। আর ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তথা পাঠক সম্প্রদায় মধ্যবিত্ত পরিবারের। 

হ‍ুমায়ূনের লেখা মানেই প্রাণবন্ত সংলাপ। মনে হয় চরিত্ররা যেন বইয়ের পৃষ্ঠা ছেড়ে উঠে এসে কথা বলছে। এত অল্প কথায় এত গভীর কথা বলতে পারা হ‍ুমায়ূনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মিসির আলীকে তার ছাত্র প্রশ্ন করে, ‘স্যার, আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?’

জবাবে মিসির আলী বলে, ‘আমি প্রশ্নে বিশ্বাস করি, উত্তরেই না।’

মাত্র একটি প্রাণবন্ত বাক্য দিয়ে হ‍ুমায়ূন পুরো চরিত্রের দর্শন ফুটিয়ে তুলতে পারেন। 

অনেকে অভিযোগ করে থাকেন, হ‍ুমায়ূন খুব গভীর কোনো লেখক নয়। তার লেখনী বড় হালকা। কিন্তু হালকা কথায় হ‍ুমায়ূন প্রায়ই ভারী দর্শন তুলে ধরেন। তার লেখা বহু লাইনই উদ্ধৃতিযোগ্য। ‘সবচেয়ে ভালো মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কাঁদে। কারণ তারা চায় না অন্য কেউ কাঁদুক।’

(বহুব্রীহি)। এমন উদ্ধৃতিযোগ্য বহু লাইনই হ‍ুমায়ূন রচনাবলিতে পাওয়া যাবে। 

মূলত হ‍ুমায়ূন খুব আটপৌরে আর সহজ করে জীবনকে দেখতেন। সেই দেখাটাকেই লেখায় তুলে ধরতেন। তিনি যেন আমাদের জীবনকে অনুবাদ বা রূপান্তর করে গেছেন তার লেখনীতে। জীবন খুব জটিল কিছু নাÑ বরং গল্পের মতো সহজ করা যায়, যদি সেটা হ‍ুমায়ূনের কলমে লেখা হয়। এই কারণেই হ‍ুমায়ূন আজও জনপ্রিয়তম লেখক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা