শাহীন রেজা
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩৪ পিএম
আল মাহমুদ
আকাশটা যেন নেমে এসেছে পৃথিবীতে। ঝরঝর বৃষ্টিতে মুখর রাজধানী। অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে ভিজে একাকার। অন্যদিন হলে হয়তো অফিসটা কামাই করেই ফেলতাম। কিন্তু কালই বিশেষ সংখ্যার মেকআপ। আর এর সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব আমার ওপরই। মতিন ভাইয়ের নির্দেশ আল মাহমুদের লেখা চাই-ই চাই। বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা। ম্যাগাজিন নয়। ব্রডশিটে ২৪ পৃষ্ঠা। এমনিতেই মাথা খারাপ। এদিকে আমার সহযোগী হাসান মাহমুদ আসেনি। আল মাহমুদ ভাইয়ের কাছে গেলে মিনিমাম ৪ ঘণ্টা। বাকি কাজ কখন করব। এক হাতে লেখা এডিট, অন্য হাতে ফাইনাল প্রুফ। মাঝেমধ্যে ইলাস্ট্রেশন নিয়ে কথা বলা। এর ওপর বৃষ্টি। শান্তিনগরে কোমরসমান পানি। বলাবাহুল্য তখন বৃষ্টি হলে রাজধানীর কোথাও পানি না জমলেও শান্তিনগরের শান্তিকে হারাম করে সেখানে পানি জমে নদী হয়ে যেত। দুপুরের খাবার খেয়ে ৪টার দিকে ফোন করলাম মাহমুদ ভাইকে। বললাম, কবিতা লাগবে। তিনি তখন উপসম্পাদকীয়তে ব্যস্ত। বললেন, লেখা শেষ করতে করতে মাগরিব হবে। তুমি তারপর এসো। সন্ধ্যা গড়াতে না গড়াতে গিয়ে হাজির হলাম মাহমুদ ভাইয়ের দরবারে। তিনি তখন লেখা শেষ করে সবেমাত্র চেয়ারে হেলান দিয়ে তৃপ্তির আলস্যে মেতে উঠেছেন। আমাকে দেখেই বললেন, চলো নিচে যাই। নিচ মানে চা আর সিগারেট। আমি বললাম, বৃষ্টি তো। তিনি ছাতা দেখিয়ে বললেন, কুছ পরোয়া নেহি। চলো। বেরিয়ে পড়লাম। এক ছাতার নিচে দুই জন। একজন কবি অন্যজন তার ভক্ত। ভক্ত বললাম এ কারণে যে, আল মাহমুদের সঙ্গে কবি হিসেবে আমার নাম উচ্চারণের সাহস বা যোগ্যতা কোনোটাই আমার নেই। এক ছাতার নিচে দুজন হলে যা হয়। দুজনের দুপাশই ভিজে যাচ্ছে। এর মধ্যে দমকা বাতাস হঠাৎ হঠাৎই উড়িয়ে নিচ্ছে ছাতা। তখন দুজনেই সামান্য সময়ের জন্য কাকভেজা।
মাহমুদ ভাই ভিজছেন আর বাচ্চা ছেলের মতো হো হো করে হাসছেন। চায়ের দোকানি ছেলেটা মাহমুদ ভাইয়ের হাসি দেখে অবাক। জানতে চাইল, চাচা কোনো খুশির খবর আছেনি? মাহমুদ ভাই তখন দিল খোলা। বললেন, আছে রে বেটা, আছে। যদি ভিজে গিয়ে জ্বর হয় তাহলে কপালে খারাবি আছে। সেই খুশিতে হাসতাছি। ছেলেটা অবাক, বলে কী লোকটা, পাগল নাকি! আমি বললাম, চা দে দুকাপ। মাহমুদ ভাই যোগ করলেন, দুটো গোল্ডলিফ তার সঙ্গে। চায়ের আগেই আগুন ধরাতে গিয়ে ভিজিয়ে ফেললেন সিগারেটটা। আমি আমারটা তার মুখে দিয়ে বাতাস আড়াল করে ধরিয়ে দিলাম। সুখটান দিয়ে একগাল হাসি হেসে বললেন, চলো ওপাশে বসি। ছাপরা ঘরের ওদিকটা তখন খালি হয়ে গেছে। দুজন গিয়ে বসলাম। চায়ের কাপ হাতে আসতেই মাহমুদ ভাইয়ের অন্য রূপ। দুটো চুমুক দিয়ে তিনি হঠাৎ চুপ মেরে গেলেন। তার চোখ সামনের দিকে। উদাস অপলক। এক হাতে সিগারেট পুড়ছে, অন্য হাতের কাপে জল হচ্ছে চা। বুঝলাম, মাহমুদ ভাই এখন আর এ পৃথিবীতে নেই।
আমি চুপচাপ চা খেতে থাকলাম। একসময় দোকানদারের কোনো একটা শব্দে তিনি ফিরে এলে বললাম, মাহমুদ ভাই চা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে, আরেকটা দিতে বলি। তিনি বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললেন, বলো বলো। এবার আরেকটা সিগারেট নিয়ে তাকে ধরিয়ে দিতেই বললেন, জানো বৃষ্টি আমাকে উদাস করে দেয়। আমি কোথায় যেন হারিয়ে যাই। আমাদের গ্রামটা বর্ষায় অন্যরকম হয়ে যেত। আমরাও হয়ে উঠতাম দস্যি, দুরন্ত। মাঠে জমা পানিতে দৌড়ঝাঁপ। বল খেলা। পুকুর থেকে তুলে আনতাম শাপলা। লাল লাল শাপলা ফুল দিয়ে মালা গাঁথত আমার এক বুবু। তাকে দিয়ে আসতাম। বলতাম, মালা গেঁথে আমাকেও একটা দিও। বুবু হেসে জানতে চাইতেন, কাকে দিবিরে পাগলা? লজ্জায় লাল হয়ে পালিয়ে যেতাম। আজ সেই বুবুটার কথা খুব মনে পড়ছে। অনেক দূরদেশে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি। আজ এই ঝুমবর্ষায় তাকে হঠাৎ মনে পড়ল। চারদিকে বাতাস কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে উঠল। বললাম, চলুন উঠে পড়ি। মাহমুদ ভাই আরও এক কাপ চা খেতে চাইলেন। চা খেয়ে আমরা চলে এলাম মাহমুদ ভাইয়ের অফিসে। তিনি লিখতে বসলেন। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলাম বৃষ্টির ঝরে পড়া। একসময় কমে এলো বৃষ্টি। মানুষগুলো আস্তে আস্তে নেমে আসতে লাগল পথে। চলাচল বাড়ছে রিকশার। আমি দাঁড়িয়ে আছি। একটি কবিতার জন্য কী এক অপেক্ষা। সাহিত্য সম্পাদকদের এই ত্যাগ, এই কষ্টের কথাÑ কেউ জানে না। লেখা সংগ্রহের জন্য তাদেরকে কতটা পরিশ্রম করতে হয় তা জানলে তাদের প্রতি কিছুটা হলেও ভালোবাসা ছুড়ে দিত অন্যরা। মাহমুদ ভাইয়ের ডাকে ফিরে তাকালাম। তিনি হাত ইশারা করে ডাকছেন। কাছে যেতেই কবিতাটা ভাঁজ করে হাতে তুলে দিলেন। বললেন, কবিতাটায় কান্না মিশে আছে। মন দিয়ে পড়লে বুঝতে পারবে। আমি সম্মানির খামটা তার হাতে তুলে দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। কবির দুঃখ যেন তার একান্ত স্বভাবের মধ্যে গাঁথা। মাহমুদ ভাই নিজেও তো বলেছেন, দুঃখ না পেলে কবি হওয়া যায় না। এ রকম অসংখ্য দুঃখের শিকড়ে বাঁধা ছিলেন বলেই তো মাহমুদ ভাই আল মাহমুদ হতে পেরেছেন। রিকশা নিয়ে অফিসে ফিরছি। ওয়ারলেস মোড় পেরুতে না পেরুতেই আবার বৃষ্টি। হুড টেনে দিয়ে ভাবলাম, এত বৃষ্টি এত জলের মধ্যেও কত স্মৃতি, কত কষ্ট। কবির অন্তর বলে কথা। জলেও যে দাহ থাকে সেই প্রথম তার উপলব্ধি নিয়ে ফিরে এলাম অফিসে।