সরকার মাসুদ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৪:১৬ পিএম
চিত্রকর্ম : মোহাম্মদ ইউনুস
মনোযোগী পাঠকরা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, আমি শুধু কবিতা লিখি না; কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনাও লিখ্তাম, মাঝে মাঝে কবিতার অনুবাদ করি। কিন্তু যা-ই করি না কেন কবিতাই আমার প্রথম প্রেম, প্রথম প্রেরণা। কবিতার মাধ্যমেই আরম্ভ হয়েছিল আমার সাহিত্যযাত্রা, উনিশশ ছিয়াত্তরের দিকে। সচেতনভাবে লিখতে শুরু করি তার পাঁচ/ছ বছর পর। সে সময়ে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সের ছাত্র। উনিশশ আশি/একাশির দিকে আবুল হাসান অকালমৃত্যুর পর খুবই জনপ্রিয়। ওই সময়েই তার কবিতা আামকে আকৃষ্ট করে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, যা-ই লিখতাম হাসানের কাব্যভঙ্গি এসে যেত। কয়েক বছর পরের কথা। ততদিনে সত্তরের বিশিষ্ট কবি আবিদ আজাদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমার মন কেমন করে’ বেরিয়ে গেছে। আবিদের কবিখ্যাতির ঢেউ রাজশাহীকেও স্পর্শ করেছে। একদিন দেখলাম ‘আমার মন কেমন করে’ হাতে নিয়ে মোশতাক দাউদী (কবিযশপ্রার্থী, বাংলা বিভাগের ছাত্র) ঘুরে বেড়াচ্ছেন ক্যাম্পাসে। তো আমি ওই কবিদের কবিতা নিবিষ্টচিত্তে পড়ি। পড়ি আর ভাবি তাদের লেখার স্টাইল নিয়ে, বিষয়বস্তু নিয়ে। ক্লাসরুমে সহপাঠী বন্ধু অসীমকুমার দাস (পরবর্তীকালে আশির প্রজন্মের বিশিষ্ট কবি, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)-এর পাশে বসে শুনি বিখ্যাত প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক আলী আনোয়ারের অসাধারণ সব লেকচার। নিজে কবি না হয়েও একজন পণ্ডিত শিক্ষক কবিতার ওপর কতটা গভীরাশ্রয়ী বক্তৃতা দিতে সক্ষম তা আমরা তার ক্লাসেই জেনেছি। তিনি আামদের পড়াতেন এমিলি ডিকনসনের ও ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা।
অর্নাস কোর্সের ওই বছরগুলোয় কবিযশপ্রার্থী তরুণ লেখক হিসেবে আমার মানসভিত্তি তৈরি হয়েছিল। কেননা আলী আনোয়ার স্যার তো ছিলেনই। আরও ছিলেন আবুবকর সিদ্দিক, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিনের মতো প্রাজ্ঞ ও পথনির্দেশক লেখক-শিক্ষকগণ। একসময় চিন্তা করলাম, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে আবুল হাসানের ভূত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতেই হবে। আমাকে লিখতে হবে সত্যিকার ভালো কবিতা, নিজের মতো করে। যা হোক পরবর্তী দু’বছরের ভেতর আমি নিজের রাস্তা খুঁজে পেলাম। ‘খুঁজে পেলাম’ বলা বোধ করি ঠিক হলো না; বলা উচিত, নিজের কাব্যপথের একটা ইশারা পেলাম। আমি এটাও বুঝলাম, কবিতার পথ কোনো সহজ ও মসৃণ পথ নয়।
এখন, কবিতার সঙ্গে পঁয়তাল্লিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর, আমার কিছু নতুন উপলব্ধি হয়েছে। মাথায় কিছু প্রশ্ন জেগেছে। কবিতা কি আমাকে ভিন্ন জীবন দিয়েছে? জীবনের অনিঃশেষ যুদ্ধে কাব্য কি ঢাল হিসেবে কাজ করেছে? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিই: ভিন্ন ধরনের জীবন হয়তো পাইনি। কিন্তু আমার জীবন সংক্রান্ত উপলব্ধি পাল্টে দিয়েছে এই কবিতা। শিল্প-সাহিত্যকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছি বলেই অবাঞ্ছিত তুচ্ছতা ও মন-নষ্ট-করে-দেওয়া কালি-ঝুলি থেকে নিজেক দূরে রাখতে পেরেছি। যদি কবি হিসেবে উঁচু জায়গায় পৌঁছতে না-ও পারি, এর মূল্যই বা কম কী?
কবিতা এবং সাহিত্যের অপর মাধ্যমগুলো আমাকে এমন এক জীবনসত্যের পাটাতনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যেখান থেকে বহির্বাস্তবতার শিরা-উপশিরাসমূহ পরিষ্কার দেখা সম্ভব। আমি সেগুলো দেখতে পাইও। কাব্যচর্চা যেন বৈকালিক অরণ্যের আলো-আঁধারে লুকোচুরি খেলা। কবিতা হচ্ছে পূর্ণিমারাতের বনদেবীÑ যে জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। কী মোহময় তার পা ফেলার ভঙ্গি! দৃষ্টিনন্দন দেহসুষমা তার আলুলায়িত চুল নিয়ে যে দাঁড়িয়ে থাকে একপলক, দৃশ্যবিহ্বল! তার মুখ ভালো করে দেখা যায় না কখনোই। তার কাছে পৌঁছার আগেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়!
এখন পর্যন্ত কবিতাই আমার বেঁচে থাকার প্রণোদনা, আবিষ্কারের অনাবিল আনন্দ, অনাবিষ্কারের অন্তর্দহন। প্রেম ও প্রশ্রয়ের চেয়েও বেশি ভাব উদ্রেককারী প্রত্যাখ্যান সহ্য করেছি কবিতাকে ভালোবেসেই। কবি, অতএব প্রশংসা, নিন্দা ও অবহেলার মাঝখানে-দাঁড়িয়ে-থাকা এক খাপ-না-খাওয়া স্বপ্নজীবী মানুষ। কবি যেমন সহ্য করেন অনেক অপবাদ; নানারকম পারিবারিক ও সামাজিক ভ্রূকুটি, তেমনি কবিতাও আত্মীকৃত করে নেয় কবির নিরাময়-অযোগ্য মানসিক যন্ত্রণা। অবশ্য আনন্দের অনুভব কবিতায় থাকতে পারে, থাকে; যেমন আছে রবীন্দ্রনাথে, জসীমউদ্দীনে, রিলকে বা লোরকার মধ্যে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তারও পেছনে ক্রিয়াশীল মনোবেদনার-বিষণ্নতার এক অব্যাখ্যেয় পটভূমি। মাঝে মাঝে ভাবি, কবি ও কবিতার সম্পর্কটা পুরনো দম্পতির সম্পর্কের মতোÑ যারা দীর্ঘকাল একসঙ্গে আছে; একত্রে থেকে পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসেছে, ঘৃণা করেছে, আবার প্রশ্রয়ও দিয়েছে। জীবনানন্দের সেই ‘ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে, ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে’-এর মতো। চার দশকের বেশি সময় যাবৎ একসঙ্গে থাকার পরেও কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক মধুর নয়, তিক্তও নয়; সম্পর্কটা বলা চলে অম্লমধুর।
তাহলে আবার রাত জেগে কবিতার কথা ভাবি কেন? এজন্য যে, কাব্যের রহস্য অনিঃশেষ। পৃথিবীর কোনো মহাকবিও এর রহস্যের কিনারা করতে পারেনি। তাই এক অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য টানে বারবার ফিরে আসি কবিতার দিকে। এর কুহক আর বহুরূপিতাই আমাকে প্রণোদিত করে চলছে এ শিল্পের স্বাদ নিতে, বারবার। ভেবে দেখেছি ‘কবিতার কুহক’ ব্যাপারটাও অদ্ভুত। কারণ কবি হচ্ছেন সেই স্বপ্নজীবী মানুষ যার মাথা ভাবের জগতে ডুবে থাকলেও পা দুটো থাকে বাস্তবতার শক্ত মাটির ওপর। এমনকি যিনি মার্কসতন্ত্রী বা সমাজবাদী কবি তিনিও আত্মযন্ত্রণার উপশম ঘটাতেই কলম ধরেন। বঞ্চিত-পীড়িত জনগোষ্ঠী সুবিধা পাচ্ছে কিংবা ন্যায়বিচার শুরু হয়েছে মানবসমাজেÑ এটা দেখার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বিষয়টি। সে হিসেবে কাব্যচর্চার কাজও এক ধরনের পলায়ন।
একজন কবি তার নিজের জীবন, চারপাশের জীবন ও জগতের বাস্তবতা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে ডুব দেন ভাবের রাজ্যেÑ কল্পনার পৃথিবীতে। সে পৃথিবী সর্বদাই সৃজনউন্মুখ। সেজন্যই ‘মায়া’ বা ‘মায়াবী’ ব্যাপারটার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেশি। তা না হলে সৃষ্টিশীলতা দানা বাঁধতে পারে না। বাস্তবতা সবকিছুকে ন্যাংটো করে দেখায়। অন্যদিকে, স্বপ্ন ভালোবাসে সব কিছুকেই অস্পষ্ট করে তুলতে। স্বপ্ন, কল্পনা, প্রতীকÑ এই তিনে যে কাজটা তা হচ্ছে আড়াল করার কাজ। স্বপ্ন, বাস্তব, কল্পনা, প্রতীকÑ এই চারটি জিনিস কবিতার বেশি প্রয়োজন। বিষয়বস্তুসম্মত কাব্যভাষা তো থাকতেই হবে। আবার এ-ও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, কবিতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বপ্নের কুহেলী এবং অপ্রিয় বাস্তবতার মাঝামাঝি অস্পষ্ট জায়গায়। সে কারণে বাস্তবতার পরিমাণ বেশি মাত্রায় থাকলেই (এমনটা ঘটলে কবি প্রগলভ হয়ে ওঠেন, যা ক্ষতিকর) সেই কবিতার শিল্পমান ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যা জরুরি তা হচ্ছে স্বপ্নপ্রিয় মনোলোক ও কণ্টকিত বহির্বাস্তবতাÑ এ দুইয়ের ভারসাম্যযুক্ত চিত্রন। সার্থক কবিতার জন্য এগুলোর কোনো বিকল্প নেই।
সৃজনশীল মানুষ নির্জনতাপ্রিয় কেন? কারণ ভাবমগ্ন বা কল্পনাগ্রস্ত হওয়ার মতো মানসিক অবস্থা সৃষ্টির জন্য একাকিত্ব খুবই প্রয়োজন। আবার সেই মানুষই কখনও কখনও ভীষণ সঙ্গপ্রিয়। একজন কবির মধ্যে এ দুটি বিপরীত অবস্থা প্রভাব ফেলে। সে একবার বাস্তবের কঠিনতার মধ্যে প্রবেশ করে, একবার স্বপ্নের কারাগারে। আবার সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়; আসেও। কিন্তু সাময়িক ওই সামাজিক সঙ্গ তাকে ভেতরে-ভেতরে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।
কবিতা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। পঁচিশ বছর ধরে আমার জীবনে কথাসাহিত্যের ভূমিকার অনুরূপ। অনেক কিছুই তো লিখি। দশটি কাব্যগ্রন্থ, চারটি প্রবন্ধের বই ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আমার পাঁচটি গল্পগ্রন্থ ও একটি উপন্যাস। তবে শুধু কবিতার্চচার মাধ্যমে আমার সৃষ্টিশীল নিঃসঙ্গতা আমি অনুভব করতে পারি সমগ্র সত্তা দিয়ে। ওই নিঃসঙ্গতাকে যথাসাধ্য ফলবান করে তুলতে পারি। আর পরীক্ষা করে দেখতে পারি, আমার অনুভূতিরাশিকে কতখানি প্রকাশ করতে পেরেছে আমারই প্রযুক্ত শব্দমালা। তাই গদ্যের ক্রমবর্ধমান আক্রমণ ও চাহিদার ভেতরও আবার কবিতা না লিখে থাকতে পারি না।