ধানসিড়ি
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৫ ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টির প্রতীকে আমি তোমাকেই ডাকি
নাসির আহমেদ
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের খরতাপে পোড়া মাঠ
যেভাবে ডুবতে চায় প্রবল বর্ষার ধারাজলে
সেভাবে তোমার জন্য অপেক্ষায় আছি
বুকে তুমি আসবে কখন বৃষ্টি মুষলধারায়?
দরিদ্র কৃষক জমি চাষ দিয়ে অপেক্ষায় থাকে
নরম পলির মধ্যে গেঁথে দিতে কচি ধানচারা।
তোমারও কোমল পলি অপেক্ষমাণ?
না কি শুধু আমিই একাকী চাষি অপেক্ষায় পুড়ি!
তোমাকে লোকে যা ডাকে ডাকুক নন্দিতা রূপবতী!
বদলে দিলাম সব নাম; আমি খরাপোড়া জমি
আমার কাঙ্ক্ষিতা তুমি বৃষ্টি অবিরাম স্নায়ুকোষে।
তোমার পলিতে আমি গেঁথে দেবো নীল ভালোবাসা।
জানো তো প্রেমিক ছাড়া কামের সৌন্দর্যশিল্প
বৃথা অন্বেষণ
বলো বৃষ্টি! দরিদ্র কৃষক ছুঁতে পেরেছে কি মন?
না হলে চর্যার যুগে ফিরে যাব বৃষ্টি-বন্দনায়
ধান-দূর্বা উপাচারে ডাকবো তোমাকে
বৃষ্টি! আয় বুকে আয়!
কদম ফুটেছে ডালে
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
বরষা এসেছে কদম ফুটেছে ডালে
আজ মনে পড়ে তার সেই রাঙা মুখ
ঘনবরষায় মুষল বৃষ্টি নামে।
পরাণে আমার প্রাচীন কথার ঢেউ
বুঝে-ও বোঝে না চামেলি চাঁপারা কেউ।
এখন সাগরে জোয়ার এসেছে বুঝি
ফেনায় ফেনায় ঢেকেছে নদীর মুখ
গহন গভীর বাতাসে চিলের ডাকে
চমকি তাকায় মেঘ-ময়ূরের সাথী।
ময়ূর আসেনি কদমের ডালে আর
আনমনে ডাকে, ডেকে যায় ঘুঘু পাখি
আমি তো জেনেছি আগামী বরষা এলে
ওই ঘুঘুটাই ডাকবে শজিনা ডালে।
তুমি কি তখনো তেমনি রবে গো বধূ
আঁচলে লুকাবে তোমার সে-রাঙামুখ
থাকবে কি ওই তিলফুল নাকে নথ!
বরষা এসেছে কদম ফুটেছে ডালে
আজ মনে পড়ে তার সেই রাঙা মুখ
ঘনবরষায় গভীর বেদনা নমে।
ট্র্যাজেডি
রেজাউদ্দিন স্টালিন
বৃষ্টির আগে মেয়েটি দৌড়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল
মেয়েটি প্রাণপণ কিন্তু বৃষ্টি অনেক আগে পৌঁছে যায়
বর্ষার কুয়াশা ঢাকা সব সিঁড়ি
বজ্র শাসাচ্ছে-দরোজা জানলাকে যুদ্ধকালীন সতর্কতা
সব বন্ধ দরজায় করাঘাত করছে মেয়েটি
অন্ধকারের আবর্তে সাদা
অশ্রু বিন্দু সে
তার চোখের চূড়ায় অবাধ্য মেঘ
সে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার কাছে
কিন্তু তাকে বারবার জাপটে ধরে
হিম হাওয়া
বায়ুসেনাদের দীর্ঘ কালোবেষ্টনী থেকে কীভাবে এগুবে
বৃষ্টি কখনও মাকড়সার জাল
কখনও দূর থেকে দেখা সৈকত
বাড়িগুলোর নাসারন্ধ্র দিয়ে বেরুচ্ছে ধোঁয়া
বৃষ্টির রেজর ব্লেড চেঁছে ফেলছে ফেরার আকুতি
দমকা হাওয়ার শ্বাসকষ্ট
জলধারা তৈরি করে নদীর বিভ্রম
স্বরদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ট্র্যাজেডি
মেয়েটি তলিয়ে যেতে থাকে ধীরে
মহানন্দা যমুনার চৌকাঠে
সংক্ষেপিত দীর্ঘ কবিতা
খালেদ হোসাইন
আমি চাকরি করি এক নগরে
বাস করি এক পল্লীতে।
মাঝেমধ্যে আমি যাই বসুন্ধরায়।
যারা আমাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছে
তারা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
কেউ কেউ নিজেই চলে গেছে
কাউকে কাউকে আমি সরিয়ে দিয়েছি
পুকুরে বৃষ্টির ফোঁটা যেমন সরিয়ে দেয়
নিকটের জল।
কেউ এসেছে বন্যার মতো, ভাসিয়ে নিয়ে গেছে
উত্তমাশা অন্তরীপে।
কেউ ভালোবেসেছিল আমার কবিতা
আর কবিতা পড়েই আমাকে উপড়ে ফেলেছে শেকড়বাকড়সহ।
কারও কারও নামই আমি মনে করতে পারি না আর
তারাও কি ভুলে গিয়েছে আমাকে?
সমুদ্রের ঢেউ যেমন ভুলে যায় পর্বতের গুহা?
কেউ গান শুনতে চাইলেও, মনে পড়ে না আমার কথা?
চৌরঙ্গীতে চরাচর অন্ধ করে নেমে আসা
তুমুল সেই বৃষ্টি কি আর নামে না কারও চোখে
গভীর রাতের সঙ্গহীন নৈঃশব্দ্যে?
শঙ্খিনী
আসিফ নূর
সমুদ্রমন্থনের ঢেউফেনায় জন্ম নেয় সর্পরানী শঙ্খিনী,
তারপর চুপচাপ বেড়ে ওঠে অরণ্যের গহিন গুহায়।
অবাধ্য বর্ষার পাহাড়ি ঢলের বাউরি পালকিতে চড়ে
দুখিনী গাঁয়ের বাড়িভিটায় ঢুকে পড়ে সাদাকালো শঙ্খিনী।
তাকে দেখে শঙ্কা নয়, গেরস্তের চোখে জ্বলে আশা।
কেননা সকলেই জানেÑ সর্পরানী শঙ্খিনী শুভবার্তাবাহী;
যার ঘরে আগমন, তার কপালে ফোটে আনন্দকুসুম।

উড়ন্ত রঙিন চিল
এমরান কবির
অর্ধেক কবিতা লিখে একটু বৃষ্টিতে ভিজে
আমি কী করে নিঃশ্বাস নিতে যাই
অর্ধেক কবিতা না-লিখে একটু বৃষ্টিতে না-ভিজে
কী করে আমি কবি হয়ে যাই!
তার চেয়ে লিখে যাই মেঘ-বৃষ্টি-বাতাস
অধ্যাপিকা, আপনিও
বুকের খাতায় এঁকে ফেলেন
কবির কাব্য-কামনার আকাশ
সেখানে বরষা আঁকবেন
বিলের নরম কাদার মতো ছন্দ আঁকবেন
ঠোঁটের উপরে আঁকবেন উড়ন্ত রঙিন চিল
বৃষ্টি-পাখির ঝাপটানিতে ভিজে যাবে
আপনার সবগুলো তিল
এত যে ভেজে, এত যে ভেজায়
আগে বুঝিনি,
অধ্যাপিকা, আপনার ভেতরে এই কথাগুলো
হোক জানাজানি
মোকামে
শামীম হোসেন
জামের রসের মতো হৃদয়ে দাগ লেগে থাকে
আর ভেজা ঠোঁটে ব্যাঙের ভঙ্গিমায় ফুটে উঠছে
বহুদূরের অতীতÑ
মাঝে মাঝে বুকের ভেতর ঘাই মেরে ডাকে।
কী করে সাজাই তবে বালির সংসার!
অহমের ধাতু ক্ষয়ে যে মাঝি ছেড়ে গেছে ঘাট
নৌকাও ভেসে গেছে তার বিপরীত স্রোতে...
ধু ধু জল রেখে গেছে তালাবিহীন শূন্য কপাট
বুকের লকেটে শুধু ঝুলে আছে স্মৃতির ভাঁড়ার।
লেবুর সুগন্ধ ছিল বুঝি তার জিহ্বার টোপে
কবুতরের পাখনায় ধেয়ে আসে অসীম আঁধার
চাতক লুকায় দেখো মেঘের কাতারেÑ
মোকামে এখন বুঝি ব্যস্ত পারাপার...
কাঙালের ছড়ি ঘোরে দেখো এই চোখের ওপর
ভেতরে শ্রাবণ কাঁদে ভেসে যায় বর্ষার ভোর...
নাইওর বর্ষা
স্নিগ্ধা বাউল
আমার মরে যাবার দিনেও এমন বৃষ্টি নাইমো
থইথই জলে ভাসবো গাছের পাতা
বারান্দায় ভিজবো একলা একটা লেবুগাছ
কদমতলায় দাঁড়াইবো ঝিনুকলতা
আমি যেদিন মরেই যাব এমন বৃষ্টি হইবো
দেখতে আইবো না অনেক পরিচিত
মরার আবার পরিচিত কী!
খানখান দুঃখের কথা কানে কানে কইয়ো
এমন বৃষ্টিই আইসো
যেন বৃষ্টির জল ধরফর করে ভিত্রে
কানকুয়া মাছ ভাসে পুকুরের জলে
জাল ভাসে জলের উপরে আর
মেঘনায় ভাসি আমি …
এমন বৃষ্টি নাইমো কাঁচামাটির মতো
যত মাটি তত জল
চোখের সামনে টলমল
বৃষ্টি দিও আকাশ আমার মরে যাবার দিনে
অনেক বৃষ্টিতে মানুষ কেবল নিজের কথাই বলে…
পরস্পর
রিমঝিম আহমেদ
কোথাও যাব ভেবে বিরহী সন্ধ্যায়
কোঁচড় ভরে নিই গোধূলি শিশুদের
হাঁটছে মেঘময়-বিষাদ পাশাপাশি
হাঁটছি আমি আর, তুমিও ছায়ালীন
রক্তহিমায়িত বন্ধ্যা যে-শরীর
ছায়ায় ডুবে গেছে, কেবল মায়াটুকু
তুলেছি আলগোছে পাঁকের কোল হতে
রেখেছি নিরিবিলি নগ্ন বিভাজনে
জীবন রঙচটা ধুলোট সন্তাপে
জীবন, ভারিখাতাÑ ওড়ে না বাতাসেও
শিরার কুঞ্চনে থামে না বিদ্রূপ
কোথাও যাব ভেবে, যাই না কোনোখানে
মগ্ন খুঁজে ফিরি স্মৃতির গ্রামদেশ
আঁচল টেনে ধরে প্রমাদ নাগপাশ
হালকা-ভারি-মেঘে সূর্য ডুবে যায়
খোলামকুচি পড়ে থাকে নিরুত্তর।
বৃষ্টি
তাসনুভা অরিন
ছাড়তে গিয়ে দেখি ধরে রাখা সহজ
ধরতে গিয়ে দেখি ছেড়ে দেয়া সহজ
তাইÑ
একটি শিউলির কাছে জানতে চেয়েছিলাম
বৃষ্টি কী?
‘রোজ সকালে নিয়ম করে ঝরে পড়া’
তারপর বহুদিন আমি শুধু বৃষ্টি হতে দেখেছি
শরীর থেকে আয়ু
মন থেকে ইচ্ছে
সম্পর্ক থেকে মানুষ
সময় থেকে শিশুকাল।
সবকিছু ঝরে পড়ে।
মেঘের রাতে হয়তো কেউ বৃষ্টি ধরে না বলে
বহুদিন ধরে ঝরছি আমিও।
চাষার ঘর
ফারজানা কুইন
খড়ের চালে লাউয়ের ডগা
পাশেই গোয়ালঘর,
ধান জমিতে বান লেগেছে
কৃষক উজাগর।
শূন্য গোলায় ধান জমেছে
ঘরে নতুন চাল,
পৌষ রাতে সুখ নেমেছে
বইছে সোনার পাল।
বর্ষা এবার ফর্সা হলো
রৌদ্র গেল কই,
বুক জমিনে চাষ দেবো
গো
কোথায় গেল সই?
বারো মাইসা বৃষ্টি আমার,
বারো মাইসা সই,
ধান জমিতে সাধ মিটিলো,
বুক জমিনে মই।
ঘাম মেশানো নুন মেশানো
কুঁড়েঘরে রই,
চাষা-চাষির জমিনেতে
বারো মাসই মই।