ইরাজ আহমেদ
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১৮:৩৫ পিএম
চিত্রকর্ম : মোহাম্মদ ইউনুস
ঘুম ভেঙে উঠেই টের পাই কেমন এক পাতলা মিষ্টি গন্ধে গোটা বাড়িটা ছেয়ে আছে। শীতকাল চলছে। বেলা উঠলেও ঘন কুয়াশা পলাতক নয়। উঠানে, গাছের মাথায়, পুকুরের দিকে কুয়াশার পর্দা গভীর নৈঃশব্দ হয়ে ঝুলে আছে। বাড়ির পেছন দিকে রান্না ঘর। অনেক মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। কবে একবার ঈদে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। মনের মধ্যে হাতড়াতে গিয়ে দেখি সেই স্মৃতি অস্পষ্ট সৌরভের মতো রয়ে গেছে।
রান্নাঘরের সামনের উঠানে মাটির চুলায় বড় লোহার কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দেওয়া
হচ্ছে সেমাই আর কোর্মা রান্নার জন্য। কেউ একজন মসলা বেঁটে চলেছে। পুকুর থেকে পানি তুলে
আনতে কেউ বালতি ভরে। বিশাল একটা পাত্রে বিছানো পরিষ্কার গামছার ওপর ধুয়ে রাখা আতপ চাল
ঢালা। কুয়াশা মিশে যাচ্ছে কড়াইতে বলক ওঠা দুধের সঙ্গে। শীতকাল বয়ে চলেছে গ্রামের জীবনে।
প্রায় শুকিয়ে আসা পানির ওপর ভোরবেলা ঝুঁকে বসে থাকে একলা শীত। বক নেমে আসে পুকুরে।
ছটফট করে আবার উড়ে যায়। নীল আকাশ আর সাদা ঠান্ডা মেঘের ছায়া বুকে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে
পড়ে বিশাল পুকুরটা। আমি বহু বছর আগের এক ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে টের পাই শীতের হাওয়ার
সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাড়ি ভর্তি হয়ে আছে ঈদের আনন্দে।
গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে গিয়ে বসি বড় আম্মার বিশাল চওড়া কাঠের
পিঁড়িতে। সেই মিঠা-মাতলা সৌরভ আমাকে টেনে নিয়ে আসে রান্নাঘরের দিকে। দেখি, বাঁশগাছের
মাথাগুলোও যেন সেই সুঘ্রাণ নিতে ঝুঁকে পড়েছে রান্নাঘরের চালার ওপর। নীলা ফুপি রাত জেগে
লাল, নীল কাগজ কেটে মোটা সুতায় আঠা লাগিয়ে সব সেঁটে দিয়েছে। বিচিত্র রঙের কাগজের ঝালরগুলো
ঝোলানো হয়েছে বাড়ির বিভিন্ন বারান্দায়। ত্রিভুজ আকৃতির মতো করে কাটা হলুদ রঙের কাগজ
লাগানো হয়েছে বাইরের ঘরের চালের ধার ঘেঁষে। কুয়াশার ঘন আস্তরণ ভেদ করে নানা রঙ উঁকি
দিচ্ছে। পুরো বাড়িতে ঝলমলে হয়ে জেগে উঠেছে ঈদের দিন।
সকাল সকাল গরুর দুধ দোয়ানো শেষ। সেই দুধ দিয়েই তৈরি হবে দুধের সেমাই
আর মুরগির কোর্মা। বড় পেতলের বাটিতে ধুয়ে রাখা হয়েছে বাদাম, কিশমিশ, দারচিনি আর এলাচ।
ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধের গহিনে একটু পরেই ডুবে যাবে অসংখ্য সেমাই। গরম মসলা সে আয়োজনে
মিশে গিয়ে অদ্ভুত নেশা ধরানো ঘ্রাণ ছড়াবে। বড় আম্মা বাদশা বানু আজকে নিজের হাতে ঈদের
খাবার রান্না করবেন। শীত গায়ে মেখে তিনি বসে আছেন দুধের কড়াইয়ের পাশে। শরীরে জড়ানো
নীল রঙের মোটা চাদর। ব্যস্ত হাতে মাঝে মাঝে নেড়ে দিচ্ছেন দুধ। এই দুধে সেমাই রান্নার
পর চুলায় বসবে কোর্মার হাঁড়ি। দুধ, প্রচুর ঘি, হালকা ভাজা পেঁয়াজ, আদা, জিরার অদ্ভুত
যোগ আর শেষে নামানোর সময় কাঁচামরিচ ছড়িয়ে নামিয়ে নেওয়া ঘন ঝোলের কোর্মা। সেই অপূর্ব
স্বাদ আজও হাহাকারের মতো অপেক্ষায় রাখে আমাকে।
রান্নাঘরে সেমাই ভাজছে দাদু। জর্দা সেমাই তৈরি হবে। লাল লাল হয়ে এসেছে
কড়াইতে স্তূপ করে ঢালা সেমাই। এক পুকুর ঘিয়ের মধ্যে দেওয়া হবে ভাজা সেমাই। ঘি আর অনেক
চিনির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক সময় নরম অথচ ঝরঝরে হয়ে উঠবে সেই সেমাই। পাশের চুলায় পোলাও
চড়বে। কাঠ আর পাটখড়ি আগুনকে তখন উস্কে দিচ্ছে। দাদুর ফর্সা মুখটা আগুনের আঁচে লাল হয়ে
আছে। আজকে পুকুরে জাল ফেলা হবে। বড় কাতলা মাছটাকে ধরার চেষ্টা চলবে। ঈদের দিন লোক এসে
বসে আছে বাইরের ঘরের বারান্দায়। তাদের সঙ্গে বিশাল আকৃতির ঝাঁকা, জাল। শীতকালে পুকুরের
আত্মায় দমবন্ধ করে বসে থাকা নৈঃশব্দ একটু পরেই হারিয়ে যাবে। কুয়াশার মধ্যেই মানুষগুলো
পানিতে নামবে জাল ফেলার জন্য। জালের ঘেরাওয়ের ভিতরে লাফিয়ে উঠবে মাছ। মানুষের উচ্চস্বরে
কথা আর হাসির আওয়াজে পুকুরে বাঁশ পাতা ঝরে পড়বে।
আমি জানি। কেমন করে যেন জানি! গ্রামজুড়ে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ার সব
দৃশ্য আমার খুব চেনা।
গ্রামের বাড়ির বিশাল রান্নাঘর। কত কী যে ছড়ানো চারপাশে! কোনো বাটিতে
পেঁয়াজ কুচি করে রাখা। কোনটাতে মসলা। গামলাভর্তি পানি। দাদুর পাশে আরেকটা মাটির চুলায়
বেগম পিঠা তৈরি করছে। শীতের সকালে চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি হবে বড় বড় চিতোই পিঠা। আগের
রাতের বাসি সবজি, বুটের ডাল দিয়ে হবে বাড়িভর্তি মানুষের নাস্তার আয়োজন। সঙ্গে যোগ হবে
ফুল তোলা কাচের বাটিতে যত্ন করে বেড়ে দেওয়া গুড়ের পায়েস। সেই পায়েসের সৌরভ ছড়িয়ে পড়বে
বাইরের ঘর পর্যন্ত। কত কে আসবে বাড়িতে। তারা উত্তরের ঘরের বারান্দায় রাখা লম্বা কাঠের
বেঞ্চিতে বসে শীতের সকালে ঘন দুধ আর গুড় মেশানো চা খাবে। চা খেতে খেতে সেমাই হয়ে গেলে
তাদের পরিবেশন করা হবে। অনু ভাবী চায়ের কাপ হাতে ব্যস্ত হয়ে এ-ঘর ও-ঘর করছেন। উত্তর
ঘরের বারান্দার কাঠের ঠুনিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন অলেক ভাই। তার দুধ দোয়ানোর কাজ শেষ।
ঈদের দিনেও তার পছন্দের এক বাটি মুড়ি আর চা সামনে রাখা। চা খেয়ে পুকুরে মাছ ধরার তদারকিতে
লেগে যাবেন।
হাাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছন দিকে ঘাসের জঙ্গল ঠেলে সড়কে নামি। বন্ধ
প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় বসে কারা যেন রেডিও শুনছে। কুয়াশা সরে গিয়ে রোদ মুখ বাড়াচ্ছে
চারপাশে। পায়ের তলায় শিশিরে ভেজা ঘাস। এক ঝাঁক টিয়া পাখি আমাকে চমকে দিয়ে উড়ে যায় ছড়িয়ে
পড়া সূর্যের আলো ভেদ করে। পা চালিয়ে অনেকটা দূর গিয়ে এক নদীর সঙ্গে দেখা। পায়ে তার
ঘুঙুর বাঁধা। চলে যেতে যেতে সে আমাকে এক মুখে দাঁড় করিয়ে রেখে বলে যায়, সে এমনি করে
আসে, এমনি করেই যায়। শীতকালের নদী শীর্ণ। ঈদের ছুটি হয়ে গেছে লঞ্চ ঘাটেও। সকালে নরসিংদী
অথবা নবীনগর থেকে কোনো লঞ্চ আসেনি। কুয়াশাও কাটেনি নদীর বুক থেকে। দু-একটা গয়নার নৌকা
দোল খাচ্ছে সামান্য ঢেউয়ের আঘাতে। ল্যাবার মিষ্টির দোকান খোলা। উচ্চস্বরে রেডিওতে গান
বাজছে সেই কতকাল আগে। মদন কাকার দোকানের সবুজ রঙ করা কাঠের দরজায় তালা ঝুলছে। শূন্য
ডিজেলের ড্রামগুলো বয়স্ক মানুষের মতো এক জায়গায় অবসন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে। মিষ্টির দোকানের
চালায় কে যেন রঙিন কাগজ কেটে কেটে আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে ঈদের দিন মনে রেখে। বাজারে
তবুও লোকজন এসেছে ঈদের নামাজ শেষ করে। পেতলের ঘটিভর্তি দুধ বিক্রি করতে এসেছেন কেউ।
কারও সামনে ক্ষেত থেকে আনা ফুলকপি, মুলা আর বেগুন। হয়তো এই ছোট্ট বাজারটা একটু পরেই
উঠে যাবে। গ্রামের পথে ঈদের দিনের দুপুরে ধুলো উড়িয়ে ঘরে ফিরবে মানুষ। সামান্য পোলাও
আর ঝাল মুরগির মাংস মেখে তারা সারবে আহার। সেমাইয়ের আয়োজন থাকবে থালার পাশে। শীতের
রোদমাখা দিনে তারা অনেকটা পথ হেঁটে চায়ের দোকানে গিয়ে গোটা বিকাল কাটাবে গল্প করে।
অলস সময় বয়ে চলে। দূরের বাজার থেকে আবার পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরি। শীতের
আড়মোড়া ভাঙা ঘ্রাণ তখনও লেগে আছে গাছের শরীরে, খড়ের গাদায়। পানের বরজের ওপর ছোট মাচায়
শিশির মেখে ঘুমিয়ে আছে চালকুমড়া। ঘুঘু ডাকে অলস দুপুর ভেদ করে। ভীষণ নীল হয়ে থাকা আকাশে
বক উড়ে যায় নদীর দিকে আরও পশ্চিমে। আমি জানি, বাড়িতে খাবার ঘরে অনেকেই খেসে বসে গেছে।
বড় চৌকির ওপর পাটি পাতা হয়েছে। থালা বাসন সাজিয়ে রাখছেন ভাবী। বড় আম্মা রান্না শেষ
করে পশ্চিমের ঘরের বারান্দায় বসে হাতমুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। দাদু ইস্ত্রি করা সাদা থান নিয়ে
যাচ্ছেন পুকুরে। শীত কেটে গিয়ে গোটা বাড়িটাকে ঘিরে ধরেছে উৎসবের আলো। বড় কাচের রেকাবিতে
বাড়া হয়েছে বড় বড় আলু আর পাতলা ঝোলে মাখামাখি গরুর মাংস, ঘন কোর্মা, ঝাল ঝাল মুরগির
পদ। সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ ভাসছে বাতাসে। নীলা ফুপি রাতে পেতে রাখা নরম দইয়ের বাটি
রেখে যাচ্ছে চৌকিতে। কত মানুষ সার দিয়ে বসে খাচ্ছে ঈদের রান্না। নসুদা, খোকনদা, এনামদা,
নুরুদা, বাবা... তাদের হাসির শব্দে উঠানে নামা পায়রারাও উড়ে পালাচ্ছে। একটু পরেই বড়
আম্মা আর দাদু এখানে খেতে বসবে। মা আর মেয়ে। দুজনই দরজার দিকে পিঠ দিয়ে বসবে। তাদের
ভাঙা ভাঙা গল্পে বয়ে যাবে অলস সময়।
শীতের দুপুর ফুরিয়ে আসে। দূর থেকে মাইকে অস্পষ্ট গান ভেসে আসে। কোনো
গ্রামে ঈদের দিনে যাত্রার মঞ্চ বসেছে হয়তো। হাওয়া ক্রমে তার ধারালো দখল নিশ্চিত করে।
কুয়াশা নামে ধীরে। স্কুল বাড়িতে রেডিওটা এখনও বন্ধ হয়নি। ফুরিয়ে আসে উৎসবের দিনটা।
বহু বছর আগে কোনো এক নির্জন গ্রামে উৎসবের ওপর পর্দা নামে। কিন্তু স্মৃতি? স্মৃতি আজও
উড়তে থাকে কখনও উৎসবের ছোঁয়া লাগা বাতাসে।