হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আর্ট গ্যালারি ঘুরে চিত্রকর্ম দেখছেন শিল্পী রফিকুন নবী।
গ্রীষ্মের উজ্জ্বল বিকাল। রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আর্ট গ্যালারিতে চলছে শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদারের একক চিত্র প্রদর্শনী। যার শিরোনাম ‘ও মৃত্যু ও নৃত্য’। প্রদর্শনীর এমন নামের কারণে কৌতূহল জাগল চিত্রকর্মগুলো দেখার। তাই যথাসময়ে উপস্থিত হই ওই শিল্পের প্রাঙ্গণে।
প্রায় অর্ধশত চিত্রকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে গ্যালারির দেওয়াল। শিল্পকর্মগুলোর আয়তন ছোট, কিন্তু দীপ্তিতে গভীর। দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ কেউ খুঁজছেন শিল্পকর্মের গূঢ়ার্থ। সবগুলোর কাজের মধ্যে বিষয় ও আঙ্গিক একই। ফর্মও একই। লতাগুল্মের রেখার ভাঁজে মিলছে প্রাণীর চোখ। ঝড়ের বিরুদ্ধে, রঙ আর মৃত্যুর ধাঁধা, প্রত্যঙ্গ আর মৃত্যুর বিভা, ঝরা পাতার নাচ, আত্মার উৎসব, রক্ত ও জেগে ওঠা, নিহত নর্তকীগণ, অজস্র তৃণের উৎসব ও সমাধি, মৃত্যুর পরের গম্বুজসহ আরও কাজের শিরোনামের সঙ্গে প্রদর্শনীর শিরোনামের মূলভাব ফুটে উঠেছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে।
কাজগুলোতে রূপকল্পের প্রকাশ ঘটেছে যথাযথভাবে। বর্তমানে আমাদের সমাজব্যবস্থা ভাঙনের বিধ্বংসী স্রোতের কবলে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে একজন শিল্পী রঙতুলির আঁচড়ে তৈরি করেন সুন্দরের পথ। শিল্পী মোবাশ্বির আলমও এর ব্যতিক্রম নন। সৃজন বেদনায় কাতর হয়েই বুঝি তিনি প্রতীকী সাংকেতিক ভাষায় প্রকৃতির বিরুদ্ধ চলা আচরণে প্রতিবাদমুখর হয়েছেন।
তার সৃষ্টির সঞ্জারিত সুরের অবগাহনে ভেসে গিয়ে দেখা যায়, জবাফুল, লতাপাতা, বট, বিশাল বিশাল গাছগুলোর নৃত্য। সেই গাছগুলোর ভেতরে ফুটে তোলা হয়েছে নারীর নৃত্য। চোখ। কিছু চিত্রকর্মে দেখা যাচ্ছে, বৃক্ষ কর্তনের নগ্ন উল্লাস। ওই কাজটিতে আবার দেখা যাচ্ছে পাখির ক্রন্দন। এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে এসেছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। বরেণ্য এ শিল্পী চিত্রকর্মগুলো সম্পর্কে মন্তব্যে বলেন, ‘আকৃতির ভেতরে যেমন নানা আকৃতি আছে, নানা সূক্ষ্ম বিস্তার আছে, তেমনি সার্বিকভাবে সবটা মিলে তিনি যেভাবে পরিসরটা বিন্যস্ত করেছেন, সেখানে তার অনুভূতির রেশটা আমরাও অনুভব করতে পারি। তার মধ্যে ছন্দিতভাব দেখতে পাই, দৃঢ় কাঠামোও দেখতে পাই। নানা কিছু নিয়ে তিনি তার ভেতরের ভাবনার ঢেউগুলোকে মূর্ততা দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন।’
এই শিল্পীর চিত্রকর্মগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় প্রাণ-প্রকৃতির জয়গানই তার মূল সুর। প্রকৃতিতে যদি পাখির নিরাপদ না থাকে সেখানে মানুষও নিরাপদ নয়। অর্থাৎ প্রকৃতির উপাদানের সহাবস্থান প্রয়োজন। সেই চেতনাটিই শিল্পী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তার সৃজনসম্ভারের মাধ্যমে। প্রদর্শনীতে দেখা হয়, শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদারের সঙ্গে। তার কাজের পিছনের গল্প জানতে চাইলে এ শিল্পী বলেন, আমরা প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে এক টুকরো আকাশ খুঁজি। দেখি গাছের কঙ্কাল। পাথরে পা রেখে হাঁটতে হাঁটতে শুনি মানুষের কলরব। শুকনো পাতার আর্তনাদ। অজস্র গাড়ির হর্ন একযোগে বেজে উঠলে শুরু হয় মেঘের নাচ। নেচে ওঠে হাতঘড়ি, তার সূক্ষ্ণ কাটা, লাল ওড়না, ছুরি।’
প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গ্যালারির দরোজা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। শিল্প সমঝদারেরা চিত্রকর্মগুলো ক্রয় করতেও পারবেন। এর মধ্যে কিছু কাজ বিক্রিও হয়েছে। যেগুলোতে পরানো হয়েছে লাল টিপ। ৬ মে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর পর্দা নামবে ১০ মে ২০২৫ তারিখে।