নূর তাজমিন নীর
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:৩৪ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৫ ১৩:৪৯ পিএম
সমস্ত দুঃখ বেদনা অতিক্রম করে এক সীমাহীন আনন্দলোকে প্রবেশ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের গানে। তিনি একই সঙ্গে কবি, সুরকার, গীতিকার, গায়ক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রবন্ধকার, শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, নাট্যকার, অভিনেতা, নাট্য-প্রযোজক, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, সংগীত গবেষক প্রভৃতি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্র তাঁর কর স্পর্শে শুধু সমৃদ্ধই হয়নি, বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
আমরা যাকে আধুনিক যুগ
বলি তার সর্বক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে অবস্থান করে আছেন রবীন্দ্রনাথ। সংগীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে
তাঁর অবস্থান তো সবারই জানা, সংগীত ভাবনার ক্ষেত্রেও যে রবীন্দ্রনাথই আমাদের মননযাত্রার
অগ্রপথিক হয়ে রয়েছেন তার প্রমাণ তাঁর আজীবনের রচনাগুলির মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। বাংলা
গান, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত, শ্রদ্ধার সংগে গাইতে/শুনতে গেলে তাঁর সংগীতচিন্তা-ভাবনার
সংগে অথাৎ তাঁর গানের বাণী, সুর, ভাব এবং তাল ও ছন্দের সাথে আমাদের পরচিয় একান্তই দরকার।
সংগীতকে সমৃদ্ধ ও নান্দনিক
করতে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও প্রচেষ্ঠার অন্ত নেই। তাঁর জীবনে নানা সময়ে নানা আলোচনার
মধ্য দিয়ে সংগীত ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। প্রবন্ধ, অভিভাষণ, পত্রাবলী, আলাপ-আলোচনা, গ্রন্থ
সমালোচনা প্রভৃতির মাধ্যমে তাঁর সংগীত বষিয়ক ভাবনা প্রকাশিত। যে প্রশ্ন গুলো নিয়ে রবীন্দ্রনাথের
সংগীত ভাবনা সে গুলো বলা যায় সংগীত সম্বন্ধে সম্ভাব্য সব প্রশ্ন। যেমন - সংগীতের উদ্দেশ্য,
কথা ও সুরের সম্পর্ক, রাগে ভাবের অভিব্যক্তি, সংগীতের অনির্বচনীয়, সংগীতের প্রকাশ ভঙ্গি
ও সংগীতের কলা-কৌশলের স্থান ইত্যাদি ।
অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক
হয়ে দাঁড়িয়েছিল রবীন্দ্রনাথ- দিলীপ কুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ- ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
আলাপ-আলোচনা। এই তিন মহারথীর মধ্যে পত্র বিনিময় ও কথা বার্তায় যে সংগীতালোচনা গড়ে উঠেছিল
বাংলা সংগীত আলোচনা সাহিত্যে তা এক অক্ষয় সম্পদ রুপে পরিগণিত হয় । তিনি মনে করেন, আর্টের
প্রধান তত্ত্ব তার পরিমিতি। কেননা রূপকে সুব্যক্ত করাই তার কাজ। বিহিত সীমার দ্বারা
রূপ সত্য হয়। সেই সীমা ছাড়িয়ে অতিকৃতিই বিকৃতি। সুবিহিত সমাপ্তির মধ্যেই আর্টের পর্যাপ্তি।
রবীন্দ্রনাথ এ কথাও
বলেছেন যে, সংগীতের মূখ্য উদ্দেশ্য হল ভাব প্রকাশ করা এবং ভাবোদ্দীপনে তালেরও বিশিষ্ট
অংশ আছে। তাল ও ছন্দ ভাব প্রকাশের একটি অংগ। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন “ কি কি সুর
কি রূপে বিন্যাস করিলে কি কি ভাব প্রকাশ পায় এবং কেনই বা পায় তার অনুসন্ধান প্রয়োজন।”
তাঁর ব্যাখ্যা অনুসারে সুখ ও দু:খের রুপ দু’রকমের।
“দুঃখের রাগিণী দুঃখের রজনীর ন্যায় অতি ধীরে ধীরে চলে, তাহাকে প্রতি কোমল স্বরের উপর
দিয়া যাইতে হয়। আর সুখের রাগিণী সুখের দিবসের
ন্যায় অতি দ্রুত পদক্ষেপে চলে।” সুতরাং ভাব দেখিয়ে দেয় সুরের পথ, আর সুর দেখিয়ে
দেয় তালের পথ।
সংগীতের একটা প্রধান
অঙ্গ তাল। আমাদের আসরে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা এই তাল লইয়া। গান বাজনার ঘোড় দৌড়ে গান জেতে
কি তাল জেতে এই লইয়া বিষম মাতামাতি। দেবতা যখন সজাগ না থাকেন তখন অপদেবতার উৎপাত এমনি
করিয়াই বাড়িয়া ওঠে। স্বয়ং সংগীত যখন পরবশ তখন তাল বলে আমাকে দেখো, সুর বলে আমাকে, কেননা
দুই ওস্তাদে দুই বিভাগ দখল করিয়াছে। দুই মধ্যস্থের মধ্যে ঠেলাঠেলি কর্তৃত্বের আসন কে
পায় , মাঝে হইতে সংগীতের মধ্যে আত্মবিরোধ ঘটে।
তাল জিনিসটা সংগীতের
হিসাব বিভাগ। এর দরকার খুবই বেশি সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দরকারের চেয়েও কড়াকড়িটা
যখন বড় তখন দরকারটাই মাটি হইতে থাকে। তবু আমাদের দেশে এই বাঁধাটাকে অত্যন্ত বড়ো করিতে
হইয়াছে, কেননা মাঝারির হাতে কর্তৃত্ব। গান সম্বন্ধে ওস্তাদ অত্যন্ত বেশি ছাড়া পাইয়াছে।
এই জন্য সঙ্গে সঙ্গে আর এক ওস্তাদ যদি তাকে ঠেকাইয়া না চলে তবে তো সে নাস্তানাবুদ করিতে
পারে। কর্তা যেখানে নিজের কাজের ভার নিজেই লন সেখানে হিসাব খুব বেশি কড়া হয় না। কিন্তু
নায়েব যেখানে তার হইয়া কাজ করে সেখানে কানাকড়িটার চুলচেরা হিসাব দাখিল করিতে হয়। সেখানে
কন্ট্রোলার আপিস কেবলই খিটিখিটি করে এবং কাজ চালাইবার আপিস বেজার হইয়া ওঠে। কবিতায়
যেটা ছন্দ, সংগীতে সেইটেই লয়। এই লয় জিনিসটি সৃষ্টি ব্যাপিয়া আছে, আকাশের তারা হইতে
পতঙ্গের পাখা পর্যন্ত সমস্তই ইহাকে মানে বলিয়াই বিশ্বসংসার এমন করিয়া চলিতেছে। অথচ
ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে না। অতএব, কাব্যেই কী, গানেই কী, এই লয়কে যদি মানি তবে তালের সঙ্গে
বিবাদ ঘটিলেও ভয় করিবার প্রয়োজন নাই।
তিনি তাঁর গানে নতুন
তাল গঠন করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি বাণী ও সুরের বিষয়টি ভেবে অর্থাৎ বাণীকে গুরুত্ব দিয়ে
এবং তার উপর সুরারোপ করে গুনে গুনে দেখেছেন যে গানটির মাত্রা সংখ্যা কত এবং কী তাল
ও ছন্দে ছন্দিত হয় ।
তাল সম্পর্কে নিজস্ব ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতেই রবীন্দ্রনাথ
ছয়টি তাল রচনা করেন ।
এগুলো হচ্ছে: ১। ঝম্পক ২।
ষষ্ঠী ৩। রুপকড়া
৪। নবতাল ৫।
একাদশী ৬। নবপঞ্চ।
এই তালসমূহের বিশেষ
বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এদের গঠনে কোন ফাঁক রাখা হয়নি। আমাদের তালের গঠনে তালি-খানি, তাল-ফাঁক,
বা আঘাত-অনাঘাত, বলে একটা ব্যাপার আছে। রবীন্দ্রনাথ এই ফাঁক জিনিসটি বর্জন করেন। তালের
তাগিদে তিনি গান রচনা করেননি । বরং গানের তাগিদে তাল সৃষ্টি করেছেন অর্থ্যাৎ কথার সুর
ও ছন্দের উপর নির্ভর করে তাল নির্ধারণ করেছেন।
নিখুঁত চিন্তার এই মানুষটি
এমন ভাবে তার বাণীকে সুর, ছন্দ ও তালে বেঁধেছেন যে কারো বাহাদুরী বা খবরদারী কিংবা
ওস্তাদী করার কোন উপায় বা প্রয়োজন নেই। তাই তো তিনি বলেছেন-“ আমি গান রচনা করতে করতে,
সে গান বার-বার নিজের কানে শুনতে শুনতে বুঝেছি যে, দরকার নেই ‘প্রভূত’ কারুকৌশলের।”
তাঁর সংগীত ভাবনার মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রোতাকে আকৃষ্ট করা, হৃদয় গ্রাহ্যি করা।
রবীন্দ্রনাথের গানে বাণী আর সুরের সঙ্গে ছন্দের বিচিত্র লীলা রয়েছে।
এ থেকে তাঁর গানের বৈচিত্র্য উপলব্ধি করা যায়। ছন্দোবিভঙ্গ সৃষ্টির নানান রকমফের আছে।
তাঁর গানে কখনো বাণীর অনুপ্রাস দিয়ে ছন্দের প্যার্টান তৈরি হচ্ছে। কখনো সুরের তানে
চমকপ্রদ স্বরবিন্যাসে , কখনো বা বাণী আর সুরের পরস্পর লীলায়। সুর আর বানী অথবা সুর
আর ছন্দের পরস্পর সংঘাতে তৈরি হয়েছে লীলাময় গতিভঙ্গি। তালে সংগীতের গতির পরিচয়ধারা
থাকে। শুধু তাই নয়, প্রতি পদক্ষেপে মাত্রাবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যে ছন্দের কত বিভঙ্গ সৃষ্টি
হতে পারেÑ তারই কিছু আলোচনা করব। রবীন্দ্রনাথ হয়ত বিশ্বনৃত্যে বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্ব
সংসার ঘুরে চলেছে নৃত্যের ছন্দে। তাঁর গানে আছে- বিশ্বতনুতে অনুতে অনুতে কাঁপে নৃত্যের
ছায়া। নটরাজের নৃত্যের তালে তাল রেখেই চলছে বিশ্বভুবন।
অনুভূতির ভাষায় একটা ছন্দ থাকবে, হোক না গদ্যছন্দ অথবা পদ্যছন্দ । অনুভূতির ছন্দ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, পূর্ণিমার সমুদ্রের মতো তালে তালে তাহার উত্থান-পতন হইতে থাকে, তালে তালে তাহার ঘনঘন নিশ্বাস পড়িতে থাকে। কথা বলিতে বলিতে তাহার বাধিয়া যায়, কথার মাঝে মাঝে অশ্রু পড়ে, নিশ্বাস পড়ে, লজ্জা আসে, ভয় হয়, থামিয়া যায়। ‘আবেগের দীর্ঘনিশ্বাস ছন্দিত হয়ে ওঠে কবিতায়, গানে। তবে কবিতা ও গানে ভেদ কোথায়? রবীন্দ্রনাথের ভাবনায়- কবিতার যেখানে শেষ, গানের সেখানে শুরু। কবিতার বাণীকে সুর নানা ভঙ্গিতে ইঙ্গিতে নানা ভাবে ভরে তুলতে পারে। সংগীতে সুরের ভাষা বিচিত্র ভাবের ভাষা হয়ে গানকে বহুমাত্রিক রুপ দিতে পারে । তার উপরে আছে ছন্দগতি। তালের বিন্যাসও সুরের ভাবকে নতুন ব্যঞ্জনা দেয় । তিনি ’হায়’ কথাটি দিয়ে কবিতা ও গানের বেলায় দেখিয়েছেনÑ কবিতায় ’হায়’ কথাটি একবার সনি:শ্বাসে উচ্চারিত হয়ে সেখানেই শেষ হয়ে যায়। অথচ গানের সুরে ’হায়’ কথাটির বহু বিস্তার ঘটতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে
রাগ-রাগিনী বিশ্ব-সৃষ্টির মাঝে নিত্য আছে। ভৈরোঁ যেন ভোর বেলায় আকাশেরই প্রথম
জাগরণ। পরজ যেন অবসন্ন রাত্রি শেষে নিদ্রাবিহ্বলতা। কানাড়া যেন ঘনান্ধাকারে
অভিসারিকা নিশীথিনীর পথ বিস্মৃতি। ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চির বিরহ বেদনা।
মুলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তি নিঃশ্বাস। পূরবী যেন শূন্য
গৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্র“ মোচন।
নতুন কে জানার অদম্য
স্পৃহা রবীন্দ্রনাথকে মত্ত করেছিল সৃষ্টির নেশায়, যে নেশায় বুঁদ হয়ে তিনি একের পর এক
সৃষ্টি করেছেন অপূর্ব সব শিল্প । এত বছর পরেও তাঁর সৃষ্টি আমাদের কাছে বিস্ময়। তাঁর
ভাবনা, তা যে বিষয়ে-ই হোক Ñগল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, চিত্রকলা, সংগীত সবই বাংলা
সাহিত্যে এক একটি রতœ।
তিনি খুব শঙ্কিত ছিলেন
যে, তাঁর গানে যেন কেউ স্ট্রিম রোলার না চালায়; গানের রসটিকে পিশে চ্যাপ্টা যেন কেউ
না করে। সংগীত নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা এত বেশি যত্নে গড়া ছিল যে তাঁর গান-ই তার প্রমাণ।
শুনলে যেন মনের মধ্যে মাধূর্য নিবিড় হয়। তাই তো তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন “আমার
সৃষ্টির আর কিছুই মানুষ মনে রাখুক বা নাই রাখুক আমার গান তারা শুনবে।”