জহিরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:১৬ এএম
পাঠকের হাতে বই তুলে দিতে অসামান্য ভূমিকা রয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের। বইমেলার বিষয়-আশয় নিয়ে মাওলা ব্রাদার্স এর স্বত্বাধিকারীআহমেদ মাহমুদুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন জহিরুল ইসলাম
মাওলা ব্রাদার্সের শুরুর গল্পটা শুনতে চাই…
আমার পিতামহ খানবাহাদুর জিয়াউল হক মাওলা ব্রাদার্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ। ’৪৭ সালের দেশভাগের আগে তিনি ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক (বর্তমানে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই তিনি আরবি বিষয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন।
আপনি কীভাবে এলেন প্রকাশনা জগতে?
মাওলা ব্রাদার্স প্রতিষ্ঠার পরে আমার পিতামহ ইন্তেকাল করলে আমার ছোট চাচা আহমেদ আতিকুল মাওলা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্ব নেন এবং কর্ণধার হন। দুর্ভাগ্যবশত ১৯৭৩ সালে তার অকালপ্রয়াণের পর আমার বড় ভাই মরহুম আহমেদ মাহফুজুল হক (জাহাঙ্গীর) মাওলা ব্রাদার্স পরিচালনার দায়িত্ব নেন এবং ১৯৮৬ সালে আমার পিতা মরহুম আহমেদ মসিউদ্দৌলা আমাকে দায়িত্ব দেন। সেই থেকে প্রকাশনার জগতে আছি।
এবারের বইমেলা ঘিরে আপনার প্রত্যাশার কথা জানতে চাই…
’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এক নতুন বাস্তবতায় বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অমর একুশে বইমেলা লেখক-প্রকাশক-পাঠকের মিলনমেলা। আশা করব যেন এর ব্যত্যয় না ঘটে। মেলা পরিচালনা কর্তৃপক্ষ যেন সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখেন। তা ছাড়া মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও বইমেলা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মুক্তবুদ্ধির চর্চায় যেন বিঘ্ন না ঘটে।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে কী করলে বইমেলা আরও আকর্ষণীয় হতে পারে?
যেহেতু বইমেলা সবে শুরু হয়েছে, তাই এ মুহূর্তে মেলার কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি সম্পর্কে কিছু বলা কঠিন। তবে আমি একটি কথা বলতে চাই, সরকার বিভিন্ন খাতে প্রচুর ভর্তুকি প্রদান করে থাকে, তাই বইমেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষ (বাংলা একাডেমি) প্যাভিলিয়ন/স্টল ভাড়া বাবদ যে টাকা নেয়, তা যেন কমপক্ষে ৫০% কমানো হয়। এ ব্যাপারে যেন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্যোগ গ্রহণ করেন; যেন ২০২৬ সালের বইমেলায় তা কার্যকর করা যায়।
মাওলা ব্রাদার্স থেকে এ পর্যন্ত কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে?
মাওলা ব্রাদার্স থেকে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে।
এবারের বইমেলায় কয়টি বই প্রকাশ করছেন? তার মধ্যে কোনগুলো আপনি উল্লেখযোগ্য মনে করেন?
এ বইমেলায় প্রায় ৫০টি বই প্রকাশিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য হলো : আনু মুহাম্মদের গণঅভ্যুত্থানের বাংলাদেশ : ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪; বাংলাদেশে প্রথম ভারতীয় হাইকমিশনার সুবিমল দত্তের (প্রাক্তন আইসিএস কর্মকর্তা) ডায়েরি ও অপ্রকাশিত Mission to Bangladesh ভিত্তি করে সুবিমল সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক (১৯৭২-১৯৭৫); সিরাজ উদ্দিন সাথীর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই মুক্তিযুদ্ধের ভিতর বাহির; কালজয়ী অন্যতম রুশ সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভ্স্কির জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে মশিউল আলমের অনূদিত ১০টি প্রবন্ধের সংকলন বিষয় দস্তয়েভ্স্কির; দস্তয়েভ্স্কির স্ত্রী আন্না দস্তয়েভ্স্কয়ার স্মৃতিকথা; আমার দস্তয়েভ্স্কি; অর্থনীতিবিদ রিজওয়ানুল ইসলামের ভ্রমণকাহিনী খুঁজি পৃথিবীর মুখ; ড. সেলিম জাহানের Bangladesh : contemporary development issues; অর্থনীতিবিদ সনৎ কুমার সাহার সাহিত্য সম্পর্কিত প্রবন্ধ সংকলন বাস্তবতার মাত্রাবিচার : সাহিত্যবিষয়ক কয়েকটি প্রবন্ধ; জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী অনূদিত শেকস্পিয়রের সনেট; দ্বিজেন শর্মার কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন : প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা; মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও দ্বিজেন শর্মা অনূদিত ভারতবর্ষের ইতিহাস; এমএ মাসুমের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিময় ও অর্থায়ন (নতুন পরিমার্জিত সংস্করণ); প্রকৌশলী লে. কর্নেল এম আলাউদ্দীন (অব.)-এর অনূদিত কুরআনের সব আদেশ-নিষেধ; আবু জাফর অনূদিত চার্লস স্টুয়ার্টের বাংলার ইতিহাস; রোখসানা চৌধুরীর নারীবাদী সাহিত্য-সমালোচনা তত্ত্ব ও তিনজন কথাসাহিত্যিকের নির্বাচিত পাঠ বিশ্লেষণ।
বর্তমানে প্রকাশনা জগতের প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?
দেশে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কাগজের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি হওয়ায় প্রকাশকরা নতুন বই প্রকাশ ও আগের প্রকাশিত বইয়ের পুনর্মুদ্রণে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন, তাই কাগজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার যেন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বই কেনার বরাদ্দ বেশ অপ্রতুল, তা বাড়ানো উচিত। বই সংগ্রহে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বই কেনা, তাতে প্রকাশকরা কিছুটা আর্থিক ভিত্তি পেতে পারেন।
একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পের সম্ভাবনার কথাও শুনতে চাই…
বর্তমানে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ২০০ অনার্স ও মাস্টার্স পাঠদানকারী কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাতটি অনার্স ও মাস্টার্স পাঠদানকারী কলেজ, অনেক নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অনার্স ও মাস্টার্সে মানসম্মত পাঠের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পাঠ্য ও রেফারেন্স বই। আমরা আশা করব, এ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র প্রকাশকরা কাজে লাগাবেন এবং পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করছি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ ও আপনাকে মাওলা ব্রাদার্স ও আমার ব্যক্তিগত তরফ থেকেও ধন্যবাদ।