আহসান হাবীব
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৪৯ পিএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:১৮ পিএম
প্রতিকৃতি : মাসুক হেলাল
ধ্রুব এষের জন্মদিন উপলক্ষে একটা লেখা চাইল মোবারক। সে নাকি ধ্রুবর জন্মদিন উপলক্ষে একটা ফাটাফাটি পাতা করবে, মানে সে যে পাতার দায়িত্বে আছে সেই পাতায়। মোবারক আমার বিশেষ প্রিয়ভাজন, কেন প্রিয়ভাজন সেই কারণটা কিন্তু অদ্ভুত। সে থাকে মানে তার বাড়ি চিনাধুকুরিয়ায়; এই একটা কারণেই সে আমার প্রিয়। চিনাধুকুরিয়াটা কোথায়?
এখানে বলে নেওয়া ভালো আমার একটা ট্রাভেল ম্যাগাজিন আছে নাম ‘ট্রাভেল এন্ড ফ্যাশন’ সেই সূত্রে দেশবিদেশ ঘোরা অনেক ট্রাভেলার মাঝেমধ্যে আমার অফিসে আসে। তাদের আমি প্রায়ই প্রশ্ন করি
Ñআচ্ছা আপনি তো অনেক দেশ ঘুরেছেন চিনাধুকুরিয়া গেছেন?
ট্রাভেলার হকচকিয়ে যায়।
Ñএটা কোথায়? খুব সম্ভব চিনের উত্তর প্রদেশে... তাই না?
আমি হো হো করে হাসি। হ্যাঁ... চিনাধুকুরিয়া আসলে বাংলাদেশের একটা জায়গা। পাবনা আর সিরাজগঞ্জের মাঝে একটা বিচ্ছিন্ন হাওর এলাকা। যেখানে আমাদের মোবারকের বাড়ি। ‘চিনাধুকুরিয়ার মেয়েটি’ এই নামে একটি বইও লিখে ফেলেছি গত মেলায়; নামটা আমার এতই পছন্দ তাই।
যা হোক প্রিয়ভাজন সেই মোবারক যখন ধ্রুবর জন্মদিনের ওপর লেখা চাইল তখন না করি কীভাবে? কেউ মারা গেলে বেশ আবেগ নিয়ে লেখা যায়, কত সত্য মিথ্যা স্মৃতি এসে ভিড় করে, সেগুলো ইধার কা মাল উধার উধারকা মাল ইধার করে দিব্যি একটা লেখা খাড়া করে ফেলা যায়। কিন্তু জন্মদিন উপলক্ষে লেখা কঠিন কাজ। আমার তাই ধারণা।
বলাই বাহুল্য, ধ্রুব এষও আমার প্রিয়ভাজন অনেক আগে থেকেই। তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় বইমেলায়। আমার তখন ‘দিনরাত্রি’ নামে একটা প্রকাশনী ছিল; ব্যাপারটা এমন না যে আমার বড় দুই ভাই লেখক বলে আমি প্রকাশক ছিলাম। তারা তখন বিদেশে ছিল। সে যাই হোক, আমি আমার স্টলে বসে আছি। সেবার তরুণ কবি মোস্তাক আহমেদের প্রথম একটা বই করেছি; বইটার নাম ‘সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট’। প্রচ্ছদটা করেছি আমি নিজেই কোলাজ এবং অ্যাবস্ট্রাক্ট টাইপের প্রচ্ছদ। সেবার প্রচ্ছদটা সবাই বেশ প্রশংসাই করেছিল। প্রচ্ছদটা বেশ ভালো হয়েছে সেটা আমারও মনে হচ্ছিল। একদিন এক পিচ্চি রোগা লম্বা টাইপের ছেলে এসে বইটা হাতে নিল, কিছুক্ষণ দেখল তারপর বলল ‘এটা আপনি করেছেন?’ আমি গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লাম। মনে মনে ভাবলাম ‘তুমি এসব প্রচ্ছদের কী বুঝবে হে পুচকে ছেলে?’
ধ্রুব এষের সঙ্গে সেই আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তারপর তো ইতিহাস। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ মানে একটা বইকে আরেক ধাপ এগিয়ে দেওয়া। ক্রমে ক্রমে ধ্রুব এষ যেন হয়ে উঠল প্রচ্ছদের কবি। বিখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনকে যেমন বলা হয় ‘ছবির কবি’ সে রকম ধ্রুবও হয়ে উঠল ‘প্রচ্ছদের কবি’। তার প্রচ্ছদে কেমন প্রভাব সেটা বলিÑ
আমার পরিচিত এক তরুণ লেখক বই বের করবে। সে খুবই উত্তেজিত। তারপর হঠাৎ শুনি বই বের করবে না। কেন?
Ñকেন বই বের করলে না? আমি প্রশ্ন করি।
Ñধ্রুবদা প্রচ্ছদ দিতে পারেনি। ধ্রুবদার প্রচ্ছদ ছাড়া বই বের করব না। দেখি আগামী বছর ...। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তরুণ।
আরেকটা ঘটনা। এ তরুণ অবশ্য বই বের করেছে। প্রচ্ছদটা বিচ্ছিরি। আমি বললাম এ প্রচ্ছদ কে করেছে?
Ñকেন ধ্রুবদা
Ñবইয়ের পাতা উল্টে দেখি প্রচ্ছদে সত্যিই ধ্রুবর নাম। কিন্তু আমার বিশ্বাস হলো না। এ প্রচ্ছদ ধ্রুব করতে পারে না।
আমার মনোভাব বুঝতে পেরে সেই তরুণ লেখক কানের কাছে ফিসফিস করে। ‘প্রচ্ছদটা আসলে আমিই করেছি। ধ্রুব এষের নাম দিয়ে দিয়েছি ইচ্ছে করে।’
Ñকেন? আমি বেশ কড়া চোখে তাকাই তার দিকে।
Ñধ্রুব এষের প্রচ্ছদ বললে দুয়েক কপি বিক্রি হয়, আমার বই কে কেনে বলেন?
এই হচ্ছে আমাদের প্রচ্ছদের কবি ধ্রুব এষ। আমার চোখের সামনে বেড়ে ওঠা এক অন্য রবীন্দ্রনাথ। তার এখনকার গেটআপে তাকে রবীন্দ্রনাথই লাগে আমার কাছে। সে লিখে সে আঁকে সে অনেক কিছু করে। তার জন্মদিনে শত বছরের অগ্রিম শুভেচ্ছা। সে আরও আরও অনেক প্রচ্ছদ করবে, আমাদের চমকে দেবে প্রতিটি প্রচ্ছদেই।
শুভ জন্মদিন প্রিয় ধ্রুব এষ।