বিদায় ২০২৪
আহমেদ বাসার
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৬:১৯ পিএম
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিসরে ২০২৪ এক অবিস্মরণীয় বছর। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন জেঁকে বসা স্বৈরশাসকের পতন যেমন রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে; তেমনি সাহিত্য ক্ষেত্রেও নিয়ে এসেছে নতুন উদ্দীপনা। সিরিয়ায়ও পতন ঘটেছে স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের। আমেরিকায় ট্রাম্পের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনও মনোযোগ কেড়েছে বিশ্ববাসীর। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণআক্রোশ বিগত বছরের এক উল্লেখযোগ্য বিষয়। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গত বছরের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আমরা ফিরে দেখার চেষ্টা করব এ আলোচনায়।
ঝরে যাওয়া ফুল
হেলাল হাফিজ (৭ অক্টোবর, ১৯৪৮Ñ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৪) : বাংলাদেশের কবিতার এক বিস্ময়পুরুষ কবি হেলাল হাফিজ। প্রথম কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশের পরই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ গ্রন্থটি অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায়। গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। এ গ্রন্থের ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ লাইনটি রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। প্রেম, দুঃখ ও বিরহ চেতনার তীব্র প্রকাশের দক্ষতাই গ্রন্থটি তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এ ছাড়া তার ‘কবিতা একাত্তর’(২০১২) ও ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’(২০১৯) নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি লাভ করেন। তবে অগণিত পাঠকের ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
গোলাম মুরশিদ (৮ এপ্রিল, ১৯৪০Ñ২২ আগস্ট, ২০২৪) : বাংলাদেশের একজন কৃতী লেখক ও গবেষক গোলাম মুরশিদ বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে মৌলিক গবেষণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন নিয়ে লেখা ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থটি মধুসূদন গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ কালান্তরে বাংলা গদ্য, রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর, রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, বিদ্রোহী রণক্লান্ত, উজানস্রোতে বাংলাদেশ, বিলেতে বাঙালির ইতিহাস প্রভৃতি। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, আনন্দ পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
হায়দার আকবর খান রনো (৩১ আগস্ট, ১৯৪২Ñ১১ মে, ২০২৪) : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ লেখক হায়দার আকবর খান রনোর পৈতৃকনিবাস নড়াইলে।
মার্কসবাদ ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার বিকাশে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শতাব্দী পেরিয়ে, ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব, পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা, মার্কসবাদের প্রথম পাঠ, শ্রেণি দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথ, মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ, বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারা, পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
ইসমাইল কাদারে (২৮ জানুয়ারি, ১৯৩৬Ñ১ জুলাই, ২০২৪) : ‘আধুনিক হোমার’ খ্যাত বিশ্বনন্দিত কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক ইসমাইল কাদারে’র জন্ম আলবেনিয়ায়। লেখালেখির শুরুতে কবিতায় মনোনিবেশ করলেও উপন্যাস লিখেই তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন সব সময়। প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আমির’ মূলত রূপক ও বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শানিত শিল্পপ্রতিবাদ। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো দ্য থ্রি-আচড ব্রিজ, দ্য পিরামিড, দ্য প্যালেস অব ড্রিম, দ্য ফল অব দ্য স্টোন সিটি প্রভৃতি। তিনি ম্যানবুকার পুরস্কার, জেরুজালেম পুরস্কার প্রভৃতি লাভ করেন।
উইলিয়াম রাদিচে (১৯৫১Ñ১০ নভেম্বর, ২০২৪) : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমী উইলিয়াম রাদিচের জন্ম যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। বাংলা সাহিত্য বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। অক্সফোর্ডে তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করে তিনি ডি.ফিল ডিগ্রি লাভ করেন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তার অনুবাদে হয়ে ওঠে ‘দ্য পোয়েম অব দ্য কিলিং অব মেঘনাদ’। রবীন্দ্রসাহিত্য ব্যাপকভাবে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশ শতকের শেষাংশে বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরির পেছনে তার অনুবাদগুলোর ভূমিকা ছিল অবিসংবাদী। এ ছাড়া উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনির বই’ তিনি অনুবাদ করেছিলেন ‘দ্য স্টুপিড টাইগার অ্যান্ড আদার টেলস’ নামে।
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ( ৯ এপ্রিল, ১৯৫০Ñ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪) : বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম লেখক ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ছোটদের উপযোগী ছড়া ও কবিতা লিখে খ্যাতি লাভ করেন। ‘জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’ কিংবা ‘আ-মরি বাংলা ভাষা’ তার জনপ্রিয় ছড়া। লেখালেখিতে তিনি নিরন্তর নিরীক্ষায় বিশ্বাসী। সামাজিক স্যাটায়ার তার লেখায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মজার ছড়া, সোনালী ছড়া, ডাইনোছড়া, রবীন্দ্রনাথ নইলে অনাথ, ছড়ায় ছড়ায় সত্যজিৎ প্রভৃতি। তিনি শিশুসাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, ছড়া সাহিত্য পুরস্কার, সুকুমার রায় পদকসহ শতাধিক পুরস্কার লাভ করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
নোবেল পুরস্কার : সাহিত্যে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার-২০২৩ লাভ করেন দক্ষিণ কোরিয়ার কথাশিল্পী হান ক্যাং। তীক্ষ্ণ কাব্যিক গদ্যের জন্য তাকে এ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। দ্য ভেজিটেরিয়ান উপন্যাস লিখে তিনি বিশ্বপরিসরে খ্যাতি ও স্বীকৃতি লাভ করেন। উপন্যাসটি ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লাভ করে। সহিংসতার কারণে মানসিক ট্রমার শিকার এক নারীর মাংস খেতে অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে উপন্যাসের মূল টানাপড়েন শুরু হয়, যা তার পুরো পরিবারে বিপর্যয় নিয়ে আসে। তিনি প্রথম এশীয় নারী নোবেল বিজয়ী এবং কিং দে জুংয়ের পর দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরীয় যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো দ্য হোয়াইট বুক, হিউম্যান অ্যাক্টস, দ্য গ্রিক লেসনস প্রভৃতি।
বুকার পুরস্কার : ‘অরবিটাল’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার-২০২৪ পান যুক্তরাজ্যের লেখক সামান্থা হাভের। দুজন পুরুষ ও চারজন নারী মহাকাশচারীর আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে কাটানো একটি দিন অনন্য ভাষায় রূপায়ণের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার : কায়রোস উপন্যাসের জন্য ২০২৪ সালের ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার লাভ করেন জার্মান লেখক ও অপেরা পরিচালক জেনি এরপেনবেক ও অনুবাদক মাইকেল হফম্যান। দুই প্রজন্মের অসমবয়সি নরনারীর প্রেমের গল্প উঠে এসেছে আলোচ্য উপন্যাসে, যেখানে মূল চরিত্রদ্বয় হ্যান্সের বয়স ৫৩ আর ক্যাথরিনার মাত্র ১৯।
পুলিৎজার পুরস্কার : কবিতা, কল্পকাহিনী, নাটক ও আত্মজীবনীর জন্য ২০২৪ সালে পুলিৎজার পুরস্কার প্রদান করা হয়। কবিতায় ‘ত্রিপাস : পোয়েমস’-এর জন্য আমেরিকান কবি ব্র্যান্ডন সোম, নাটকে ‘প্রাইমারি ট্রাস্ট’-এর জন্য আমেরিকান নাট্যকার ইবোনি বুথ, আত্মজীবনীতে ‘লিনিয়াস ইনভিনসিবল সামার : আ সিস্টাসর্ সাসর্ ফর জাস্টিস’-এর জন্য মেহিকান লেখক ক্রিস্টিনা রিভেরা গাজা, নাইট ওয়াচ কল্পকাহিনীর জন্য আমেরিকার কথাকার জেইন অ্যান ফিলিপস এ বছর পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার : বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে কবিতায় শামীম আজাদ, কথাসাহিত্যে নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর ও সালমা বাণী, গবেষণায় জুলফিকার মতিন, অনুবাদে সালেহা চৌধুরী, নাটকে মৃত্তিকা চাকমা ও মাসুদ পথিক, শিশুসাহিত্যে তপংকর চক্রবর্তী, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় আফরোজা পারভীন ও আসাদুজ্জামান আসাদ, ফোকলোরের জন্য তপন বাগচী, সুমনকুমার দাশ প্রমুখ এ পুরস্কার লাভ করেন।
একুশে পদক : ভাষা ও সাহিত্যে ২০২৪-এ একুশে পদক লাভ করেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (মরণোত্তর), মিনার মনসুর, মুহম্মদ সামাদ ও ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন।