রফিকউল্লাহ খান
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৪৫ এএম
চিত্রকর্ম : মনিরুল ইসলাম
প্রচারমাধ্যম সাহিত্য-শিল্পের প্রকৃতি ও গতিপথ নির্ধারণে কতটা ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে, বর্তমান সময় তার প্রমাণ। শিল্প সৃষ্টি নিঃসন্দেহে ব্যক্তির একান্ত অধ্যবসায় ও তপস্যার ফল। কিন্তু সেই নির্জন তপস্যার অর্জন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায় কতটা শিল্পস্রষ্টার নিজের আর কতটা অন্যদের, তা বিতর্কসাপেক্ষ। অথচ এ নির্বস্তুক দায়বোধই সাহিত্যকে সমাজায়ত ও গণমুখী হতে ভূমিকা পালন করেছে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন এবং গৃহবাসীর সৃষ্টির সঙ্গে বাইরের জগতের সংযোগের সেতু প্রতিষ্ঠায় সাময়িক পত্র ও সংবাদপত্রের ভূমিকার দিকটিই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে। বিগত দুই শতাব্দীব্যাপী সাহিত্যের বিচিত্রমুখী প্রচার ও প্রসারে, পাঠকসংখ্যার অভাবনীয় বিস্তারে সংবাদপত্রের ভূমিকা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।
দুই.
উনিশ শতকের বাংলাভাষী ভূখণ্ড ভারতবর্ষের যেকোনো ভূভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল জাতীয় চেতনার দ্বন্দ্ব ও গতির আবর্তে। এ ভূখণ্ডেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়; আবার এ ভূখণ্ডেই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের চেতনা সর্বাগ্রে অঙ্কুরিত ও বিকশিত হতে থাকে। রাজসভা থেকে সাহিত্যের গতিবিধি জনসভা তথা জনগণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে শুরু করে। বাংলা ভাষার প্রথম ‘গণমাধ্যম’ ‘সমাচার দর্পণ’ (১৮১৮)-এর প্রকাশ শব্দশিল্পকে পৌঁছে দেয় সাধারণ শিক্ষিত মানুষের দোরগোড়ায়। ভাষার মুদ্রিত রূপ কেবল গ্রন্থাগার কিংবা পণ্ডিতের টেবিলে নয়, তা পৌঁছে যেতে থাকে অল্পশিক্ষিত মানুষের হাতে হাতে। ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৮৩১) প্রকাশের ফলে এ জনসভার সাহিত্যচর্চার গতি হয় আরও বেগবান, বৃহত্তর জনজীবনমুখী। সাহিত্যিকের হাত কীভাবে রাজসভা থেকে জনসভা, জনসভা থেকে বৃহত্তর লোকজীবনমুখী হয়ে ওঠে, ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রমাণ। তিনি ছিলেন একাধারে সম্পাদক, কবি, কর্মী, সংগঠক, আবিষ্কারক। প্রথমে সাপ্তাহিক রূপে প্রকাশিত হলেও ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন দৈনিক রূপে আত্মপ্রকাশ করে সংবাদ প্রভাকর। বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলির সমান্তরালে লুপ্তপ্রায় সাহিত্যকর্ম আবিষ্কার, লোকসাহিত্য আবিষ্কার ও প্রকাশ এবং নতুন লেখকদের রচনা প্রকাশ এ পত্রিকার অনন্য ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রমাণ করেছে। বিভিন্ন সভাকবি এবং পাঁচালিকারের রচনা সংগ্রহ ও প্রকাশ তার অতুলনীয় কীর্তি। সাহিত্যচর্চা বেগবান, বিতর্কমূলক ও গণমুখী করার লক্ষ্যে তিনি ‘সংবাদ রত্নাবলী’, ‘সংবাদ সাধুরঞ্জন’ ও ‘পাষণ্ডপীড়ন’ নামে আরও তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। অক্ষয় কুমার দত্তের সম্পাদনায় ১৮৪২ সালে প্রকাশিত সাময়িক পত্র ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় কেবল তত্ত্ববিদ্যা, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, বিজ্ঞান ও ভূগোলবিষয়ক প্রবন্ধের সঙ্গে নারী শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের সমর্থন এবং বাল্যবিবাহবিরোধী উচ্চমানের প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) পত্রিকার প্রকাশ বাংলা সাময়িক পত্রের জগতে অনন্যসাধারণ ঘটনা। সৃষ্টিশীলতা ও মননচর্চা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জীবনে সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে বঙ্গদর্শনের ভূমিকা ঐতিহাসিক। এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি পত্রিকার কথা আমাদের বিষয়ভাবনার সূত্রেই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বাংলা, ইংরেজি, ফারসিসহ কয়েকটি ভাষায় সুপণ্ডিত, বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক প্যারীচাঁদ মিত্র মহিলাদের ‘হিতকরী’, ‘মাসিক পত্রিকা’ (১৮৫৪) সম্পাদনা করে বাংলা সাময়িকীর জগতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। ডিরোজিওর অন্যতম শিষ্য, বাংলার নবজাগরণের মূলধারার সাধক প্যারীচাঁদ মিত্র নারী শিক্ষা, নারী অধিকার এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের বহুবিধ অসঙ্গতি দূর করার লক্ষ্যে সাহিত্য সৃষ্টি ও পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। উল্লেখ্য, উনিশ শতকে সাময়িক পত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশই ছিলেন লেখক, কবি, অনুবাদক, কথাশিল্পী কিংবা প্রাবন্ধিক। উনিশ শতকে কেবল কলকাতাকেন্দ্রিক জীবনেই নয়, বর্তমান বাংলাদেশ থেকেও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাময়িক পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তৎকালীন সমাজের দলিল হিসেবে ওইসব পত্রিকার মূল্য অপরিসীম। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ’ (২০০৬) গ্রন্থসূত্রে আমরা জানতে পারি ১৮৫৭ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ থেকে ২৪১টি সাময়িক পত্র-সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। তার মতে, ‘...পূর্ববঙ্গে প্রকাশিত ২৪১টি সংবাদ সাময়িকপত্রের অনেকগুলোই ছিল সাপ্তাহিক এবং নিয়মিত। যেমন “ঢাকা প্রকাশ”-এর আয়ু তো ছিল প্রায় এক শ’ বছর। কালীপ্রসন্ন ঘোষ সম্পাদিত সাহিত্য মাসিক “বান্ধব”কে অনেকে আখ্যা দিয়েছিলেন “দ্বিতীয় বঙ্গদর্শন” বলে।’
উনিশ শতকের বাংলার সাময়িক পত্র-সংবাদপত্রের ইতিহাস বাংলার নবজাগরণেরই শিল্পফসল। ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশের পর থেকে সাহিত্যচর্চার সমান্তরালে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণ, নতুন লেখক সৃষ্টি যেমন বৃদ্ধি পেতে থাকে, তেমন শিক্ষার প্রতিও বৃদ্ধি পেতে থাকে মানুষের আগ্রহ। উনিশ শতকের এ নব্যশিক্ষিত বাঙালি তরুণরাই বাংলা সাহিত্য বিশ্বমানে উন্নীত করেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় থেকেই বাঙালির সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে সাময়িক পত্র ও সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও ঘটে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভারতের এ সর্বব্যাপ্ত গণজাগরণে ইংরেজের সুবিধাভোগী ও অনুগত কতিপয় দ্বিধান্বিত মধ্যবিত্ত ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা নামক বোধটি ভাব থেকে বস্তুগত অভিজ্ঞানে পরিণত হয়। লেখকদের মধ্যে রাজনীতিসচেতনতা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। সংবাদপত্রগুলোও এ বিষয়ে অনেক বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সিপাহি বিপ্লবকালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সোমপ্রকাশ’ (১৫ নভেম্বর, ১৮৫৮) পত্রিকার ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তীকালের অনেক পত্রিকার মধ্যেই সোমপ্রকাশের প্রভাব লক্ষ করা যায়। পূর্ববঙ্গের প্রথম সংবাদপত্র ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ আত্মপ্রকাশ করে ১৮৪৭ সালে। ১৮৬০ সালে রংপুর থেকে আরও একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ নামে। ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র ‘ঢাকা প্রকাশ’ কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় ১৮৬১ সালে যাত্রা করে। অনেকটা কলকাতার সোমপ্রকাশের আদলে পরিকল্পিত এ পত্রিকার প্রভাব জনজীবনে কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়েছিল। কুমারখালীর বাংলা পাঠশালার শিক্ষক কাঙ্গাল হরিনাথ ১৮৬৩ সালে মাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেন। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে রচনা ও সংবাদ থাকলেও প্রধানত নীলকর ও জমিদারদের কৃষকের ওপর শোষণ-নিপীড়নের তথ্যনির্ভর রচনা প্রকাশের জন্য পত্রিকাটি খ্যাতি লাভ করে। সমাজ সংস্কার আন্দোলন, নারী শিক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা, পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে জনজীবনে সচেতনতা সৃষ্টি প্রকাশিত সাময়িক পত্র ও সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য ছিল। রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী পত্রিকা যে ছিল না তা বলা যাবে না। কিন্তু সমাজগতির চারিত্র্যই ছিল প্রগতি ও আলোকমুখী; মনুষ্যত্বের অপার সম্ভাবনার শত উৎসমুখ খুলে দেওয়ার প্রতি। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ এ মহাকালের একেকটি শিল্পস্তম্ভ। এঁরা প্রায় সবাই গৃহকোণ থেকে নিজেদের সৃষ্টি সাময়িক পত্রের পাতায় তুলে ধরেন। এবং সম্পাদনা করেন একাধিক পত্রিকা।
তিন.
ঐতিহাসিক কারণেই উনিশ শতকের নবজাগরণে বাঙালি মুসলমানের অংশগ্রহণ বিলম্বিত ও বিঘ্নিত হয়। জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় ওই নবজাগরণকে খণ্ডিত বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু বাঙালি মুসলমান বিশ শতকের প্রথম তিন দশকে অতিদ্রুত তাদের এ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং রুশ বিপ্লবের রক্তিম অভিজ্ঞতার ছোঁয়া তাদের নবজাগরণের তারুণ্যদীপ্ত উদ্দীপনার সঙ্গে সাম্যবাদী রাজনীতির গণমুখী চেতনা যুক্ত করে দেয়। উনিশ শতকেও বাঙালি মুসলমানের সম্পাদনায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। তবে অধিকাংশই রক্ষণশীলতা এবং পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছে। সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে এককভাবে বাংলাকে গ্রহণের দ্বিধা তাদের সৃষ্টিশীলতা ও মননচর্চা গতিশীল করতেও ব্যর্থ হয়েছে। যেমন, ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে শেখ আলিমুল্লাহর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সমাচার সভারাজেন্দ্র’ বাংলা ও ফারসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৮৪৬ সালে মৌলভী ফরিদুদ্দীন খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জগদুদ্দীপক ভাস্কর’ নামক সাপ্তাহিক সংবাদপত্রটি ছিল পঞ্চভাষিক। উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানদের সম্পাদনায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হলো মীর মশাররফ হোসেনের সম্পাদনায় মাসিক পত্র ‘আজীজন নেহার’ (১৮৭৪), শেখ আবদুর রহিম সম্পাদিত সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘সুধাকর’ (১৮৮৯), মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক পত্র ‘হিতকরী’ (১৮৯০) প্রভৃতি অসাম্প্রদায়িক, হিন্দু-মুসলমানের মিলনকামী এবং বাংলা ভাষায় সামবায়িক ও জীবনমুখী সাহিত্যচর্চার ধারা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া শেখ আবদুর রহিম সম্পাদিত ‘মিহির’ (১৮৯২), ‘মিহির ও সুধাকর’ (১৮৯৫), ‘কোহিনুর’ (১৮৯৮)Ñ সম্পাদক : এস কে এম মহম্মদ রওশন আলী, মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘লহরী’ (১৯০০), সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত মাসিক সাহিত্যপত্র ‘নবনূর’ (১৯০৩), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘বঙ্গীয়-মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’ (১৯১৮) প্রভৃতি বাঙালি মুসলমানকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিসচেতন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যমনস্ক এবং মননমুখী হতে সহায়তা করে। ‘সমাচার দর্পণ’ (১৮১৮) প্রকাশের ১০০ বছর পরে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মাসিক সাহিত্যপত্র ‘সওগাত’। উদার ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, মুক্তবুদ্ধির চর্চায় বিশ্বাসী, মুসলমান সমাজে নারীমুক্তি আন্দোলনের সমর্থক এবং মুসলমান তরুণদের মধ্যে নতুন নতুন লেখক সৃষ্টি ও তাদের কার্যকর সহায়তা সওগাতের অনন্যতার পরিচয় বহন করে। ইতিহাসের মানদণ্ডে বিচার করলে এ দীর্ঘজীবী পত্রিকা (১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর পত্রিকার অফিস কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসে এবং নতুন পর্যায়ে প্রকাশিত হতে থাকে) বাঙালি মুসলমানের জীবনচেতনার আধুনিকায়নে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) বিশিষ্ট হয়ে ওঠে চলিত গদ্যরীতির প্রয়োগ ও সংযতবাক, বুদ্ধিদীপ্ত শিল্পসাধনার বিপ্লবী উদ্যোগের কারণে। ‘বঙ্গদর্শন’ থেকে ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) বাঙালির সৃষ্টিশীল সাধনা ও মননচর্চার ক্ষেত্রে যে গতি, বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির ধারা সৃষ্টি করেছিল, ‘সওগাত’ থেকে ‘শিখা’ (১৯২৬) পর্যন্ত সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হলো বিশ্বজনীন জ্ঞানসাধনা, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন গণমানুষের মুক্তির সংগ্রাম এবং মুসলিম সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ। ‘শিখা’ ছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুখপত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে গঠিত এ সংগঠনের কার্যক্রম ঢাকার নবাববাড়ির রক্ষণশীল রক্তচক্ষু ও গোঁড়া মুসলমানদের দ্বারা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু যাঁদের মত ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট; মুক্তি সেখানে অসম্ভব’Ñ তাঁদের মুক্তচিন্তার লেখনী থামানো যায়নি। ১৯১৮-২৬ এ সময়সীমায় বাংলা সাময়িক পত্রের জগতে এক নবধারার সৃষ্টি হয়। প্রকাশিত হয় কয়েকটি ভিন্নধারার সাময়িক পত্র। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম থেকে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও আবদুর রশীদ সিদ্দিকীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মাসিক সাহিত্যপত্র ‘সাধনা’। মোজাম্মেল হকের সম্পাদনায় ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় ’মোসলেম ভারত’ পত্রিকা। এ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা নানা কারণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাও পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে। মোসলেম ভারতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যের মাধ্যমে ‘উত্থানপ্রয়াসী’ ও ‘পতিত’ মুসলমান সমাজের কল্যাণসাধন এবং তৎসহ হিন্দু-মুসলমান মিলন দৃঢ়তর করা। কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সম্পাদনায় ১৯২০ সালে ‘নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমর্থক এ দৈনিক পত্রিকার আর্থিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছিলেন এ কে ফজলুল হক। রাজরোষে পড়ে নবযুগের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যাত্রালগ্ন থকেই ধূমকেতু ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মিলনের সমার্থক হয়ে ওঠে। এ পত্রিকাই প্রথম রাজনীতিতে স্বরাজের পরিবর্তে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করে : ‘ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের ওপর।’ পত্রিকায় সরকারবিরোধী রচনার জন্য কাজী নজরুল ইসলাম কারারুদ্ধ হন। সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ (১৯২৫) পত্রিকা শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপত্ররূপে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদধন্য এ পত্রিকা সম্ভবত এ দেশে কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচারের কাজে প্রথম বাংলা সাময়িক পত্র। প্রধান পরিচালক : কাজী নজরুল ইসলাম; সম্পাদক : মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে এ পত্রিকা কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ সম্পাদিত ‘গণবাণী’ (১৯২৬) পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়। লাঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গণবাণী ‘বয় কৃষক ও শ্রমিক দলের মুখপত্রে রূপ লাভ করে।
কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পরে ‘কল্লোল’ (১৯২৩) পত্রিকা কেন্দ্র করে বাংলার সাহিত্যজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। সাহিত্যের সব রূপের বিষয় ও শিল্পচেতনায় রবীন্দ্রনাথকে অতিত্ক্রম করার প্রয়াস প্রবল হয়ে ওঠে। কলকাতাকেন্দ্রিক এ সাহিত্য আন্দোলনের ভিত্তি যে ঢাকায় সূচিত হয়েছিল, সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেনের বক্তব্যে তার প্রমাণ সুস্পষ্ট : ‘কল্লোলের বীজ বপন হইয়াছিল ঢাকায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলের ছাত্রদের বার্ষিক পত্রিকা “বাসন্তিকা”য় (১৯২২)। স্বভাবতই বিদ্যালয় ও ছাত্রনিবাসের আওতায় এ বীজ সতেজে প্ররূঢ় হইতে পারে নাই। কল্লোলের প্রবাহ কিছুদূর গড়াইলে পর ইহার একটি কচি শাখা বাহির হইয়াছিল ঢাকায়Ñ “প্রগতি” (১৯২৭)।’ বাংলাদেশের সাময়িক পত্র ও সাহিত্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ ঘটনার গুরুত্ব অপরিসীম।
১৮১৮ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা অনেক; যার অধিকাংশই ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ভিন্ন মাটি, মানুষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে সাহিত্য আন্দোলনের অঙ্কুর ঢাকাতেই উপ্ত হয়েছিল। আর শাখাপ্রশাখার পরিচর্যা ও বৃদ্ধি ঘটেছিল ১৬৬ বছরের ঔপনিবেশিক বাংলার রাজধানী কলকাতায়। ‘১৯২৬ সালে নবপর্যায়ে সওগাত বেরুবার আগে ও পরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সাধনা, ভাস্কর, বঙ্গনূর, নবনূর, আঙ্গুর, ধূমকেতু, সাম্যবাদী এবং শিখা, জাগরণ, বুলবুল, নওরোজ, জয়তুসহ কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বার্ষিক, ত্রৈমাসিক, মাসিক, সাপ্তাহিক বেরিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এসবের কোনো কোনোটার আরো অগ্রসর ভূমিকার প্রতিশ্রুতিও ছিল। তবে ড. আনিসুজ্জামানের তথ্যানুযায়ী ১৯১৮ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত প্রকাশিত পত্র-পত্রিকার প্রকাশ সংখ্যা ৮২। কোনোটাই দীর্ঘায়ু হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সওগাত ও মোহাম্মদীই ধারাবাহিক এবং প্রধান সাময়িকপত্রের ভূমিকা পালন করেছে।’ (হাসান হাফিজুর রহমান : ‘সওগাত থেকে সমকাল’) ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ নানা দিক থেকে সওগাত-পরবর্তী সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পত্রিকা।১৯২৭ থেকে ১৯৩১ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বছর এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বর্ষের সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আবুল হুসেন, পরবর্তী দু’বছর সম্পাদনা করেন কাজী মোতাহার হোসেন এবং শেষ দুই খণ্ড যথাক্রমে আহম্মদ আবদুর রশীদ ও আবুল ফজল। শিখার নতুন আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি ওই কালের বাঙালি জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে বলা যাবে না। কিন্তু কালান্তরে শিখায় প্রকাশিত রচনাগুলো নানামাত্রিক তাৎপর্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে ধরা পড়ে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাত্র চার বছর পর ঢাকা থেকে ১৯৫১ সালে সওগাত পত্রিকা নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। শিখা গোষ্ঠীর অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে সিকান্দার আবু জাফরের উদ্যোগ ও সম্পাদনায় উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকাল’ প্রকাশিত হয়। হাসান হাফিজুর রহমানের মন্তব্য এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য : ‘আশ্চর্য যোগাযোগ বলতে হবে। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ এবং সমকাল বস্তুত মুসলিম সাহিত্য সমাজ, শিখা এবং সওগাতেরই উত্তরসূরি, ঐতিহ্যধারায় পুষ্ট। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে এই তরুণ দল এবং নবীন পত্রিকার যাত্রা শুরুও হলো শিখা আর সওগাতের সম্পাদকদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সমন্বয়ী হাত ধরে। যে মানবিক মূল্যবোধ সওগাতে ভিত্তি পেয়েছিল, ৪০ বছর পর সমকালেই তা নতুন উদ্ভাবনা খুঁজে পেল। সওগাতের নেতৃত্বের অবসান ঘটেছিল। সমকালের নেতৃত্ব শুরু হলো।’ সমকাল যে ধারার সূত্রপাত করে তার প্রেরণা থেকেই ‘উত্তরণ’ ও ‘কণ্ঠস্বর’-এর মতো সৃষ্টিশীল সাহিত্য ও শিল্পসচেতন পত্রিকার প্রকাশ এবং ‘স্বাক্ষর ও সুনিকেত মল্লার’-এর মতো মৌলিক ও ব্যতিক্রমী লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের সাময়িক পত্রিকার জগৎ সমৃদ্ধতর করেছে।
দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সাল থেকে সূচিত ভাষা আন্দোলন, ১৯৫২-এর জাতিসত্তার রক্তিম উজ্জীবন এবং পরবর্তী সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এ ভূখণ্ডের সাহিত্য সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার জগতে নবধারার সূত্রপাত করে। দৈনিক পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ সংখ্যার মাধ্যমে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মাঝে নব্য বিকাশমান স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতিসত্তার অঙ্কুরিত আকাঙ্ক্ষা পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রতিদিনের রাজনীতি সাহিত্যের বিশুদ্ধ শিল্পলোককে হয়তো বা কিছুটা রক্তাক্ত করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজায়ত চেতনার রূপায়ণে একটা জাতিগত স্বতন্ত্র চরিত্র অর্জন করে। ১৯৪৭-৭০ সময়ে এ দেশে প্রকাশিত সাময়িক পত্রের সংখ্যা ৫০০ (সূত্র : শামসুল হক : বাংলা সাময়িকপত্র (১৯৪৭-৭০)। এসব সাময়িক পত্রের মধ্যে প্রগতিবাদী, আধুনিক চিন্তাধারার সাময়িক পত্রের পাশাপাশি পাকিস্তানবাদী সাহিত্যিক আবর্জনাও কম ছিল না। তবে সেসব পত্রিকা ষাটের দশকের শেষান্তে এসেই অন্তর্হিত হতে শুরু করে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্রোত বাংলাদেশের সাহিত্যলোককেও নতুন সম্ভাবনার পথে ধাবিত করে।