× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এখন নদী-জল

আরিফুল হাসান

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৮ এএম

এখন নদী-জল

কোন দিকে বয়? কোন দিকে বেয়ে চলে তরণি? কে? তখন রাত তিনটা, মানুষের ঘুমের স্বপ্নের ভেতর তামার রঙ ঢুকে গেলে মানুষ প্রশংসিত বেশ্যা, আর মানবীর দীর্ঘশ্বাসের মায়ামন্ত্র হয়ে নির্ঘুম তলায় তলিয়ে গেছে। চোখের কিরণ মুছে গেছে, তামাদি উশুল হয়ে অশ্রুপ্রবাহ উৎক্ষেপণের মন্ত্রের মতো আজব ঊনদিশায় হাহাকার বুকে খাঁখাঁ ফিরছে। তখন মানুষ ঘুমায়। বেড়াল দুটো জেগে ওঠে। তারা রমণের অপেক্ষায় পরস্পর পরস্পরের নির্ঘুম রাতের প্রতিপক্ষ হয়ে হামলে পড়ে। চোখের শিশিরে শীতকাল তখন। না, ঘুম নেই কোনো উদাসীর চোখে। সে হয়তো মানুষ নয়, হয়তো মানুষের ছায়া তার মধ্যে কখনও ছিল, না হলে রাতের এমন অস্থির যাপনে তার নিঃসঙ্গ-সংগীত সুরে মূর্ছনায় উর্বর হয়ে উঠত না কালক্ষেপণে। আক্ষেপের বিষয়, তার এমন আজদাহা স্বপ্নের ভেতর রাতের জেগে থাকা এবং বেড়ালের ঝগড়া আপেক্ষিক কোনো সম্পর্ক বোঝাতে চাইলেই উদাসী তা দূরে রাখে। কোথায় রাখে? কোন খেয়ালে বয় চোরা নদীর স্রোতে? কোন পাহাড়ের উজান থেকে, কোন ঝরনার জল থেকে নেমে এসে এমন ভাসালে রাতটাকে? উত্তরগুলো অজানা।

না, ঘুম নেই। এ চোখে স্বপ্নের বদলে নেমেছে সর্বনাশ। সর্বস্বান্ত ভূমিসাৎকল্পে যখনই অকস্মাৎ উদাসী খুন হয়ে ওঠে আর জেগে থাকা দুই বেড়ালের ঝগড়ার পর নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তখন বিভাজনের দেয়াল তুলে কে হৃদয়ের দুটি ভার্টিবা ছুড়ে দেয় দূরে দূরে, হিমালয়ে অথবা কুহেতুরে। কেন? কেন এমন অস্থিরতা ভরা রাতের ভেতর নির্গন্ধের মানুষ কখনও অস্থিপাকে, কখনও দুর্বিপাকে নিজেকে নিমজ্জন করাতে পারে, কে পারে? কে পারে না?

যা হোক, সংঘাতটা বাধে। দুই রাস্তার নিভৃত অন্তরালে বেড়ালগুলো শান্ত হয়ে এলে দুই গ্রুপের দুজন করে চারজন, চারজন করে আটজন, ষোলো জন পর্যন্ত নামে। উদাসের তখন ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। বড় ঘুম পায়। কিন্তু ঘুমায় না। রাতের নীরবতার ভেতর এসব কোলাহল ছুড়ে দিয়ে সে জেগে থাকে আগুনের অগ্রভাগে। চোখের পলকে তার দৃশ্যপট উধাও হতে থাকে। কোনো না কোনো কল্পনায় তার মনে পড়বেই এসব বসন্ত দিবসের কথা। মনে পড়ার কারণ আছে। কারণ সর্বাধিক এদিক দিয়ে যে নিষিদ্ধ অবতারণায় অস্থিতিশীল সামগ্রিকতায় কখনও কখনও করপোরেট হানায় যখন ঘুম লুট হতে থাকে, যখন রাতগুলো থেমে যায় দুজন দুজন করে ষোলো জন পর্যন্ত তখন অবিকল উল্লাসে নীল তারা একটা খসে পড়ে। কোনো পক্ষে পনেরো জন হয়ে গেলে উদাসের তাতে যায় আসে না। সে খেলায় তার অংশগ্রহণ দর্শকও নয়। তার আবার মনে পড়ে বেড়াল দুটির কথা। তার বাসায়ও একটি আছে। আসে তার কাছে। নাম সিম্বা।

বেড়াল দুটি রমণে লিপ্ত হলে কোজাগর পক্ষ বুঝতে পারে রাত এখন নাপাকির তীর্থ কারখানা। তারা ছুড়ে মারে পাথর। অন্য পক্ষের বেড়ালের কান ফেটে যায় আর তাতে এ পক্ষের বেড়াল ক্ষিপ্ত হয়ে স্বীয়পক্ষের লোকের চোখ উপড়ে দেয়। চিৎকার শুনে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেবে এ পক্ষ ইট ছোড়ে। ও পক্ষও ছোড়ে। এভাবে রাত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকলে উদাস আরও উদাসী হতে থাকে। তার কাছে রাতগুলো ধোঁয়া আর সিগারেটের মতো। পুড়ে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় নিজের ভেতর। অপেক্ষার কার্বনে জমা রেখে উজান স্রোতের ঢেউ, নিমেষেই জলফড়িঙের মতো এসব আকস্মিকতা মুছে ফেলে তরণিটি ধরা দেয় চোখের সামনে। রাত বাড়ে। তিনটা পেরিয়ে অনেকটা। অনেক রাত। ঘুমোনো দরকার। হ্যাঁ, সত্যিই ঘুমোনো দরকার। ঘুম চোখের জন্য উপকারী। জেগে থাকলে চোখ আবোলতাবোল দেখে। চোখের চশমায় উপকৃত হয়। তবু উদাসী চশমার দূরত্ব অতিক্রম করতে ভয় পায়। চোখের ভেতর থেকে সমস্ত দৃশ্যযোগ সরে গেলে অদৃশ্য শূন্যতায় তার আর দৃষ্টির দাম কী?

বেড়াল দুটি মরে না। লোকগুলো দুজন দুজন চারজন করে ষোলো জন হওয়ার পরও সেখানে আরও লোক আসতে থাকে। একে একে প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে লোকজন নামে। ঝগড়াটা তখন আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। মানুষজন ভাবছে এখানে কিছু আছে। আসলে তাদের ভাবানো হচ্ছে। তাদের ভাবানোটা অন্যায়, অন্যায্য, এভাবে মানবগুটিতে দাবা খেলা পাপিষ্ঠের কাজ। তবু খেলা চলে। লাশ পড়ে। আর এ একটি লাশ কেন্দ্র করে শুরু হয় ক্ষমতার দাপট। সাংবাদিক আসে, বুম এগিয়ে ধরে। মাইকে কথা বলে নেত্রীনেতারা। তাদের কথা শুনে জনগণ ভরকায়, চমকায়, সবশেষে সব মেনে নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যেতে যেতে ভাবেÑ ঘর কি তাদের আছে, নাকি এ মুহূর্তে ঘর থেকেও তারা পর? না, এত কিছু জানে না উদাসী। সে ভাবে, রাতটার আর কিঞ্চিৎ বাকি আছে। বাকিটুকু কাজে লাগাতে হবে। সে দেখে রাতের পর্দা ফাঁক করে আবার সেই নদী জেগে ওঠে। নৌকা ভাসে। কে চালাচ্ছে জানে না। উদাসী জানতেও চায় না। কিন্তু বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণি, হাঙর-কুমির সব ওত পেতে থাকে। এ বরফজল, হিমের রাত, কীভাবে মানুষের ঘুমের ভেতর আবার গুম হয়ে যায় দেখা যায় না। তার চশমায় আবার ঘোলা দাগ পড়ে।

চোখের চশমার ঘোলা দাগ মুছে উদাসী আবার চোখে দেয়। ফাঁকে দুই টুকরো রুটি মুখে দেয়। ক্ষুধা আর কাম পোষ মানানো যায় না। বেড়ালগুলো আবার একত্র হয়েছে। এ কানফাটা শীতে ইটের আঘাতে রক্তাক্ত কান নিয়েই, প্রতিবাদে সপক্ষের মানুষের চোখ তুলে নিয়েই বেড়ালগুলো আবার রমণে লিপ্ত হচ্ছে। তারা আবার ঝগড়ার মহড়া দিচ্ছে। প্রথমে মেও মেও মিয়াও। মিয়াও মিয়াও মিয়াও। ওয়াও ওয়াও ওয়াও। গ্র গ্র গ্র রবে ওদের ঝগড়া বাড়তে থাকে। ভালোবাসার খুনসুটি।

লাশ পড়া পক্ষ থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। পুলিশ লাশ নিতে চেয়েছিল। নেতারা এসে পড়ায় তারা লাশ নিতে দেয়নি। সামনে রেখে বক্তৃতা দিয়েছে। তারপর নেতারাসহ লোকজন একে একে সরে গেলে যাদের লাশ তারা বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। এখন আবার নেতাদের পরামর্শেই লাশ নিতে এসেছে। নাকি নেতাদেরই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কে জানে? এত কিছু ভাবে না উদাসী। তার নদীতে এখন ঝড়। শীতের রাতের ঝড় মিথ্যার মতো বিধ্বংসী। তার নদীর স্রোতগুলো মিথ্যা হয়ে যায়। তার নদীটা উধাও হয়ে যায়। সে দেখে, কোনো ঝরনাধারা থেকে নয়, কোনো পর্বতের হিমবাহ থেকে নয়, নদী নয়Ñ আগুনের স্রোত বইছে। দূরে, এক জ্বালামুখ লাভা ঢালছে রুষে উঠে। উদাসীর বুক কেঁপে ওঠে। দেখে, বৈঠা নেই। মানুষের ঘুমের শেষপ্রান্তের মতো একটি দীর্ঘ ক্ষুধা সমাপ্তির শতদুয়ার রুদ্ধ করে দিয়ে সর্বনাশা কোজাগর রাতে কিলবিল হয়ে ধেয়ে আসে। তাহলে নৌকাটা কে? আর কেইবা মাঝি?

রাত এখন শেষ হয়ে আসে। নীরবতার ভেতর বেড়ালগুলো আবার নিজ গলিতে ঢুকে পড়লে উদাসীরও চোখও ঘুমে ঢলে পড়ে। তখন সে দেখতে পায় নিজের একটি দ্বৈতচরিত্র তার মুখোশের সামনে একটি আয়না ধরে আছে। সে দেখে একই সঙ্গে মানব ও মানবী, একই সঙ্গে এ পক্ষ ও প্রতিপক্ষ, একই সঙ্গে রাত এবং দিনের সন্ধিক্ষণ, একই সঙ্গে জাগরণ এবং ঘুমের অবস্থাÑ শুধু গত রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা তার চোখে পড়ে না। পত্রিকার পাতাও তা বেমালুম চেপে গেছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা