আরিফ মঈনুদ্দীন
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৩ এএম
শেখ আফনান বিন খতিব ড্রাইভারের রুমের সামনে এসে ভাবলেন, গতকাল গাড়ি চালানোর সময় বেটার চোখে ঘুম দেখেছি। এই বেটা সারারাত কী করে একটু দেখা যাক। ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানো আর মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গনের প্রতীক্ষা করা এক কথা। দেখি ড্রাইভার গফুর মিয়া কী করছে? ভাবতে ভাবতে তিনি ড্রাইভারের ঘরের সামনে এসে দরজায় টোকা দিলেন।
ভেতর থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে গফুর মিয়া দরজা খুলল। রাত প্রায় দুটো বাজে। গফুর মিয়া বলল, মালিক কোথাও যাবেন নাকি। রেডি হয়ে আসি?
শেখ আফনান বললেন, না তার দরকার নেই। তুমি এত রাত পর্যন্ত না ঘুমিয়ে কী করছ দেখতে এসেছি। চলো তোমার ঘরে যাই।
বলতে বলতে তিনি ড্রাইভার গফুর মিয়ার ঘরে প্রবেশ করলেন। বিছানার ওপর রাজ্যের ছবি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তিনি বললেন, এসব কী? কার ছবি দেখছ রাত জেগে?
গফুর মিয়া লজ্জিত কণ্ঠে বলল, মালিক এবার বাড়ি গিয়ে বিয়ে করেছি। বউয়ের ছবি দেখছি। এগুলো সব ওয়াশ করিয়ে নিয়ে এসেছি।
মালিক উৎসাহ নিয়ে হাসিমুখে বললেন, কই দেখি কেমন মেয়ে বিয়ে করেছ?
মালিকের হাসিমুখ দেখে গফুর মিয়া বিনয়ে গলতে গলতে বলল, এই নিন মালিক দেখুন, বউটি আমার বেশ সুন্দর!
মালিক ছবিগুলো হাতে নিয়ে বললেন, বাহ বেশ তো! চমৎকার মেয়েই তো বাগিয়েছ। মেয়েটি খুব সুন্দরী! আচ্ছা ঘটনা তাহলে, এই! তুমি গাড়ি চালাতে গিয়ে ঝিমানোর কারণ তাহলে রাত জেগে বউয়ের ছবি দেখা। না না এটা চলবে না। ভালো ঘুম না হলে গাড়ি চালানো বিরাট রিস্ক। তুমি এভাবে আর রাত জাগবে না। আরেক দিন আমি টের পেলে তোমার চাকরি কিন্তু নট হয়ে যাবে।
গফুর অতীব তাজিমের সঙ্গে বলল, জী আচ্ছা স্যার। আর এরকম হবে না।
মালিক একটু ধমক-ধামক দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
কয়েক মিনিট পরে আবার গফুর মিয়ার ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। গফুর মিয়া ছবিগুলো বালিশের পাশে রেখে ঘুমের আয়োজন করছিল। দরজা খুলে দেখে মালিক দাঁড়িয়ে আছেন। মালিকের মুখ হাসি হাসি। গফুর মিয়া একটু প্রশ্রয় অনুভব করে বলল, স্যার কোথাও যাবেন নাকি? আরবদের আবার সময়ের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। হঠাৎ রাত ৩টায় এসে বলবে, চল তো বাইরে যাব। এই শেখদের অনেকগুলো স্ত্রী থাকে। ন্যূনতম চারজন সব সময় থাকে। রাতে হঠাৎ মনে পড়ল আজ তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে শোবেন, ব্যাস ড্রাইভারকে বলল, তৈরি হও। ওর ফ্ল্যাটে যাব। চারজন চার জায়গায় থাকে। অঢেল পেট্রো ডলার মানে দেরহাম অকাতরে খরচ করে। জীবনকে এপিঠ-ওপিঠ করে উপভোগ করে।
মালিক শেখ আফনান বললেন, কোথাও যাব না তোমার ঘরে চলো।
এবার গফুর মিয়া একটু শঙ্কিত হলো, না-জানি বলে কাল সকাল থেকে তোমার চাকরি নাই। তল্পিতল্পা নিয়ে রেডি হও। গফুর মিয়া বলল, মালিক কোনো সমস্যা?
মালিক বললেন, না কোনো সমস্যা না। তোমার ছবিগুলো আবার একটু দেখি। গফুর হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। অতি উৎসাহে ছবিগুলো মালিকের হাতে দিয়ে বলল, দেখুন মালিক দেখুন।
গফুর মালিকের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে তার চিন্তার সীমা বেশিদূর বিস্তৃত না। সে হাসিমুখে মালিকের দিকে তাকিয়ে আছে।
ছবি কয়েকটা দেখে মালিক শেখ আফনান বললেন, আচ্ছা এরকম সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করে তুমি এখানে একা একা থাকবে! তোমার ভালো ঘুম হবে না, গাড়ি চালানোর সময় ঝিমাবে। এটা তো অনেক বড় ঝুঁকি। তার চেয়ে এক কাজ করো, ওকে এখানে নিয়ে আসো। দুজন মিলে আরামে থাকো। সুন্দর মতো গাড়িও চালাতে পারবে।
গফুর মহাখুশি হয়ে বলল, কীভাবে আনব মালিক?
কীভাবে মানে? আমি ভিসার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি তাড়াতাড়ি তোমার দেশের কাগজপত্র করতে বলো। পাসপোর্ট কপি নিয়ে এসে আমাকে দাও। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ঠিক আছে?
গফুর তো যারপরনাই খুশি। তার রীতিমতো নাচতে ইচ্ছে করছে। সে বলল, জী মালিক আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
গফুরের মালিক শেখ আফনান ঠোঁটের হাসিকে আরেকটু ফুটিয়ে দিয়ে গফুরের ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। বাকি রাত তো আনন্দে গফুরের ঘুমই আসতে চায় না। দেশে ফোন দিয়ে বউকে বলল, আমার টুনটুনি বউ মস্ত বড় খবর আছে।
বউ যথারীতি অবাক হয়ে বলল, কী মস্ত বড় খবর বলে ফেলুন। আমি তো আর ধৈর্য ধরতে পারছি না।
আচ্ছা আচ্ছা বলছি। বড় খবর একটু আস্তে-ধীরে মজা করেই বলতে হবে। আনন্দে আমার ঘুম আসছে না। গফুরের বউ ফারহানা বলল, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে অবস্থা। আপনি বলুন তো কী খুশির খবর?
গফুরের বউ গফুরকে ‘আপনি আপনি’ করে বলে। এটা গফুরের নির্দেশ তাকে তুমি বলা যাবে না। এটা নাকি তার কাছে অপমানের মতো লাগে। এই কথা শুনে ফারহানা বলেছে, আমাদের বাড়িতে যে মেয়েদের বিয়ে হয়েছে, সবাই স্বামীকে ‘তুমি’ করে বলে। এতে নাকি প্রেম-মহব্বত পাকাপোক্ত হয়। আপনি এটা বোঝেন না।
গফুর বলেছে, আমার বোঝনের কাম নাই। তুমি আপনি করে বলবে।
ফারহানা সলিমদ্দিন ভূঁইয়া বাড়ির মেয়ে। নামকরা বাড়ি। হালে এই বাড়ির কিছু কিছু পরিবার একেবারে গরিব হয়ে মাটির কাছাকাছি চলে এসেছে। ফারহানাদের অবস্থাও সে রকম। সংসারে বাবা-মা এবং ওরা তিন বোন। সে বড়। তার বাবা বাড়ির অনেকের মতামত উপেক্ষা করে গফুরের কাছে মেয়ে দিয়েছে শুধুমাত্র পয়সাওয়ালা হওয়াতে। ফারহানা এসএসসি পর্যন্ত পড়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ছোট দুই বোন এইটে-নাইনে পড়ে। তাদেরও পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাবা ওয়াদুদ ভূঁইয়া জমিজমা যা ছিল প্রায় সব বিক্রি করে ফুলবাবু সেজে দিন কাটাচ্ছেন। সম্মুখে অন্ধকার দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি প্রবাসী ছেলে যার কাছে অর্থবিত্ত আছে এমন জায়গায় বিয়ে দিলে, একজন পয়সাওয়ালা গার্জেন পাওয়া যাবে। ছোট মেয়েদের বিবাহ দিতেও তো পয়সাকড়ি লাগবে। গফুর ছেলে ভালো। বিদেশে কী কাজ করে এটা বিবেচ্য নয়, টাকাকড়ি বেশ কামাচ্ছে এটা বোঝা যায়। বাড়িতে একটি দোতলা দালান তৈরি করেছে। জমিজমাও বেশ কিনেছে। উপজেলা শহরে একটি সাততলা দালানের কাজ প্রায় সমাপ্ত। দালানের কাজ সমাপ্ত হলে ওরা গ্রাম থেকে এখানে এসে উঠবে। ছেলেমেয়ে হলে পড়ালেখার সুবিধার জন্য এই ব্যবস্থা। সবার তো বাড়ি থাকে না। অনেকে ভাড়া বাড়িতে থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করায়। গফুরের সাততলা বিল্ডিং সমাপ্ত হলে মোটা অঙ্কের ভাড়ার টাকাও পাওয়া যাবে। দেখা যাবে তখন ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে বলবে, বাবা আপনি এটা দেখাশোনা করুন, কী আনন্দ কী আনন্দ! এসব ভেবে টেবে উনি বাড়ির সবার মতামত উপেক্ষা করে গফুরের হাতে মেয়ে তুলে দিয়েছেন। বাড়ির সবাই ফুটানি করেÑ জাত গেল স্ট্যাটাস গেল! কিন্তু ওনাকে তো দুটো টাকা দিয়ে সাহায্য করেন না। খালিমুখে বড় বড় কথা। থাক তোরা তোদের জাতপাত নিয়ে Ñআমার টাকার দরকার। পয়সাওয়ালা মেয়ে-জামাই দরকার। আমি গোষ্ঠী মারি তোদের এসব জাতপাতের। গফুরদের বাড়ির নাম চৌকিদার বাড়ি। তাতে কী হয়েছে। আমার মেয়েটা সুখে থাকবে এটাই বড় কথা। অন্য আরও কত লাভ হতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতে আনন্দ-বেদনার মিশেলে তিনি হু হু করে কেঁদে ফেলেছেন। তার অবচেতন মন তাকে কাঁদিয়ে দিয়েছে। হাতি খাদে পড়লে যা অবস্থা হয়। তিনি উদ্ধারের পথ বের করেছেন।
গফুর-ফারহানা মজার মজার আলাপ করছে। ফারহানা বারবার তাড়া দিচ্ছে। খবরটা কিন্তু এখনও বলেননি।
গফুর মজা করতে করতে বলল, ধুর পাগলি বউ আমার! কইয়া ফালাইলেই তো মজাই শেষ। আরেকটু অপেক্ষা করো বলছি।
ফারহানা অভিমানী স্বরে বলল, তাহলে আমি টেলিফোন রেখে দিচ্ছি...।
গফুর বলল, বউ আর রাগ কোরো না, এবার বলব।
জী, অন্য কথা বাদ। শুধু খুশির খবরটা বলেন।
আচ্ছা আর ভণিতা নয়। এবার শোনো। শুনছ তো? কথা কি কিলিয়ার শোনা যায়?
হ্যাঁ যায়, বলেন।
গফুর কিছুটা কৃত্রিম আমতা আমতা করে বলল, ধুর খবরটা এত মজার যে তোমাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলতে পারলে বেশি আনন্দ পেতাম।
ফারহানা বলল, আপনি আবার ভণিতা শুরু করেছেন। আমি টেলিফোন রাখছি...
গফুর তরতরিয়ে বলল, আরে আরে কর কী! এবার বলছি। কথা হলো তোমাকে আরব দেশে আনার একটা ব্যবস্থা হইতেছে। আমার মালিক ভিসা দিবেন।
ফারহানা প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, কী বলছেন আপনি! সত্যি কি তাই?
তবে আর বলছি কী? তাহলে ঘটনাটি শোনো।
বলেন বলেন, আমি শুনছি।
আমার মালিক শেখ আফনান বিন খতিব, সাহেব রাত দুইটার সময় আমি ঘুমাচ্ছি নাকি জাগনা আছি দেখতে এসেছিলেন। কারণ, ড্রাইভাররা যদি নিয়মমাফিক না ঘুমায় তাহলে গাড়ি চালানো সমস্যা। জীবন-মরণ সমস্যা। গাড়ি যেকোনো সময় রাস্তার বাইরে চলে যেতে পারে। অথবা অন্য গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। এইজন্য উনি চেক করছিলেন। আমি বসে বসে তোমার ছবি দেখছিলাম। উনি বললেন, এগুলো কার ছবি?। আমি বললাম। তারপর ছবিটবি দেখে মালিক বললেন, সুন্দর একটি মেয়েকে বিয়ে করে একলা ফেলে রেখেছ। নিয়ে এসো আমি ভিসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এই হলো ঘটনা। তুমি আমার শ্বশুর-আব্বাকে বলবে যাবতীয় কাগজপত্র রেডি করার জন্য। উনি বুদ্ধিমান মানুষ। দেখবে এক সপ্তাহের ভেতর পাসপোর্ট-টাসপোর্ট বানিয়ে হুলস্থুল বাধিয়ে ফেলবেন। যত তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট বানানো যায় তত তাড়াতাড়ি আসতে পারবে। বাবাকে বলবে আর্জেন্ট চার্জ দিয়ে যেন পাসপোর্ট বানিয়ে ফেলে। ন্যাশনাল ব্যাংকে তোমার যে অ্যাকাউন্ট আছে ওখান থেকে চেক কেটে যা লাগে দিয়ে দিবে। বাবাকে টাকা দেওয়ার সময় একটু বেশি করে দিয়ো। উনি চা-নাস্তা খাবেন, কাপড়চোপড় কিনবেন। যা চায় দিয়ে দিয়ো। কোনো সমস্যা নেই। উনি তো এখন আমাদের গার্জেন।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া মহা উৎসাহে কাজে লেগে গেলেন। পনেরো দিনের মধ্যেই ফারহানার পাসপোর্ট তৈরি হয়ে গেল। যথারীতি পাসপোর্টের কপি পাঠানো হলো। তার সাত দিন পরেই ফারহানার ভিসা প্রস্তুত। গফুরের আনন্দ আর ধরে না। ভিসা দেশে পাঠিয়ে বলল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এসো। আল নূর ট্রাভেলস-এর নূরুল আলম ভাই আমার পরিচিত। আমি টেলিফোনে ওনাকে বলে দিব। তুমি বাবাকে নিয়ে একবার ঢাকায় যাবে। নূরুল আলম ভাইয়ের অফিসে যাবে। দেখবে সবকিছু পানির মতো হয়ে যাচ্ছে। একটুও ঝামেলা হবে না। ওনারা টিকিট কেটে ব্যবস্থা করে দেবেন। তুমি এখানে বিমানবন্দরে এলে আমি তোমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। নাম দেখে তুমি আমার কাছে চলে আসবে। খুব সুন্দর ব্যবস্থা। আমার আর তর সইছে না। ‘কখন তুমি আসবে, কখন তুমি আসবেÑ এই অস্থির অবস্থার মধ্যে পড়ে আছি।
ফারহানার ফ্লাইটের ডেট ঠিক। গফুর মালিককে বলল, মালিক আগামী পরশুদিন আমার বউ আসতেছে। আমি বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসব।
মালিক বললেন, ঠিক আছে। নিয়ে এসো।
গফুরের অপেক্ষা আর সহ্য হচ্ছে না। কখন ‘পরশুদিন’ আসবে এই শুধু ভাবনা।
বিকালবেলায় শেখ আফনান বললেন, আচ্ছা গফুর তুমি এক কাজ করো। তোমার একটু দুবাই যেতে হবে। আগামীকাল যাবে। তার পরদিন একজনকে নিয়ে আসবে। আমার গাড়ি নিয়ে যাও।
গফুরের তলপেটে একটা মোচড় দিয়ে উঠল। যদি আসতে দেরি হয় তখন ফারহানাকে রিসিভ করবে কে?
গফুর ম্লান কণ্ঠে বলল, মালিক আমার বউ যে আসছে। যদি আমি ঠিক সময়মতো আসতে না পারি?
মালিক বলল, তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। তোমার বউয়ের পাসপোর্টের একটি ফটোকপি আমার কাছে আছে। আমি প্ল্যাকার্ড নিয়ে একজন লোক পাঠাব। ওকে নিয়ে আসবে। কোনো সমস্যা হবে না। আমার অফিসে একটি বিশ্বস্ত বাঙালি ছেলে আছে। নাম হোরমুজ। তুমি তো তাকে চেন, ওকে পাঠাব পাসপোর্টের কপি দেখাবে। আর প্ল্যাকার্ড নিয়ে অপেক্ষা করবে। তুমি হোরমুজের সঙ্গে কথা বলো। আর টেলিফোন করে বউকে বলে দিয়ো। ঠিক আছে?
গফুর নিরুপায় হয়ে অনেক কষ্টে মন খারাপের ভাবটা লুকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলল, জী মালিক, ঠিক আছে।
গফুর ফারহানাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলল, যথারীতি হোরমুজকেও বলে দিল। হোরমুজ ভাই মানুষ ভালো। কোনো অসুবিধা নেই।
দুবাই পুলিশ গফুরের গাড়ি চেক করবে। তার বিরুদ্ধে নাকি ইলিগেশন আছে।
গফুর আঁতকে উঠল! এরা কী বলে? সে তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সে সুবোধ বালকের মতো গাড়ি থেকে নামল, পুলিশ গাড়ির কাগজপত্র দেখে বলল, চলো থানায় যেতে হবে। সে বলল, আমার বিরুদ্ধে কী ইলিগেশন? আমি কী করেছি? বেশি কথা বলবে না। তুমি গুরুতর বেয়াদবি করেছ।
গাড়িসুদ্ধ তাকে থানায় নিয়ে গেল। তার তিন মাসের জেল হলো। উপায়ান্তর না দেখে তাকে কারাগারে ঢুকে যেতে হলো। তার কাছে তিন মাস তিনশ বছরের মতো মনে হচ্ছে। এখন সে কী করবে। এটা তার মালিকের কারসাজি কি না সে ভাবছে!
এদিকে হোরমুজ গফুরের বউকে নিয়ে মালিকের কাছে পৌঁছে দিল। মালিক বাসায় পৌঁছার আগেই পথ থেকে ফারহানাকে গাড়িতে তুলল।
ফারহানা ইংরেজিতে কোনোরকমভাবে ইশারা-ইঙ্গিতে জানতে চাইল গফুর কোথায়Ñ
মালিকও তাকে বুঝিয়ে দিল গফুর কাজে আছে আসতে দেরি হবে। তুমি ভালোভাবে থাকবে। কোনো অসুবিধা হবে না। মালিক ফারহানাকে একটি সুন্দর ফ্ল্যাটে নিয়ে তুলল। ফারহানা প্রমাদ গুনছে, গফুর কি এরকম ফ্লাটে থাকে? কী হতে যাচ্ছে? মালিকের চোখের ভাষা ফারহানা ধরে ফেলেছে। মেয়েরা এই বিষয়টি খুব ভালো বোঝে। পুরুষের চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ্ তাদেরকে উপরি পাওনা হিসেবে দিয়েছেন।
মালিক ইশারা-ইঙ্গিতে সহজ ইংরেজিতে বলল, এটা তোমার বেডরুম এখানে আরাম করে রেস্ট নাও, গফুর আসতে একটু দেরি হবে।
ফারহানার জন্য অনেক আইটেমের খাবার ব্যবস্থা করা হলো। তার কিছুই ভালো লাগছে না। সে গফুরকে ফোনে ধরিয়ে দিতে বলল।
মালিক বলল, তা দেওয়া যাবে না।
এই কথা শুনে ফারহানার চমক ভাঙল। এখানে তো অন্য সমস্যা মনে হচ্ছে! সে কাঁদতে শুরু করল।
মালিক বলল, এই মেয়ে কেঁদেকেটে লাভ নেই। আমি যা যা বলি শোনো। তোমাদের অনেক লাভ হবে।
ফারহানা কোনো কথা শুনতে রাজি নয়। সে বলল, আমাকে আমার স্বামীর কাছে নিয়ে যাও। আমি অন্য কোনো কথা শুনব না।
মালিক ভাব করতে চেষ্টা করল। ফারহানা কোনোভাবেই রাজি নয়, সে বিশাল খাটের এক কোনায় গিয়ে জড়সড় হয়ে বসে রইল। এভাবে শুয়ে-বসে দুই দিন কাটল।
তৃতীয় দিন ফারহানার যাবতীয় শক্তি যেন রহিত হয়ে গেল। শারীরিক, মানসিক সব ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলল। সে নিশ্চল পুতুলের মতো হয়ে গেল। কাদামাটির মতো পড়ে রইল। মালিক যা করার সবই করল। বলল, তিন মাস পরে তোমার স্বামী আসবে। তখন তুমি মুক্ত হবে। এখন আমি যা বলব তা শুনবে। এর বাইরে অন্য কোনো চিন্তা কোরো না।
ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলে। তাকে আরবি শেখানোর চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। এক-দেড়মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ফারহানা একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেল। কী আর করবে সুযোগ পেলে আত্মহত্যা করা ছাড়া তার আর গতি নেই। গফুরের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগে এক কাজিনের সঙ্গে তার সামান্য প্রেম ছিল। সামান্য প্রেমকে পুঁজি করে তার সেই কাজিন মোখলেস ভাই তাকে প্রথম দংশন করেছিল। ওইসব পাপের কারণে সম্ভবত এখন আবার পাপের বোঝা ভারী হতে চলল, কী আর করা! হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। সে আধোআধো আরবিতে একদিন বলল, আপনি বিয়ে করে ফেলুন। মালিক বলেছে, দেখা যাক হতেও পারে।
তিন মাস জেল খাটার পর গফুর মুক্তি পেল। হন্তদন্ত হয়ে মালিকের বাড়ি গিয়ে দেখে বউ তো এখানে নেই। গফুর পাগলের মতো হয়ে গেল। সে অনেক কষ্টে জেদ চেপে রেখে কৃত্রিম বিনয়ের ভাব করে মালিককে বলল, মালিক আমার বউ কোথায়?
মালিক বললেন, কোনো চিন্তা করবে না। তোমার বউ ভালো হেফাজতে আছে। আজই আসবে। চলো গাড়ি নিয়ে তোমার বউকে নিয়ে আসব।
যে ফ্ল্যাটে ফারহানাকে রাখা হয়েছে তার নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই ফারহানা নেমে এলো। তার চেহারা এত সুন্দর হলো! কখন যেন একটা পরী ডানা হারিয়ে উড়তে না পেরে মাটির পৃথিবীতে হাঁটছে। সে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরতে চাইল। ফারহানা সরে গিয়ে বলল, এখন আমাকে ছোঁবে না। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
গফুর বেদনাহত হয়ে মনে হচ্ছে ঢলে পড়ে যাবে। নিজেকে শক্তভাবে ধরে রেখে বলল, কী হয়েছে ফারহানা? তুমি এমন করছ কেন?
ফারহানা বলল, আমার কিছু হওয়া বাকি নেই। তুমি আমাকে ধরবে না।
গফুর সবকিছু অতি অল্পতেই বুঝে ফেলেছে। কী করবে এখন সে? মালিকের মতো প্রভাবশালী লোককে কিছু করা তো দূরের কথা চোখ রাঙিয়ে তাকানোও যাবে না। একটু উল্টাপাল্টা হলে আবার জেলে ঢুকিয়ে দিবে। সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুবোধ বালকের মতো স্টিয়ারিং-এ বসল।
মালিক ফারহানাকে বলল, তুমি সামনের সিটে গফুরের পাশে বসো।
মালিক পেছনে বসল। গাড়ি চলছে তার আপনগতিতে। মালিক বলল, গফুর সাবধানে চালাও আবার অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলিও না।
মালিকের বাসায় গাড়ি এসে পৌঁছেছে। মালিকের নির্দেশে ফারহানা গফুরের ঘরে গিয়ে উঠল। সে যেখানে এই তিন মাস ছিল তার তুলনায় এটা একটা গোশালা। ছোট একটি রুম হলেও এটাস্টড বাথরুম আছে। খাটটাও একটু বড় আছে। দুজন অনায়াসে শুতে পারবে। ফারহানা গফুরকে বলল, তুমি কি কিছুই বুঝতে পারোনি?
ফারহানা, আমি সবই বুঝেছি। আমি যে জেল খেটেছি তিন মাসÑ সে কথা তোমাকে বলেনি?
হ্যাঁ বলেছে। তোমার কী-এক অপরাধে তিন মাসের জেল হয়েছে। তিন মাস পরে তুমি আসবেÑ তা তো আমি বুঝতেই পারছি। গতকালই তিন মাস শেষ হয়েছে। এই তিন মাস তোমার এই সম্পদÑ ‘আমি’ তোমার মালিকের রক্ষিতা ছিলাম। আমাকে যা করার করেছে। আমি এখন অপবিত্র। এইজন্য আমাকে ছুঁতে নিষেধ করেছি।
গফুর বাক্-রুদ্ধ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বলল, এখন আমি কী করব! তুমি বুঝতেছ না। আমার জেলের শাস্তিটা মালিকের বানানো। এইজন্যেই এই লোক তড়িঘড়ি ভিসা দিয়ে তোমাকে আনিয়েছে। এখন যা হওয়ার হয়েছে, তুমি এই ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। আমি জানি এটা ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। তারপরও আমরা নিরুপায়। এখন অপেক্ষা করতে হবে। সামনে আমাদের জন্য আর কী কী সমস্যা আছে?
পরদিন সকালবেলায় গফুরের মালিক তার ঘরে এসে হাজির। বললেন, তোমরা তল্পিতল্পা নিয়ে প্রস্তুত হও। নিজের দেশে যাবে। আমি টিকিটের ব্যবস্থা করেছি। আর হতাশ হয়ো না। এই নাও আমি বেশকিছু দিরহাম দিচ্ছি। দেশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য একটা কিছু কোরো। ও ভালো কথা, কয়েকটা গাড়ি কিনে রেন্ট-এ কারের ব্যবসা কোরো। এখানে ৫ (পাঁচ) লাখ দিরহাম আছে এটা নিয়ে যাও। আমি একটা ডকুমেন্ট বানিয়ে দিয়েছি। বিমানবন্দরে ধরলে এটা দেখাবে। আর না ধরলে তো নাই। এই নিয়ে আর ভাববে না। কালকেই তোমাদের ফ্লাইট।
মালিক ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই ফারহানা দিরহামের প্যাকেটটা ছুড়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলল, তুমি কিছুই বললে না।
গফুর বলল, আমি সামান্য ড্রাইভার। কিছু-একটা বললে, যদি তার অপমান হয়, তাহলে আবার আসামি বানিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেবে। তখন সবই যাবে। চিন্তা তো আমিও কম করছি না। এখন কী করি বলো? দিরহামগুলো নিয়েই যাই। কত কিছুই তো মানুষ পৃথিবীতে গোপন রাখে। এটাও গোপন থাকল। তোমার তো কোনো উপায় ছিল না। যেমন উপায় ছিল না আমার। আর মনের মধ্যে কষ্টকে পুষিয়ে রাখিও না। এসো আমার কাছে এসো।
ফারহানা গফুরের বুকের মধ্যে মিশে গিয়ে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। গফুর মুহূর্তেই সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে পরম মমতায় স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল।