× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিজ্ঞাপন

ফারহানা সিনথিয়া

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:০০ এএম

বিজ্ঞাপন

সাদা শাড়ি পরে বিনু এসে দাঁড়িয়েছে ঝুল বারান্দায়। মা বলেছিল সাদা সালোয়ার-কামিজ পরতে। সাদা ওড়নায় লেগেছে হলুদ রঙের ছোপ। সেজন্যই সাদা শাড়ি।

আকাশ লালচে হয়ে আসছে। আসর আর মাগরিবের মাঝামাঝি। কিছুক্ষণ পরই আজান হবে। তারপর মিলাদ শুরু হবে। আগরবাতির ঘ্রাণে মাথা ধরে যাচ্ছে। বিনু ভাবল এই তীব্র ঘ্রাণে কি তার একার মাথা ধরে? সমস্যা হচ্ছে নিজের বাবার কুলখানির দিনে এমন প্রশ্ন অদ্ভুত শোনা যায়। কাকেই বা প্রশ্ন করবে ভেবে পেল না বিনু।

বিনুর ছোটবোনের নাম রায়না। ১০ বছর বয়স। তরুণী বিনুর সঙ্গে তার বয়সের তফাত ষোলো বছরের। এজন্য বোন কম, মায়ের ভূমিকা নিতে তাকে বেশি দেখা যায়। রায়নাকে কেউ সালোয়ার-কামিজ পরিয়ে দিয়েছে।

বাবার দাফনের দিন তার পরনে কেন লাল রঙের জামা ছিল এ নিয়ে বিস্তর কথা শুনিয়ে গেছেন বড় ফুপু। শোকের বাড়িতে কেমন পোশাক পরে আসতে হয় তা নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে জ্ঞান দিলেন।

বিনুর জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হয়েছিল বড় ফুপুর ছেলে যে মাতাল হয়ে দাদাজানের মিলাদের দিন হড়হড় করে বমি করেছিল; সেদিন ফুপু কেন সহবত শেখাতে আসেননি। বেফাঁস প্রশ্ন গিলে ফেলতে হয়। নেহাত বেকুব না হলে কেউ মুখরা বড় ফুপুর সঙ্গে লাগতে যায় না। তার চিৎকারে কাকপক্ষী পর্যন্ত ডানা ঝাপ্টে পালিয়ে যায়।

রায়না বলল, ‘আচ্ছা আপা। পরকীয়া কী?’

‘তুমি এ শব্দটা কার কাছে শিখেছো?’

রায়না প্রমাদ গোনে। বড়দের কাছে শোনা নিষিদ্ধ শব্দের অর্থ সে জানে না। তবে বোঝে ভুল করেছে।

‘ওমা। সুতপা আন্টি এসেছেন উনিই তো বললেন। বাবার পুরোনো বন্ধু। বাবা মারা যাওয়ার পরে ফেসবুকে ছবি দিয়ে অনেক কথা লিখেছিলেন উনিই তো বললেন পরকীয়া না কী একটা শব্দ। এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার না আরও কী একটা ইংরেজি শব্দ বলছিলেন। আমি তো বুঝিনি জিজ্ঞেস করতেই সুন্দর করে বাংলায় বুঝিয়ে দিলেন। সুতপা আন্টি আমার জন্য চকলেটও এনেছেন দেখো।’

সুতপা আন্টির শব্দমালা হচ্ছে মিছরির ছুরির মতোন। মিষ্টি শব্দে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তার জুড়ি নেই।

ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল বিনু। তারপর বলল, ‘এসব বাজে শব্দ। বাজে কথা। মাকে বা অন্য কাউকে এসব কথা বলার দরকার নেই। শুধু শুধু কিল খাবে।’

ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলো বিনু। চুলে জট লেগেছে। তেল দিয়ে দিতে হবে। কয়েক দিন ধরে খুব অনিয়ম হচ্ছে। রায়নার খেয়াল রাখছে না মা। মা এখনও বিপর্যস্ত।

গভীর বিষাদের অনুভূতি হচ্ছে শোক। এ শোক যে ভালো করে বিক্রি করে খাওয়া যায় তা সুতপা আন্টিকে দেখে কে না বুঝবে। প্রথমে বাবার সঙ্গে ছবি দিয়ে লিখল কীভাবে প্রথম নাটকে কাস্টিং করা হয়েছিল। তার অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ মনোয়ার হোসেন তাকে দেখেই থিয়েটার থেকে সোজা সিনেমায় নামালেন। দ্বিতীয় দিন তার প্রথম সিনেমার ছবি; সঙ্গে মনোয়ার হোসেন তার সিনেমায় অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন তার বর্ণনা।

কখন থামতে হয় এ মহিলা শেখেননি। সব ব্যাপারে অতিরঞ্জন। মিথ্যা বলতে বলতে এখন কোনটা অভিনয় আর কোনটা সত্যিকারের জীবন গুলিয়ে ফেলেছেন।

নীল সাদা পৃথিবীতে এখন শুধু বোঝেন কী করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হয়। সেটা করতে গিয়েই লিখে ফেললেন আকারে ইঙ্গিতে বিনুর বাবা অল্পবয়সি এক কন্যার সঙ্গে পরকীয়া করেছেন সেই গল্প। অথচ বিনু নিশ্চিত জানে এ মহিলার নীল সাদা ডাকবাক্সেও হয়তো জমে আছে নোংরা গল্প। অন্যের নোংরা ঘটনার সুযোগ কেউ ছাড়তে চায় না। এখনও মিলাদে এসে কুৎসা করে যাচ্ছেন।

মায়ের কান পর্যন্ত এসব গেলে বাসায় হুলুস্থুল বেধে যাবে। সে দ্রুত পরিস্থিতি সামলাতে পৌঁছাল বসার ঘরে। মা বসে আছেন খালা, মামি, চাচিদের সঙ্গে।

সেখানে গিয়ে নিশ্চিত হলো রায়না বেফাঁস কোনো কথা মাকে বলেনি।

মাগরিবের নামাজের পরই শুরু হলো মিলাদ। অল্পবয়সি হুজুর সুরেলা কণ্ঠে মোনাজাত ধরেছেন। বিনু চোখ বুজে ফেলল। এ মুহূর্তে অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠের বাইরে যা শুনছে তা শুধুই যেন শব্দদূষণ।

মিলাদ শেষ হতেই গুঞ্জন শুরু। উপস্থিত মহিলাদের মাঝে কয়েকজন উঠলেন নামাজ পড়তে। কয়েকজন বসে রইলেন। বিনু উঠে গেল খাবারের ব্যবস্থা করতে। যত দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা হবে তত তাড়াতাড়ি সবাই বিদায় নেবেন। বিনু একাকী শোক পালন করার সুযোগ পাবে।

দ্রুত নামাজ পড়ে সে তেহারির ব্যবস্থা করল। নিজ হাতে রেঁধেছে। ডাইনিং টেবিলে বসে অল্প কজন খাচ্ছেন। সুতপার পাশে যিনি বসেছেন তিনিও অভিনেত্রী। নাম তিলোত্তমা। ইদানীং উপন্যাসও লিখছেন। বিনু যে ওনার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন লক্ষ করেননি।

‘বুঝেছো, আমি যে নতুন উপন্যাসটি লিখেছি না ওই যে “চরিত্রহীন”। ইচ্ছে করেই মনোয়ার ভাইয়ের নামে একটা চরিত্র রাখব। বুঝেছো তো কেন? ওই যে অল্পবয়সি মেয়েটা উর্বশী নাম।’

সুতপা আন্টি চোখের ইশারায় তিলোত্তমাকে থামতে বললেও সে গড়গড় করে কুৎসা করে গেল।

বিনু হাসিমুখে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনাকে আরেকটু তেহারি দিই আন্টি? রাত হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত খেয়ে বাড়ির পথ ধরুন। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে।’

তিলোত্তমা অপ্রস্তুতভাবে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ। আসলেও আমার জলদি উঠতে হবে।’

কিছুক্ষণ পরই ঝুম বৃষ্টি নামল। একে একে সবাই বিদায় নিলেন। শূন্য হয় শোকসভা। পড়ে থাকে বিষাদ আর আগরবাতির তীব্র ঘ্রাণ।

রায়নাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় বিনু। বড় একটা নিঃশ্বাস ঘুমের মধ্যে ফেলে। মশারির বাইরে একটা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে সুতপা। অন্ধকারে মিশে গেছে তার শরীর। বিনু তার মায়ের গন্ধে চেনে ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে দুই বোনকে দেখছেন।

‘মা এখানে এসো। আজকে আমাদের সঙ্গে শোবে এসো।’

‘জায়গা হবে?’

‘হবে না কেন!’

চুপ করে শুয়ে থাকে দুজন। বাইরে শোনা যায় গাড়ির হর্ন।

সুতপা নীরবতা ভেঙে বলেন, ‘আচ্ছা বিনু, তুই ওই মেয়েটাকে দেখেছিস? একটা কথা বল তোÑ সে আমার চেয়ে সুন্দর?’

‘ভুল প্রশ্ন করলে। ভুল মানুষকে প্রশ্ন করলে। তুমি আমার চোখে সব সময়ই সুন্দর।’

সুতপা অন্ধকারে হাসেন, ‘তোর বাবাকে তো জিজ্ঞেস করতে পারছি না। এজন্যই তোকে জিজ্ঞাসা করলাম।’

‘এবার ঘুমাও তো মা।’

গভীর রাত অবধি বিনু জেগে থাকে। অপেক্ষা করে কখন সুতপা ঘুমাবেন। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় জানালার গ্রিলের ছায়ায় একটা নকশা দেখা যায়। তিরতির করে কাঁপে নারকেল গাছের পাতা। সেসব দেখতে দেখতে একসময় বিনু ঘুমায়।

পরদিন সকালে কাজের সহকারী মেয়েটা টিভি দেখছে। সুতপাকে দেখা যায় একটা বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে অংশ নিতে। সাবানের বিজ্ঞাপন। রঙ ফরসা করার সাবান। বিজ্ঞাপনের আগে ক্যান্ডিড কিছু কথা বলেছেন এক সাংবাদিক ভদ্রলোককে।

‘কালকে মনোয়ার ভাইয়ের কুলখানিতে গিয়েছিলাম। উনি না থাকলে তো আমি নায়িকা হতে পারতাম না। এই যে বড় ব্র্যান্ড আমাকে এন্ডোর্স করছে সব তো ওনার জন্যই।’

বিনুর মনে হলোÑ রঙ পরিষ্কার করার সাবানের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। কেউ মানসিকতা পরিষ্কার করার পণ্যের বিজ্ঞাপন কেন দেয় না!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা