শৌনক দত্ত
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৫ এএম
অলংকরণ : গুপু ত্রিবেদী
পথের পাঁচালীর দুর্গার মৃত্যু মাইলফলক হয়ে আছে। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে মৃত্যু সর্বদা একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে এসেছে। মহাভারতের মতো অতি বড় বীর, অনিবার্য যার প্রয়োজনÑ সেও অবলীলায় ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্গা ও অপুর বেড়ে ওঠা, পাঠকের হৃদয়ের মধ্যে দুর্গা ধীরে ধীরে পরিণতি পায়। আকস্মিক দুর্গা দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেলে কণ্ঠ ছিঁড়ে কান্না আসে। মৃত্যুকে বিভূতিভূষণ তার উপন্যাসে এক প্রতীকী মাত্রায় তুলে ধরেছেন
মৃত্যুর অনিবার্যতা সম্পর্কে সচেতনতা জাগ্রত করার অর্থ আমাদের নিজেদের হতাশ বা ভয়ে পূর্ণ করার জন্য নয়। মৃত্যু এমন একটা বিষয়Ñ যা নিয়ে অনেকে ভাবতে পছন্দ করেন না। তবে মৃত্যু হলো জীবনের একটা সত্য এবং এমন একটা বিষয়Ñ যা প্রত্যেককে মুখোমুখি হতে হবে। আমরা যদি অনিবার্য বিষয়গুলোর জন্য খুব ভালোভাবে নিজেদের প্রস্তুত না রাখি, তাহলে আমরা ভীষণ ভয় ও অনুশোচনার সাথে মারা যেতে পারি। মৃত্যুর মতো পরিপূর্ণ বিষয়টি হয়তো তখনই এমন বিশেষ করে প্রত্যক্ষ সম্ভব, যখন তা অনেককাল ধরে ব্যক্তিগত যাপনে থাকে। বিভূতিভূষণের সাহিত্যে অনন্তলোকে যাত্রার ঘটনা অন্তত তেমনি ইঙ্গিত করে। হয়তো ‘মৃত্যুচেতনা’ মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আসে বলেই তা ঘটে। প্রথম স্ত্রী গৌরীর মৃত্যু, এরপর বোন ও মায়ের চলে যাওয়া থেকেই সে অভিজ্ঞতার জন্ম হয়ে থাকতে পারে, যার অভিজ্ঞান ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর তৈরি সব মৃত্যুর পটভূমির আগে ও পরে। বিভূতিভূষণের সাহিত্যে মৃত্যু এসেছে পথের গতি বদলে যাওয়ার আয়োজন নিয়ে। তাঁর কাছে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং অন্য এক শুরু। বলা যায় মৃত্যু মানে অনিঃশেষ এক যাত্রা। তপোব্রত ঘোষ ব্যক্তিগত পুরাণ নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, জন্মমৃত্যুর চক্রপথে মানুষ চিরপথিক আর সেই চক্রপথের পরিচালক পথের দেবতা বৈশ্রবণ। এখানে তিনি একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘ভাবজীবন’।
‘উমারানী’ গল্পে প্রথমটি শৈল, দ্বিতীয়টি উমারানীর মৃত্যু। গল্পে শৈল লেখকের নিজের ছোট বোন। তাঁর মৃত্যুর খবর যখন পেলেন, তখন দখিন হাওয়া শীত তাড়িয়ে দিচ্ছে। যে-বোনকে তিনি ভালোবাসতেন সে আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডলের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। প্রকৃতির সঙ্গে মৃত্যুর উপমায় অভিঘাতটি অন্যরকম হয়ে ওঠে পাঠকের মনে। সেই শৈলর স্বামী বিয়ে করেন উমারানীকে। নিজের বোনের স্থানে কিন্তু লেখকের উমারানীকে ভালো লাগার কথা নয়। তবে উমারানীর হৃদয়ের উত্তাপে তিনি পরাজিত। একসময় ছোট করে ‘রানী’ নামেও ডাকেন লেখক। শৈল নিজের দাদার (লেখককেই ধরা হচ্ছে কারণ উত্তম পুরুষের ব্যবহার) জন্য বুনতে শিখেও প্রথম মাফলারটি বানিয়েছিল স্বামীর জন্য। এই গল্প শুনে উমারানী, স্বামীর প্রয়াত প্রথম স্ত্রীর ভাইয়ের জন্য পশমের জুতো বোনেন। নিজের খাবারের পয়সা বাঁচিয়ে ভাইয়ের বিয়ের জন্য রুপার কাঁটা তৈরি করান। লেখকের মনে হয়, শৈল থাকলে এর বেশি কিছু করতে পারত না। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় বিভূতিভূষণের কথাশিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘একটি মৃত্যু পেরিয়ে আরেকটি জীবন প্রতিষ্ঠা হয় : শৈল ধারাবাহিক উমারানীতে, যদিও এ মেয়েটি অজানা-অচেনা। এভাবেই বিভূতিভূষণের বীক্ষায় জীবন প্রবাহিত হয়, আপনজনের মৃত্যু বিচ্ছেদ ঢেকে দিয়ে আরেক জীবন আসে।’
আরণ্যক উপন্যাসে সত্যচরণ কল্পনা করেছে, ‘মৃত্যুর পরে অজানা কোন অদৃশ্যলোকে অশরীরী হইয়া উড়িয়া চলিয়াছি ভগবান বুদ্ধের সেই নির্বাণ-লোকে, যেখানে চন্দ্রের উদয় হয় না, অথচ অন্ধকারও নাই।’ পথের পাঁচালীতে দুর্গার মৃত্যুতে পাঠক বেদনায় বুঁদ হয়ে উঠলেও তিনি নির্বিকারচিত্তে লিখে যানÑ ‘আকাশের নীল আসত্মরণ ভেদ করিয়া মাঝে মাঝে আনন্দের হাতছানি আসেÑ পৃথিবীর বুক থেকে ছেলেমেয়েরা চঞ্চল হইয়া ছুটিয়া গিয়া অনন্ত নীলিমার মধ্যে ডুবিয়া নিজেদের হারাইয়া ফেলেÑ পরিচিত ও গতানুগতিক পথে বহুদূরপারে কোন পথহীন পথে দুর্গার অশান্ত চঞ্চল প্রাণের বেলায় জীবনের সেই সর্ব্বাপেক্ষা বড় অজানার ডাক আসিয়া পৌঁছিয়াছে!’ আসলে অপুর জীবনে নতুন বাঁক আনতে দুর্গার মৃত্যু হয়তো দরকার ছিল। এ বিদায় না হলে নিশ্চিন্দিপুর থেকে তাদের কাশী যাওয়ার পথটা সরল হতো না। উপন্যাসে দুর্গার একবারই বিয়ের সম্ভাবনা উঁকি দেয়। লিখেছেন, ‘কি জানি কেন আজকাল তাহার মনে হয় একটা কিছু তাহার জীবনে শীঘ্র ঘটিবে। এমন কিছু শীঘ্রই আসিতেছে যাহা আর কখনো আসে নাই।’ পাঠক ভাবেন, এ যেন বিয়েরই প্রস্তুতি। দুর্গার মৃত্যুতে আকস্মিক বোঝা যায়, সেই নতুন কিছুর অনুভব আসলে মৃত্যুর জাল বুনতে বুনতে এসেছেন লেখক। মৃত্যুর পরও পাঠকের মনে রয়ে যায় এক কিশোরীর রেলগাড়ি দেখার মতো তুচ্ছ কিন্তু বৃহৎ ইচ্ছাটা।
পথের পাঁচালীর দুর্গার মৃত্যু মাইলফলক হয়ে আছে। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে মৃত্যু সর্বদা একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে এসেছে। মহাভারতের মতো অতি বড় বীর, অনিবার্য যার প্রয়োজনÑ সেও অবলীলায় ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্গা ও অপুর বেড়ে ওঠা, পাঠকের হৃদয়ের মধ্যে দুর্গা ধীরে ধীরে পরিণতি পায়। আকস্মিক দুর্গা দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেলে কণ্ঠ ছিঁড়ে কান্না আসে। মৃত্যুকে বিভূতিভূষণ তার উপন্যাসে এক প্রতীকী মাত্রায় তুলে ধরেছেন,Ñ‘দুর্গা আর চাহিল না। আকাশের নীল আস্তরণ ভেদ করিয়া মাঝে মাঝে অনন্তের হাতছানি আসেÑপৃথিবীর বুক থেকে ছেলেমেয়েরা চঞ্চল হইয়া ছুটিয়া গিয়া অনন্ত নীলিমার মধ্যে ডুবিয়া নিজেদের হারাইয়া ফেলেÑপরিচিত ও গতানুগতিক পথের বহুদূর পারে কোনো পথহীন পথেÑদুর্গার অশান্ত, চঞ্চল প্রাণের বেলায় জীবনের সেই সর্বাপেক্ষা অজানা ডাক আসিয়া পৌঁছাইছে।’
দুর্গার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ‘নতুন কাপড় পরাইয়া ছেলেকে সঙ্গে লইয়া হরিহর নিমন্ত্রণ খাইতে যায়। একখানা অগোছালো চুলে-ঘেরা ছোট মুখের সনির্বন্ধ গোপন অনুরোধ দুয়ারের পাশের বাতাসে মিশাইয়া থাকেÑহরিহর পথে পা দিয়া কেমন অন্য মনস্ক হইয়া পড়ে।’ পাঠক চোখে অশ্রু না এনে পারে না।
ইছামতী উপন্যাসে অত্যাচারী নীলচাষি শিপটন সাহেবের মৃত্যুদৃশ্যও আমাদের নাড়া দেয়। সুদূর ইংল্যান্ডের কোনো এক গ্রাম থেকে আসা। মৃত্যুকালে রক্ষিতা গয়া মেম আর রাম কানাই কবিরাজ মুচি বাগদিরা ছাড়া তেমন কেউ তার পাশে ছিল না। যখন সাহেবের কথা বন্ধ, শ্বাসকষ্টÑদেওয়ান হরকারী বলল, এ কষ্ট আর দেখা যায় না। মৃত্যুর চূড়ান্তপর্বে কষ্ট হয় কি নাÑমানুষের জানা সম্ভব নয়। বিভূতিভূষণ লিখলেনÑ
শিপটন সাহেবের কষ্ট হয়নি। কেউ জানত না সে তখন বহুদূর স্বদেশের ওয়েস্টমোরল্যান্ডের অ্যান্ডসি গ্রামের ওপরকার পার্বত্যপথ রাইনোজ পাস দিয়ে ওক আর এলম গাছের ছায়ায় ছায়ায় তার দশ বছর বয়সের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে চলেছিল খরগোশ শিকার করতে, কখনো বা পার্বত্য রদ এল্টার-ওয়াটারের বিশাল বুকে নৌকায় চড়ে বেড়াচ্ছিল, সঙ্গে ছিল তাদের গ্রেট ডেন কুকুরটা...
হয়তো মৃত্যুর আগে মানুষের অবচেতনে তার শৈশবের স্মৃতিই বেশি ভেসে ওঠে।
আসলে ‘মৃত্যুকে কে চিনিতে পারে, গরীয়সী মৃত্যু-মাতাকে? পথপ্রদর্শক মায়ামৃগের মতো জীবনের পথে পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে সে, অপূর্ব রহস্যভরা তার অবগুণ্ঠন কখনো খোলে শিশুর কাছে, কখনো বৃদ্ধের কাছে..।’
মানুষ নিজের মধ্যেও অনেকবার মরে যায়, তার দেহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে। শারীরিক অস্তিত্ব বিলয়ের জন্য যদি দুঃখবোধের উদয় হয়। কিন্তু কোন সে শরীর, মৃত্যুর সময় আমরা কোন শরীরের কথা বলি। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, এমনকি বার্ধক্যেও মানুষ এক রূপ থেকে অন্য রূপে যায়।
‘দৃষ্টিপ্রদীপ’-এ বিভূতিভূষণ সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটেছেন। লৌকিক-অলৌকিক আর জিতুর প্রেম, ভবিষ্যৎ দর্শন, দরিদ্রতা নিয়ে তিনি যে চিত্র আঁকলেন সেটা খুব একটা সার্থকতা পেল না।
বিভূতিভূষণের সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা বিতর্কিত উপন্যাস ‘দেবযান’ সম্পর্কে। এই উপন্যাস লিখতে তাঁকে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত করতে হয়েছে। লৌকিক ও অলৌকিকতার যুগপৎ মিশেল থাকলেও দেবযান যেন এসব কিছুকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক উপন্যাস রচনা করলেন।
এই উপন্যাসে ধরা পড়েছে তাঁর মৃত্যুচেতনা। মৃত্যুর আগের জীবন সম্পর্কে আমরা সকলেই ওয়াকিবহাল কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী জীবন কেমন হবে এটাই মানুষের চির-কৌতূহলের বিষয়। এই চিন্তা থেকেই জন্ম নিয়েছে দেবযান। উপন্যাসটা পড়া শেষ করে মনে হয়েছে, এ তো শুধ মৃত্যু চেতনা নয় এর ভেতরে ধরা আছে স্রষ্টার গভীর চিন্তা ও বিশ্বাসের জগৎ। আছে সুগভীর রোমান্টিক চেতনাবোধ। আত্মা যে অবিনাশী এই সত্য তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কল্যাণীকে। প্রেমের উপাখ্যানের সঙ্গে মিশে গেছে অলৌকিকতা। পুনর্জন্মের কথা। আছে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির কথাও। যতীন ও পুষ্পের মধ্যে যে বাল্যপ্রেম ছিল অভিশাপগ্রস্ত, যার জন্যে পার্থিব জীবনে তারা মিলিত হতে পারেননি। মৃত্যুর পরে সেই আকাঙ্ক্ষা, সুপ্ত প্রেম নতুন রূপে ধরা দিল। শুরুতে যেটা ছিল মর্ত্য জীবনের মধুর বিধুর কাহিনী মৃত্যুর পরে সেটা হয়ে উঠল।
সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এই উপন্যাস। জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে, মৃত্যুর পরে পরলোক সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস। বিভূতিভূষণ নিজেও তাঁর জীবনের ভেতর দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন মৃত্যুকে।
একদিনের একটা ঘটনার কথা বললে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। সেবার স্কুলে পুজোর ছুটি পড়লে বিভূতিভূষণ স্ত্রী কল্যাণী আর শিশু পুত্রকে নিয়ে চললেন ঘাটশিলায়। সেখানে থাকেন তাঁর ভাই নুটু, পেশায় একজন চিকিৎসক। ঘাটশিলাতে বিভূতিভূষণ একটা ছোট্ট বাড়ি বানিয়েছিলেন। নাম দিয়েছেন, ‘গৌরীকুঞ্জ’।
১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫ সাল। কোজাগরী পূর্ণিমার দুইদিন পরে বিকেলের দিকে বেড়াতে বের হলেন। জঙ্গল আর পাহাড়ঘেরা ধারাগিরিতে। সঙ্গে আছে লরি বাংলোর ভক্তদা, কানুমামা এবং আরও কয়েকজন। পাহাড়ে উঠতে উঠতে বিভিন্ন গল্প হচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় তখন দ্বিতীয়ার চাঁদ তার মহিমা ছড়াচ্ছে। শাল, পিয়াল আর আমলকীর বনে মাতন লেগেছে। কী এক বন্য ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। কন্টিকারীর ঝোপ থেকেই আসছে এই গন্ধ। তাঁরা বড় একটা পাথরখণ্ডের উপরে বসে থাকলেন বহুক্ষণ।
রাত বাড়ছে, কয়েকজন উঠে পড়লেন। সঙ্গীরা এবারে নামছেন, কিন্তু বিভূতিভূষণ আরও উপরে উঠতে লাগলেন।
‘কী হল, আসুন, আর উপরে উঠবেন না।’
কিন্তু কে শোনে সে কথা। তিনি উঠতে লাগলেন। হঠাৎই একটা বিকট চীৎকারে সঙ্গীরা ঘাড় ঘোরালেন। উপরের দিকে উঠে দেখলেন দুই হাতে মুখ ঢেকে বিভূতিভূষণ থরথর করে কাঁপছে। তাকিয়ে দেখেন, সামনে একটা খাটিয়া। তার উপরে সাদা কাপড়ে ঢাকা দেওয়া, সম্ভবত মৃতের শরীর।
নিচে মাটির সরায় চাল, কলা ইত্যাদি।
সঙ্গীরা ভাবলেন হয়তো পাহাড়িদের কারো মৃতদেহ রাখা হয়েছে।
বিভূতিভূষণের মুখে কথা নেই। সর্বাঙ্গে ঘামের স্রোত। সঙ্গীদের কাঁধে ভর দিয়ে কোনোমতে নিচে নামলেন। দেখে মনে হচ্ছে তিনি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন। সঙ্গীরা আশ্চর্য হলেন, যিনি কিনা রাত বেরাত জঙ্গল, পাহাড় সব ঢুঁড়ে বেড়িয়েছেন জীবরভর প্রেতাত্মা, পরলোক চর্চা করে গেলেন তিনি পেলেন ভূতের ভয়!
কথাটা জিজ্ঞেসা করতেই বিভূতিভূষণ বললেন, ‘কিছুদিন ধরে বুঝতে পারছিলাম। আজ মনে হল এবারে আমাকে যেতে হবে।’
Ñ‘কী হয়েছে খুলে বলুন তো?’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কে যেন হাতছানিতে আমাকে খাটিয়ার দিকে টেনে নিয়ে গেল। এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে আমি সেই সাদা কাপড় সরাতেই দেখি মড়ার মুখটা আমারই! ওটা আমারই মৃতদেহ।’
Ñ‘কী সব বাজে চিন্তা করছেন?’
বন্ধুরা ধমক দিলেন।
বিভূতিভূষণ ম্লান হেসে বললেন, আব্রাহাম লিংকনও কিন্তু ঠিক এমনি তাঁর মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন মৃত্যুর আগে। তবে তিনি দেখেছিলেন নিদ্রিত অবস্থায়। আর আমি প্রত্যক্ষ করলাম জাগ্রত অবস্থায়।
তিনি শুধু একটাই অনুরোধ করলেন, কল্যাণী যেন এ ব্যাপারে কিছু জানতে না পারে।
সকলে ডাহিগড়ে ফিরে এল শবযাত্রার মত।
এর কিছুদিন বাদেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন।