সৈয়দ শামসুল হক
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৫ এএম
সৈয়দ শামসুল হক
সৈয়দ শামসুল হকের এ লেখাটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত। ২০১১ সালে অধুনালুপ্ত একটি দৈনিকের জন্য তিনি লেখাটি প্রদান করেন। অনুলিখনের পর তিনি তা সম্পাদনা দেখে পূর্ণাঙ্গতা দান করেন। এটি তাঁর কোনো গ্রন্থে স্থান পায়নি। শৈশব, লেখার শুরুর সময় ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে রচনায়। কল্পনার আধকেশা নদীর কারিগরের স্বপ্নময় এক জগতের খোঁজ এতে পাওয়া যাবে।
আমি সব সময় অনুভব করি যে, আমার ভেতরে অনবরত কিছু জন্ম হচ্ছে এবং সেই কথাগুলো আমি বলতে চাই। না বললে আমি খুব অসুস্থ বোধ করি। এটাকে বলা যায় আমার সুস্থতা অর্জন। সবকিছুর কেন্দ্রে কিন্তু মানুষ। মানুষকে নিয়েই জীবন, মানুষকে নিয়েই পৃথিবী, ইতিহাস এবং আমিও মানবজন্ম নিয়ে পৃথিবীতে আসি। ফলে সবকিছু নিয়েই যে অনবরত অনুরণন হচ্ছে নিজের ভেতরে, সেগুলোকে সাহিত্যের ভাষায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করি।
আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার। আমি তাকে দেখেছি, মধ্যরাতে উঠে হাঁটুগেড়ে মনোযোগের সঙ্গে লিখছেন। সেটা কোনো না কোনোভাবে আমার মানসজগতে কাজ করেছিল। এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন, ডাক্তার না হয়ে লেখক হলাম কেন? আসলেই এটার কোনো উত্তর নেই আমার কাছে।
অনেকে মনে করেন কবিত্ব ঈশ্বর প্রদত্ত একটা শক্তি। আমি তা বিশ্বাস করি না। এটা একেকজনের পরিপার্শ্ব, মানসগঠনের ওপর নির্ভর করে। আমার হয়তো মনে হয়েছে ভেতরে যে কথাগুলো রয়েছে সেগুলো বলা খুব দরকার। ছেলেবেলায় আমার বাবা-মা বলতেন, আমি যেকোনো ঘটনা খুব গুছিয়ে সুন্দর করে বলতে পারতাম। সুতরাং বলা যায় যে, লেখা শুরুর আগেও লেখার ব্যাপারটা আমার মধ্যে ছিল। শিশুকালে তো আমরা প্রায় সবাই-ই কবিতা পড়া দিয়ে শুরু করি। বাবা-মা কবিতা বা ছড়া শেখান-পড়ান। স্কুলপাঠ্যের কবিতাগুলো কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করে থাকবে। এসব পড়ে একটা কিছু আমার দেখার ভেতরে এসে গেল। আমি হয়তো ভাবতাম যে, এভাবে তো আমিও দেখতে পারি। এ রকম অনেক অগোছাল ভাবনাই আমার ভেতরে কাজ করে থাকতে পারে। মোটের ওপরে যদি বলি, আমি লেখক। আমি ভাষা নিয়ে কাজ করি। আর ভাষার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। সেই মানুষগুলোকে নিয়েই আমার ভাবনা-চিন্তা-অনুরণন। এখন যে সময়ে এসে পৌঁছেছি, সেটা অনেক কিছুর ভেতর দিয়ে পার করে এসেছি। মহাযুদ্ধ দেখেছি, দেশভাগ দেখেছি, ৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হলো এবং সেই নির্বাচনের ফলাফলকে কীভাবে বানচাল করা হলো, সামরিক শাসন হলোÑ কত কিছুই তো দেখলাম। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যাÑ আমাদের জীবনে অনেকগুলো বড় ঘটনা ঘটে গেছে। অনেকে এই ঘটনাগুলোর ভেতর দিয়ে বাস করেন। আমার ভেতরে এই ঘটনাগুলো অনুরণন সৃষ্টি করে। আমি সবকিছুই একটু ভেতর থেকে, একটু গভীরে দেখার চেষ্টা করি। এই মুক্তিযুদ্ধ কি শুধু মুক্তিযুদ্ধ, শুধু রণাঙ্গনে যুদ্ধ হচ্ছে, লুণ্ঠিত হচ্ছে, অগ্নিসংযোগ হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছেÑ এটাই তো প্রথম নয়, পৃথিবীতে এ রকম অনেক হয়েছে। জিনিসগুলো আমি ভাবার চেষ্টা করেছি। মানুষ, মানুষের সম্পর্ক নিয়ে, প্রেম নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি। এসব ভাবনা যে একটা প্রকল্প আকারে গ্রহণ করেছি তা নয়। এসব বিষয় সব সময় মনের ভেতরে যে অনুরণন সৃষ্টি করে, তা আমি কখনও শব্দে, কখনও ছন্দে, কখনও নাটকে, কখনও গল্প বা উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি জীবন থেকে উপভোগ করি, এ জীবন আমার কাছে অত্যন্ত নাটকীয় জিনিস।
অনেকে বলেন, আমার কল্পনাভূমি জলেশ্বরী সেখানে আধকেশা নামে একটা নদী আছে। আমি খুব অল্প বয়সেই ঢাকায় চলে এসেছি। কিন্তু আমার কল্পনাভূমি রয়েছে শৈশবে, গ্রামেই।
অধিকাংশ সাধারণ মানুষ গ্রামে বাস করে। যাদের আমরা সাধারণ বলি, আমার কাছে তাদেরও বিশিষ্ট মনে হয়। কারণ প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও টানাপড়েন রয়েছে। তো এটা ঠিক যে, প্রতিটি গল্পের জন্য আলাদা আলাদা গ্রাম পরিবেশ তৈরি না করে আমার ছেলেবেলায় দেখা গ্রামটির ওপর ভিত্তি করে সেটাকে অবিকল না রেখে, কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে সবটা মিলিয়ে আমি একটা জনপদ, একটি ছোট শহর, তার চারপাশে অনেকগুলো গ্রাম, কাছেই ভারত সীমান্তÑ সবটা মিলিয়ে আমি একখণ্ড জায়গা তৈরি করতে চেয়েছি, যার ভেতর দিয়ে আমি সমগ্র বাংলাদেশকে দেখতে পাই। আমাকে বারবার নতুন জায়গার সন্ধান করতে হয়নি। কিন্তু শহর নিয়েও যে লিখিনি তাও নয়।
কিন্তু শহর জীবন আমার কাছে অতটা গুরুত্ব পায়নি; যতটা পেয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন, গ্রামীণ জীবন, ছোট শহরের জীবন। আমি সাধারণ মানুষের ভেতরে অসাধারণত্ব খুঁজতে চেষ্টা করেছি। চাপের মুখে সাধারণ মানুষের যে উত্থান, যে অভ্যুদয় হয়, এটা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি, সাধারণ মানুষ অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়েছে। এই যে এমন মহান মুক্তিযুদ্ধ আমরা করেছি, মুক্তিযোদ্ধারা অধিকাংশই তো গ্রামের, ছোট শহরের, মফস্বলের কিন্তু তাদের ভেতরে কী রকম বড় একেকজন মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। তারা উন্নত হয়েছে, উন্নীত হয়েছে। এ দিকটাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
আর আমাদের দেশে যে নগরায়ণ হলো, সেটা অন্যদিকে চলে গেল। বাংলাদেশের যে অভিজ্ঞতা; রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে অভিজ্ঞতা; সামরিক শাসনের যে অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞার প্রেক্ষিতে নগরায়ণ খুব ছোট্ট একটা জায়গায়...।
আমার প্রথম গল্পের বই বের হয় ১৯৫৪ সালে। সেসময় আমি কবিতাও লিখতাম। কবিতা ও গল্প দুটোতেই আমি সমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু এখন আমি ছোটগল্প অনেকটাই কম লিখি। কিন্তু ছোটকালে আমি কবিতা এবং গল্প সমানভাবে লিখেছি। কিন্তু আমি যে পরিমাণ কবিতা লিখেছি তার অর্ধেকও প্রকাশ করিনি। আমি মনে করেছি, লেখাকে লেখা হয়ে উঠতে হবে। যেকোনো লেখার আমি চারটি দিক বিচার করি। যখন কবিতা লিখছি তখন বিচার করিÑ এ কবিতাটি কী কবিতা হয়েছে, আরেকটি হচ্ছে আমি আগে যে কবিতা লিখেছি তার ভেতরে এটির স্থান কোথায় হবে। আমি কি একই কথা বলছি, আমি কি একই রকমে কথা বলছি। তার পর বাংলা ভাষায় কবিতার একটি ধারা রয়েছে, সেখানে এই কবিতার অবস্থান কোথায়। তদুপরি সমগ্র বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিশ্বকবিতারও একটি মান রয়েছে, সেখানে লেখাটির স্থান কোথায়। এই চারটি বিবেচনার ভেতর দিয়ে আমি নিজেকে সন্তুষ্ট বোধ করলেই কেবল লেখাটি প্রকাশ করি। নইলে আমার সমাপ্ত, অর্ধসমাপ্ত অনেক লেখা রয়েছে। মাঝেমধ্যে আমার ল্যাপটপের দিকে তাকালে আমি অবাক হয়ে যাই এত লেখা অসমাপ্ত রেখেছি। লেখালেখির দিক থেকে বলতে গেলে আমি খুব অতৃপ্ত মানুষ।
আমি মনে করি, একটা মানুষের জীবনের ভেতরে অনেকগুলো জীবন থাকে। এই আমি এবং দশ বছর আগের আমি এক নই। প্রতিটি অভিজ্ঞতার পরই আমাদের নতুন করে জন্ম হয়। সেই অর্থে আমি বহুবার জন্মগ্রহণ করেছি এবং বহুবার আমার মৃত্যু হয়েছে। আমার বই ‘প্রণীত জীবন’-এ একটা কথা রয়েছে, আমার বাবার জীবনে এই প্রশ্নটা বারবার দেখা দিয়েছে উনি বারবার বলতেন, যা আমার ভেতরেও একটা প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রশ্নটা হলোÑ আমি এখানে কী করছি। এ জীবনের একটা অর্থ আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি কি নিষ্ক্রিয়, আমি কি মৃত, শুধু নিঃশ্বাস টানছি বলেই কি আমি জীবিত। আমি বেঁচে থাকার মধ্যে একটা অর্থ খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ঘটনায় আমি জীবনের অর্থ সন্ধান করে চলেছি। এখনও সন্ধান করছি। দেশ ও বিদেশ দুটোই আমার কাছে এক। আমি একই সঙ্গে বিশ্বের আবার আমি বাঙালিও বটে। বিশ্বে ভালো যা কিছু হয়েছে সবকিছুর উত্তরাধিকার আমার, সবকিছু আমার অর্জন। আবার আমি যে বিশেষ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছি, বিশেষ অঞ্চলের মানুষের বিশেষ ভাষাভাষীর, তার মধ্যেও আমি বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করি। আমরা কিন্তু খণ্ডিত মানুষ নই। আমরা একটি মানব সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। যেমন ধরা যাক আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। পৃথিবীতে শুধু কি আমরাই মুক্তিযুদ্ধ করেছি? মুক্তিযুদ্ধ কি আর হয়নি? গণহত্যা কি আর হয়নি? ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সামরিক শাসনÑ এসব তো পৃথিবীর অন্য দেশেও হয়েছে। আমি সবার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখতে চাই।
আমার ভেতরে একটা উন্মাদ অস্থির পাখি বাস করে। সে কেবলই এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে ভ্রমণ করে। কিন্তু লেখার টেবিলে আমি এক অন্য মানুষ। লেখা হচ্ছে নির্জন, নিঃসঙ্গ এবং অত্যন্ত ধ্যানমগ্ন একটি কাজ। যখন সবাই আড্ডা দিচ্ছি, আনন্দ করছি, উপভোগ করছি, সামাজিকতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি কিংবা ঘুমিয়ে রয়েছি; তখন একজন লেখক তার ঘরে জেগে রয়েছেনÑ হয় পড়ছেন, নয় লিখছেন অথবা ভাবছেন। কত কত মধ্যরাত গেছে আমি বারান্দায়, আমার দক্ষিণের বারান্দায় চুপ করে একা বসে আছি। অনেকে দেখে মনে করতে পারেন যে, হয়তো কোনো সাংসারিক ঝামেলায়, পারিবারিক কারণে বারান্দায় বসে আছি। কিন্তু মোটেই তা নয়। এই বিশ্ব আমার পরিবার, এই ষোলো কোটি মানুষ আমার পরিবার, এর প্রতি ইঞ্চি আমার জায়গা।
কবিদের নাকি প্রেরণাদাত্রীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমার প্রেরণা আমি নিজেই। আমি সবকিছুর ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছি, বাস করছি, বিশ্বাস করছিÑ এটাই আমার প্রেরণা। আমার জীবনই আমার প্রেরণা, আমার অভিজ্ঞতাই আমার উপকর্ম, আর আমার ভাষাই হচ্ছে আমার...।
আমার একটি কবিতায় ধূসরতার কথা রয়েছে। এই ধূসরতা হচ্ছে আমার অন্তর্গত, একেবারেই ভেতরকার। কখনও কখনও এমন অনুভব হয় যে, আমি অত্যন্ত ধূসরতার ভেতরে রয়েছি। আমার বন্ধুদের অনেকেই চলে গেছে। যাদের সঙ্গে পথ হেঁটেছি, বড় হয়েছি তারা আর কেউ নেই এখন। এদিক থেকে ধূসর মনে হয়।
আগেই আমার ভেতরের অনুরণনের কথা বলেছিলাম। এই বাহাত্তর বছর বয়সে এসেও আমার ভেতরে সেই অনুরণন হচ্ছে। এই যে সময়ের অনুরণন আমার ভেতরে হচ্ছে, সেটাকে ভাষায় ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আমার কাছে খ্যাতি, বিত্ত, সম্মানÑ এগুলো বড় কোনো কথা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এমন একটা দেশে আমার প্রচুর ভক্ত রয়েছে, যে দেশে সাক্ষরতার হারই খুব কম, পড়াশোনার অভ্যেস খুবই কম। সে রকম একটি দেশে লেখক হয়ে আমি যে সম্মান পেয়েছি, এর কোনো তুলনা হয় না।