মঈনুস সুলতান
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৩২ এএম
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:২১ এএম
ওয়াশিংটন ডিসির ইউনিয়ন স্টেশন। ছবি : লেখক
মি. নুর আল মাইউনগানি গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার বাইফোকাল চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে রোডম্যাপ দেখেন। রাত সাড়ে নয়টার মতো। আমরা ভার্জিনিয়ার ফলস্ চার্চ থেকে ওয়াশিংটন ডিসির সিটি সেন্টারে যাচ্ছি। কেনিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম মাইউনগানি বছর কয়েক হলো যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। ইংরেজি বলেন তিনি চমৎকার, কোথাও কাজবাজ করে রুজিরোজগারও করছেন বেশ ভালো। খুব ফিটফাট কোট-প্যান্ট-টাই পরে ভোরবেলা কফির থার্মাল মগ হাতে স্মার্টলি কাজে যান। উইকেন্ডে স্পোর্টস্ জ্যাকেটের পকেটে টাইয়ের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করা রুমাল গুঁজে হাটবাজার করতে বেরোন। একা থাকেন বলে মানুষটি একটু প্রতিবেশী-রঞ্জক গোছের। কেনিয়ান কায়দায় পিনাটবাটারের ঘন ক্বাথে বিস্তর রসুনের ফোঁড়ন দিয়ে চিকেন রান্না করলে আমাকে এক বাটি দিতে ভোলেন না। উইকেন্ডে আমি শপিংয়ের বিশেষ একটা সময় পাই না, হাটবাজারে মতি নেই বুঝতে পেরে মাঝে মাঝে অনুরোধে আমার জন্য জরুরি কিছু খাবারদাবারও তিনি কিনে নিয়ে আসেন।
মি. মাইউনগানি মানুষটি ভালো হলেও যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিকতার হালহকিকত তেমন একটা বোঝেন বলে মনে হয় না। ঈদে-চান্দে তিনি মাথায় কারুকাজ করা তাজের সঙ্গে ‘বুবু’ বলে আজানুলম্বিত আলখাল্লা পরতে ভালোবাসেন। আমি ছাড়া আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাকি সব প্রতিবেশীই পোল্যান্ড, রোমানিয়া কিংবা ইতালি থেকে আগত সব শ্বেতাঙ্গ ইমিগ্রেন্টস্। অনেকেই ইংরেজি তেমন ভালো বলেন না। তো এক শবেবরাতে মাইউনগানি কেনিয়ান কায়দায় হালুয়া-রুটি তৈরি করে তা প্রতিবেশীদের বিলানোর উদ্যোগ নেন। তার পাশের অ্যাপার্টমেন্টে পোলিশ মহিলার লিভিংরুমের দুয়ার কী কারণে জানি খোলা ছিল। সন্ধেবেলা শ্বেতাঙ্গিনী নারী কাজ থেকে ফিরে সিল্কের রিলাক্স রৌব পরে কাউচে আধশোয়া হয়ে রেডওয়াইন পান করতে করতে স্টিরিওতে শোঁপার ক্লাসিক্যাল মিউজিক শুনছেন; আচমকা দুয়ারে হালুয়ার বর্তনে মোমবাতি জ্বেলে দুধসাদা আলখাল্লা পরা মি. মাইউনগানি ছায়ামূর্তির মতো এসে দাঁড়ালে তার হাত থেকে ঠন করে পড়ে যায় ওয়াইন গ্লাস। পোলিশ ভাষায় পরিত্রাহী চিৎকার করতে গিয়ে মহিলার তো নার্ভাস ব্রেক ডাউন হওয়ার উপক্রম!
ভার্জিনিয়া থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়া কঠিন না। রাত সাড়ে নয়টার দিকে এদিকে ট্রাফিকের ঝামেলাও কিছু থাকে না। মাইউনগানি রোডম্যাপ দেখেও ভুল টার্ন নিলেন বলে আমি একটু বিরক্ত হই। তার গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে আটকানো জিপিএস, তা দিয়ে যেকোনো গন্তব্যে অত্যন্ত সহজে যাওয়া যায়। মাইউনগানি বোধ করি জিপিএস ইউজ করতে জানেন না তাই থাকুমুকু করে ভুল শুধরিয়ে সঠিক সড়কে উঠে আসার চেষ্টা করেন। রাতের সিটিস্কেপে ক্যাপিটল হিলের আলোকিত ডোম ও আব্রাহাম লিংকন মেমোরিয়ালের আউটলাইন ভেসে উঠলে বুঝতে পারি বার দুই তিনি ভুল টার্ন নিলেও অবশেষে ইউনিয়ন ইস্টিশনে এসে পৌঁছাবেন। পাশের সিটে বসে আমি কেনিয়ার সাম্প্রতিক খ্রিস্টান-মুসলিম রায়টের খবর খুঁটিয়ে পড়ি। নাইরোবির এ পুরোনো পত্রিকা মাইউনগানি আমাকে পড়তে দিয়েছেন। রায়টের সূত্রপাত হয় জ্যামাইকা থেকে আগত এক মোল্লা জামে মসজিদে জ্বালাময়ী খুতবা দিলে। মুসলমান তরুণরা খেপে গিয়ে পুড়িয়ে দেয় গোটা দুই গির্জা। প্রতিক্রিয়ায় খ্রিস্টানরা পাঙ্গা-শাবল ও ভোজালি দিয়ে হত্যা করে বেশ কিছু মুসলিমকে। মাইউনগানির পরিবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে গিয়ে দেখে সড়কে তাদের গোত্রের বেশ কিছু চেনাজানা মুসলমানের লাশ পড়ে আছে। এ অবস্থায় খোলামেলা রাজপথে হেঁটে পালিয়ে যাওয়া নিরাপদ নয়। তার আত্মীয়স্বজন নিকটবর্তী একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। ঘণ্টাখানেক পর বুঝতে পারেন তারা ভুলে এসে উঠেছেন এক খ্রিস্টান ধর্মযাজকের বাড়িতে। ধর্মযাজক বাইবেল স্টাডি করার ছোট্ট কামরায় তাদের লুকিয়ে রাখেন চার দিন। বর্তমানে পরিস্থিতি নরমাল। এ কাহিনী নাইরোবির ইংরেজি পত্রিকার সংবাদ হয়েছে। আত্মীয়স্বজনরা ডাকে পত্রিকার কাটিং মাইউনগানিকে পাঠালে তার কাছে সমস্ত ঘটনা অলৌকিক মনে হয়। তিনি শুকরিয়া আদায়ের জন্য কিছু কেনিয়ান খাবার তৈরি করেছেন। ভার্জিনিয়ায় আমরা যে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকি এখানে খাবার বিতরণের জন্য কাঙাল পাওয়া মুশকিল। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিস্তর হোমলেস বা গৃহহীন মানুষের বসবাস। এদের অনেকে নিত্য উপাসকাপাস করেন। আমি মাইউনগানিকে পরামর্শ দিই হোমলেসদের মাঝে খাবার বিলিয়ে দিতে।
ইউনিয়ন ইস্টিশনের সামনে আমরা গাড়ি পার্ক করি। এখানে ল্যাম্পপোস্টগুলোর বাতি কী কারণে জানি নিভিয়ে রাখা হয়েছে, তাই শ্বেতপাথরের বিপুল অট্টালিকাকে ভুতুড়ে দেখায়। হোমলেসদের তালাশে কেনিয়ান খাবারের প্যাকেট নিয়ে আমরা ইস্টিশনের ভেতরে ঢুকি। রাতের মতো বোধ করি ট্রেন চলাচল শেষ। বিশাল পরিসরের স্পেসে কোনো প্যাসেঞ্জার নেই। মাইউনগানি অবাক হয়ে অর্ধবৃত্তাকার ছাদ ও বেলকনি দেখেন। বেলকনিতে এক সারি লাইফ সাইজের স্ট্যাচু। মনে হয় আমরা যেন দাঁড়িয়ে আছি এক প্রাসাদের দরবার হলে, আর আমাদের দুই দিকে কোনো জাদুবলে প্রস্তরীভূত হয়ে আছে দুই সারি রাজপ্রহরী। অবশেষে আমরা বাইরে এসে ঘাসের গোলাকার চত্বরে যেখানে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মূর্তি, তার নিচে একজন জ্যালজেলে চেহারার হোমলেস মানুষের তালাশ পাই। তিনি মূর্তির বাঁধানো বেদিতে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছেন। মাইউনগানি তাকে এক প্যাকেট খাবার দিলে তিনি ফোঁকলা দাঁতে হেসে বললেন, ‘আই অ্যাম নট রিয়েলি এ হোমলেস। ম্যান, কাম টু মাই প্লেস ওয়ান ডে, আমি তোমাদের তাজা ট্রাউট মাছ রান্না করে খাইয়ে দেব।’ আমি জানতে চাই, ‘হোয়ার ইজ ইয়োর হোম?’ তিনি খাবারে আঙুল ঢুকিয়ে মাংসের হাড় স্পর্শ করে বললেন, ‘ইউ গাইজ্ শুড গিভ মি সাম ফিস। দাঁত নেই তো, মাংস খাওয়া বড় ঝামেলা যে।’ মানুষটি তেমন বয়স্ক না, তার সব দাঁত কেন পড়ে গেছে ঠিক বুঝতে পারি না। তিনি খানিকটা মাস-পটেটো মুখে পুরে শার্টে আঙুল মুছে ছেঁড়া ঝ্যারঝ্যারে ব্যাগ থেকে বের করেন একটি হাউসবোটের ছবি এবং তা দেখিয়ে বললেন, ‘দিস ইজ্ মাই হোম। আই অ্যাম আ ফিশারম্যান। আই ডোন্ট লাইক লিভিং ইন অ্যা হাউস। নৌকায় বসবাস করতেই আমি অভ্যস্ত।’ হাউসবোটের ছবি হাতে খাবারের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার ঝিমোতে শুরু করলেন।
ঝুপসি অন্ধকারে বেঞ্চে বসে আছেন আরেকজন হোমলেস মানুষ। তার পাশে রাখা রেক্সিনে বাঁধাই ভারী বাইবেল; তার ওপর জ্বলছে দুটি মোমবাতি। মৃদু আলোয় তিনি স্ক্রুড্রাইভার দিয়ে গিটারের তার ঠিক করছেন। মাঝে মাঝে তা থেকে টুংটাং শব্দ ছড়াচ্ছে। বাইবেলে মোমবাতির পাশে জড়ো করে রাখা আধপোড়া সব সিগারেট। মাইউনগানি তাকে এক প্যাকেট খাবার দিলে তিনি খাবার শুঁকে বললেন, ‘লিসেন গাইজ্, আই ডোন্ট রিয়েলি লাইক অল দিস স্পাইসি ফুড? তোমাদের কাছে একটা সিগ্রেট হবে না?’ আমরা অপারগতা প্রকাশ করলে কাঁধ অবধি দীর্ঘ লালচে চুলের এ হোমলেস মোমবাতির শিখায় সিগ্রেটের শেষাংশ জ্বালিয়ে তাকিয়ে থাকেন বিষণ্ন দৃষ্টিতে সামনের ইউনিয়ন ইস্টিশনের শ্বেতকায় হর্ম্যের দিকে। জাদুবলে কোথাকার কোন গোপন প্রজেক্টর থেকে তাতে ফুটে ওঠে স্ট্যাচু অব লিবার্টির ছায়া। দেখতে দেখতে ইস্টিশনের দেয়ালজুড়ে ভেসে যেতে থাকে ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকত আর গ্র্যান্ড কেনিয়ানের ছায়ারূপ।
গাড়ি হাঁকিয়ে ফেরার পথে সিগন্যালের লাল বাতিতে স্লো করতেই দেখি পাশের গলিতে একটি বাড়ির সিঁড়িতে বসে আরেক হোমলেস মানুষ। তার মলিন ব্যাগের পাশে কার্ডবোর্ডে সাইনে লেখা ‘হ্যাংগ্রি, সিক অ্যান্ড টায়ার্ড।’ ততক্ষণে বাতির লাল রঙ বদলে সবুজ হলে গাড়ি দাঁড় করানো যায় না। ট্রাফিক ম্যানেজ করে মাইউনগানি টার্ন নিয়ে গাড়ি সাইড করে বললেন, ‘এক প্যাকেট খাবার কাউকে দিতে পারিনি। এখানে পার্ক করা যাবে না। তুমি কি কাইন্ডলি এ প্যাকেট হোমলেস মানুষটাকে পৌঁছে দেবে? আমি গাড়ি নিয়ে রাউন্ড দিতে থাকব। খাবার দেওয়া হয়ে গেলে তোমাকে পিক করতে কোনো অসুবিধা হবে না।’ আমি প্যাকেট হাতে ফুটপাতে লাফিয়ে নামি।