জান্নাতে নাঈম
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৪ ১২:০৫ পিএম
কাল যদি মৃত্যু হতো/আজ শোকের দুদিন:/ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে ভুলে যেত তারকামণ্ডলি/সবকিছু মনে হতো ধাঁধা-সব কিছু বিগত অচিন।’ হালকা শব্দে সুরের তালে তালে এ পঙ্ক্তিগুলো বেজে যাচ্ছে। রাজধানীর বারিধারার ২ নম্বর সড়কের জে ব্লকের ৬ নম্বর বাড়ির ‘গ্যালারি প্ল্যাটফর্মস’-এর দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই শব্দ ও সুর শুনতে পেলাম। প্রজেকশনের পর্দায় চোখ রাখতে নজরে এলো শিল্পী আবদুশ শাকুর শাহের চিত্রকর্ম। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে। আবৃত্তিশিল্পী দেওয়ান সায়ীদুল হাসানের কণ্ঠে বেজে চলেছে কবিতা। কক্ষজুড়ে পিনপতন নীরবতা।
গ্যালারির দেয়ালে চিত্রকর্ম ঝুলছে। পাশেই কবিতা। কবিতা ও চিত্রকর্মের বিষয় এক। মানুষের মৃত্যু। করোনার করালগ্রাসে যখন বিশ্ববাসী নতজানু। সে সময়ের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। আর কবির কবিতায়ও এ একই ভাবের সমাবেশ ঘটেছে।
কথা হলো কিউরেটর সুলতানের সঙ্গে। তিনি বলেলেন, ‘কবি বিমল গুহর কবিতার সঙ্গে চিত্রশিল্পী আবদুশ শাকুর শাহের চিত্র নিয়ে এ প্রদর্শনী।’ বাঃ চিত্রকর্ম ও কবিতার যূথবদ্ধ এ আয়োজন। এর মধ্যে দেখা হলো কবির সঙ্গে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কবিতার সঙ্গে মিল রেখে শিল্পী চিত্রকর্ম এঁকেছেন, নাকি এ শিল্পকর্ম দেখেই কবিতা লেখা হয়েছে? স্মিথ হেসে কবি উত্তর দিলেন, ‘চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মানুষের কোনো কোনো মাধ্যমে মিল থেকে যায়। এ কবিতাগুলো করোনাকালে ঘরে বন্দি অবস্থায় লেখা হয়েছে। অন্য সবার মতো শিল্পীও বন্দি সময় কাটাচ্ছিলেন ঘরে বসে। তিনিও রঙতুলি নিয়ে এ চিত্রকর্ম এঁকেছেন। দুজন দুই মাধ্যমে অসহায় সময়ের কথা তুলে ধরেছি। তবে সে সময়ে আমাদের দুজনের মধ্য কোনো প্রকার যোগাযোগ হয়নি। পরে এসে জানতে পেরেছি।’
করোনাকালের স্মৃতি এখনও মানুষকে তাড়িত করে। সে সময় মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল সবাইকে। করোনার সময় হাসপাতালে থেকে দেখেছেন কবি মৃত্যুর রূপ। সে পরিবেশকে কবি লিখে রেখেছেন তার খাতার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায়। করোনার মাতালনৃত্যের প্রত্যক্ষ রূপের সেই কবিতাগুলো ‘এ কোন মাতাল নৃত্য’ শিরোনামে ২০২২ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়। সেসব কাব্যগন্থ থেকে বাছাই করে ১৪টি কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনালয়ের দেয়াল। সঙ্গে শিল্পী আবদুশ শাকুর শাহের করোনাকালে আঁকা ১৪টি শিল্পকর্ম। শিল্প ও কবিতার যৌথ প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন ছড়াশিল্পী আমির খসরু সেলিম। এ দর্শনার্থী এসেছেন বগুড়া থেকে। তিনি এসেছেন বোনের বাড়ি বেড়াতে। এখানে চিত্রকর্ম ও কবিতা নিয়ে প্রদর্শনীর তথ্য তিনি পেয়েছেন সমাজমাধ্যম থেকে। এ দর্শনার্থী বলেন, ‘আমাদের নিকট অতীতের দুঃসহ স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে এ গ্যালারিতে। যা দেখে সেই বন্দি দিনগুলোর কথা মনে হচ্ছে।’ এ দর্শনার্থীর মতো আরও অনেকেই কবিতার সঙ্গে চিত্রকর্মের এ প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।
গ্যালারি প্ল্যাটফর্মস আয়োজিত এ প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে ‘কাল যদি’। যা দুটি মাধ্যমের একটি শৈল্পিক সংলাপ। প্রদর্শনীর চিত্রকর্মগুলোর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয় শিল্পী আবদুশ শাকুর শাহের সঙ্গে। শিল্পী বলেলেন, ‘একজন শিল্পীর চোখে করোনার সময়টা কেমন ছিল সেটাই মূলত চিত্রকর্মে তুলে ধরা হয়েছে। এটা একটি সময় এবং মানুষের দুঃসহ সময়ের ইতিহাস ধরে রাখতে এ ছবিগুলো এঁকেছিলাম। করোনার সময় যে কষ্ট, আমি সে সময়ের ঘটনা নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। যখন করোনা শুরু হলো, তখন আমি বুঝতে পারিনি। সরকার থেকে যখন নির্দেশ এলো, তারপর আমি সেই পরিপ্রেক্ষিতে ছবি আঁকা শুরু করলাম।’
বলা যায়, এ প্রদর্শনীর বিষয় মূলত করোনা মহামারির অভিজ্ঞতার এক মর্মস্পর্শী প্রতিফলন। শিল্পী এবং কবির আন্তঃসংযোগের বহিঃপ্রকাশ বটে। প্রতিদিন সকাল এগারোটা থেকে রাত আট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনালয়টি। ১৪ জুলাই শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত।