ঈদস্মৃতি
আনোয়ারা সৈয়দ হক
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ১০:০১ এএম
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪ ১০:৫১ এএম
প্রচ্ছদ : হাসুরা আকতার রুমকি
বাঙালি মুসলমানের কাছে ঈদ আসে একটা স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে আনন্দের একটি দিন। ঈদের স্মৃতির কথা মনে হলে আমি এখনও ফিরে যাই আমার শৈশবে। সেই কত আগের কথা! যখন ভৈরব নদ জেগে ছিল। নদে পানি ছিল। আমরা ভৈরবের ওপর দিয়ে যেতাম। কত অজস্র স্মৃতি-আলোড়িত সেসব দিন।
ঈদের দিন সকালবেলা উঠে নতুন জামাকাপড় পরতাম। বাইরে ঘুরে বেড়াতাম। কোনো কোনো ঈদের দিনে দেখা গেছে বাবা-মায়ের মুখ ভারী। কিন্তু আমি ছোট মানুষ। অত কিছু বুঝতাম না। নতুন জামা পেয়েছি। আমার আনন্দ আর ঠেকায় কে!
মধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয়। আমাদের পরিবারও এর বাইরে নয়। অনেক ভাইবোনের সংসার। ছিল সাংসারিক নানান টানাপড়েন। তার পরও ঈদ পালন করা হতো। বাবা সবকিছুর ব্যবস্থা করে ফেলতেন। সেমাই, জর্দা, জাফরান, পোলাও, রোস্ট রান্না করা হতো। যেহেতু ঈদের আনন্দ ছোটদের মন থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না। নতুন জামাকাপড়, জুতো পরে প্রতিবেশীর বাড়িতে যেতাম। তারা দেখে বলত কী সুন্দর তোমার চুল, এই পোশাকে তোমাকে দারুণ মানিয়েছে। এসব শুনে অনেক ভালো লাগত। ভুলে যেতাম দুঃখকষ্ট। সেমাই, পায়েসসহ মজাদার খাবার খেয়ে বড়দের সালাম করতাম। এজন্য কিছু পুরস্কারও পেতাম। কেউ দু পয়সা দিতেন। আবার কেউ একটু বেশি দিতেন।
এ দিনটি যাপনের জন্য পনেরো-বিশ দিন আগে থেকে প্রস্তুতি চলত। কে কী নেবে। এবার কোন আত্মীয়বাড়িতে যাওয়া হবে। নানান পরিকল্পনা করা হতো। একটা হুলুস্থুল ব্যাপার। কে কী নেবেÑকেউ জুতো, কেউ জামা। আবার কেউ বেড়াতে যাবে দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি। তাদের সেই আবদার পূরণ করতে মধ্যবিত্ত পরিবার হিমশিম খেত। প্রত্যেকের বায়না পূরণের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করা হতো। এ ক্ষেত্রে মায়েরা মুখ চেপে সব সহ্য করতেন। তখনকার দিনে তো মায়েদের উপার্জন ছিল না। সম্পূর্ণভাবে নির্ভর ছিল বাবার ওপর। এখন যেমন মায়েরা আয় করেন। তাই নিজেদের সন্তানের জন্য শপিং মলে গিয়ে পছন্দ করে পোশাক কিনে আনেন। কিন্তু আমাদের মায়েরা বাবাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। দিন বদল হয়েছে। এখন বিপণিবিতানগুলোয় গেলে দেখা যায় নিম্নমধ্যবিত্ত মায়েরা ভিড় করছেন নানান কিছু কিনতে। নিজেদের পছন্দমতো সন্তানের জন্য পোশাক কিনে দিতে পারেন তারা। এই মায়েদের চোখে মুখে আনন্দের ছাপ লক্ষ করা যায়। এখন আমার এ দৃশ্য দেখে খুব ভালো লাগে। তাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই দিয়ে নিজের এবং সন্তানের শখ পূরণ করতে পারছেন। কিন্তু আমাদের মায়েদের সে সুযোগ ছিল না। আমাদের জন্য বিশেষ কিছু করতেও পারতেন না। এজন্য আমার কাছে ঈদ আনন্দ এবং বেদনারও। দুটির মিশেলেই কেটেছে আমার শৈশবের ঈদ। তার পরও ঈদের দিনের জন্য অপেক্ষা করতাম। আমরা একমাত্র ওই ঈদেই নতুন জামাকাপড় পেতাম। ঈদের বাইরে অন্য কোনো সময় তো আর তেমন কিছু দেওয়া হতো না। ঈদ উপলক্ষে বাবা মায়ের জন্য নতুন শাড়ি কিনে আনতেন। মা আমাদের নতুন জামাকাপড় পরিয়ে দিতেন। সুন্দর করে গোছগাছ করে দিতেন। আদর করতেন। তখন খুব ভালো লাগত।
ঈদোৎসব বাঙালি মুসলমানের একটা সংস্কৃতি। সবাই মিলে এ আনন্দ যাপন করি। আমরা যে সমাজে, পরিবেশে বাস করি সেখানকার দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই মিলে যদি ঈদ যাপন করতে পারি, তবে তো ঈদ সত্যিকার অর্থে আনন্দ উৎসবে পরিণত হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ
বিশেষজ্ঞ