ফয়সাল খান
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৩ ১০:৪৫ এএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৩ ১১:২৫ এএম
আমির হোসেন
এক যুগের বেশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত আছেন আমির হোসেন। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ময়লার গাড়ির চালক হিসেবে বেতন-ভাতা তুলছেন। কিন্তু সেই গাড়ি নিজে না চালিয়ে আলাদা চালক নিয়োগ দিয়েছিলেন।
২০২১ সালে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পাওয়ার পর আরও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন আমির। শুরুতেই নিয়োগ করা চালক স্বপনকে বাদ দিয়ে দেন তিনি। তাকে এবার করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। বিনিময়ে স্বপনের কাছে ৩ লাখ টাকা দাবি করেন আমির। বেকারত্ব ঘোচাতে সুদে, ধারদেনা করে আমিরকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেন স্বপন। কথা ছিল চাকরি হলে বাকি টাকা দেবেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর হয়ে গেলেও চাকরি পাননি তিনি। টাকা ফেরতে চাইলে উল্টো খাচ্ছেন হুমকি-ধমকি।
শুধু এই স্বপন নয়, প্রধান নির্বাহীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দোহাই দিয়ে অসহায় ও দরিদ্র অনেককে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আমির। চাকরির আশায় টাকা দেওয়া মানুষগুলো দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের গাড়ি চালানোর সুবাদে আমির এখন আর কাউকে পরোয়া করেন না। মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
দেড় বছর ধরে ‘প্রভাবশালী’ এই চালকের ঘুষ নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত নিয়েও চলছে লুকোচুরি। যদিও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, আমির হোসেন ডিএসসিসি পরিবহন চালক ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (রেজি : ২২০১) প্রচার সম্পাদক। এরই মধ্যে নানা অভিযোগে এই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত তিনজন গাড়িচালক চাকরি হারিয়েছেন। আমির হোসেন ডিএসসিসির ময়লার গাড়ি চালানো শুরু করেছিলেন ২০১১ সালে। এর চার বছরের মাথায় তিনি স্বপনকে মাসে ৭ হাজার ও দৈনিক ১ হাজার টাকা চুক্তিতে ময়লার গাড়ি চালানোর জন্য নিয়োগ দেন। স্বপন তার হয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত গাড়ি চালান। ওই বছর আমিরকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহম্মদের গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন স্বপনকে বাদ দিয়ে আমির ওই কর্মকর্তার গাড়ি চালানো শুরু করেন। পরের বছর অক্টোবরে ফরিদ আহম্মদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যোগ দিলে আমির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পান। এরপর থেকে তিনি ওই দায়িত্বেই আছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পাওয়ার পর আমির প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বাসিন্দা হিসেবে কর্মচারীদের কাছে তার আলাদা দাপট ছিল। চাকরি দেওয়ার কথা বলার সময়ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরি দেবেন বলে যাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তারা কেউই চাকরি পাননি। সিটি করপোরেশনের মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তাদের অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের দুটি কপি প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে এসেছে।
তদন্ত নিয়ে লুকোচুরি
২০২১ সালে অভিযোগ দেওয়ার পর ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব) ফরিদ আহম্মদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তার চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেবেন।
অভিযুক্ত আমির নিজেও জানিয়েছেন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছেরকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে গত ১১ জুন আবু নাছের জানান, তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো চিঠি বা নির্দেশনা আসেনি। এরপর সচিব দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখায় বেশ কয়েকবার খোঁজ নিয়েও এই তদন্তের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করলে গত ১৮ জুন নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। সচিব আকরামুজ্জামন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছেরকে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
১৯ জুন এ প্রসঙ্গে আবু নাছের জানান, এবারই প্রথম চিঠি পেয়েছেন তিনি। এর আগে চিঠি দিলে এখন ফের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হতো না।
মেয়রের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিয়ম নিয়ে তার এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। সেটি মেয়রের নজরে আসে। পরে তিনি তদন্ত করে সত্যতা পান এবং ওই কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন। কিন্তু এই গাড়িচালকের বিরুদ্ধে নিরীহ মানুষকে হয়রানি, প্রতারণা ও ঘুষগ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও তিনি রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, এসব বিষয় হয়তো মেয়র স্যারকে জানানো হয়নি। তিনি জানলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতেন।
বিষয়টি যাচাই করার জন্য প্রতিদিনের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানেন না।
আমিরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেওয়া অভিযোগে স্বপন উল্লেখ করেছেন, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের (আইচার পরী-২৩) গাড়িটি চালানোর জন্য আমির তাকে নিয়োগ করেন। তার গাড়ি চালানোর সুবাদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেন। তিনি আমার বাসায় এসে স্ত্রী ও শাশুড়ির সামনে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকাগুলো নেন। এখন পরিবহননেতা হওয়ায় আমাকে এড়িয়ে চলেন। ফোন করলে বিজি দেখিয়ে কেটে দেন আবার রিসিভও করেন না। তার বাসায় গেলে গালাগাল করেন, এমনকি ভয়ভীতি ও নানা হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।
স্বপন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সরকারি চাকরি হবে ভেবে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে এবং সুদে ঋণ নিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিই। চাকরি তো দূরের কথা, এখন টাকা চাইতে গেলে নিজের জীবন নিয়ে টানাটানি। সিটি করপোরেশনে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। একবার শ্রমিক নেতাদের মধ্যস্থতায় আমির ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন। আমি পুরো টাকা চাওয়াতে হুমকি দেন।
এসব অভিযোগ তুলে নিতে আমির হোসেনের ভাগিনা পরিচয়ে স্বপনের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তার স্ত্রীকে হুমকি দেয় এক ব্যক্তি। তাদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে রয়েছে।
মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেওয়া অন্য একটি অভিযোগ থেকে জানা গেছে, মো. আলী মুন্সির ছেলেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি দেবেন বলে তার কাছ থেকে দুই দফায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন আমির হোসেন।
অভিযোগে আলী মুন্সি উল্লেখ করেন, আমির হোসেন আমার ছেলেকে (মো. আশিক) এক বছরের মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বললে ঋণ নিয়ে তাকে দুবারে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিই। বারবার আশ্বাস দিয়েও চাকরি দেননি। এখন চাকরি তো দূরের কথা, তিনি আমার সঙ্গে উল্টাপাল্টা কথা বলেন এবং টাকার কথাও অস্বীকার করেন।
আলী মুন্সি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে কাজ করি। আমার ছেলে বড় হয়েছে। তাই আমির হোসেন চাকরির কথা বললে আমি না করিনি। আমির আমার কাছ থেকে প্রথমে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এরপর এই টাকা না দিতে পেরে আমাকে বলেন, আপনার ছেলেকে সরকারি চাকরি দেব। আপনি ৪ লাখ টাকা মিলিয়ে দেন। পরে আমি আরও ১ লাখ টাকা দিই।
কিন্তু চাকরি দেবে, দিচ্ছে বলে আর দেয়নি। এখন সে টাকাও দেয় না। টাকা চাইলে এখন তিনি বলেন, আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিইনি।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক পুরোনো। আমি অনেকবার বলেছি। সিটি করপোরেশন তদন্ত করছে, তাই এ নিয়ে কিছুই বলতে চাই না।