রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৪ এএম
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১১:৪০ এএম
ক্রেমলিনে ২০১৩ সালে শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চুক্তি সই অনুষ্ঠানে টিউলিপ সিদ্দিক, সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ রেহানা ও রূপন্তী সিদ্দিক।
চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারির কথা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তখন মাত্র ১৬ দিন বাকি। এর মধ্যেই সেদিন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল-একনেক বৈঠকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় আরও ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের এই অতিরিক্ত ব্যয় ধরে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এই অর্থ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমাও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সাল করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ানোর এই প্রস্তাব অনুমোদনের পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পটি আমাদের দেশের জন্য ‘শ্বেতহস্তী’ হয়ে দাঁড়াবে কি না।
পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। ২০১৬ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রতি ডলারের দাম ধরা হয়েছিল ৮০ টাকা। যা বেড়ে হয়েছে ১২২ টাকার বেশি। অর্থাৎ মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।
যেহেতু রূপপুর প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থই বিদেশি ঋণনির্ভর এবং বড় অংশের ব্যয় ডলারে পরিশোধযোগ্য, তাই বিনিময় হারের এই পরিবর্তন সরাসরি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. কবির হোসেনের ভাষায়, “ডলারের দর বৃদ্ধিই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান চালক।” বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময় বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়াই এখন বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
রূপপুর বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, পরামর্শক সেবা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ব্যয় প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলক কম ধরে নেওয়া হয়েছিল।
বাস্তবায়নের পথে এসে দেখা যাচ্ছে, এসব খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ৩৮টি উপাদানের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং নতুন করে ১০টি উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। গ্রিন সিটি আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরিও ব্যয় বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কিছু রুশ ব্যাংকের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
এর ফলে নির্মাণকাজের পাশাপাশি ঋণচুক্তি ও অর্থছাড়ের সময়সীমাও একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে। সময় বৃদ্ধির অর্থ শুধু বিলম্ব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি আর্থিক ব্যয়, সুদ ও প্রশাসনিক খরচ। ফলে প্রকল্পটি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। জ্বালানি লোডিং ও চূড়ান্ত কারিগরি পরীক্ষায় জটিলতা থাকায় সময় বাড়ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ৭ এপ্রিল থেকে জ্বালানি লোডিং শুরু হলে বছরের মাঝামাঝি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকল্প কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, পরীক্ষার সময় একাধিক কারিগরি সমস্যা ধরা পড়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে রূপপুরের বিদ্যুতের ট্যারিফে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম চার সেন্টের আশপাশে থাকবে বলে যে হিসাব করা হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা আর প্রযোজ্য নয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান ডলারের দর বিবেচনায় নিলে রূপপুরের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট কমপক্ষে ১০ টাকা হতে পারে। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ পরিশোধের সময় উৎপাদন ব্যয় আরও বেশি থাকবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমানের মতে, “ডলারের দর যদি আরও বাড়ে, তাহলে পারমাণবিক বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার অনেক ওপরে চলে যাবে। এতে ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থায় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রকল্পের স্বচ্ছ ব্যয় মূল্যায়ন, বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে এই বিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতি সিদ্ধান্ত।
নির্মাণব্যয় বিতর্ক
ভারত, তুরস্ক, ইরান, বুলগেরিয়াসহ বেশ কিছু দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে রাশিয়ার রোসাটম। এসব দেশে রোসাটমের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণব্যয়ের তুলনায় রূপপুরের নির্মাণব্যয় বেশি।
ভারতের কুদামকুলামে রাশিয়ার ভিভিইআর ১০০০ প্রযুক্তিতে দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রয়েছে। সেখানে একই প্রযুক্তির আরও চারটি ইউনিট স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও দুটি ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এই ছয়টি ইউনিট নির্মাণে সেখানে মোট ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা।
রাশিয়ার রোসাটম ফিনল্যান্ডে ১২০০ মেগাওয়াটের ভিভিইআর প্রযুক্তির একটি পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণ করছে। এটি নির্মাণে ৬ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকার কিছু বেশি) ব্যয় ধরা হয়েছে।
এখানে ইউনিটপ্রতি নির্মাণব্যয় বা ওভারনাইট কস্ট ৫ হাজার ডলার। রাশিয়ার প্রযুক্তিতে তুলনামূলক কম টাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে তুরস্কে। তুরস্কের আক্কুইউ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চার ইউনিটের (প্রতি ইউনিট ১২০০ মেগাওয়াট)। কেন্দ্রটি থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
চার ইউনিটের এ কেন্দ্রের পেছনে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ১৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা)। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২০০ ডলার (৩ লাখ ৮১ হাজার ৭৭৩ টাকা)।
পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তিতে দুই ইউনিটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণব্যয় এশিয়া মহাদেশের অন্য দেশগুলোর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণব্যয়ের তুলনায় বেশি।
শুধু তা-ই নয়, নির্মাণব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জাপান, ফিনল্যান্ড, স্লোভাকিয়া রিপাবলিক, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারত, এমনকি রাশিয়াকেও পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন পর্যায়ের চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্টসহ) পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
রূপপুরের মূল প্রকল্পের নির্মাণব্যয়ের বাইরে আরও ১৯ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এসব ব্যয় মূল প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যেমন, রূপপুর প্রকল্পের জন্য ২২ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ৩৩৯ কোটি টাকা। এ অর্থ দিয়েছে রেল মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। ফিজিক্যাল প্রোটেকশন সিস্টেম (পিপিএস) প্রকল্পের পেছনে এই অর্থ ব্যয় হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ডিজাইন বেসিস থ্রেটের (ডিবিটি) বাইরে থেকে আসা ঝুঁকি মোকাবিলা করাও এই প্রকল্পের লক্ষ্য। এসব প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠান পিজিসিবি সূত্র বলেছে, রূপপুরের বিদ্যুৎ দেশের আট জেলায় সরবরাহে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। এই অর্থ ভারত থেকে ঋণ আকারে নিয়েছে বাংলাদেশ। সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ করছে তিনটি ভারতীয় কোম্পানি।
রূপপুর প্রকল্পের তথ্যপ্রযুক্তির পেছনে আরও ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রকল্প অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে।
এমনকি প্রকল্পের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি আনতে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে পাবনার পাকশী পর্যন্ত নদীপথ খননে (ক্যাপিটাল ড্রেজিং) ব্যয় হয়েছে ২৩২ কোটি টাকা।
তবে ২০১৮ সালে এই ড্রেজিং করার এক বছরের মাথায়ই নদীর নাব্যতা আগের অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪২ কোটি টাকা।
সার্বিক বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাটাই ছিল অপ্রয়োজনীয়। এত অর্থ ব্যয় করে এই প্রকল্প করার মানে নেই। এটার স্বচ্ছতা নেই।”