প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৭ এএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪১ এএম
চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ ও হীরা ক্রয়-বিক্রয় করে অবৈধভাবে ৬৭৮ কোটি টাকা অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আলোচিত ডায়মন্ড ব্যবসায়ী দিলীপ আগারওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা করেছে সিআইডি। সোমবার গুলশান থানায় মামলাটি হয়। মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) সিআইডির মিডিয়া শাখা থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে দিলীপ কুমার আগারওয়ালা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সিআইডির পুলিশ সুপার জসিম উদ্দীন
খান জানিয়েছেন, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সিআইডি
ঢাকার ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের আর্থিক লেনদেন, নথিপত্র
ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি
স্থানীয় বাজার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ করে অবৈধ পন্থায়
অর্থ উপার্জন করেছে। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণে চোরাচালান ও উৎসহীন অর্থ উপার্জনের সত্যতা
মেলায় ১৭ নভেম্বর
দিলীপ কুমার আগারওয়ালার বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার মানি লন্ডারিং মামলা করা হয় গুলশান থানায়। অনুসন্ধানে অবৈধ পন্থায় অর্জিত ৬৭৮ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া
গেছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল
ক্রাইম ইউনিটের অনুসন্ধানে জানা যায়, দিলীপ
কুমার আগারওয়ালা ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী
হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে স্বর্ণ ও হীরা ব্যবসা পরিচালনার আড়ালে অর্থ পাচার
ও চোরাকারবারি করে আসছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালের ৬
সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এলসির
মাধ্যমে বিদেশ থেকে মোট ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার স্বর্ণবার, অলংকার, লুজ
ডায়মন্ড ও অন্যান্য দ্রব্য বৈধভাবে আমদানি করে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয়, বিনিময়, পরিবর্তন পদ্ধতিতে মোট ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ করে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সিআইডিকে
এর উৎস বা সরবরাহকারী সংক্রান্তে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়। বৈধ নথি না
থাকায় এসব বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরা অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে
বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়।
চোরাচালানের মাধ্যমে
অর্জিত সম্পদ ও অপরাধলব্ধ অর্থ রূপান্তর, হস্তান্তর বা ব্যবহার
সংক্রান্ত তথ্য ও নথিপত্র পর্যবেক্ষণে মানি লন্ডারিংয়ের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান
হলে অনুসন্ধান প্রতিবেদন অতিরিক্ত আইজিপি, সিআইডি বরাবর দাখিল করা হয়।
পরবর্তীতে ১৬ নভেম্বর সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মামলা দায়েরের
অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের বিরুদ্ধে গুলশান থানায়
দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলা সিআইডির তফসিলভুক্ত হওয়ায় এর তদন্ত সিআইডিই পরিচালনা
করবে। প্রয়োজনীয় নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের
তথ্য যাচাই করে আইন অনুযায়ী নিবিড় তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সিআইডি। রাষ্ট্রের
অর্থ পাচারে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের
আর্থিক স্বার্থ সংরক্ষণে সিআইডির এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে দিলীপ
কুমার আগারওয়ালার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও
সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত অক্টোবর মাসে মামলা দুটি করা হয়। পৃথকভাবে করা দুই
মামলার মধ্যে দিলীপ কুমার আগারওয়ালার বিরুদ্ধে অসাধু উপায়ে ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ৪০৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ
অর্জন করেছেন। তার নামে থাকা ৩৪টি ব্যাংক হিসাবে ৭৫৫ কোটি ৩০ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৩
টাকার সন্দেহজনক লেনদেনও শনাক্ত হয়েছে। এসব অর্থ হস্তান্তর, রূপান্তর
ও স্থানান্তরের মাধ্যমে তিনি প্রকৃত আয়ের উৎস আড়াল করেছেন। অন্যদিকে
দিলীপের স্ত্রী সবিতা আগারওয়ালা জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ
৪৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৭ হাজার ২৮৭ টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন ও দখলে রেখেছেন। তার
৮টি ব্যাংক হিসাবে ২১৩ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৯২৭ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণও
পেয়েছে দুদক। সবিতা আগারওয়ালার বিরুদ্ধেও একই ধারায় মামলা করা হয়। মামলার আগে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার ও তার স্ত্রীর আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন
আদালত। পরে দুদক তা জব্দ করে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪
সালের ৩ সেপ্টেম্বর দিলীপ কুমার আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরদিন তাকে
আদালতে তোলা হলে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই
মামলায় দিলীপ কুমার আগারওয়ালাকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন
আদালত। জুলাই আগস্ট গণহত্যার অভিযোগে একাধিক হত্যা মামলায়
তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলায় নিম্ন ও উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন তার
আইনজীবীরা। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর ১ অক্টোবর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। অভিযোগ
রয়েছে জামিন পেয়ে গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আগারওয়ালা। তাকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা
করে একটি বিশেষ মহল। পুলিশের ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকেও বিষয়টি গোপন রাখা হয়। দিলীপ কুমার আগারওয়ালা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১
(আলমডাঙ্গা ও সদরের একাংশ) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করে হেরে যান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক
উপকমিটির সদস্য।